সোমবার | আগস্ট ১০, ২০২০ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

বিশেষ সংখ্যা

খাদ্যনিরাপত্তা

কৃষিতে পুঁজির প্রবেশ ও কৃষকের বঞ্চনা

গৌতম কুমার রায়

মানুষের সভ্যতা সৃষ্টিতে নদীর একটি বিশেষ ভূমিকা আছে। ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীর উৎস তুরস্কে। এ দুই নদীর মিলিত অববাহিকায় গড়ে ওঠে ‘মেসোপটেমিয়া’ সভ্যতা। এ দুই নদীর প্রবাহ আসে তুরস্কের পাহাড়ি অঞ্চলের তুষার গলা জল ও বৃষ্টিপাত থেকে। তবে এখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম হওয়ায় কৃষি উৎপাদনের চেয়ে পশুচারণ সংখ্যা বেড়েছে। যেজন্য মেসোপটেমিয়া এলাকার মানুষ তার প্রয়োজনের তাগিদ মেটাতে দিন দিন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আবার সিন্ধু সভ্যতা ছিল মূলত কৃষিনির্ভর সভ্যতা, যা স্থানীয় দ্রাবিড়েরা শুরু করে। বহিরাগত আর্যদের আগমনের কারণে এ সভ্যতা বিনষ্ট হয়। পরিমিত বৃষ্টি, সহনশীল তাপমাত্রা ও উর্বরতার কারণে গঙ্গা নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠে ষড়ঋতুভিত্তিক কৃষি সভ্যতা। একই জমিতে সারা বছর আউশ, আমন, রবিশস্য এমনও তিন ফসল এখানে উৎপাদন হতো। গঙ্গা নদীর মোহনায় আগেও সুন্দরবন ছিল এবং তা ছিল এখনকার চেয়ে আয়তনে অনেক বড়। এখন নদীর উজানে বাঁধ দেয়ার কারণে আমাদের ভাটি এলাকার মানুষের কৃষি মরেছে, সভ্যতার পালাবদলে আমাদের পরিবর্তন এসেছে সংস্কৃতি, সম্প্রীতি, সামাজিকতায় এবং চিড় ধরেছে আমাদের নীতি ও নৈতিকতায়। চিরদিনই কৃষি মানবিক সভ্যতার আসল নিয়ামক ও নিয়ন্ত্রকও বটে। যেখানে কৃষি নেই, সেখানে প্রকৃতি থাকে না। যেখানে প্রকৃতি থাকে না, সেখানে মানবিকতা ও সভ্যতা টিকতে পারে না।

বাঙালির বাংলাদেশ একসময় বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন ছিল। তখন আমাদের জলের মাছের সঙ্গে, জলসহিষ্ণু ধানের জাত ছিল। যে কারণে সেই আদিকাল থেকে একটি প্রবাদ প্রচলিত হয়ে আসছে, ‘মাছে ভাতে বাঙালি’ এ কথাটি। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে বাঙালির অস্তিত্বের কথা প্রথম জানা গেছে বলে শ্রুত রয়েছে। তবে তা অবর্ণিত। অতঃপর খ্রিস্ট-পরবর্তী সপ্তম শতাব্দীতে চর্যাপদ সৃষ্টি হওয়ায় আমাদের অস্তিত্বের বিষয়টিকে স্মারক গ্রোথিত করে দেয়। জলমগ্ন এ উর্বর পলিবাহিত জনপদে একে একে আসা মানুষ জমি ও জলকে ব্যবহার করে মাছ, ফল, ফসল উৎপাদনের আয়োজন করতে থাকে। বর্ষা, ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলা করে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে নিজেরা জমিতে ১০ ফুট উঁচু বাঁধ তৈরি করতে লাগল। কেননা এ বাঁধ দিয়ে জমির মধ্যে জল ঢুকতে বাঁধা দেয়া হতো। জলমগ্ন এ জলজ আঙিনাকে বলা হতো বং। আবার উচু বাঁধকে বলা হতো আইল বা আল। বং+আইল মিলে হলো বঙাইল। অতঃপর বঙালি, এরপর এলো বাঙালি। পাঁচ হাজার বছরের আরো আগে এই বং শব্দটা এসেছে চৈনিক ভাষা থেকে। তবে অবস্থাদৃষ্টে প্রমাণ হয়, বাঙালিরা এ জনপদে বসবাস শুরু করেছে তারও বহু আগেই।

