শনিবার| ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২০| ৯ফাল্গুন১৪২৬

বিশেষ সংখ্যা

গরিব মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টার গল্প

ড. আতিউর রহমান

বড় ধরনের ভূমিধস বিজয় নিয়ে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে, যার পটভূমি ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোদিনবদলের সনদরূপকল্প ২০২১বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে তৈরি ম্যানিফেস্টোর মাধ্যমে তরুণ সমাজকেডিজিটাল বাংলাদেশগড়ার স্বপ্নে উজ্জীবিত করা হয়। সরকার গঠন করার চার মাস পর বাংলাদেশ ব্যাংকের দশম গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালনের ডাক পড়ে। যেদিন ঘোষণা আসে, সেদিন আমি নেপালের কাঠমান্ডুতে। একটি সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়েছিলাম। দিনটি ছিল ২৬ এপ্রিল। ওইদিন বিকালে বিমানে করে ঢাকায় ফিরেই জানতে পারলাম গভর্নর হিসেবে নিয়োগের কথা। আমাকে না জানিয়েই বঙ্গন্ধুকন্যার দেয়া গুরুদায়িত্ব আমি সানন্দেই গ্রহণ করেছিলাম। আমার প্রতি আস্থা রাখার জন্য তার কাছে আমি চিরদিন কৃতজ্ঞ থাকব।

দায়িত্ব একই সঙ্গে আমার জন্য ছিল আনন্দের চ্যালেঞ্জিং। দায়িত্ব নেয়ার আগে আমার ঝুলিতে ছিল তিন দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা। আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালে আসার পর প্রথম সোনালী ব্যাংক পরবর্তী পর্যায়ে জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী আমাকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিযুক্তির ফলে দেশের অর্থনীতি ব্যাংকিং খাত নিয়ে আমার গবেষণার অভিজ্ঞতাকে বাস্তবে কাজে লাগিয়ে সার্বিক অর্থনীতিকে গণমুখী ধারায় এগিয়ে নেয়ার একটা সুযোগ এসেছিল। এক্ষেত্রে আরো শতগুণ শক্তি আর সাহস জুগিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর সেই ক্ষুদ্র মোবাইল বার্তা, যে বার্তায় তিনি আমাকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন, ‘ দেশের গরিব মানুষের জন্য কাজ করবেন।আমার কাজের শক্তির ভিত্তি ছিল প্রধানমন্ত্রীর ক্ষুদ্র মোবাইল বার্তাটি।

তাই গভর্নরের চেয়ারে বসে প্রতি মুহূর্তে আমি দেশের গরিব মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য কাজ করেছি। সর্বদাই চোখের সামনে রেখেছি তাদের অব্যক্ত মুখগুলোকে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে গরিবের জন্য ব্যাংকিংয়ের নবধারায় প্রবেশের লক্ষ্যে ধাপে ধাপে পথ গড়ে তুলতে কাজ করেছি, যার রেখাচিত্র গ্রন্থিত করেছি, আমার বুনে গেলাম আশার স্বপন-গভর্নরের দিনলিপি (মে ২০০৯-মার্চ ২০১৬) বইতে। অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির পক্ষে আমি নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। সেসব নানা উদ্যোগের কথা আজ না বলে লেখায় কেবল মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বিষয়ে খুব সংক্ষেপে কিছু বলতে চাই।

এক.

বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের বিকাশটি ঘটে প্রধানমন্ত্রীর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৭ সালে। মোবাইল ফোনের অবকাঠামোগত বাড়তি সুবিধা আমি সুযোগ হিসেবে দেখতে পেয়েছিলাম বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব নেয়ার পর। প্রযুক্তি যোগাযোগ অবকাঠামোগত সুবিধার ওপর ভিত্তি আস্থা রেখে আমরা ২০১০ সালেই এমএফএস কার্যক্রম শুরু করি। ২০১০ সালের ১৪ এপ্রিল নববর্ষের বড় উপহার হিসেবে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে রেমিট্যান্স সেবা চালু হয়। ঢাকা ব্যাংক ইস্টার্ন ব্যাংকের সঙ্গে মোবাইল ফোন অপারেটর বাংলালিংকের যৌথ উদ্যোগে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার উদ্বোধন হয়। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম মোবাইল রেমিট্যান্স সেবা চালু করে।

দুই.

