বুধবার | মে ২৭, ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সংকেত

২০২০ সালের শেয়ারবাজার

হতাশা নাকি ঘুরে দাঁড়ানোর বছর

২০১৮ ও ২০১৯ সালে শেয়ারবাজারে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের নিট লেনদেন ছিল নেতিবাচক। কিন্তু বর্তমান বাজারের মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও) বিবেচনা করলে দেশী ও বিদেশী দুই শ্রেণীর বিনিয়োগকারীদের জন্যই অত্যন্ত আকর্ষণীয়

ক্রমাগত সূচকের দরপতন আর পোর্টফোলিওতে থাকা শেয়ারের সম্পদমূল্য কমার মধ্য দিয়ে একটি হতাশাজনক বছর পার করেছে দেশের শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা। অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে নতুন বছরে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে, এমন প্রত্যাশা করতেও সাহস পাচ্ছেন না বিনিয়োগকরীরা। আর এরই প্রতিফলন দেখা গেছে নতুন বছরের প্রথম দুই কার্যদিবসের লেনদেনে। এ সময় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ব্রড ইনডেক্স বেড়েছে মাত্র ৬ পয়েন্ট। নতুন বছর হতাশায় কাটবে নাকি ঘুরে দাঁড়াবে শেয়ারবাজারএ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শঙ্কা কাজ করছে। এ বছর দেশের শেয়ারবাজার কেমন যাবে, এ নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন।

গেল বছর দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক ছিল ইতিবাচক। পাঁচ বছর ধরেই বাংলাদেশ গড়ে ৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। গেল অর্থবছরে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। দেশের শিল্প খাতের কারণে এ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যা দেশের মোট অর্থনীতির ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ। সরকার চলতি অর্থবছর ৮ দশমিক ২০ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। অবকাঠামো খাতের মেগা প্রকল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি মাথাপিছু আয় বাড়ার প্রভাবে ভোগের পরিমাণ বাড়লে এ লক্ষ্যমাত্রা সহজেই অর্জন করা সম্ভব হবে।

২০১৯ অর্থবছরে দেশের সার্বিক সিপিআই মূল্যস্ফীতির পরিমাণ ছিল ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ৫ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। চলতি অর্থবছরে সরকার মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও গত অর্থবছরে দেশের প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের হার ছিল ইতিবাচক। এ বছরও এটি ইতিবাচক থাকবে বলে ধারণা করা যায়। ২০১৯ অর্থবছরে রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং পোশাক খাতের কারণেই রফতানিতে দুই অংকের প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছে। তবে চলতি ২০২০ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাস রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল নেতিবাচক। রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক মুদ্রা বিনিময় হার অর্থবছরের বাকি সময়ে রফতানি প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো খাতের মেগা প্রকল্পের নির্মাণসামগ্রীর কারণে গেল অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। তবে চাল ও অন্যান্য খাদ্যশস্যের বাম্পার ফলনের কারণে এ সময়ে খাদ্যশস্য আমদানির পরিমাণ কমেছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের পাশাপাশি মেগা প্রকল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির কারণে চলতি অর্থবছর আমদানি প্রবৃদ্ধির হার বাড়বে বলেই ধারণা করা যায়।

চলতি হিসাবে ২০১৯ অর্থবছরে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা গেছে। রফতানির পরিমাণ বাড়ানোর বিপরীতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনার পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রবণতা চলতি অর্থবছরে চলতি হিসাবে ঘাটতির পরিমাণ সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সহায়ক হতে পারে। ২০১৯ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ কমে ৩২ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ সময় ডলারের বিপরীতে টাকার ২ দশমিক ২৯ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে। অন্যান্য প্রতিযোগী দেশে মুদ্রার অবমূল্যায়ন হলেও বাংলাদেশে মুদ্রার অবমূল্যায়ন হবে না বলে জানিয়েছে সরকার। ফলে সামনের দিনগুলোতে রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে পারে।