নিজেদের জীবনধারণের জন্য মানুষ শিকারের পরে কৃষিকে ব্যবহার করতে থাকে। বীজ থেকে গাছ হয়, এ ধারণা প্রথম আসে আদিকালে প্রিয় মানুষের সমাধিতে সমাহিত মানুষের প্রিয় ভুট্টার বীজ ছিটিয়ে রেখে তা থেকে গাছের জন্ম হতে দেখে। শুরু হয় বীজের ব্যবহার এবং এ থেকে কৃষির প্রচলন। কৃষি এল। ফল ও ফসলের উৎপাদন দিয়ে নিজের এবং গোষ্ঠীভুক্ত মানুষের প্রয়োজন মিটিয়ে জীবনধারণ করা। পরিবার, সমাজ ও গোষ্ঠীতে দিনে দিনে মানুষ বাড়তে থাকে। আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশেষ করে বছর বছর বন্যা ও খরা মানুষকে ঘিরে ধরতে লাগে। কৃষি উৎপাদনে প্রয়োজন সংকুলান হতে বাধা হতে লাগল। এভাবে কোনো পণ্য অতিরিক্ত উৎপাদন হতে থাকে আবার কোনো পণ্য উৎপাদনে ঘাটতি হতে লাগল। প্রয়োজনের তাগিদ বাড়তে থাকে দিন দিন। মানুষও এ থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতে থাকে। এ উপায় খুঁজতে গিয়ে কৃষিতে সন্নিবেশিত হলো শ্রমবিনিময় প্রথা, খোরাকি কৃষি, বর্গা প্রথা, পণ্য বিনিময় প্রথা, কড়ি বিনিময় প্রথা, টাকা বা মুদ্রা বিনিময় প্রথা। রফতানি বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রাপ্ত মূল্যবান ধাতব মুদ্রা দিয়ে মোগল সরকার পণ্যভিত্তিক বদল অর্থ বাণিজ্য থেকে মুদ্রাভিত্তিক অর্থনৈতিক ধারার সৃষ্টি করে। এরপর এল বাজার কৃষি, কৃষিতে আমদানি ও রফতানি ব্যবস্থা, কৃষিতে প্রক্রিয়াকরণ পণ্য উৎপাদন ও তার সামগ্রিক ব্যবহার, অতঃপর কৃষিতে মুক্তবাজার অর্থনীতি। বিনিময় প্রথায় একজন কৃষক বিভিন্ন প্রকার দ্রব্যের কাছে আসতে পারতেন না। যেজন্য কৃষি ও শিল্প এদের পারস্পারিক যে নির্ভরতা, তা সম্পন্ন হতো না। তবে যখন কৃষিতে বাণিজ্য এল, কৃষিজ কাঁচামাল শিল্পে এল এবং রূপান্তরিত পণ্য তৈরি হতে লাগল, তখন কৃষক তার প্রয়োজনের তাগিদে অন্যান্য দ্রব্যের সঙ্গে পরিচিত হতে লাগল।

চীনে কৃষি ও উন্নয়ন নিয়ে একটি প্রবাদ আছে। তা হলো, ‘জাতীয় উন্নতি ও সমৃদ্ধি হলো গাছের মতো। কৃষি তার মূল, শিল্প তার শাখা ও বাণিজ্য তার পাতা।’ অর্থাৎ বলতেই পারি, কৃষিকে নির্ভর করে দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা নির্ভর করে।