এমএফএস লাইসেন্স নিয়ে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক প্রথম এমএফএস কার্যক্রম শুরু করে। তারপর ব্র্যাক ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি হিসেবেবিকাশপৃথক প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতি নিয়ে বিদেশী বিনিয়োগসহ একক ফোকাস দিয়ে এমএফএস কার্যক্রম আরম্ভ করে। উল্লেখ্য, দুটি এমএফএস অপারেটরই আজ মূল দুই বাজারশক্তি। আমরা সবার জন্য সুযোগ দেয়ার রীতি অনুসরণ করতে চেয়েছিলাম। নির্দিষ্ট শর্তের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকগুলোসহ অন্যদের সুবিধা দিয়েছি, যার পরিপ্রেক্ষিতে মোট ২৮টি ব্যাংক এমএফএস লাইসেন্স পায়, যার একটি মাত্র ছিল ব্যাংক সাবসিডিয়ারি। ২০১০ সালে আমরা ‘Amendment of Guidelines of Mobile Financial Services for the Banks’ শিরোনামে এমএফএস খাতের গাইডলাইন দিই। গাইডলাইনের ভিত্তিতেই ব্যাংকগুলোকে লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল। গাইডলাইন তৈরি করতে আমরা চারটি বিষয়কে নীতি প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনায় রেখেছিলাম।

প্রথমত, বাংলাদেশের বিরাজমান আর্থিক আইন অনুসারে ব্যাংক কিংবা ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি ছাড়া অন্য ব্যাংকবহির্ভূত প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান তৈরির অনুমোদন দেয়া সম্ভব নয়।

দ্বিতীয়ত, দেশের মনিটারি পলিসিতে যেন আর্থিক কার্যাবলির সংযোগ প্রতিফলন থাকে এবং ট্রান্সমিশন চ্যানেল যেন দ্রুততর করা যায়, সে বিষয়গুলো আমাদের বিবেচনায় রাখতে হয়েছিল।

তৃতীয়ত, এমএফএস খাতের সঙ্গে যারা সরাসরি যুক্ত হবেন, বিশেষত, ব্যাংকিং সেবার আওতার বাইরের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কথা বিশেষভাবে স্মরণে রেখেছিলাম।

চতুর্থত, সাধারণ মানুষ জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে প্রযুক্তিভিত্তিক খাতকে নিরাপত্তার আওতায় আনার লক্ষ্যে তিনটি বিষয়কে বিবেচনায় রেখে আর্থিক সেবা ডিজাইন করা হয়েছিল। বিষয় তিনটি যথাক্রমে মানি লন্ডারিং, হুন্ডি টেরোরিস্ট ফিন্যান্সিং প্রতিরোধ। মূলধারার ব্যাংকিংয়ের মতো আমরা এফএমএস খাতকেও গোড়া থেকেই শৃঙ্খলার মধ্যে রাখার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। একই সঙ্গে সহজতর কেওয়াইসি চালু রেখে লেনদের নয়া ধারাকে রেগুলেটরি বাড়তি চাপ থেকে মুক্ত রেখেছিলাম। অবশ্য প্রযুক্তির উন্নতির কারণে এখন ইলেকট্রনিক কেওয়াইসি সহজেই করার নয়া সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

এফএমএস খাতের ব্যাপারে গোড়া থেকেই মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর খুব আগ্রহ ছিল। তারা নিজস্ব মালিকানায় এমএফএস পেতে খুবই তত্পর ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে জনস্বার্থনির্ভর রেগুলেটরি অবস্থান থেকে তাদের সেই মালিকানা বা লাইসেন্স দেয়া সম্ভব হয়নি। এক্ষেত্রে এমএনও এমএফএস উভয় ইন্ডাস্ট্রি প্রথম পর্যায়ে রেভিনিউ শেয়ার মডেলের ভিত্তিতে কাজ শুরু করে। মডেলের আওতায় শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।

তিন.

আর্থিক খাতের রেগুলেটর হিসেবে আমি আমার সময়ে গুরুত্ব দিতে চেয়েছি গ্রাহকস্বার্থে সেবা খরচ কমানোর ওপর। বলাই বাহুল্য, কাজটি সহজ ছিল না। একপর্যায়ে মোবাইল নেটওয়ার্ক আপারেটররা রেভিনিউ শেয়ার মডেলের পরিবর্তে সেশনভিত্তিক শেয়ারের প্রস্তাব নিয়ে আসে। বিষয়টির সুচিন্তিতভাবে সবার অংশগ্রহণে সমাধানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক বিটিআরসি যৌথ উদ্যোগে একটি টেকনিক্যাল কমিটি তৈরি করে। যৌথইউএসডি টেকনিক্যাল কমিটি দায়িত্ব বা টিওআর ছিল এমএফএস খাতের প্রতিটি সেশন খরচ কত হওয়া উচিত তার মূল্য স্থির করে দেয়া। টেকনিক্যাল কমিটি বিস্তারিত একটি প্রতিবেদন পেশ করে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটররা নিজেদের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে সেশনপ্রতি যে মূল্য প্রস্তাব করেছিল, তা বাস্তবসম্মত নয়। কাজেই কমিটির পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক একটি স্টাডির সুপারিশ করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠানসিগ্যাপবাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ হয়ে স্টাডি করে। কিন্তু সে উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত সাফল্যের মুখ দেখেনি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বিটিআরসি তাদের উদ্যোগ অব্যাহত রাখে। দুই রেগুলেটরের মধ্যে নতুন এক কমিটির মাধ্যমে সেশনপ্রতি মূল্য স্থিরের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কমিটিগুলোতে এমএফএস খাতের সঙ্গে যুক্ত সব স্টেকহোল্ডারের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছিল। নানা পক্ষের টানাপড়েনের শেষে সমাধান হয় প্রধানমন্ত্রীর আইটি উপদেষ্টার নির্দেশনায়, সব পক্ষের উপস্থিতিতে।

