সোমবার | আগস্ট ১০, ২০২০ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

বিশেষ সংখ্যা

আর্থিক খাত সংস্কার

শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় বিফল প্রয়াস

তৌফিক আহমদ চৌধূরী

স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় ব্যাপক বিবর্তন হয়েছে। সত্তরের দশকে একচেটিয়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা বজায় ছিল। আশির দশকের প্রথম থেকেই বেসরকারি ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া শুরু হয়েছে, যা এখনো অব্যাহত। বেসরকারি ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার পরও আশি ও নব্বইয়ের দশকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোই প্রাধান্য বজায় রেখেছিল। তারপর থেকেই বেসরকারি ব্যাংকগুলোর প্রাধান্য ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার আমানতের এবং সম্পদের প্রায় ৬৫ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকগুলোর দখলে (BB Annual Report, 2016-17, P-31)। আশির দশকে মূলত বেসরকারি খাতে আরেকটি নতুন ধারার ব্যাংকিং শুরু হয়, যাকে বলা হয় ইসলামিক ব্যাংকিং। এর আনুপাতিক শেয়ার ২৩-২৪ শতাংশের মধ্যে সীমিত আছে। বিদেশী ব্যাংকগুলোর আনুপাতিক আধিপত্য ৪-৫ শতাংশের মধ্যেই প্রথম থেকে এখন পর্যন্ত বজায় রয়েছে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কাঠামোগত এ পরিবর্তনের পেছনে অন্যতম কারণ ছিল ‘ব্যাংক সংস্কার’। ব্যাংকিং-সংশ্লিষ্ট গবেষক ও নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, Banking sector reform is a process, not an event। ব্যাংক সংস্কার শুধু একটি প্রক্রিয়া নয়, চলমান প্রক্রিয়া। দেশ ও অর্থনীতির চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যাংক সংস্কারও চলতে থাকে। গত কয়েক দশকে, বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে ব্যাংক সংস্কারমূলক যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে এবং সেগুলোর অভিঘাত আর্থিক খাতের ওপর কেমন ছিল, সে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করাই এ লেখার উদ্দেশ্য।

ব্যাংক সংস্কার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ১৯৭২ থেকেই শুরু করতে হবে। স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি অনুন্নত এবং বৈচিত্র্যহীন (undiversified) আর্থিক খাত লাভ করে, যা ছিল ব্যাংকনির্ভর এবং মূলত মালিকানাবিহীন (কারণ পশ্চিম পাকিস্তানি মালিকরা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশ ত্যাগ করেছিল)। একই সময় তত্কালীন বাংলাদেশ সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছিল ব্যাংক-বীমা-বৃহৎ শিল্প ইত্যাদি জাতীয়করণের মাধ্যমে দেশের সার্বিক উন্নয়নে অবদান রাখা। এসব কারণেই তত্কালীন সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থার মোট ১২টি ব্যাংককে পুনর্গঠিত ও পুনর্বিন্যস্ত করে ছয়টি ব্যাংকে রূপান্তর করে। একই সঙ্গে অন্যান্য বৃহৎ শিল্প ও সংস্থার মতো ব্যাংকগুলো জাতীয়করণ করা হয় এবং সরকারের অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের জন্য প্রস্তুত করা হয়। সেজন্যই পুরো সত্তর ও আশির দশকের প্রথম কোয়ার্টার পর্যন্ত ব্যাংকগুলো সম্পূর্ণভাবে সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ও কঠোর তদারকির মধ্যে পরিচালিত হয়েছিল। নির্দেশনা ও অনুশাসনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল— অগ্রাধিকার খাত (যেমন— গ্রামীণ এলাকা, কৃষি ইত্যাদি) ও পাবলিক এন্টারপ্রাইজগুলোকে ঋণ প্রদান (কখনো কখনো কম সুদে), বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত হারে আমানত গ্রহণ ও ঋণ প্রদান, গ্রামীণ এলাকায় শাখা সম্প্রসারণ ইত্যাদি। এতে প্রথম দশকে অর্থাৎ ১৯৭২-৮২ শাখা সম্প্রসারণ (বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়), অগ্রাধিকার খাত ও সরকারি এন্টারপ্রাইজগুলোকে ঋণ প্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধন হলেও ব্যাংকগুলোর আর্থিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছিল। সরকারি নির্দেশনায় আর্থসামাজিক বিবেচনায় অতিদ্রুত ঋণ বিতরণের ফলে ঋণশৃঙ্খলা দারুণভাবে বিঘ্নিত হয়। শাখাগুলোর viability-সংক্রান্ত ব্যাপারটি বিবেচনায় না নিয়েই অনেক গ্রামীণ শাখা সম্প্রসারণ করা হয়েছিল। ঋণের হার বিশেষ করে অগ্রাধিকার খাতের ঋণের হার, ভর্তুকি দেয়ার নামে এমন নিচু পর্যায়ে নির্ধারিত হয়েছিল, যা দিয়ে ঋণের খরচ ও ঝুঁকি বহন করা ছিল ব্যাংকগুলোর জন্য অসাধ্য। এতে খেলাপি ঋণ ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়; অন্যদিকে দুর্বল আইন কাঠামো ও সরকারি নির্দেশনার অভাবে খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলো তত্পর ছিল না। ব্যাংকিং সেবার মানও একই সময় দারুণভাবে নিম্নগামী ছিল। এসব কিছুর প্রতিফলন ছিল ব্যাংকগুলোর মুনাফা ও মূলধন— দুটিই নেতিবাচক অবস্থায়।