ঔপনিবেশিক-পূর্ব (১৭৫৭ সালের আগে) ঔপনিবেশিক আমল (১৭৫৭-৯৩ সাল পর্যন্ত): প্রাক-ঔপনিবেশিক আমলেও কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ্য কেনাবেচা করতেন। ১৬৭৯-৮৮ খ্রিস্টাব্দ সময়ের মধ্যে সুবেদার শায়েস্তা খানের সময়ে টাকায় আট মণ চাল কেনাবেচার খবর আমরা জানি। এ পণ্য যে দামেই হোক না কেন, তা ভোক্তার কাছে হাতবদল হতো। আমাদের এ উপমহাদেশে কৃষিবাজারের পত্তন হয় অনেক আগেই। সুলতানি আমল, মোগল আমল এমনকি তারও আগে এ কৃষি বাণিজ্যের প্রথা আসে। তবে ঔপনিবেশিক সময়ে এ বণিজ্যের একটা প্রকট প্রভাব পরিবর্তিত হয়। ১৭ শতকে সমুদ্রপথে জল বাণিজ্য যোগাযোগ তৈরি হওয়ার ফলে আমাদের দেশ থেকে ইউরোপে রফতানি বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ১৭১৭ খ্রি. বাদশাহি ফরমান লাভের পর ইংরেজরা আমাদের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে ব্যাপক হারে যোগ দেয়। যেখানে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ইংরেজ শাসক গোষ্ঠী শুধু বাণিজ্যের কারণে এ উপমহাদেশে আসে। তবে তারা আসন গেড়ে শাসন করেছে আমাদের। তারা এখানে বাণিজ্যের যে বেসাতি ঘটায়, তার প্রধান ও একমাত্র বাণিজ্য উৎস আসে এ কৃষি খাত থেকেই। যেজন্য কৃষি বাণিজ্যের একটা প্রভাবিত সূচনা এখান থেকেই শুরু হয়। কেননা সে সময় কতকগুলো নির্দিষ্ট পণ্যকে টার্গেট করে শুরু হয় কৃষি বাণিজ্য। যেমন একসময় কৃষিপণ্যে চায়ের কদর ছিল। এরপর আসে রেশম, আফিম, নীল, তাঁতবস্ত্র, আখ, পাট এমনও কিছু পণ্য।

১৮২৪ সাল। ভারতের আসামে চা আবিষ্কার হয়। এরপর চায়ের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। ১৮৩০ সাল। ভারতের আসামে এ সালের প্রথম দিকে চায়ের বাণিজ্যিক গুরুত্ব অনুভূত হয়। তারপর এটা ছড়িয়ে যায় উত্তরবঙ্গের দিকে। তবে চা কিন্তু কৃষিপণ্য হলেও একে কৃষকের পণ্য বলা চলে না। এখানে চা বাগানের মালিক শ্রমিক নিয়োগ করে চা উৎপাদন করতে থাকেন। কেননা এ সময়ে ব্রিটিশদের কাছে চা একটা অতিশয় আবশ্যিক পানীয় হিসেবে গ্রহণযোগ্য ছিল। ভালো বাজারের জন্য এখানে সরকারের যেমন পৃষ্ঠপোষকতা ছিল আবার এ পণ্য ‘বাণিজ্যিক পণ্য’ হিসেবে বাজারে সমাদৃত ছিল। এ সময়ে ভারতের চা বিশ্ববাজারকে প্রভাবিত করেছিল। এ পণ্য গুরুত্বের কারণে সে সময় থেকে চায়ের উৎপাদন যেমন প্রতিযোগিতায় আসে আবার তা বাণিজ্যিক গতি লাভ করে দ্রুত। কিন্তু ১৯ শতকের শেষে চায়ের বাজারটা সম্পূর্ণভাবে ইউরোপীয়দের দখলে চলে আসে।

একটা সময়ে আমাদের এ উপমহাদেশের পাটনায় আফিমের চাষ ছিল। এ চাষে তখন পর্যন্ত কোনো ব্যাপকতা ছিল না। এ পণ্যকে যখন বাণিজ্যের পর্যায়ে আনা হলো, তখন এল প্রতিযোগিতা, যা প্রসারতা পেল ব্রিটেনে, চীনে এমনকি তখন ভারতেও। ভারতে তখন তুলা ও আফিম রফতানি পণ্য হিসেবে বেশ গতিলাভ করতে সক্ষম হয়েছিল। ভারতের বিভিন্ন স্থানে এ সময় মুনাফা লাভের জন্যই আফিম চাষ ছড়িয়ে যায় এবং এ আফিম ব্রিটেন ছাড়াও চীনা বাজার দখল করতে সক্ষম হয়েছিল।