ব্যবসার ব্যয় কম হওয়ার কারণে বাংলাদেশ বিদেশী উৎপাদকদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান হয়ে উঠতে পারে। তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর আধিক্য, সস্তা শ্রম ও জ্বালানি ব্যয়, পরিবহন সুবিধা এবং নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ফলে সামনের দিনগুলোতে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়বে বলে প্রত্যাশা।

কঠিন তারল্য পরিস্থিতি এবং সঞ্চয়পত্রের উচ্চসুদের কারণে গত অর্থবছরে সুদের হার ছিল ঊর্ধ্বমুখী। এ সময় বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত সীমা ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশের অনেক কম। খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকের ঋণ সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ না হওয়ার কারণে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ধারের পরিমাণ বাড়ছে। সম্প্রতি সরকার সুদের হার ৯ শতাংশ কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি কার্যকর করা গেলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়বে বলে প্রত্যাশা করা যায়।

বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও দেশের অর্থনীতির সার্বিক অগ্রগতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না শেয়ারবাজার। গেল বছরের প্রথম মাসে বাজার ছিল ইতিবাচক। কিন্তু এর পর থেকেই গতি হারানো শুরু হয়। আর্থিক খাতের তারল্য সংকট, পিপলস লিজিংয়ের অবসায়ন ঘোষণার প্রভাব, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, গ্রামীণফোনের সঙ্গে বিটিআরসি দ্বন্দ্ব এবং বস্ত্র খাতের কোম্পানিগুলোর রফতানি কমে যাওয়ার নেতিবাচক প্রভাবের কারণে গত বছর পুঁজিবাজারে সূচকের ধারাবাহিক নিম্নমুখিতা লক্ষ করা গেছে। ব্যাংকের সুদের হার কমানো সম্ভব হলে আমানতকারীদের তহবিলের একটি অংশ পুঁজিবাজারে আসার সুযোগ তৈরি হবে। স্টক লভ্যাংশের ওপর করারোপ চলতি অর্থবছর শেষে কার্যকর হবে। এর ফলে বাড়তি করের ভয়ে কোম্পানিগুলোর মধ্যে অহেতুক স্টক লভ্যাংশ দেয়ার প্রবণতা কমার বিপরীতে নগদ লভ্যাংশ দেয়ার প্রবণতা বাড়বে। আর এর ইতিবাচক প্রভাব দেখা যেতে পারে পুঁজিবাজারে।

বিদ্যুৎ খাতের বেশকিছু বড় প্রকল্পে সরকার গত ১০ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এর ফলে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার চেয়ে বেশি হয়েছে। এতে সামনের দিনগুলোতে বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে সরকারের বিদ্যুৎ কেনার পরিমাণ কমতে পারে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পৌঁছে যাওয়ার কারণে গ্রাহকদের মধ্যে ডাটা ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ছে। এর ফলে সামনের দিনগুলোতে টেলিযোগাযোগ খাতে ভালো প্রবৃদ্ধির

সম্ভাবনা রয়েছে। মানুষের আয় বাড়ার পাশাপাশি নগরায়ণের প্রসারের কারণে খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের কোম্পানিগুলোর ভালো প্রবৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। ২০১৯ অর্থবছরে ওষুধ খাতে ৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে এবং গত পাঁচ বছরে এ খাতে গড়ে ১৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। স্থানীয় ও বিদেশের বাজারে ভালো সুযোগ থাকায় সামনের দিনগুলোতে ওষুধ খাতের কোম্পানিগুলোর ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।

যদিও গত ২০১৮ ও ২০১৯ সালে শেয়ারবাজারে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের নিট লেনদেন ছিল নেতিবাচক কিন্তু বর্তমান বাজারের মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও) বিবেচনা করলে দেশী ও বিদেশী দুই শ্রেণীর বিনিয়োগকারীদের জন্যই অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তাছাড়া বর্তমানে অনেক বড় মূলধনি ও ভালো কোম্পানির শেয়ারদর অনেক কম। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা সবসময় ফ্রন্টিয়ার মার্কেটগুলোতে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজে বেড়ায়। একদল বিদেশী বিনিয়োগকারী বাংলাদেশ থেকে তাদের বিনিয়োগ তুলে নিয়ে গেলেও অন্য আরেক দলের এখানে বিনিয়োগের ভালো সুযোগ রয়েছে। কারণ তারা সবসময় সবচেয়ে কম দামে শেয়ার কিনে সর্বোচ্চ দামে বিক্রি করে মুনাফা করতে আগ্রহী। এ সুযোগ দেশী বিনিয়োগকারীদের জন্যও একইভাবে প্রযোজ্য।

প্রত্যাশিত রিটার্ন না পাওয়ায় বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ক্রমশ কমছে। গত সাড়ে তিন বছরে ছয় লাখের বেশি বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজার ছেড়ে গেছে। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) তথ্যানুসারে, ২০১৬ সালের ২০ জুন পুঁজিবাজারে বিও হিসাবের সংখ্যা ছিল ৩১ লাখ ৮৯ হাজার ৯৪৩টি। এর মধ্যে পুরুষ বিনিয়োগকারী ছিল ২৩ লাখ ২৪ হাজার ৬৯৩ জন আর নারী বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৬৫ হাজার ২৫০। তাছাড়া এ সময় অনিবাসী বাংলাদেশী বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫৯ হাজার ১৯২। সর্বশেষ এ বছরের ২ জানুয়ারি দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৭৩ জনে। বাজার ছেড়ে গেছে ৬ লাখ ২৪ হাজার ৮৭০ জন বিনিয়োগকারী। এর মধ্যে পুরুষ বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমেছে ৪ লাখ ৪৫ হাজার ৫৬৬ এবং নারী বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমেছে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৩০৪। আর এ সময়ে অনিবাসী বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমেছে ১৩ হাজার ৬৭৬।

বিপুলসংখ্যক এই বিনিয়োগকারী বাজারের আচরণে বীতশ্রদ্ধ হয়ে চলে গেছে বলে ধারণা করা যায়। আবার এর মধ্যে নিষ্ক্রিয় বিও হিসাবের সংখ্যাও রয়েছে, যেগুলো নবায়ন ফি না দেয়ার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। যদিও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের বিপরীতে এসব বিনিয়োগকারীর যা লোকসান হয়েছে, তার কতটুকু বাজারের কারণে আর কতটুকু নিজেদের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে, সেটিও একটি বিবেচ্য বিষয়। তবে যাই হোক এই বিনিয়োগকারীদের আবারো বাজারে ফিরিয়ে আনতে পারলে বাজারে একটি সার্বিক ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এজন্য সবার আগে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। সরকারও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আন্তরিক। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী বাজারে সুশাসনের ঘাটতির বিষয়টি উল্লেখ করে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নির্দেশনা দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রীর এ নির্দেশনা কার্যকর হলে সামনের দিনগুলোতে বাজারে সুশাসন আরো সুদৃঢ় হবে বলে আশা করা যায়। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে থাকা আস্থার সংকট কতটুকু দূর হবে, সেটি দেখার বিষয়। সার্বিকভাবে এ বছর বাজার নিয়ে অতি আশাবাদী হওয়ারও কিছু নেই, আবার একেবারে হতাশ হওয়ারও কিছু নেই। তবে অপ্রত্যাশিত কোনো সিদ্ধান্ত কিংবা বিষয় যেকোনো মুহূর্তে বাজারের গতি পরিবর্তন করে দিতে পারে, সেটিও মনে রাখতে হবে।

 

এলবিএসএল বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট রিভিউ ২০১৯ এবং ডিএসই

সিডিবিএল ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অবলম্বনে

মেহেদী হাসান রাহাত