 ১৯৭২-৮২ পর্যন্ত ব্যাংকিংয়ের নেতিবাচক ধারাকে প্রতিহত করার জন্য বাংলাদেশ সরকার দুটি জাতীয়করণকৃত ব্যাংক বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

সঙ্গে সঙ্গে নতুন বেসরকারি ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান করার ঘোষণা দেয়া হয়। আশির দশকে একটি ইসলামিক ব্যাংকসহ মোট ছয়টি বেসরকারি ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল জাতীয়করণকৃত ব্যাংকগুলো বেসরকারি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে, ফলে ব্যাংকিং সেবার মান বাড়বে, ব্যাংকগুলো টেকসই (viable) হবে; অন্যদিকে ব্যাংকিংনির্ভর সরকারি উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডও (যেমন— অগ্রাধিকার খাতে ঋণপ্রবাহ) চলমান থাকবে। মালিকানাভিত্তিক ব্যাংক সংস্কারের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকিং অনুশাসন ও নীতিমালায় (বিশেষ করে ঋণশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত) কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। ফলে ১৯৮২-পরবর্তী সময়ে ঋণ সংস্কৃতির উন্নতির বিপরীতে অবনতি হয়েছে। ঋণ আদায়ের ব্যাপারে নতুন কোনো আইন বা অনুশাসন গৃহীত না হওয়ায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ দিন দিনই বাড়তে থাকে। আইন ও অনুশাসনের দুর্বলতা এমন পর্যায়ে ছিল যে, ব্যাংকগুলোকে প্রকৃত খেলাপি ঋণ এবং সে সংক্রান্ত প্রভিশনিং ও রিপোর্টিং করার বাধ্যবাধকতাও ছিল না। এক কথায় বলতে হয়, মালিকানাভিত্তিক সংস্কার ব্যাংক ব্যবস্থার কোনো উন্নতি সাধন করতে সক্ষম হয়নি, বরং এরই মধ্যে ব্যাংকিং পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে।

মালিকানাভিত্তিক সংস্কারের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে উদ্ভূত প্রতিযোগিতার ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার আশানুরূপ উন্নতি না হওয়ার প্রেক্ষিতে ১৯৮৪ সালে তদানীন্তন বাংলাদেশ সরকার ড. এমএন হুদার নেতৃত্বে National Commission on Money, Banking and Credit গঠন করেছিল। কমিশন কাজ শুরু করার কয়েক মাস পর ড. এমএন হুদা স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করায় পরবর্তীতে কমিশনের নেতৃত্ব দেন অধ্যাপক এএফএ হোসেন। কমিশনকে বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সমস্যাগুলো, যেমন— ঋণ প্রদান, খেলাপি ঋণ আদায়, জাতীয়করণকৃত ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, ব্যাংকিং আইন-কানুনের স্বল্পতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি ইত্যাদির ওপর আলোকপাতপূর্বক রিপোর্ট ও সুপারিশ প্রদান করতে বলা হয়। কমিটি ৩০৫টি সুপারিশসহ ১৯৮৬ সালের জুনে রিপোর্ট দেয়। কমিশনের উল্লেখযোগ্য সুপারিশ ছিল— ব্যাংক ব্যবস্থা, মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ এবং সুদের হার-সংক্রান্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ আদায়ের ব্যাপারে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ; গ্রামীণ ও কৃষিঋণ-সংক্রান্ত কৌশল; ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি; বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি; ব্যাংকিং জাল-জালিয়াতি রোধকল্পে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি কাঠামোর দুর্বলতা চিহ্নিত করা, দূরীভূত করা এবং প্রয়োজন হলে নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করা। কমিশনের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে তদানীন্তন সরকার কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল: রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর জন্য খেলাপি ঋণ আদায় টার্গেট নির্ধারণ, ঋণখেলাপিদের ভবিষ্যতে নতুন ঋণ প্রদান না করা ইত্যাদি। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা সত্ত্বেও ব্যাংকিং পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