যদি নীল চাষের কথা বলি। ১৭৪০ সাল। এক রঞ্জক পদার্থ হিসেবে নীল পরিচিতি পায়। নীল মূলত ব্রিটিশদের টেক্সটাইলের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় এক কাঁচামাল। কেননা ওয়াডের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে নীল প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। ইউরোপীয়দের নিয়ন্ত্রণে এবার নীল চাষ ছড়িয়ে গেল। তখন এখানে নীল পরিচিতি পায় যেন এক নতুন ফসল হিসেবে। পণ্যটি এ কারণে তখন লাভজনক এক পণ্য। পণ্যটির চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক ছিল। পশ্চিম ভারত, উত্তর আমেরিকার নীল চাষকে একসময় ইংরেজ শাসকরা বাংলার কিছু এলাকায় চাষ করতে বাধ্য করেছিল। নীল আমাদের দেশে বাণিজ্যিক পণ্যের চেয়েও কলঙ্কের পণ্য হিসেবে বেশি পরিচিত। কেননা এ নীল চাষের বাধ্যবাধকতার কারণে চাষী ও চাষীবান্ধব জমিদারদের সঙ্গে নীলকরদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। ইংল্যান্ডে বস্ত্র শিল্পের প্রসার হলো। আবার ফ্রান্সের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে সৈন্যদের জন্য নীল পোশাকের ব্যবহার বেড়ে গেল। বেড়ে গেল নীলের ব্যবহারও। তবে আমেরিকার স্বাধীনতা এল। তখন আমেরিকা থেকে নীলের সরবরাহ কমে গেল। এ সময়ে পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের মানুষ নীলের বদলে কফি ও তুলার উৎপাদনে ঝুঁকে গেলে নীল চাষ অর্ধেকে নেমে আসে। কিন্তু ১৮১০ সালের মধ্যে বাংলার নীল চাষ এক দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে যায়। ১৮৫৯-৬০ সালে বাংলার কৃষক বিদ্রোহ নীল শিল্পের ওপর বড় আঘাত হিসেবে ইতিহাসখ্যাত হয়ে আছে।

১৭৫৭ সালের আগে থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলার রেশম শিল্পের বেশ কদর ছিল। তুলাকে বাদ দিয়ে রেশমকে তখন উল্লেখযোগ্য রফতানিযোগ্য পণ্য হিসেবে পরিগণিত করা হতো। আবার পাট শিল্পের কদরও আন্তর্জাতিকভাবে এ সময়ে বাজার দখল রাখতে সক্ষম হয়েছিল। এক অর্থকরী ফসল হিসেবে পাটের আগমন ঘটে ১৮৫৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে। রফতানি পণ্য হিসেবে রেশমের চেয়ে পাটের চাহিদা বেশি ছিল। ১৮৭৫ সাল পর্যন্ত পাট ও তাঁত শিল্পের কারখানা বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। আর এসব হয়েছিল পণ্যের বাণিজ্যিকীকরণের জন্য।

আমাদের কৃষকের ঘামে উৎপাদিত চাল সবসময় এক বাণিজ্যিক ফসল। কেননা এ চাল কখনো আমদানি আবার কখনো রফতানি পণ্যে পরিচিতি এসেছে। আমাদের বাহারি চালের কদর বিশ্বের নানা দিকে, নানা প্রান্তে ছড়িয়েছিল, ছড়িয়ে আছে।

উৎপাদনগত সক্ষমতা, বাজার চাহিদা, পরিবেশগত বিষয় বিবেচনা করে আমাদের দেশে এখনো কিছু পণ্য সুদীর্ঘকাল থেকে বাজার ধরে রেখেছে। আবার কিছু কৃষিপণ্য নতুন করে বাজারে প্রবেশ করেছে। যেমন আখ, তাঁতবস্ত্র, চা, পাট, চামড়াজাত পণ্য বাজারে আছে আগে থেকেই। নতুন পণ্য হিসেবে হিমায়িত চিংড়ি, কচ্ছপ, কাঁকড়া, পোশাক, কুঁচে বাজার ধরেছে।

এ দেশের সমাজ ও জীবন কাঠামোটা গড়ে উঠেছে কৃষি উৎপাদনের প্রয়োজনে এবং তার বাধ্যবাধকতায় আমাদের মৌলিক চাহিদার প্রতিটি এসেছে কৃষিজ উত্কর্ষ ঘটিয়ে। যেখানে শ্রম, মেধা, ঝুঁকি এবং প্রয়োজনকে সামনে নিয়ে উৎপাদন ঘটানো হয়েছে। এ উৎপাদনকে সমন্বয় করতে কৃষিজ বাণিজ্য ও বাজার তৈরির তাগিদ সৃষ্টি করতে হয়েছে।

