বুধবার| এপ্রিল ০১, ২০২০| ১৭চৈত্র১৪২৬

বিশেষ সংখ্যা

বিকাশ একটি রেগুলেটেড আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা

কামাল কাদীর

প্রায় এক দশক সময়কালে বিকাশ বাংলাদেশে গড়ে ওঠা একটি আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান। বিকাশ দেশময় আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাকিং সেবা চালু করেছে, যা দ্রতগতিতে আজ দেশের তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফরচুন ম্যাগাজিনের বাছাইকৃত পৃথিবীতে সামাজিক গতিশীলতা সৃষ্টি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে কাজ করছে, এমন ৫০টি কোম্পানির মধ্যে বিকাশ ২৩তম স্থান পেয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে কম দামে বিকাশ দিচ্ছে এমএফএস আর্থিক সেবা। একইভাবে বিকাশ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অ্যাপস ব্যবহারকারী আর্থিক সেবা। বিশ্বের সেরা প্রযুক্তি আর আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের সমাবেশ ঘটেছে বিকাশে। রেগুলেটরি নিয়ম-কানুন মেনে এবং রেগুলেশন অনুসরণ করে ধাপে ধাপে বিকাশ বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বাংলাদেশের মূলধারার ব্যাংকিংয়ের বাইরে এখনো রয়ে গেছে দেশের অধিকাংশ মানুষ। এখনো তাই বড় আকারের জনগোষ্ঠীকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ধারায় নিয়ে আসাই মূল চ্যালেঞ্জ। বিকাশ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসারে, মনিটরিং রিপোর্ট হিসেবে প্রতি মাসে সন্দেহজনক এজেন্টেদের একটি তালিকা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়। বিধি নির্দেশ অমান্যকারী এজেন্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে প্রয়োজনীয় কেইসসহ পাঠায় বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্ট ইউনিট (বিএফআইইউ) কারণে বিরাজমান আর্থিক ব্যবস্থায়, প্রান্তিক কর্মরত দরিদ্র মানুষদের মূলধারার আর্থিক খাতের সেবা পাওয়ার সুয়োগ সীমিত। এটি আমাদের আর্থিক ব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা। আর প্রান্তিক দরিদ্র মানুষের বড় সমস্যা ছিল, যারা দেশের ভেতরে বড় শহরগুলোয় কাজের সন্ধানে যান, সেখান থেকে বাড়িতে টাকা পাঠানোর জন্য তাঁদের অনানুষ্ঠানিক খাতের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া উপায় থাকত না। সেক্ষেত্রে নানা অপ্রাতিষ্ঠানিক পথে নিজেদের পরিবারের কাছে টাকা পাঠাতে হতো। যেমন এলাকার পরিচিত মানুষ যখন কেউ বাড়ি ফিরছে, তখন অনেকেই তাদের হাতে বাড়ির জন্য টাকা পাঠিয়ে দিতেন। অনেকেই আবার উচ্চ ফির বিনিময়ে মধ্যস্বত্ব্বভোগীর মাধ্যমে জরুরি প্রয়োজনে বাড়িতে টাকা পাঠাতেন। আর্থিক লেনদেনের এমন অনানুষ্ঠানিক পরিস্থিতি আমরা পাই ২০১০ সাল পর্যন্ত, অর্থাত্ এমএফএস সেবা, বিশেষ করে বিকাশের সেবা বাজারে আসার আগ পর্যন্ত।

বিকাশ এমএফএস খাতের আজ সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান। প্রতিটি দিন দেশের প্রচলিত আইন রেগুলেটরি ফ্রাম-ওয়ার্কের প্রতি অনুগত থেকে বিকাশ তার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এক্ষেত্রে বিকাশের বিনিযোগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বোর্ড, রেগুলেটর, সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, ডিস্ট্রিবিউটর, এজেন্ট সর্বোপরি গ্রাহকদের পূর্ণ সহায়তা পেয়েছে। গ্রাহক জনস্বার্থে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্য কাজ করার লক্ষ্য বিকাশ দুই ব্যক্তির মাঝে লেনদেন, সরকারের আর্থিক নিরাপত্তা জাল কর্মসূচির অনুদান দ্রুত পৌঁছে দেয়া, দোকানের পেমেন্ট, বেতন প্রদান, ইউটিলিটি বিল প্রদান, বেতন প্রদান, পণ্য ক্রয়, মোবাইল রিচার্জ, শিক্ষাবৃত্তি, কেনাকাটা, বিদ্যুত্ বিল প্রদানসহ সব ধরনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং ডেবিট ক্রেডিট কার্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করে নানা ধরনের সেবা প্রদানের কর্মপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তির উদ্দেশ্য অর্জনের লক্ষ্যে, যাদের হাতে ন্যূনতম একটি মোবাইল ফোন রয়েছে, কিন্তু যারা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাকিংয়ের বাইরে অর্থাত্ যাদের ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট নেই, এমন মানুষের প্রাথমিক পর্যায়ের ব্যাংকিং সেবা দেয়ার চেষ্টা করেছে। সমাজের সর্বস্তরের শহর-গ্রামের নির্বিশেষে সব মানুষকেই তারা সেবার আওতার নিয়ে আসার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে এবং ধাপে ধাপে জনগোষ্ঠী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকের আওতায় একসময় অন্তর্ভুক্ত হবে।