এমন অবস্থায় বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংকিং দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে ১৯৯১ সালে Financial Sector Adjustment Credit (FSAC) প্রদান করে। FSAC-র আওতায় একই সময়ে USAID কারিগরি সহায়তা হিসেবে (TA) Financial Sector Reform Project (FSRP) নামে আরেকটি অনুদান দেয়। বিশ্বব্যাংক মূলত ব্যাংকিং কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে বাংলাদেশের ব্যাংকিং দুর্বলতা দূরীকরণে ব্যাপক সংস্কারমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। বিশ্বব্যাংকের গৃহীত পদক্ষেপগুলো মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল— আমানত ও ঋণের সুদের হারের ওপর থেকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহারপূর্বক এগুলো বাজারনির্ভর করে তোলা; ঋণশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য ঋণ অনুমোদন, শ্রেণীকরণ ও প্রভিশনিং নীতিমালা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীতকরণ; সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মূলধন ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করা; লোকসানি শাখাগুলোর যৌক্তিককরণ; ব্যাংক ব্যবস্থা তদারকির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকে দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ; খেলাপি ঋণ আদায়কল্পে আইনি কাঠামো সংস্কার ইত্যাদি। বিশ্বব্যাংকের এসব সংস্কারমূলক কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল স্বল্প মেয়াদে আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকগুলোর operational efficiency বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের বাজারমুখী করে তোলা এবং আর্থিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। আগেই বলা হয়েছে FSRP সমন্ধে, ১৯৯২ সালে FSRP কার্যক্রম শুরু করে বিশ্বব্যাংকের উপরোক্ত পদক্ষেপগুলো সফলভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে বেসরকারীকরণের জন্য তৈরি করা এবং পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বেসরকারি ব্যাংকের আধিপত্য ও প্রভাব বৃদ্ধি করা।

নব্বইয়ের দশকে বিশ্বব্যাংক সূচিত ব্যাংক সংস্কার আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কতটুকু সক্ষম হয়েছিল, সেদিকে একটু নজর দেয়া যাক। ব্যাংকগুলোর আর্থিক শৃঙ্খলা সাধারণত দুটি সূচকের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়— প্রথমটি হচ্ছে মূলধনের পর্যাপ্ততা এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশনিং। ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত ব্যাংকের মূলধন নির্ধারিত হতো ব্যাংক দায়ের আঙ্গিকে, সে হিসাবে উপরোক্ত সময় (১৯৯৫ পর্যন্ত) মূলধন ছিল মোট ব্যাংক দায়ের ৬ শতাংশ, ১৯৯৬ সাল থেকে ব্যাংকের মূলধন নির্ধারণ করা হয় ব্যাংকের ঝুঁকি ভারিত সম্পদের (Risk weighted assets) আঙ্গিকে। Basel-I প্রদত্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আঙ্গিকে বাংলাদেশ ব্যাংক তখন বাংলাদেশে কর্মরত সব দেশী-বিদেশী, সরকারি- বেসরকারি ব্যাংকের জন্য মূলধন নির্ধারণ করে ঝুঁকি ভারিত সম্পদের ৮ শতাংশ। ১৯৯৫ পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে সরকার কর্তৃক প্রচুর মূলধন জোগান দেয়া সত্ত্বেও সেগুলোর মূলধন ঘাটতি ছিল ৮ শতাংশ, একই সময়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি ছিল ১৩ শতাংশ নতুন মূলধন পরিমাপের মাপকাঠি অনুযায়ী (Basel-I); ১৯৯৬ সালের শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩০ ও ২০ শতাংশ। এরই মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ এবং প্রভিশনিং ঘাটতি দুই-ই বাড়ছিল। মূলধন ঘাটতি, শ্রেণীকৃত ঋণের বৃদ্ধি ও প্রভিশনিং ঘাটতি ইত্যাদির উপস্থিতির জন্যই রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি উভয় ধরনের ব্যাংকেরই অপারেশনাল দক্ষতা ক্রমাগত হ্রাস পেতে থাকে, ফলে স্বল্প মেয়াদে আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে যে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল, তা হয়নি।