কেননা একজন কৃষক কখনো উৎপাদনকারী আবার তিনি একজন ভোক্তাও বটে। কৃষি বাণিজ্য একজন ভোক্তাকে তার চাহিদা ও রুচিমতো প্রয়োজনীয় উপযোগ নিতে এবং তা দিতে সাহায্য করে। আমাদের দেশ থেকে মূলত অন্যান্য যে সম্পদই অন্য দেশে যাক না কেন, তার মধ্যে কৃষিজি পণ্য বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে প্রায় পুরোটা। তবে পলাশীর যুদ্ধ ও নবাবের পতনের বিষয়টি এ দেশের বাণিজ্যপ্রবাহ ধারায় ব্যাপক তাত্পর্যমণ্ডিত বটে।

১৮ শতকের শুরুতে এশিয়া থেকে ওলন্দাজরা যে পণ্যগুলো হল্যান্ডে রফতানি করত, তার ৪০ শতাংশ এ বাংলা থেকে। বিষয়টি স্পষ্টত বিশ্ববাণিজ্যের একটি সময় ছিল, যখন বিশেষ করে এশিয়া বাণিজ্য জগতে বাংলার স্থান ছিল অতি দাপুটে শক্তিতে। সেজন্য এ সময়ে এ অঞ্চলে যে শিল্প উন্নতির বাতাবরণ ঘটেছিল, তা সম্ভব হয়েছিল প্রথমেই উৎপাদনের খাতিরে, সে উৎপাদনে প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়েছিল, উৎপাদন ক্রিয়ায় ছিল মজবুত সংগঠন ও উৎপাদিত পণ্যের ছিল বিশ্ববাজারও। যদিও আজকের দিনে আমাদের দেশে এ বিষয়গুলোর জন্য রয়েছে আরো গবেষণা ও প্রযুক্তির জন্য অনেক উন্নত প্রতিষ্ঠানও।

