শুক্রবার | মে ২৯, ২০২০ | ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

বিশেষ সংখ্যা

বাংলাদেশের মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস

মামুন রশীদ

ফিনটেক বিশ্বব্যাপী একটি উদীয়মান খাত, যা গ্রাহক ও ব্যবসা উভয়ের জন্য আর্থিক পরিষেবা পুনর্নির্মাণে প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যার ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অভূতপূর্ব প্রভাব পড়ে। বর্তমান ডিজিটাল যুগের সহজ প্রবেশাধিকার, সুবিধা, দক্ষতা ও গতির দাবি ফিনটেক শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিশাল বাজার তৈরি করেছে। ফিনটেক প্লাটফর্মভিত্তিক ডিজিটাল ফিন্যান্স সার্ভিস (ডিএফএস) মূলত আর্থিক ব্যবস্থাপনা ব্যক্তি ও ব্যবসার হাতের মুঠোয় এনে দেয়। ফলে লোকজন খুব সহজেই দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও লেনদেন করতে পারে। প্লাটফর্মটি বিভিন্ন আর্থিক পরিষেবা নিয়ে গঠিত, যা লেনদেন, সঞ্চয়, ঋণ, বীমা ও রেমিট্যান্সের মতো ডিজিটাল চ্যানেলের মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া ডিএফএসের মধ্যে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে অন্যতম চার উপাদানের একটি হচ্ছে ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহার। এটি কার্যকর করার পর থেকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমএফএসের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি: মূল পরিসংখ্যান
আর্থিক বিকাশের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক ব্যবস্থা অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক, যা একই সঙ্গে আমাদের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি উল্লেখযোগ্য, যেখানে অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর লোকেরা আজও আনুষ্ঠানিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মৌলিক আর্থিক পরিষেবা গ্রহণের সুবিধা থেকে দূরে রয়েছে। মনে রাখতে হবে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি মানে শুধু গ্রামে-গঞ্জে বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা খোলা নয়।
আমাদের দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠী মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। তবে শুধু ৪১ শতাংশ বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো আনুষ্ঠানিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। এমএফএস বাংলাদেশে আর্থিক ও প্রযুক্তির সেবা অঙ্গীভূতকরণের পাশাপাশি গ্রাম ও শহরে টাকা লেনদেনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পরিষেবার উন্নতির মাধ্যমে এটি কেবল অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠাই করছে না, বরং প্রচলিত পিরামিড মার্কেট ব্যবস্থায় উন্নত অনুপ্রবেশ নিশ্চিত করছে ও অনলাইন ই-কমার্স লেনদেনে উন্নতি ঘটিয়েছে। গ্লোবাল ফিনডেক্স ২০১৭ অনুযায়ী, দেশটির প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ৫০ শতাংশের আর্থিক হিসাব রয়েছে, যা ২০১৪ সালে ছিল ৩১ শতাংশ। এ অগ্রগতির প্রায় পুরোটাই ঘটেছে বিকাশ মোবাইল মানি হিসাবে ২০ শতাংশ বৃদ্ধির কারণে।

এমএফএস খাতের নিয়ন্ত্রণজনিত প্রাসঙ্গিকতা

হিসাবধারীর সংখ্যা ও লেনদেনের পরিমাণ বিবেচনায় ২০১১ সালে এমএফএস চালু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক এক্ষেত্রে জোরালো প্রবৃদ্ধি প্রত্যক্ষ করেছে এবং এ-সংক্রান্ত বহু অভিজ্ঞতা লাভ করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় উদ্ভাবনমূলক পরিসর সৃষ্ট সুযোগের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত ও পুরনো আর্থিক সেবা সম্প্রসারণের জন্য একটি অধিকতর যৌক্তিক, সহায়ক ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ প্রদানের লক্ষ্যে ২০১৮ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি নতুন নিয়ন্ত্রণ গাইডলাইন প্রকাশ করেছে।
আলোচ্য গাইডলাইন অনুযায়ী এমএফএস সেবা প্রদানকারীরা কেবল দেশের তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংকের নেতৃত্বে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। তবে এসব ব্যাংক একটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান গঠন করতে পারে, যেটি কেবল এমএফএস সেবা দেবে। ব্যাংককে ওই সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানে অন্তত ৫১ শতাংশ ইকুইটি রাখতে হবে, বোর্ড পর্ষদের সংখ্যাধিক্যে থাকতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের লোকজন। অধিকন্তু মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর ছাড়া কোনো ব্যাংক একটি স্বতন্ত্র সাবসিডিয়ারি পরিচালনা করতে পারে কিংবা অন্য ব্যাংক বা ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ইকুইটি পার্টনারও রাখতে পারে। তারপর ব্যাংকটি পেমেন্ট সাপ্লাই প্রভাইডার (পিএসপি) হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্টে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ন্যূনতম ৪৫ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন রাখার মাধ্যমে সাবসিডিয়ারি মডেলভিত্তিক এমএফএস সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেয়। অধিকন্তু ঝুঁকি দূরীকরণে রিটেইন্ড আর্নিংস থেকে পরিশোধিত মূলধনের সমপরিমাণ রিজার্ভ ‘ক্যাপিটাল’ তৈরিরও বিধান রাখা হয়েছে। লোকসান হলে ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন বজায় রাখতে এমএফএস সেবা প্রদানকারীদের অতিরিক্ত মূলধন ইনজেক্ট করতে হতে পারে।
ফরেন পেমেন্টের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নস্ট্রো হিসাবের মাধ্যমে কেবল এমএফএস ক্রেডিট গ্রহণ করবে এবং কেবল বাংলাদেশী টাকার মাধ্যমে সুফলভোগীর এমএফএস অ্যাকাউন্টে সমপরিমাণ অর্থ প্রদান করবে। এমএফএস সেবা প্রদানকারীরা কোনো বহির্মুখী বা আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট ট্রানজেকশন করতে পারে না।