বিশ্বব্যাংক সূচিত ব্যাংক সংস্কার কর্মসূচির একটি অন্যতম লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমে ব্যাপক উন্নতি সাধন করা। এ লক্ষ্য অর্জন করতে চেয়েছিল ব্যাংকিং কম্পিউটারাইজেন এবং নতুন নতুন ব্যাংকিং প্রযুক্তি ব্যবহার, যথোপযুক্ত ঋণ সংস্কৃতি চালু এবং ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা উন্নীতকরণের মাধ্যমে। সেজন্য বিশ্বব্যাংকের কনসালট্যান্টরা বেশকিছু management and operational toolsও প্রদান করেছিলেন, যেমন— ঋণ ঝুঁকি বিশ্লেষণ (LRA), বৃহৎ ঋণ রিপোর্টিং ব্যবস্থা (LLRS), নতুন ঋণ লেজার কার্ড (NLLC), কর্মদক্ষতা পরিকল্পনা ব্যবস্থা (PPS), তথ্য ব্যবস্থাপনা (MIS), ব্যাংক তদারকি, বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অফ সাইট তদারকি শুরু করা ইত্যাদি। এসব tools – techniques সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। এত সব সংস্কারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরও সার্বিক ব্যাংকিং পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, স্বল্প মেয়াদে ব্যাংকগুলোয় আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরে আসেনি। নব্বইয়ের দশকের দুটি রাজনৈতিক সরকারের আমলে দুবার অনেকগুলো বেসরকারি ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল। এসব নতুন বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে নতুন ব্যাংকিং প্রযুক্তি ও সংস্কার গ্রহণেও তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। তারাও তাদের পূর্বসূরিদের মতো ক্রমাগতভাবে ঋণ প্রদানে অযাচিত হস্তক্ষেপ শুরু করেছিল, ফলে ঋণ শৃঙ্খলার আরো অবনতি ঘটে।

FSAC এবং FSRP-র আওতায় নব্বইয়ের দশকে গৃহীত ব্যাংক সংস্কার কর্মসূচি সফল হয়নি কেন? ১৯৯৬ সালে Development Association Inc নামক একটি আন্তর্জাতিক কনসালটিং প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংক সূচিত ব্যাংক সংস্কার কর্মসূচির Impact Evaluation সম্পাদন করে। তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় re-engineering process বা ব্যাংক সংস্কারমূলক toolsগুলো সফলভাবেই বাস্তবায়িত হয়েছে, তবে এর সুফল পেতে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। রিপোর্টে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাংক সংস্কারমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নে যে ধরনের নেতৃত্ব প্রয়োজন, তা বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় সর্বত্র বিরাজমান নয়। যার জন্য স্বল্প মেয়াদে সংস্কার কর্মসূচি ভালো ফল দিতে পারেনি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে বেসরকারীকরণের জন্য তৈরি করাও সম্ভব হয়নি। তবে যে management এবং operational tools বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় এরই মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে, তা ভবিষ্যতে চলমান থাকলে সংস্কার কর্মসূচি বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় অনুকূল প্রভাব ফেলবে। বিআইবিএম পরিচালিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, নব্বইয়ের দশকে গৃহীত ব্যাংক সংস্কার কর্মসূচি আর্থিক শৃঙ্খলা আনয়নে ব্যর্থ হয়েছে। তার মূল কারণ ছিল সংস্কার কর্মসূচির ফোকাস ছিল কীভাবে, কত দ্রুততায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা যায়। FSAC-FSRP ব্যাংক সংস্কারের ‘মূল লক্ষ্য’ (অর্থাৎ ব্যাংকগুলোকে বাজারমুখী করা, ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, আর্থিক শৃঙ্খলা স্থাপন, আইনি কাঠামোর সংস্কার) থেকে সরে গিয়ে সংস্কার কর্মসূচিতে মনোযোগ দিয়েছিল ‘প্রান্তিক লক্ষ্য’ (যেমন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক বেসরকারীকরণ) অর্জনে, এতে কোনো লক্ষ্যই অর্জিত হয়নি। বেসরকারীকরণের আগে সরকারি ব্যাংকগুলো কার্যকরভাবে পুনর্গঠন করা দরকার ছিল। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর governance সমস্যাও দূরীভূত করা হয়নি। এগুলো না করেই সুদের হার বাজারমুখী করার উদ্যোগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল। ঋণ আদায় তথা lenders recourse on borrowers নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন আইনি কাঠামোর সংস্কার-সংক্রান্ত বিষয়েও যথেষ্ট অগ্রগতি হয়নি।