কৃষকের ঘামে যখন বঞ্চনার পুরস্কার

বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি এখন কৃষিজ পণ্য উৎপাদন, ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল। আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমরা আমিষে উদ্বৃত্ত। ফল ও ফসল উৎপাদনেও আমরা নিজেরা নিজেদের জন্য যথেষ্ট। জমি কর্ষণ থেকে ফসল উৎপাদন পর্যন্ত একজন কৃষক যে শ্রম দেন, তা থেকে তার শরীর থেকে ঝরঝর করে ঘাম ঝরলেও ন্যায্যমূল্য মেলে না সে ঘামের। কৃষকের টাকায় শহুরে মানুষের আয়েশের ব্যবস্থা হলেও কৃষকের দুঃখ লাঘবের নেই কোনো চিন্তাচেতনা। কৃষকের ভাগ্যে ন্যায্যমূল্যে সার মেলে না। ভালো বীজের অভাবে ফসল হয় না। সেচের জন্য জলের আকাল যেন নিত্যদিনের। ডিজেল, বিদ্যুৎ, ট্রাক্টর-টিলার-থ্রেশার, ওষুধ মেলাতেও তারা সিন্ডিকেট চক্রের শিকার। পুঁজির আকালে তারা সামান্য টাকা ঋণ নিলে ভাগ্যে জোটে সার্টিফিকেট মামলা। কৃষকের জন্য কোনো বীমা নেই। নেই ফল ও ফসলের বীমাও। অথচ বছর বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দুর্ঘটনায় কৃষক সর্বস্বান্ত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বজ্র বাণে কৃষকের মৃত্যুহার বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। রাজনৈতিক দল থেকে সব পেশাজীবীর সংগঠন থাকলেও দেশের লাখ-কোটি কৃষকের জন্য কোনো সংগঠন হয়ে ওঠেনি এখনো। আমাদের কৃষকের উন্নয়নের জন্য দরকার কৃষক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। আমাদের তা এখনো নেই তেমনটি। দেশের কৃষক সেই আদিকাল থেকেই শোষিত। কৃত্রিম বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তারা যখন ফসল উৎপাদন করতে পারেন না, তখন ফসল আকালে দুর্ভিক্ষেও পীড়িত হন এ কৃষকই। একটু চিন্তা করে আমাদের পুঁজি ও প্রযুক্তি মিশিয়ে কৃষিকে বিকশিত করা গেলে কৃষককে বাঁচানো যেত স্বচ্ছন্দে। দেশের কৃষক ভূমিহীন বেশি। ‘মাটিতে যাদের পড়ে না চরণ, মাটির মালিক তারাই হন’— যুগে যুগে মাটির মালিকানায় নেই কৃষক। দেশের খাসজমি, পুকুর, গোচারণ ভূমি, খাল, নদ-নদী সবকিছুর অধিকারে ভূমিদস্যুরা হলেও অধিকারহারা থাকেন কৃষক। কৃষকের বাজারে পুঁজির আবির্ভাব হওয়ার জন্য কখনো কখনো শোষিত হয়েছেন কৃষক। ফসলের বাজারে চাহিদা বা পণ্যমূল্যের খবর রাখেন না কৃষক। বাজারে হঠাৎ আবির্ভূত দালাল, আড়তদার, পাইকাররা বারবার সর্বস্বান্ত করে চলেছে কৃষককে। জমির আইলে এসে ভোক্তা যখন পণ্য কিনতে পারবে, তখন পণ্যের প্রকৃত মূল্য পেয়ে লাভবান হবেন কৃষক। কৃষক থেকে ভোক্তা এদের সবারই পকেট ফাঁকা হয়ে তা জমা হয় মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। আগে শোষণ ছিল একমুখী। এখন তা বিভিন্ন নামে ও বিভিন্নভাবে। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের দাম যে হারে বাড়ে, তার চেয়ে অনেক গুণে বেড়েছে উৎপাদন খরচ। সিন্ডিকেট চক্রের খপ্পরে পড়ে কৃষককে অনেক সময় মন্দা বাজারেও পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হতে হয়। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কৃষক সংগঠন আছে। বেসরকারি সংস্থাদের কাজ আছে কৃষি ও কৃষকদের নিয়ে। তার পরও দিন দিন কৃষক দরিদ্র থেকে আরো দরিদ্র হচ্ছেন এবং তারা অধিকার হারাচ্ছেন, সর্বস্বান্ত হচ্ছেন, প্রতারিত হচ্ছেন কৃষকই। এ দেশে কৃষকরা যদি সংগঠিত না হন, তবে তাদের মহাকালের ধারায় জীবনের যে দুর্ভোগ, তা লাঘব হবে না। যদিও একদিন এ দেশের কৃষকের গোলায় ধান ছিল, গোয়ালে গরু ছিল, তাদের চাষের জন্য জমিও ছিল। যেদিন থেকে বেহিসাবে লোক বেড়েছে, সেদিন থেকে আমাদের কৃষক জমির অধিকার হারাতে বসেছেন। তারা দরিদ্র থেকে আরো দরিদ্র হতে বাধ্য হয়েছেন। মোগল সরকারের সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত কৃষি আমাদের উপযুক্ত উপকরণ। কৃষি ও কৃষককে উন্নয়ন করা গেলে আমাদের সুখের পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শক্তি আরো দৃঢ় হবে। রাস্তাঘাট, জল, রেল ও আকাশপথে পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে কৃষি বাণিজ্য সম্প্রসারণ হয়। এতে ভোক্তা ও উৎপাদক দুজনই লাভবান হবেন। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি ব্যবহারে দেখার বিষয় কৃষির সাফল্যে তার কারিগর কৃষকের জীবনে কতটুকু প্রাপ্তি আসে। নইলে দুধ যেমন রাস্তায় ঢেলে পড়বে, পেঁয়াজ যেমন জমিতে শুকিয়ে যাবে, ধানও যেমন ক্ষেতেই চিটা হয়েই শেষ হবে। ডিজিটাল যুগে কৃষকদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়, তবে তাদের জন্য একক বাজেট প্রণয়ন হয় না। সাম্প্রতিক কালে বর্তমান সরকার বাজেটের সময় আলোচনায় এনেছেন কৃষকদের। কৃষকদের জন্য রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা রয়েছে। ১৯৯২ সালে রাষ্ট্র ধরিত্রী সম্মেলনে কৃষকদের জন্য অঙ্গীকার করেছেন। তার ২২ নীতিমালায় আছে উন্নয়নের জন্য স্থানীয় সম্পদের ভূমিকা অনেক। রাষ্ট্রের সেজন্য উচিত তাদের বিশেষ করে কৃষকদের একক উৎপাদক হিসেবে স্বীকার করা এবং তারা যেন টেকসই উন্নয়নের চলকে সাবলীল অংশগ্রহণ করতে পারেন, তার ব্যবস্থা করা।

    

লেখক: গবেষক ও পরিবেশ ব্যক্তিত্ব