পর্যন্ত দেশের কোটি ৭০ লাখ অর্থাত্ ৩৭ মিলিয়ন মানুষ বিকাশের মাধ্যমে নিরাপদে বাড়িতে টাকা পাঠাচ্ছেন এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এসব সেবা দিচ্ছে। বিকাশ চারটি বৈশিষ্ট্যের কারণে খাতে সফল হয়েছে বলে গবেষকদের মূল্যায়ন। প্রথমত: মানসম্মত বিনিয়োগ, দ্বিতীয়ত: উন্নত প্রযুক্তি বাছাই, তৃতীয়ত: মানসম্মত ব্যবস্থাপনা, চতুর্থত: শক্তিশালী ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক।

এমএফএস খাতের মাধ্যমে ক্যাশ লেইস ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার লক্ষ্যে, ধাপে ধাপে পেমেন্টের সব ধরনের কাজেই এখন বিকাশ ব্যবহার হচ্ছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শহরে এসে অপ্রাতিষ্ঠানিক নানা কাজ (যেমন রিকশা, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছোট চাকুরে) করে তারা বিকাশ ব্যবহার করে বাড়িতে টাকা পাঠাচ্ছেন। একইভাবে ছোট ছোট ব্যবসায়ী গার্মেন্ট শ্রমিকদের বেতন নগদে না দিয়ে বিকাশে দিচ্ছেন। পারিবারিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এটি ব্যবহার করছে, ফলে সরবরাহকারীদের টাকা দিতে তাদের এখন আর সশরীরে সেখানে যেতে হচ্ছে না। বিকাশ তুলনামূলকভাবে কম খরচে প্রথাগত সব ব্যবস্থার চেয়ে কীভাবে গ্রাহকের কাছে কম সময়ে, কম খরচে দক্ষতার সঙ্গে সেবা পৌঁছে দিচ্ছে।

বিকাশ আজ বিশ্বের অন্যতম সফল এমএফএস কোম্পানি, যার মালিকানায় রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান মানি ইন মোশন, আইএফসি, গেট ফাউন্ডেশন অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল। বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের নীতি সহায়ক অবস্থান এক্ষেত্রে ধাত্রীর ভূমিকা পালন করেছে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে অনুকূল নীতি সহায়তা পরিবেশে বিকাশের যাত্রা ২০১০ সালে। প্রথাগত ব্যাংকিংয়ের খরচ, দরিদ্র মানুষের থাকার জায়গায় ব্যাংক হিসাব না থাকা ব্যাংকিং লেনদেনের আনুষ্ঠানিকতার কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে প্রথাগত ব্যাংকিং সেবা পৌঁছতে বেগ পেতে হয়েছে। সে কারণে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস যৌক্তিক বিকল্প হিসেবে শক্ত ভূমি পায়; এভাবেই এমএফএস খাতটি ধারাবাহিকভাবে ধাপে ধাপে আজকের জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।

২০১০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের বিধিমালা তৈরি করে এবং সিদ্ধান্ত নেয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ব্যাংকের নেতৃত্বে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস পরিচালিত হবে। বিধিমালার আলোকে বিকাশ ব্র্যাক ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি কোম্পানি হিসেবে গঠিত হয়। ব্র্যাক ব্যাংক বিকাশ যৌথভাবে বিধিমালা পরিপালন নিশ্চিত করবে। বিশেষত তিন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা যথাক্রমে প্রথমত: কেওয়াইসি, দ্বিতীয়ত: অর্থ পাচার প্রতিরোধ তৃতীয়ত: সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন প্রতিরোধ গ্রাহকের অর্থেও নিরাপত্তা। প্রথম দিন থেকেই বিকাশের সরাসরি তত্ত্বাবধানে তিন কাজ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় দক্ষতার সঙ্গে সম্পূর্ণ কমপ্লায়েন্সের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। কমপ্লায়েন্সে সেবা প্রদানের জন্য বিকাশকে নিয়মিত ধারাবাহিকভাবে তিনটি কাজ করতে হয়। তিন কাজ যথাক্রমে নিম্নরূপ:

প্রথমত: বিকাশের প্রত্যেক গ্রাহককে একটি কেওয়াইসি ফরম পূরণ করতে হয়। পূরণকৃত ফরমের তথ্য জাতীয় পরিচয়পত্র ডাটা ব্যাংকের সঙ্গে মিলিয়ে গ্রাহক করার সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত করা হয়। সেসঙ্গে পূরণকৃত কেওয়াইসি ফরমগুলো ডিজিটাল এন্ট্রি করে প্রতিটি ফরম স্থায়ীভাবে বিকাশের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণ করা হয়। বর্তমানে বিষয়টি আরো সহজ করা হয়েছে। -কেওয়াইসির মাধ্যমে লাইনে সরাসরি জাতীয় পরিচয়পত্র ডাটা ব্যাংকের সঙ্গে মিলিয়ে গ্রাহক হওয়া সম্ভব।

দ্বিতীয়ত: বিকল্প অর্থ পাচার প্রতিরোধ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়নরোধ কল্পে, বিকাশের মধ্যে পৃথক বিভাগ প্রশিক্ষিত লোকবল তৈরি করছি। উদ্যোগ কেবল কেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তৃণমূল পর্যন্ত গোটা ব্যবস্থার মধ্যে তা নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মোবাইল আর্থিক সেবার বিধিমালা অনুযায়ী বিকাশ এজেন্টদের নিয়মিত কেওয়াইসি অর্থ পাচার রোধে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এছাড়া সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অর্থায়ন জালিয়াতি কীভাবে মোকাবেলা করা হবে, সে বিষয়েও তাদের প্রশিক্ষিত করা হয়। এতে এজেন্টরা আর্থিক সুরক্ষা-বিষয়ক সর্বশেষ তথ্য পেয়ে থাকেন এবং বিষয়গুলো মনিটরিংয়ের শৃঙ্খলা গড়ে তুলেছে।

বিকাশ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসারে, মনিটরিং রিপোর্ট হিসেবে প্রতি মাসে সন্দেহজনক এজেন্টেদের একটি তালিকা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়। বিধিনির্দেশ অমান্যকারী এজেন্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে প্রয়োজনীয় কেইস পাঠায় বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্ট ইউনিট (বিএফআইইউ)

তৃতীয়ত: গ্রাহকের অর্থের নিরাপত্তা বিধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের রেগুলেশন অনুযায়ী গ্রাহকের শতকরা ২৫ ভাগ অর্থ সরকারি ট্রেজারি বিলে বাদ বাকি ৭৫ ভাগ দেশের প্রথম সারির ব্যাংকগুলোয় রক্ষিত।

বিকাশ শুরু থেকে আজ পর্যন্ত আইন, নিয়মকানুন রেগুলেশন মেনে চলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। সামগ্রিকভাবে নতুন খাতটিকে উন্নয়নের স্বার্থে, বিকাশ রেগুলেটরের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করেছে। প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। প্রথম দিকে এমএফএস গ্রাহক তাদের ওয়ালেটে কত টাকা রাখতে পারবে তা সুনির্দিষ্ট ছিল না। বিকাশ প্রশ্নে তার গ্রাহকদের জন্য সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা সীমা স্থির করে। উদাহরণ থেকে একটি কথা আমরা স্পষ্ট করে বলতে পারি, তা হলো বিকাশ নিজেও আর্থিক খাতের স্টেকহোল্ডার হিসাবে নিয়ম-কানুন বিধিমালা মেনে চলতে কিংবা বিধিমালা তৈরিতে অংশীদারি ভূমিকা পালনে বিশেষ আগ্রহী। এক কথায় বিকাশ গোড়া থেকেই একটি কমপ্লায়েন্স আর্থিক সেবা প্রদানে ছিল বদ্ধপরিকর। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি রেগুলেটেড আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা হিসাবে, সাধারণ মানুষের প্রতিদিনকার জীবনে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বর্তমানে বিকাশ গ্রাহকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে ইন্টারঅপারেটিবিলিটি তৈরির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যা ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাপনা পরিবেশকে গতিশীল রাখতে অবদান রাখবে।

 

কামাল কাদীর: প্রধান নির্বাহী, বিকাশ