আইপে
আইপে হলো একটি ডিজিটাল ই-ওয়ালেট। নিজেদের ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে সংযোগ সাধন করে এটি গ্রাহকের অর্থ লেনদেনে সহায়তা করে। এ সেবা বর্তমানে দেশের ৫৭টি ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত। এ লেনদেন ব্যবস্থা দুই হাজারেরও বেশি আউটলেটে শতাধিক ব্র্যান্ড দ্বারা স্বীকৃত।


নগদ
বাংলাদেশের ডাক বিভাগের একটি ডিজিটাল আর্থিক সেবা হলো নগদ। দেশের নানা প্রান্তে এটির সাড়ে আট হাজারের ওপর শাখা আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হওয়ায় এটি বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক সুবিধা উপভোগ করে। এটা মূলত পোস্টাল অ্যাক্টের কারণে। ফলে দেশের অন্য এমএফএস সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের তুলনায় নগদ নিজস্ব গ্রাহকদের পাঁচ গুণেরও বেশি লেনদেনসীমা উপভোগের সুযোগ দিতে পারে। ডাক বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দেয়া তথ্যানুযায়ী, নগদের প্রায় ৩০ লাখ সক্রিয় গ্রাহক আছে। একজন নগদ গ্রাহক নিজের হিসাবে দৈনিক আড়াই লাখ টাকা জমাতে পারে, যেটি অন্য এমএফএস অপারেটরের জন্য অনুমোদিত ৩০ হাজার টাকার ৮ গুণেরও বেশি।


ডিমানি
ডিমানি হলো পোস্ট অফিসের সঙ্গে কাজ করা একটি ফিনটেক কোম্পানি। এটি শুরু হয়েছে কেবল চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে। তাদের উদ্দেশ্য গ্রামীণ ও বিচ্ছিন্ন এলাকার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর নাগালে পৌঁছানো। এটি কেবলই ‘ডাক টাকা’ চালু করেছে। এটি এমন এক ব্যাংকিং সেবা, যা ব্যবহারকারীদের ২ টাকারও কমে হিসাব খোলার সুযোগ দেয় এবং এটি গ্রাহকদের টাকা উত্তোলন ও জমা দেয়াসহ অর্থ পরিশোধেরও সুযোগ দেয়। প্রথম ইসলামী ই-ওয়ালেট সেবা প্রদানে তারা সম্প্রতি আল-আরাফাহ ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি সই করেছে।


বিকাশ
দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় এমএফএস হলো বিকাশ। তাদের বাজার অংশীদারিত্ব ৫০ শতাংশেরও বেশি। অধিকন্তু নগদ লেনদেন সহজতর করার মাধ্যমে তারা দেশে ১ লাখ ৮০ হাজার এজেন্টের ব্যবসা চাঙ্গা করেছে। প্রতিষ্ঠানটি অব্যাহতভাবে বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে একযোগ হচ্ছে। বিকাশের বড় গ্রাহকভিত্তি রয়েছে। তারা রেমিট্যান্স প্রেরণ সহজ করেছে এবং সঞ্চয়ের ওপর সুদও দেয়।
ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ও আলিপে সিঙ্গাপুর ই-কমার্স প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিটির ইকুইটি পার্টনার। বিল গেটস ফাউন্ডেশন ও আলিপে এ কোম্পানিতে নন-ভোটিং প্রেফারেন্স শেয়ার ধারণ করে। অধিকন্তু কোম্পানিটি অ্যান্ট ফিন্যান্সিয়ালের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব ঘোষণা করেছে।