চার.

এমএফএস ইন্ডাস্ট্রি প্রায় এক দশকের মধ্যে দেশের সর্বত্র পৌঁছে গেছে। হাঁটা পথের দূরত্বে দেশের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব প্রান্তিক মানুষ তাদের বাড়ির পাশে সেবা পাচ্ছে। আনুমানিক নয় লাখ এজেন্ট খাতের  সঙ্গে যুক্ত। দৈনিক প্রায় হাজার ৩০০ কোটি টাকা এমএফএস খাতের মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে। দৈনন্দিন জীবনে এমএফএস খাতের প্রভাব আজ সর্বব্যাপী। প্রান্তিক দরিদ্র মানুষ, রিকশাওয়ালা, নারী গার্মেন্ট শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, সরকারি ভাতা (সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী) বা অর্থ, বিদ্যুত্ পানির বিল, বেতন প্রদান, মার্চেন্ট পেমেন্ট সরকারি পেমেন্ট সবকিছুই হচ্ছে আজ এমএফএসের মাধ্যমে। এমনকি একজন ভিক্ষুকও এখন নিয়মিত ব্যাংকিং করছে। সেবা প্রদানে যে খরচ গ্রাহকরা বহন করে, তার ৬০-৬৫ শতাংশই এজেন্টরা নিয়ে নেয়। বাকিটা মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রোভাইডার ভাগাভাগি করে নেয়। প্রযুক্তির উন্নতি হচ্ছে। স্মার্টফোন ব্যবহার বাড়ছে। অ্যাপস ব্যবহারও বাড়ছে। ধীরে ধীরে খরচও কমে আসবে। শিক্ষা উপবৃত্তিসহ অনেক সেবা অবশ্য বিনা মূল্যেই এমএফএস প্রোভাইডাররা দিচ্ছে।

২০১৮ সালে এমএফএস রেগুলেশন চূড়ান্ত করা হয়েছে। আমি দায়িত্বে থাকাকালীন ড্রাফট রেগুলেশন দিয়ে আসি। এরই মধ্যে রেগুলেশন চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে আমি এখনো মনে করি, এমএফএস বা ডিএফএস যা- বলি না কেন, ব্যাংক-লেড মডেলই আমাদের মতো অর্থনীতির জন্য যথোপযুক্ত। ফলে ওই মডেল থেকে সরে এসে কোনো নতুন রেগুলেশন চাপিয়ে দেয়া উচিত হবে না। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে আমি অবশ্য নানা মাধ্যম নতুন উদ্ভাবনমূলক উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তবে তা অবশ্যই হতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক স্থিরীকৃত আর্থিক খাতের কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করে। কমপ্লায়েন্সের প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করা হবে আর্থিক খাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ আত্মঘাতী।

কাজেই বাংলাদেশ ব্যাংককে পাশ কাটিয়ে সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের মাধ্যমে আর্থিক খাত পরিচালনা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। দেশের আর্থিক সেবা খাতের একজন প্রাক্তন রেগুলেটর হিসেবে আমার অনুরোধ থাকবে প্রধানমন্ত্রীর দার্শনিক নির্দেশনায় গরিব জনগোষ্ঠীর স্বার্থে বিগত এক দশকে যে এমএফএস খাত গড়ে উঠেছে, তা যেন রেগুলেটরি দুর্বলতায় এবং নিয়মকে পাশ কাটিয়ে তাড়াতাড়ি কিছু করার প্রচেষ্টার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এমএফএস সরকারের বড় সাফল্যগুলোর একটি। সাফল্যকে আরো সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিকতার পথে নিয়ে যেতে হবে, যাতে গরিব মানুষ সেবা পাওয়ার পাশাপাশি তাদের আর্থিক নিরাপত্তা আরো বেশি মাত্রায় নিশ্চিত করা যায়। সেদিকে সর্বক্ষণ খেয়াল রাখতে হবে। জনস্বার্থই হতে হবে আমাদের মুখ্য বিবেচনা।

 

. আতিউর রহমান: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার প্রফেসর