শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২০ | ৯ আশ্বিন ১৪২৭

বিশেষ সংখ্যা

এমএফএস রেগুলেশন ও তিনটি মৌলিক প্রশ্নের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত

খন্দকার সাখাওয়াত আলী

এমএফএস রেগুলেশন তিনটি মৌলিক প্রশ্নের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত

খন্দকার সাখাওয়াত আলী

বাংলাদেশ ব্যাংক এমএফএস গাইডলাইন প্রথম নিয়ে আছে ২০১১ সালে। আর গাইডলাইনের ওপর ভিত্তি করে এমএফএস বিগত প্রায় এক দশকে বিশাল বড় সামাজিক নির্ভরশীলতার সার্বক্ষণিক অর্থনৈতিক লেনদেনের নেটওয়ার্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এমএফএসের এমনতর বিপুল, বিশাল, বিস্তৃত ছড়িয়ে পড়ার কথা এমএফএসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রেগুলেটর নিজেরাও শুরুতে ভাবতে পারেনি। এমএফএসের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তাই এমএফএস খাতকে আরো প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের প্রশ্নটি দেশ জনস্বার্থে জরুরি হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক পরবর্তী সময়ে গাইডলাইনকে রেগুলেশনে নিয়ে আসে ২০১৮ সালে। দ্বিতীয় প্রজন্মের রেগুলেশনের মাধ্যমে খাতের সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে এমনটা নয়। বরং এমএফএসের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের প্রশ্নে তিনটি নীতি-সিদ্ধান্তের প্রয়োজনীয়তা দিনকে দিন সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে।

 

গাইডলাইন থেকে রেগুলেশনের পরিপ্রেক্ষিত (২০১১-১৮)

বিগত প্রায় এক দশকে এমএমএস কার্যক্রমের সাফল্য ঈর্ষণীয়। সাফল্য দৃশ্যমান বিশেষত বিকাশের ক্ষেত্রে। এমএফএস একটি পেমেন্ট সিস্টেম হিসেবে দ্রুত সহজভাবে অর্থ লেনদেনের একক সেবাদানের উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করছে। আর একক সেবার বৈশিষ্ট্যটিই আগামীতে নীতিগতভাবে ধরে রাখা দরকার, যাতে আর্থিক ব্যবস্থার শৃঙ্খলা বিঘ্নিত না হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক ব্যবস্থাপনার নীতি-নির্দেশক আইনি কাঠামো অনুসারে বাণ্যিজ্যিক ব্যাংকগুলো এমএফএস কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বর্তমানে মোবাইল টেলিফোন কোম্পানিগুলো নির্দিষ্ট ফির ভিত্তিতে এমএফএসকে সেবা প্রদান করছে। কাজেই এমএফএস ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে দুটি রেগুলেটরের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। আর্থিক রেগুলেটর হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রোভাইডার হিসেবে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর রেগুলেটর বাংলাদেশ টেলিফোন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি)

 

দ্বিতীয় প্রজন্মের রেগুলেশন (এমএফএস রেগুলেশন, ২০১৮) দ্বারা তিনটি মৌলিক পরিবর্তনের বিষয় স্পষ্ট করেছে:

এক. এমএফএস খাতের বৃহত্তর নেটওয়ার্কের সঙ্গে ব্যাংকের আন্তঃ সম্পূরক সম্পর্ক, যা দুই পক্ষের মধ্যে একটি ভারসাম্যময় ভিত্তি তৈরি করেছে, যা দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক সুবিধাজনক অর্জনে ভূমিকা রেখেছে। আর ভিত্তি এমএফএস খাতের পরিসর বাড়াতে সহায়ক হবে। রেগুলেশনে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এমএফএস খাত সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম ডিপার্টমেন্ট (পিএসডি) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। এমএফএস রেগুলেশন (. ধারায়) বলা হয়েছে, রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্সের শর্ত পূরণসাপক্ষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ডিপোজিট জমা নেয়া, অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণের লেনদেনে সহায়তা করা, অর্থাত্ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এমএফএস অপারেটরদের এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবে, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক বিস্তার এমএফএস খাতের বহুমুখীকরণে সহায়ক হবে।

দুই. মোবাইল ফোন কোম্পানি শুধু নেটওয়ার্ক প্রোভাইডার। রেগুলেটরের মাধ্যমে তা স্পষ্ট করা হয়েছে। বিষয়টি এমএফএস রেগুলেশনে (. ধারার -এর বি) বলা হয়েছে, কারা এমএফএস খাতে বিনিয়োগ করতে পারবে পারবে না। যারা পারবে তারা হলো ব্যাংক নন-ব্যাংক প্রতিষ্ঠান, এনজিও, ফিনটেক কোম্পানিগুলো, যারা আর্থিক খাতে কাজ করছে এবং এমএফএস খাতে বিনিয়োগ করতে পারবে না, তারা হলো মোবাইল নেটওয়ার্ক ওপারেটর (এএনও)