রকেট
রকেট হচ্ছে একটি ব্যাংক লেড বা ব্যাংক নেতৃত্বাধীন মডেল। বিভিন্ন এজেন্ট ছাড়াও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ১৮২টি শাখায় এ সেবা পাওয়া যায়। এটি প্রথম কোম্পানি, যা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ব্যাংকিং পরিষেবা চালু করেছে। বাজার অংশীদারিত্বে বিকাশের পর দ্বিতীয় স্থান অধিকারী রকেটের রয়েছে প্রায় ২ লাখ ১৯ হাজার এজেন্ট।


নেক্সাস পে
উন্নত ব্যাংকিং সেবা দান ও গ্রাহকদের কার্ড সমন্বয়ের লক্ষ্যে এটি ডিবিবিএল হিসাবধারীদের একটি অ্যাপ প্রদান করে। ২০১৮ সাল শেষে নেক্সাস পে অ্যাপ ডাউনলোডের সংখ্যা ১৭ লাখে উন্নীত হয়েছে। অন্য প্রতিযোগীদের মতো নেক্সাস পের মাধ্যমে প্রদত্ত সব সেবার মূল্য সম্পূূর্ণভাবে ফ্রি এবং এর জন্য বাড়তি কোনো কমিশনের প্রয়োজন হয় না। বর্তমানে ৬২৮ জন নেক্সাস পে মার্চেন্ট রয়েছে।


বাংলাদেশের বাইরে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস
বিশেষভাবে কেনিয়ায় মোবাইল মানি হিসাব বিস্তার লাভ করেছে, যেখানে ৭৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্কের একটি করে এমএফএস হিসাব রয়েছে। তাছাড়া উগান্ডা এ জিম্বাবুয়েতে প্রায় ৫০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্কের এমএফএস হিসাব আছে। সাব-সাহারান আফ্রিকার ১০টি দেশের অর্থনীতিও এমএফএসে এগিয়ে, যেখানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হিসাবধারীর সংখ্যাকে মোবাইল মানি হিসাবধারীরা ছাড়িয়ে গেছে। এসব অর্থনীতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত বুরকিনা ফাসো, শাদ, আইভোরি কোস্ট, গ্যাবন, কেনিয়া, মালি, সেনেগাল, তানজানিয়া, উগান্ডা ও জিম্বাবুয়ে।


আফ্রিকা
দুর্নীতি মোকাবেলার হাতিয়ার হিসেবে ও আফ্রিকায় ইবোলার অপপ্রচার এড়াতে ইমারজেন্সি-রেসপন্স ওয়ার্কারদের বেতন প্রদানে এমএফএস ব্যবহূত হয়।


এম-পেসা
এম-পেসা হলো ২০০৭ সালে সাফারিকম দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি এমএফএস অ্যাপ। ২০১৮ সালের তথ্যানুযায়ী এম-পেসার ৩ কোটি ৭০ লাখের বেশি সক্রিয় গ্রাহক এবং কঙ্গো, মিসর, ঘানা, কেনিয়া, লেসোথো, মোজাম্বিক, তানজানিয়ায়সহ মোট সাতটি দেশে এর চার লাখ এজেন্ট রয়েছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর নাগাদ ৩ কোটি ৭০ লাখ সক্রিয় গ্রাহক ১ হাজার ১০০ কোটি লেনদেন করেছে এবং প্রতি সেকেন্ডে গড় লেনদেন ৫০০টি। কেনিয়ায় ৮০ শতাংশ বাজার এম-পেসার দখলে।
২০১৯ সালে এম-পেসার মোট লেনদেন মূল্য ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে এবং লেনদেনের পরিমাণে বেড়েছে ২২ দশমিক ১ শতাংশ। পুরো প্ল্যাটফর্মটি ২০১৯ সালে ১৯ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। এটি যেমন গ্রাহক সংখ্যার দিক থেকে, তেমনি তহবিলের উচ্চতর বেগের দিক থেকেও। ২০১৯ অর্থবছরে আমরা ২১ লাখ সক্রিয় এম-পেসা গ্রাহক যোগ হতে দেখেছি।
এম-পেসা গ্লোবাল সহজতর করতে সাফারিকম পেপ্যাল, গুগল প্লে স্টোর, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন ও আলি এক্সপ্রেসের সঙ্গে চুক্তি করেছে। পেপ্যালের মাধ্যমে এম-পেসা গ্রাহকরা মাসে ১১ হাজারের অধিক লেনদেন করে, গুগল প্লে স্টোরের মাধ্যমে মাসে ৫ হাজার ২০০-এর বেশি অ্যাপ কিনতে পারে এবং ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মাধ্যমে পাঁচ লাখের অধিক ক্যাশ এজেন্ট এবং বিশ্বব্যাপী ৩০০ কোটির অধিক ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠাতে পারে।