২০০০ সালে সিপিডির নেতৃত্বে বাংলাদেশের সুশীল সমাজ বিশ্বব্যাংক সূচিত আর্থিক খাত সংস্কারের ওপর আরেকটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করেছিল। মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও বিশ্বব্যাংক দাবি করে তাদের আর্থিক খাতের সংস্কার কর্মসূচি তৈরি হয়েছে National Commission on Money, Banking and Credit-এর সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে, কিন্তু দাবিটি যথার্থ নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রেই বিশ্বব্যাংক কমিশনের সুপারিশ উপেক্ষা করেছে। কমিশনের সুপারিশ ব্যাংক ব্যবস্থার মৌলিক সমস্যার (যেমন: কৃষিঋণ, খেলাপি ঋণ, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পুঁজির স্বল্পতা, আইনি কাঠামোর দুর্বলতা) ওপর নিবন্ধিত ছিল, কিন্তু বিশ্বব্যাংকের সংস্কার কর্মসূচি এগুলো পাশ কাটিয়ে সম্পূর্ণভাবে নিবন্ধিত ছিল সার্বিক economic deregulation-এর ওপর। তাছাড়া ব্যাংক সংস্কার কর্মসূচি যে ধারাবাহিকতায় (sequencing) বাস্তবায়িত হয়েছিল, তা ছিল বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবর্জিত। এসব কারণেই নব্বইয়ের দশকের বিশ্বব্যাংক সূচিত ব্যাংক সংস্কার কর্মসূচি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়নি।

FSAC-FSRP কর্মসূচি ১৯৯৬ সালে সমাপ্ত হয়। প্রায় একই সময়ে তত্কালীন বাংলাদেশ সরকার
ড. ওয়াহিউদ্দিন মাহমুদের নেতৃত্বে একটি ব্যাংক সংস্কার কমিটি [Banking Reform Committee (BRC)] গঠন করে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি পর্যালোচনাপূর্বক সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি ও আর্থিক শৃঙ্খলা আনয়ন-সংক্রান্ত সুপারিশ প্রদান করার জন্য সংস্কার কমিটিকে বলা হয়। কমিটি ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সরকারের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। কমিটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতার জন্য Supervisory and regulatory forbearanceকে মূলত দায়ী করে মোট চারটি বিষয়ের ওপর সুপারিশ প্রদান করে। বিষয়গুলো ছিল— ব্যাংকিং তদারকি ও নীতিমালার সংস্কার, বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনর্গঠন, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন এবং ব্যাংকিং আইন সংস্কার। FSAC-FSRP প্রকল্প শেষ হওয়ার পর বিশ্বব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংক পুনর্গঠন প্রকল্প [Commercial Bank Restructuring Project (CBRP)] নামে আরেকটি উদ্যোগ গ্রহণ করে। CBRP-র উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংকিং ব্যবস্থার সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উন্নতিকল্পে কী কী জরুরি ব্যবস্থা নেয়া যায়, তা নিরূপণ করা। এ লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে দুটি মিশন পাঠায়। প্রথম মিশনের একটি মন্তব্য এখানে প্রণিধানযোগ্য। ‘Three pillars of banking effective legal system, good management and strong and effective central bank need to be rebuilt’ (in Bangladesh)। মূলত BRC-র সুপারিশের ওপর ভিত্তি করেই CBRP-র সুপারিশমালা তৈরি করা হয়েছিল। সেগুলোর বাস্তবায়ন পর্যায় ও ফলাফল নিয়ে পরবর্তীতে আলোচনা করা যেতে পারে।

 

লেখক: মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)