তিন. এমএফএস রেগুলেশনের (২০১৮) ধারা . .-এর () ধারার মধ্যে এক ধরনের বিরোধ রয়েছে, যা খাতের উন্নয়নের জন্য একটি বাধা। ধারা .-তে বলা হয়েছে, এমএফএস খাত বাংলাদেশ ব্যাংকের পিএসপি দ্বারা সরাসরি নিয়ন্ত্রিত হবে। অথচ একই পাতার .-এর () ধারায় আবার বলা হচ্ছে, একটি একক ব্যাংককে তার সাবসিডিয়ারি কোম্পানির জন্য শতকরা ৫১ ভাগ শেয়ার রাখতে হবে। সেই ব্যাংককে প্যারেন্ট ব্যাংকের ভূমিকায় রাখা হয়েছে এবং প্যারেন্ট ব্যাংককে কন্ট্রোল শেয়ার বোর্ডের মেজরিটি সদস্য বাধ্যবাধকতার সুযোগ রাখা হয়েছে।

 

রেগুলেটরি মূল্যায়ন

প্রথমত, বাংলাদেশ ব্যাংক এমএফএস খাতে মোট ২৮টি ব্যাংককে লাইসেন্স দিয়েছিল, যার মধ্যে কেবল একটি ছিল ব্যাংক সাবসিডিয়ারি, আর তা হচ্ছে বিকাশ। আর বিকাশ বাংলাদেশে এমএফএস সেক্টরে সবচেয়ে ভালো করেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এমএফএস মূলত পেমেন্ট সিস্টেম প্রযুক্তির এক সফল মেলবন্ধন। প্রযুক্তিনির্ভর পেমেন্ট সিস্টেমের ভেতর স্টেকহোল্ডার হিসেবে একই সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে তিনটি পেশাদারি গ্রুপ। গ্রুপগুলো যথাক্রমে ব্যাংক, প্রযুক্তি বাজার ব্যবস্থাপনা, যারা প্রত্যেকে নিজ নিজ পেশাদারির ক্ষেত্রে দক্ষ। এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা গেছে বিপুলসংখ্যক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের স্বল্পশিক্ষিত একটি এজেন্ট গোষ্ঠীকে। যারা স্বল্প সময়ে সামান্য প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ নিয়ে ক্ষেত্রকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে অর্থাত্ এজেন্টরা।

বাংলাদেশের আর্থিক নীতি-কাঠামোর কারণেই এদের এমএফএস সেক্টরে এমএনওদের অংশীদার হিসেবে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। কারণ এমএনও মুখ্যত এমএফএসের নেটওয়ার্ক প্রোভাইডার এমএনওর নেটওয়ার্কের ওপর এমএফএস নির্ভরশীল, তাই এদের মালিকানার অংশীদার করা হলে খাতের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংক এমএফএস রেগুলেটরের মাধ্যমে মুখ্যত দুই ধরনের মডেল গড়ে তোলার প্রাথমিক সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। প্রথম মডেলটি শতভাগ ব্যাংক মালিকানাধীন, অন্যান্য ব্যাংকিং সেবার পাশাপাশি তারা এমএফএস সেবা দেয়ার জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত হয়। দ্বিতীয় মডেলটি ছিল ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি কোম্পানি অর্থাত্ বিকাশ। মডেলের আওতায় দক্ষ ব্যবস্থাপনা, মানসম্মত দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ, উন্নত প্রযুক্তি একক ফোকাস হওয়ার কারণে এদের সাফল্য অনুকরণীয়।

দ্বিতীয়ত, এমএফএসের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মূল কাজটি ছিল দূরদর্শীসম্পন্ন এমএফএস রেগুলেশন তৈরি করা। যাতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্য, রেগুলেটরের সরাসরি তত্ত্বাবধান, গ্রাহকের স্বার্থ সংরক্ষণ সার্বিকভাবে ব্যাংকিং রীতি প্রযুক্তিগত নিরাপত্তাসহ নানা দিক সুনিশ্চিত করা, যাতে মানি লন্ডারিং, হুন্ডি সন্ত্রাসী অর্থায়ন রোধ করা যায়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন (২০১০) এমএফএস রেগুলেশনে (২০১৮) মানি লন্ডারিং, হুন্ডি সন্ত্রাসী অর্থায়ন রোধ করা সম্ভব হয়। উল্লেখ্য, এমএফএস রেগুলেশনে (২০১৮) সাবসিডিয়ারি মডেলকে প্রাধান্য দিয়েছে।

বিকাশের কেসটি বিবেচনায় নিলে আমরা দেখি, বাংলাদেশ ব্যাংকের এমএফএস রেগুলেশনে (২০১৮) একটি কৃত্রিম শেয়ারহোল্ডিংয়ের সমস্যা রেখে দেয়া হয়েছে। এমএফএস রেগুলেশনে (২০১৮) ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি মডেলকে এগিয়ে রেখে মূলধারায় রাখা হয়েছে। ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে শতকরা ৫১ ভাগ শেয়ারহোল্ডিংয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে কৃত্রিমভাবে, যা বিজনেস কেস হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ। কৃত্রিম ত্রুটিপূর্ণ দিকটি ঠিক করা দরকার, যা আর্থিক ব্যবস্থার একটি টেকসই ব্যাংকিং ধারা তৈরিতে সহায়ক হবে। কৃত্রিম ত্রুটিপূর্ণ দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

এক. এমএফএস খাতটি রেগুলেটরসহ সবার জন্যই ছিল একেবারে নতুন। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রাথমিক পর্যায়ে নিজেরা সরাসরি তত্ত্বাবধান না করে ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালনা করেছে। ব্যাংকের একটি অতিরিক্ত সেবা ব্যাংক সাবসিডিয়ারি উভয় ক্ষেত্রে। কাজেই এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ধরনের কৌশল ছিল, সরাসরি দায়িত্ব না নিয়ে ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে এমএফএস সেবা দেখভাল করা। কিন্তু বিগত এক দশকে পরিস্থিতির বদল হয়েছে। প্রায় সাড়ে তিন কোটি গ্রাহক, দুই লাখ এজেন্ট ২৫০-৩০০ ডিস্ট্রিবিউটর আজ খাতের সঙ্গে জড়িত। গ্রাহক জনস্বার্থে এমএফএস খাতের তত্ত্বাবধান সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক হওয়া জরুরি।

দুই. এমএফএস খাতের উন্নয়নের জন্য যে পরিমাণ বিনিয়োগ, গুণগত প্রযুক্তি, একক ফোকাস শক্তিশালী ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক দরকার হয়, এমএফএস লাইসেন্স ব্যাংকগুলো কেন সাফল্যজনকভাবে করতে পারল না, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার। যেসব ব্যাংক শতভাগ মালিকানা নিয়ে নিজেদের অন্য সব ব্যাকিং সেবার পাশাপাশি এমএফএস সেবা দিয়ে তেমনভাবে সফল হতে পারেনি, খানিকটা ডাচ্-বাংলার রকেট ছাড়া। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পিএসডির কাছ থেকে পৃথক লাইসেন্স পাওয়ার পরও ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি হিসেবে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হলে তা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র।

প্রথমত, মালিকানা ইস্যুটি। ব্যাংক সাবসিডিয়ারি যারা তাদের শতকরা ৫১ ভাগ শেয়ার বিধিবিধান অনেকটা ভূমিপুত্রধর্মী আইন, যা বিনিয়োগকে অনুত্সাহিত করে এবং বিজনেস কেস হিসেবে বিনিয়োগকারীদের উত্সাহব্যঞ্জক নয়।

দ্বিতীয়ত, বিকাশের কেসের মাধ্যমে আমরা দেখছি, এমএফএস সেবার পরিসর, গুণগত মানোন্নয়ন সেবার বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে বিকাশ ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ জোগাড় করেছে। বিনিয়োগের প্রভাব, সেবার মান, সেবার বহুমুখীকরণ কমপ্লায়েন্স ইস্যুকে নিজেদের দিক থেকে গুরুত্ব দিয়ে অগ্রসর হওয়ায় আস্থার সম্পর্ক বেড়েছে।

তৃতীয়ত, ব্যাংক সাবসিডিয়ারির জায়গায় বিশেষায়িত কোম্পানির কথা ভাবা যেতে পারে।

 

তিনটি মৌলিক প্রশ্নের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত

বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে সরকারের ডিজিটাল রূপকল্প বাস্তবায়ন আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্য অর্জনে তিনটি সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা জরুরি। সিদ্ধান্তগুলোর কারণে বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর আর্থিক স্বার্থ খর্ব হলেও দেশ জনস্বার্থে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি।

প্রথমত, এমএফএসের বাজার প্রতিযোগিতায় ব্যাংকগুলোর বর্তমানে যে প্রতিযোগিতা রয়েছে পবিবেশ সৃষ্টির হয়েছে, তা জিইয়ে রাখা কৌশলগতভাবে খাতের জন্য মঙ্গলজনক। কারণ বর্তমানে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে ভবিষ্যতে খাতের বাজার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে, যা হবে যথার্থ টেকসই বাজার কৌশল।

বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ ধরনের পেমেন্ট সিস্টেম কোম্পানির অনুমোদন দিতে পারে। আর তা হতে হবে সংসদের অনুমোদনের মাধ্যমে। বিশেষ ধরনের কোম্পানিকে যেখানে ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি কোম্পানির মতে শতকরা ৫১ ভাগের অত্যাবশ্যকীয় কোনো বাধ্যবাধকতা থাকবে না। শতকরা ৫১ ভাগের বাধ্যবাধকতা এমএফএস খাতের গতিশীলতা বিরুদ্ধ ব্যাংকিং আইনের এমএফএস খাতকে কোনো গোষ্ঠীর একক নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখার লক্ষ্যে ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি। খাতে দেশী বিদেশী আরো মানসম্মত বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। অথবা সরকার স্বপ্রণোদিত হয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে নতুন ধারার মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল পেমেন্ট সার্ভিস তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে, যা হবে খাতের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের স্থায়ী সমাধান।

প্রথমত, এমএফএসের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল পেমেন্ট সার্ভিস এক্ষেত্রে সম্ভাব্য ভালো সমাধান। আর নতুন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল পেমেন্ট সার্ভিস বাছাই করার প্রধানতম শর্ত সূচক হতে পারে বর্তমানে এমএফএস লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে যারা এরই মধ্যে ভালে করছে অর্থাত্ যারা মানসম্মত বিনিয়োগ, প্রযুক্তি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কমপ্লায়েন্সের শর্তগুলো পূরণ করবে, তাদেরই কেবল লাইসেন্স বা অনুমোদন দেয়া যেতে পারে। লাইসেন্স দেয়ার ন্যূনতম শর্ত তৈরি করে তার ভিত্তিতে লাইসেন্স প্রদান করতে হবে।

 

দ্বিতীয়ত, এমএফএসের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর পুঁজির কেন্দ্রীভবন দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। সফল এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর দেশীয় মালিকানা নিশ্চিত করার জন্য, ব্যাংকের জন্য দেশীয় পুঁজিবাজারে শেয়ার ছেড়ে দেয়ার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা এক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়ার বিধান রাখা, ভবিষ্যতে শেয়ারবাজারে এদের আসার সুযোগ তৈরি করা, যাতে সাধারণ মানুষ ক্রমান্বয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারহোল্ডার হয়ে উঠতে পারে।

তৃতীয়ত, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এমন একটি সফল সম্ভাবনাময় খাতকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের লক্ষ্যে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের দিকনির্দেশনা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সুদৃষ্টির দাবি রাখে। আমাদের অবশ্যই প্রযুক্তির ক্রমবিকাশমান বিকাশের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে হবে। প্রযুক্তির নানা প্লাটফর্ম ফিনটেকের মাধ্যমে পেমেন্ট সেবা চালু করার উত্সাহ দেখিয়ে অনেকে এগিয়ে আসবে এবং তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসে বা আসবে। কিন্তু এক্ষেত্রে দুটো বিষয় আমাদের স্মরণ রাখতে হবে। প্রথমত, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য বিশ্বমানের। বিশ্বের অন্যান্য অংশের দেশগুলো আমাদের কাছ থেকে বেস্ট প্র্যাকটিসগুলো শিখতে পারে। দ্বিতীয়ত, আমাদের জন্য অনুকরণীয় যেসব দিকনির্দেশনা সুপারিশ করে, দেখতে হবে নিজেরা অর্থাত্ উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজেরা এসব উদ্যোগ নিয়েছে কিনা বা কী নীতি অনুসরণ করছে।

শেষ কথা হচ্ছে, গ্রাহকের সংখ্যা, আকার, গরিব মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এবং ভবিষ্যত্ সাইবার নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে মালিকানাধীন ব্যাংকের ওপর নয় বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের খাতের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকা বিশেষভাবে জরুরি। আমাদের বাস্তবতায় চাহিদার ভিত্তিতে পৃথক সত্তার মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল পেমেন্ট সার্ভিসের কথা বাংলাদেশ ব্যাংককে তাই গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে, যা হবে বাংলাদেশ ব্যাংক দ্বারা সরাসরি নিয়ন্ত্রিত বা রেগুলেটেড।

 

খন্দকার সাখাওয়াত আলী: সমাজতাত্ত্বিক গবেষক

বাংলাদেশ মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সাফল্য, সম্ভাবনা চ্যালেঞ্জ, নীতি পর্যালোচনা কতিপয় সুপারিশ গ্রন্থের লেখক