চীন
চীনে প্রায় ৮১ কোটি ৭০ লাখ মোবাইল ফোন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে ৫৮ কোটি ৩৪ লাখ লোক মোবাইল পেমেন্ট অ্যাপ ব্যবহার করে। ১২ লাখ ২৫ হাজার কোটি ডলারের মোট লেনদেনসহ চলতি বছরের তথ্যনুযায়ী এটি প্রায় ৭৭ দশমিক ৪ শতাংশ। গত বছর থেকে এটি ৩১ দশমিক ৫২ শতাংশ বেড়েছে। অনুমান করা হচ্ছে, ২০২৫ সাল নাগাদ চীনা মোবাইল পেমেন্ট বাজার ২ কোটি ৫৬ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলারের সমপরিমাণ হবে। আলিপে ও টেনসেন্ট চীনের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।


আলিপে
অ্যান্ট ফিন্যান্সিয়েলের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী এরিক জিঙ্গের মতে, আলিপে ও এর স্থানীয় ই-ওয়ালেট প্রভাইডাররা ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ১২০ কোটি গ্রাহকদের সেবা দিয়েছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের হিসাব থেকে এটি ২০ শতাংশ বেশি। আলিপে দৈনিক ১৭ কোটি ৫ লাখের ওপর লেনদেন সম্পন্ন করে। ২০১৯ সালে কোম্পানিটি তাদের অ্যাপে একটি ‘টুর পাস’ সুবিধা চালু করেছে, যেটি চীনে যাওয়া পর্যটকদের নিজেদের বিদেশী মোবাইল নম্বরে অ্যাপটি নিবন্ধনের মাধ্যমে লেনদেনের সুযোগ করে দেয়।
২০১৮ সালে আলিপে ড্রাগনফ্লাই চালু করেছে, যেটি একটি ফেসাল রিকগনিশন পেমেন্ট ডিভাইস। এ ডিভাইসের ব্যয় গতানুগতিক সেল্ফ সার্ভিস পস মেশিনের চেয়ে ৮০ শতাংশ কম এবং এটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা মার্চেন্টদের প্রতিবন্ধকতা দূর করে।

বাংলাদেশে এমএফএসের চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা
বাংলাদেশে বিকাশ ৫৩ শতাংশের সর্বোচ্চ বাজার অংশীদারিত্ব ধারণ করে। এ ধরনের প্রভাবশালী মার্কেট প্লেয়ারের কারণে সৃষ্ট প্রতিযোগিতা ঘাটতি সামাজিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে বলেও কেউ কেউ মনে করেন। এম-পে, আলিপেসহ অন্য বৈশ্বিক এমএফএস সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সংশ্লিষ্ট খাতের জন্য বিপুল সুযোগ সৃষ্টিকারী হিসেবে আবির্ভূত হলেও বাংলাদেশী এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ পিছিয়ে। প্রতিযোগিতার ঘাটতি এখানে সেবার মাঝে অধিকতর উন্নয়ন ঘটেনি বা নতুন সেবা যুক্ত হয়নি, তার একটি বাড়তি কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
অধিকন্তু বাজারে সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণও প্রতিযোগিতা ও উদ্ভাবন ঘাটতির জন্য দায়ী। এ খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থসংশ্লিষ্ট মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরদের অনুমতি না দেয়ার বিষয়টিও আলোচিত।
এমএফএস গ্রাহকভিত্তি হ্রাসের অন্য কারণগুলোও সামনে এসেছে। যেমন পার্সন টু পার্সন (পিটুপি) ট্রান্সফার সেবা, যেটি বিকাশের প্রধান সেবা। এ সেবা উপভোগে ভোক্তাদের কোনো হিসাব থাকার প্রয়োজন হয় না এবং অর্থ পাঠাতে সহজেই এজেন্টদের হিসাব ব্যবহার করতে পারে। এ ধরনের লেনদেন মোট লেনদেনের ৭০ শতাংশ। এ সেবার জন্য গ্রাহক নিজের হিসাব খোলার প্রয়োজন বোধ করে না। সাংস্কৃতিক রীতিনীতি, নিম্নসাক্ষরতা হার ও মোবাইল ফোনের অভিগম্যতায় বৈষম্যের কারণে ৬৫ শতাংশ বাংলাদেশী হিসাবধারী পুরুষের বিপরীতে নারী হিসাবধারীর সংখ্যা মাত্র ৩৬ শতাংশ। ইন্টারমিডিয়ার তথ্যমতে, ৭৬ শতাংশ বাংলাদেশী পুরুষের মোবাইল ফোন আছে, যেখানে নারীদের মাত্র ৪৭ শতাংশ।

মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক