সোমবার | আগস্ট ১০, ২০২০ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

বিশেষ সংখ্যা

পোশাক শিল্প

চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়

শফিক উজ জামান

রফতানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জিডিপিতে অবদান বৃদ্ধি, যে দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা হোক না কেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পোশাক শিল্পের অবদান অপরিসীম। স্বাধীনতার সাত বছর পর প্রায় শূন্য থেকে শুরু করে মাত্র ১২ বছরের মধ্যেই রফতানিতে বিলিয়ন ডলারে পৌঁছা এবং ১০ লাখের অধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থান করা এ শিল্পের জন্য অনেকটা কল্পনাতীত ছিল। এ শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, শ্রমিকের সিংহভাগ নারী, যার অধিকাংশ এসেছে গ্রাম এলাকার হতদরিদ্র পরিবার থেকে। স্বাধীনতার ঊষালগ্নে বাংলাদেশ ছিল কৃষিনির্ভর প্রান্তিক অর্থনীতির দেশ। কেবল পাটজাত দ্রব্য ও কাঁচামাল ছাড়া কোনো রফতানি পণ্য ছিল না। তেমন অবস্থা থেকে তিলে তিলে গড়ে ওঠা পোশাক শিল্প আজ বাংলাদেশকে বিশ্বে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। গত ৩৫ বছরের চড়াই-উতরাই পার হয়ে আজ দেশের পোশাক খাতে আবির্ভূত হয়েছে শ্রমিক অসন্তোষ ও অস্থিতিশীল বিশ্ববাজার। এসবই দেশের অর্থনীতির জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এ শিল্প খাতকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে। একই সঙ্গে এ শিল্পের সম্ভাবনাও কম নয়। আলোচ্য প্রবন্ধে এ শিল্পের আবির্ভাব, উদ্যোক্তাদের বৈশিষ্ট্য, শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক এবং শিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনার দিক তুলে ধরা হয়েছে।

পোশাক শিল্পের বিকাশ অর্থনীতিতে শিল্পের গুরুত্ব

গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত রফতানি খাতে পোশাক শিল্পের নাম ছিল না। ১৯৭৬ সালে রিয়াজ গার্মেন্টস ও জুয়েল গার্মেন্টস পোশাক শিল্পে যোগ দেয়। রিয়াজ গার্মেন্টস ষাটের দশকেই পোশাক শিল্প-কারখানা গড়ে তোলে, তবে তা ছিল স্থানীয় বাজারভিত্তিক। সর্বপ্রথম ১৯৭৭ সালে রিয়াজ গার্মেন্টস ফ্রান্সে পোশাক রফতানি শুরু করে। ১৯৭৮ সালে নুরুল কাদের, একজন সরকারি আমলা ও মুক্তিযোদ্ধা কোরিয়ার দাইয়ু কোম্পানির সহায়তায় পোশাক রফতানি শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৯ সালে আরো কয়েকটি ফার্ম এগিয়ে আসে। তবে ১৯৮০-৮১ সালের আগ পর্যন্ত এ শিল্পের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা।

১৯৭৭-৭৮ সালে ২২টি ফার্ম পোশাক রফতানি করে ৪০ হাজার ডলার আয় করে এবং এর দুই বছর পর থেকেই রফতানি আয় ও ফার্মের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। ১৯৭৩-৭৪ সালে রফতানি আয়ে নিরঙ্কুশ আধিপত্য ছিল পাট ও পাটজাত দ্রব্যের। তবে ক্রমেই পোশাক শিল্পের বৃদ্ধি রফতানি আয় দখল করে নেয়। ১৯৮৪-৮৫ সাল পর্যন্ত রফতানি খাতে পাট ও পাটজাত দ্রব্যের অংশ ছিল অর্ধেকের বেশি, অর্থাৎ ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এর পরের বছর থেকেই পোশাক রফতানি প্রধান খাত হিসেবে আবির্ভূত হয়। ২০০০ সাল থেকেই পোশাক মোট রফতানির তিন-চতুর্থাংশ দখল করে। অন্যদিকে রফতানিতে পাট খাত ৫ শতাংশের নিচে নেমে যায়। বর্তমানে পোশাক রফতানির (ওভেন ও নিটিং খাতের একত্রে) মোট রফতানিতে ৮১ দশমিক ১৭ শতাংশ (২০১৩-১৪ অর্থবছর) অবদান রয়েছে।

১৯৮১-৮২ সালে মোট পোশাক শ্রমিকের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫ হাজার। আজ তার পরিমাণ ৪০ লাখ এবং এর ৮০ শতাংশই নারী শ্রমিক। ১৯৯৫-৯৬ সালে সমগ্র শ্রমশক্তিতে নারী শ্রমিকের অংশ ছিল ৩৮ শতাংশ। তার মধ্যে ৭ শতাংশ ছিল ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে। বর্তমানে সমগ্র ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে নিয়োজিত নারী শ্রমিকের পরিমাণ ৪০ শতাংশ।

পোশাক রফতানির কারণেই আমদানি-রফতানি ব্যবধান কমেছে এবং বর্তমান রফতানি আয় দিয়ে ৮০ শতাংশ আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। তেমনিভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতেও পোশাক শিল্পের অবদান অপরিসীম। পোশাক শিল্পের বৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়ে উঠেছে অনেক সহযোগী শিল্প ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। সামগ্রিকভাবে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত ৪০ লাখ শ্রমিক এবং সহযোগী শিল্প ও সেবা খাতের শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ফলে আড়াই-তিন কোটি মানুষের জীবিকার সংস্থান হয়েছে, যা দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সত্তরের দশকে বাংলাদেশ কেবল কাঁচামাল রফতানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। আর বর্তমানে রফতানি পণ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই শিল্পপণ্য, যা উন্নয়নশীল দেশে অনন্য।

বাংলাদেশে পোশাক শিল্পে উদ্যোক্তা শ্রেণীর আবির্ভাব

কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে রূপান্তরের মাধ্যমে সাধারণত শিল্পায়ন শুরু হয়। তবে দেশ-কালভেদে এর ভিন্নতাও লক্ষণীয়। শিল্পায়নের মাধ্যমেই অর্থনীতির অন্যান্য খাত, উপখাতের বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ফলে দেশের অগ্রগতি ত্বরান্বিত হয়। শিল্পায়ন ছাড়া কোনো দেশ উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত বিরল। আমরা উন্নত দেশ না বলে হামেশাই বলি শিল্পোন্নত দেশ। তাই দেশের অগ্রগতির জন্য শিল্পোন্নয়ন অপরিহার্য। বাংলাদেশের মতো বিপুল ঘনবসতিপূর্ণ দেশে শিল্পোন্নয়নের গুরুত্ব আরো বেশি। কিন্তু শিল্পোন্নয়নের জন্য সর্বাধিক প্রয়োজন উদ্যোক্তা শ্রেণীর সৃষ্টি। নতুন পণ্য ও সেবার সৃষ্টি, গুণগত মান বৃদ্ধি বা যেকোনো ধারণার উদ্ভাবনই হলো উদ্যোগ বা শিল্পোদ্যোগ। আর যিনি এ উদ্যোগ গ্রহণ করেন, তাকেই সাধারণত আমরা উদ্যোক্তা বলি। আরো বিস্তারিত বলতে গেলে শুধু শিল্পক্ষেত্রে নয়, উদ্যোক্তা নামের সঙ্গে সম্পদ সৃষ্টির সম্পর্ক আছে। সম্পদ আপনাআপনিই সৃষ্টি হয় না। প্রকৃতি থেকে অঢেল সম্পদ পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু এ প্রকৃতি প্রদত্ত সম্পদকেও ব্যবহারযোগ্য সম্পদে পরিণত করতে প্রয়োজন গবেষণা, আবিষ্কার, উন্নতি ও উদ্ভাবন। গবেষণা ও আবিষ্কারের মাধ্যমে জ্ঞান ও নতুন পদ্ধতি সৃষ্টি হয়। এ জ্ঞান ও নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করে ক্রমান্বয়ে উদ্ভাবনের মাধ্যমে তা উৎপাদনকাজে প্রয়োগ করা হয়। এসব কিছু মূলত অর্থনৈতিক কার্যকলাপের অন্তর্ভুক্ত। সম্পদ সৃষ্টির এ পরস্পর-সম্পর্কিত গবেষণা, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, উন্নয়ন ও উদ্ভাবনের সমগ্র প্রক্রিয়াটিই যারা সম্পাদন করেন, তারাই উদ্যোক্তা। নতুন নতুন পণ্য ও পদ্ধতি আবিষ্কারের ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা বহন করেন, শ্রমিক অসন্তোষ মোকাবেলায় শান্তিপূর্ণ সমাধানে উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং শ্রমিককে উৎপাদনশীল করার জন্য উন্নত প্রযুক্তিসহ জটিল কলাকৌশল শেখানোর প্রশিক্ষণ দেয়া— এ সবকিছুই উদ্যোক্তার কর্মকৌশলের আওতাধীন। এ উদ্যোক্তা বা Entrepreneur শব্দটি সুম্পিটারের দেয়া।

দেশের শিল্পায়ন তথা উন্নয়ন মূলত এ উদ্যোক্তার জোগানের ওপর নির্ভরশীল। শিল্প বিপ্লবের ফলে ব্রিটেনের উন্নয়নে বেশি অবদান ছিল উদ্যোক্তা গোষ্ঠীর। শুধু ব্রিটেনে নয়, বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোর উন্নয়নের পশ্চাতে এ শিল্পোদ্যোক্তা গোষ্ঠী সর্বাধিক অবদান রেখেছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল কৃষিভিত্তিক, শিল্পায়নে অনগ্রসর। শিল্পোদ্যোক্তা বলতে যা বোঝায়, তা ছিল প্রায় অনুপস্থিত। ঐতিহাসিক কারণেই বাংলাদেশ শিল্পে অনগ্রসর। উল্লেখ্য, প্রাক-ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশ শিল্পে সমৃদ্ধশীল অঞ্চল হিসেবে পরিচিত ছিল। ঔপনিবেশিক আমলে ঐতিহ্যবাহী শিল্প ধ্বংস করে বাংলাদেশ ব্যবহূত হয় ইউরোপ ও উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠা শিল্পাঞ্চলের কাঁচামাল সরবরাহকারী দেশ হিসেবে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ ঔপনিবেশিক আমলের বৈষম্য অবসানের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর আচরণ ছিল ঔপনিবেশিক আমলের অনুরূপ। ষাটের দশকে আন্দোলনের চাপে কিছু কিছু সুবিধা দেয়ায় কিছু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে উঠলেও শিল্পক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানি প্রাধান্য অটুট থাকে।

স্বাধীনতার পর অর্থাৎ ১৯৭২ সালে কৃষিই ছিল অর্থনীতির প্রধান খাত। জিডিপিতে শিল্পের অবদান ছিল ১৩ শতাংশ, তার মধ্যে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের অবদান ছিল ৯ শতাংশ। জাতীয় অর্থনীতিতে শিল্পের গুরুত্বের কথা বিবেচনা করেই প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। স্থানীয় কাঁচামালভিত্তিক শিল্পের বিকাশ ও আত্মনির্ভরশীল শিল্পের গতি ত্বরান্বিত করতে আমদানি বিকল্পায়ন কৌশল গ্রহণ করা হয়। তবে নামে আমদানি প্রতিস্থাপন হলেও শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের উল্লেখযোগ্য অংশ ও মূলধনি দ্রব্যের প্রায় পুরোটাই ছিল আমদানিনির্ভর। এ আমদানি দ্রব্যের চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা সংস্থানের একমাত্র উপায় ছিল প্রাথমিক পণ্য রফতানি। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে প্রাথমিক পণ্যের মূল্য হ্রাসের কারণে বাণিজ্য ভারসাম্য ক্রমেই বাংলাদেশের বিপক্ষে চলে যায়। ফলে আমদানি প্রতিস্থাপন কৌশল কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়। তা সত্ত্বেও স্থানীয় কাঁচামালভিত্তিক বেশকিছু বৃহৎ ও মাঝারি শিল্প-কারখানা স্থাপিত হয়। ১৯৭৫ সালের আগস্টে বঙ্গবন্ধু ও তার আড়াই মাস পর জাতীয় চার নেতার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়, তার সঙ্গে সঙ্গে শিল্পনীতি কৌশলেও পরিবর্তন ঘটে।

১৯৮২ সালে নয়া শিল্পনীতি গৃহীত হয়। এ নীতিমালায় বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল নির্দেশিত কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচির অধীনে ১৯৭৩ সালে গৃহীত আমদানি প্রতিস্থাপন কৌশলের পরিবর্তে রফতানিমুখী কৌশল গ্রহণ করা হয়। এ নতুন নীতিমালায় রাষ্ট্রীয় খাত সংকোচন করে ব্যক্তিখাতকে উৎসাহিত করা হয়, যা আজো অব্যাহত আছে।

উল্লেখ্য, ব্রিটিশ ভারতে শেষের দিকে বস্ত্র শিল্পের পাশাপাশি পাট শিল্প গড়ে ওঠে এবং বিগত শতাব্দীতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পরই ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্প হিসেবে কলকাতার আশপাশে গড়ে ওঠা এ শিল্পের তিন-চতুর্থাংশ কাঁচামাল সরবরাহ হয় পূর্ব বাংলা অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশ থেকে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় স্থাপিত ১০৬টি পাটকলের একটিও বাংলাদেশের ভাগে পড়েনি। নয়টি বৃহৎ বস্ত্র কারখানা ছাড়া সবই ছিল হস্তশিল্প স্তরের। এ সময় শিল্প ও ব্যবসার বৃহৎ অংশের মালিক ছিলেন হিন্দু মারোয়াড়ি ব্যবসায়ীরা। দেশ বিভাগের পর এ ব্যবসায়ীদের অধিকাংশই ভারতে চলে যান। শিল্প ও ব্যবসাক্ষেত্রে এ শূন্যস্থান দখল করে নেন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা ব্যবসায়ীরা এবং শিল্প ও ব্যবসাক্ষেত্রে স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত এদের প্রাধান্য অব্যাহত থাকে। ফলে বাংলাদেশে তেমন কোনো উদ্যোক্তা শ্রেণীর গড়ে ওঠার সুযোগ হয়নি।

১৯৮২ সালে রফতানিমুখী শিল্পোন্নয়ন কৌশল গৃহীত হওয়ার মধ্য দিয়ে রফতানি শিল্পের সুযোগ সৃষ্টি হয়। উন্নত পুঁজিবাদী দেশে শ্রমের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় শ্রমনির্ভর পোশাক শিল্প অনুন্নত দেশে স্থানান্তর করা হয়। ষাট ও সত্তরের দশকে এসব শিল্পকে বাজার ও কোটা সুবিধা দিয়ে হংকং, তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে স্থাপন করা হয়। মাত্র দুই-আড়াই দশকেই এসব সুবিধা কাজে লাগিয়ে এসব দেশ নয়া শিল্পায়িত দেশে পরিণত হয়ে উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরিতে চলে যায় এবং সস্তা মূল্যের পোশাক শিল্প বাংলাদেশের মতো অনুন্নত দেশে চলে আসে।

বাংলাদেশের বিপুল সহজলভ্য উদ্বৃত্ত সস্তা শ্রম ও কোটা সুযোগের পাশাপাশি সরকারি সুবিধা যেমন— শুল্কমুক্ত আমদানি, ২৫ শতাংশ নগদ সহায়তা, ব্যাক টুক ব্যাক এলসি, বন্ডেড ওয়্যার হাউজ ফ্যাসিলিটিজ, সর্বোপরি সংরক্ষিত বাজারের আকর্ষণে অনেকেই পূর্বাভিজ্ঞতা ছাড়াই এ ব্যবসায় নেমে পড়ে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের আগেই শ্রীলংকায় পোশাক শিল্প যাত্রা করে। কিন্তু আশির দশকের শুরুতে গৃহযুদ্ধের কারণে সেখানকার ক্রেতারা বাংলাদেশকেই উপযুক্ত স্থান হিসেবে বেছে নেয়।

যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে, শিল্প-কারখানা স্থাপনে নিশ্চিত বাজার ও সরকারের প্রণোদনাসহ অন্যান্য সুবিধার কারণে ঝুঁকি গ্রহণের প্রয়োজন হয় নেই। অর্থাৎ মূলধন সংগ্রহ, বাজার অন্বেষণ, উপকরণের জোগান অনেকটা সহজেই পাওয়ায় ব্যবসার ন্যূনতম অভিজ্ঞতাহীন অনেকেই পোশাক শিল্পে প্রবেশ করে এবং সফলকাম হয়। পুঁজি, প্রযুক্তি, নিশ্চিত বাজার ও ন্যূনতম মাত্রায় মূল্য সংযোজনের কারণে অনেকেই দীর্ঘদিন পোশাক শিল্পকে বাণিজ্য সহযোগী শিল্প হিসেবে অভিহিত করেছে। তবে নব্য শিল্পায়িত দেশের অনেকেই বাণিজ্য সহযোগী শিল্প দিয়ে শুরু করে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে।

পোশাক শিল্পের এ নব্য উদ্যোক্তাদের ওপর এক গবেষণায় দেখা যায়, এসব উদ্যোক্তার শতভাগ এসএসসি পাস। ৮৮ দশমিক ৯ শতাংশের অন্তত ব্যাচেলর ডিগ্রি রয়েছে। ব্যাচেলর ডিগ্রিধারীদের ৩৬ দশমিক ১ শতাংশ বিএ, ১৯ দশমিক ৪ বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার, ২২ দশমিক ২ এমএসএস ও ২ দশমিক ৮ শতাংশ এমএসসি পাস। তাছাড়া ৫২ দশমিক ৮ শতাংশের যেকোনো এক ধরনের ভোকেশনাল ট্রেনিং আছে এবং ৩২ দশমিক ২ শতাংশ বিভিন্ন স্তরে বিদেশে লেখাপড়া করেছেন। এছাড়া শিল্পোদ্যোক্তাদের ৩৮ দশমিক ২ শতাংশের পরিবারের পেশা ব্যবসা ছিল। যদিও এ গবেষণা প্রায় ১৪ বছর আগের। তথাপি এ তথ্যগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আশাব্যঞ্জক এজন্য যে, এই প্রথম এক ঝাঁক অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত অপেক্ষাকৃত তরুণ বাঙালি উদ্যোক্তার খাতায় নাম লিখিয়েছেন। তারা সবাই যে সত্যিকারের উদ্যোক্তার গুণাবলি অর্জন করতে পেরেছেন, তা আলোচনাসাপেক্ষ। তবে রমণী মোহন দেবনাথের বইয়ে যেমনটি বলা হয়েছে, ‘শিক্ষিত বাঙালির ব্যবসার চেয়ে কেরানির চাকরি বেশি পছন্দ’, সে অপবাদ কিছুটা হলেও দূর হয়েছে। আজকে অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, আরো উচ্চশিক্ষিতরা এ ব্যবসায় আসছেন। এ শিল্পপতিদের অনেকেই উচ্চতর গবেষণা ও শিক্ষার জন্য নিজেরা যাচ্ছেন এবং কারখানার কর্মকর্তাদের বিদেশে পাঠাচ্ছেন। আজকের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে উদ্যোক্তা হতে হলে উচ্চশিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। তবে স্বল্পশিক্ষা নিয়েও অভিজ্ঞতা, শ্রম ও অধ্যবসায়ের কারণে অনেকেই খ্যাতিমান শিল্পপতিতে পরিণত হয়েছেন। বাংলাদেশেই ট্রাকের হেলপার থেকে ও সাধারণ শ্রমিক থেকে শিল্প মালিক হয়েছেন, এমন উদাহরণও বিরল নয়।

সমাজজীবনে পোশাক শিল্পের প্রভাব

পোশাক শিল্পের হঠাৎ আবির্ভাব ও দ্রুত বৃদ্ধিতে আবেগতাড়িত হয়ে অনেকেই একে পোশাক শিল্পের বিপ্লব অথবা সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন হিসেবে অভিহিত করেন। অর্থনীতি তথা সমাজ জীবনে পোশাক শিল্পের আগমন ও বিস্তারের ব্যাপক প্রভাব স্বীকার্য হলেও একে বিপ্লব বলা অতিরঞ্জিত বৈ কিছু না। ইউরোপে সংঘটিত মাত্র কয়েক দশকের শিল্পবিপ্লব হাজার বছরের কৃষিভিত্তিক কুসংস্কারাচ্ছন্ন সামন্তবাদী সমাজকে উলটপালট করে শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সমাজে পরিণত করেছে। তেমন কিছু বাংলাদেশে ঘটেনি। যদিও ইংল্যান্ডে বস্ত্র শিল্প দিয়েই বিপ্লব শুরু হয়েছিল। জন কের ফ্লাইং শাট্ল্, জেমস হারগ্রিবসের স্পিনিং জেনি, রিচার্ড আকরাইটের ওয়াটার ফ্রেম, জেমস ওয়াটসনের স্টিম ইঞ্জিন, সামুয়েল ক্রম্পটনের পাওয়ার লুম— এসব যুগান্তকারী আবিষ্কার মানুষকে একদিকে যেমন দৈহিক শ্রম থেকে মুক্তি দিয়েছে, তেমনি মানুষের উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ ঘটিয়ে চেতনাকে নাড়া দিয়েছে, যা বাংলাদেশে বিরল। অন্যদিকে হংকং, তাইওয়ান ও কোরিয়াও বাংলাদেশের মতোই পোশাক শিল্পের কোটা সুবিধা ও নিশ্চিত বাজার সুবিধা পেয়ে শিল্পায়ন শুরু করে এবং তিন দশকেই উন্নত দেশের প্রযুক্তি আত্মস্থ করে দ্রুত শিল্পায়িত দেশে পরিণত হয়। এসব দেশের পরিবর্তনও অনেকটা বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মতোই। তবে বাংলাদেশের রফতানিমুখী পোশাক শিল্প তিন দশক আগে যাত্রা করলেও এসব দেশের মতো বিপ্লব বা বৈপ্লবিক পরিবর্তন কোনোটারই ধারেকাছে যেতে পারেনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতি বা সমাজজীবনে যে পরিবর্তন এনেছে, তাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।

পোশাক শিল্পের সাফল্য অসামান্য হলেও প্রথমদিকে এ শিল্পের পরিবেশ অনুকূল ছিল না। পোশাক শিল্পের আগে রফতানি শিল্প বলতে কেবল পাট ও পাটজাত দ্রব্য ছিল, যার চাহিদা ক্রমান্বয়ে কমছিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় শূন্যের কোটায় ছিল। অভিজ্ঞ-দূরদর্শী উদ্যোক্তার অভাবে নতুন রফতানি পণ্য বাজারে যোগ হচ্ছিল না। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের পরিচিতি ছিল দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, খরা, দুর্নীতিগ্রস্ত, স্বৈরশাসক, সামরিকতন্ত্র আর রাজনৈতিক অস্থিরতার দেশ হিসেবে। বিদেশী পণ্ডিত, কপট প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ একবার বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি আরেকবার ‘উন্নয়নের পরীক্ষাগার’ ইত্যাদি আপত্তিকর বিশেষণে চিহ্নিত করেছেন। এমনই একটি নিরানন্দ হতাশাজনক পরিবেশ থেকে মাত্র ১০ বছরে এক ঝাঁক উদীয়মান উদ্যোক্তা পাঁচ লাখ লোকের (যার অধিকাংশই নারী) কর্মসংস্থান করে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন। এটা দেশী-বিদেশী অনেকেই কল্পনা করতে পারেনি। আড়াই দশকও পার হয়নি, সেই পণ্ডিতরাই বাংলাদেশকে উদীয়মান টাইগার কিংবা ‘নেক্সট ইলেভেন’ ইত্যাদি বিশেষণে অভিহিত করছেন। আসলে আমরা মনোজগতে এখনো উপনিবেশের আছর থেকে বের হতে পারিনি। বিদেশীরা খারাপ বললে সেটাই মেনে মন খারাপ করি, আর উদীয়মান ব্যাঘ্র বললে উত্ফুল্ল হই। বাংলাদেশ তলাবিহীন ঝুড়িও নয় আবার শক্তিশালী ব্যাঘ্রও নয়। এ দেশে খনিজ সম্পদ নেই, লোকসংখ্যা বেশি। এ কারণেই বাংলাদেশ ‘কেস স্টাডি’ হয়ে যায়। কিন্তু পৃথিবীতে অনুন্নত বিশ্বে যেসব দেশ খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ, তার অধিকাংশই দরিদ্র বা চরম দরিদ্র। আবার জাপান, কোরিয়া খনিজ সম্পদে দরিদ্র হয়েও পৃথিবীর প্রাচুর্যের দেশ। আসলে সম্পদহীন বলে কোনো দেশ নেই। অন্য কোনো সম্পদ না থাকলেও মানবসম্পদ তো আছে! মানুষকে উপযুক্ত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুলতে পারলেই সম্পদ সৃষ্টি হবে। মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশ তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন না করলেও পোশাক শিল্পে কর্মসংস্থান ও সম্পদ সৃষ্টিতে আশা জাগিয়েছে। বিশেষ করে সমাজের অবহেলিত নারীসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

এতদিন নারী শ্রমিক প্রধানত কৃষি, কুটির শিল্প, গৃহকর্মী হিসেবেই নিয়োজিত ছিলেন। পুরুষ শ্রমিকের সমান ও ক্ষেত্রবিশেষে বেশি শ্রম দিয়েও তাকে কম মজুরিতে সন্তুষ্ট থাকতে হতো। কুটির শিল্পে এবং অনেক ক্ষেত্রে বিনা মজুরিতে কেবল খাবারের বিনিময়ে দিনব্যাপী কাজ করতে হতো। এ অবহেলিত নারীদের সনাতন নিম্ন উৎপাদনশীল ক্ষেত্র থেকে তুলনামূলক উচ্চ উৎপাদনশীল পোশাক শিল্পে নিয়ে এসেছে। যদিও নিম্নমজুরিতে তাদের আর্থিক দৈন্য কাটেনি, এখনো ন্যূনতম মজুরি, বোনাস ও উন্নত কাজের পরিবেশ সৃষ্টিতে তাদের আন্দোলন করতে হচ্ছে, কিন্তু পোশাক শিল্প ৩০ লক্ষাধিক নারীকে শুধু শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতিই দেয়নি, তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিচয় দিয়েছে। তারা দেখছে, তাদেরই নিপুণ হাতে তৈরি পোশাক বাংলাদেশকে বিশ্বে নতুনভাবে পরিচয় করে দিচ্ছে।

শুরুতে নারীদের পোশাক শিল্পে যোগ দেয়া সুনজরে দেখা হয়নি এবং পরিবার তথা সমাজে নানা বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টেছে এবং পরিবারে তাদের মতামতকে আজ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। পরিবর্তন এসেছে এসব শ্রমিকের শিক্ষাক্ষেত্রেও। পোশাক শিল্পে যোগ দিয়েই তারা শিক্ষার মর্যাদা বুঝতে পেরেছেন। তাদের ছেলেমেয়ে-ভাইবোনেরা আজ স্কুল যাচ্ছে। দেশে প্রাথমিক শিক্ষার হার বেড়েছে অনেকাংশে পোশাক শিল্পে যোগ দেয়ার কারণে। নিজে ১০-১২ ঘণ্টা পরিশ্রম করেও ছেলেমেয়েকে স্কুলে পাঠাচ্ছেন। পোশাক শিল্পের আশপাশের প্রাথমিক স্কুলগুলোয় তাদের ব্যাপক উপস্থিতিই তার প্রমাণ। আজ একজন নারী শ্রমিক কাজ শেষে বাড়ি ফিরে যখন দেখেন, তার মেয়ে বা বোন প্রতিবেশী বান্ধবীর সঙ্গে কম্পিউটারে কাজ শিখছে, দুই দশক আগে স্বপ্নেও কল্পনা করা যায়নি। এ ধরনের ঘটনা ব্যতিক্রম হলেও শুরু হয়েছে, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। পোশাক শিল্পই এ আশা দেখিয়েছে।

দুর্ঘটনা, শ্রমিক অসন্তোষ ক্রেতাগোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়া

সত্তরের দশকেই এ শিল্পের আগমন ছিল অনেকটা আকস্মিক। অভিজ্ঞ উদ্যোমী উদ্যোক্তা, দক্ষ প্রযুক্তি, শ্রমিক ও ব্যবস্থাপকের মাধ্যমে বাজার সৃষ্টি বা অনুসন্ধানের ঝুঁকি নিয়ে পোশাক শিল্প সৃষ্টি হয়নি। কোটা সুবিধা, সরকারি সহযোগিতা ও সস্তা শ্রমের কারণেই এ শিল্পের বিকাশ ঘটেছে। পোশাক শিল্পের এ হঠাৎ আগমন ও দ্রুত বেড়ে ওঠা থেকে অনেকেই এর টিকে থাকা নিয়ে সন্দেহ করেছিলেন। বিশেষ করে ২০০৫ সালে কোটা উঠে যাওয়ার পরও এ শিল্প বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা করেছিলেন। কিন্তু কোটা উঠে যাওয়ার পর এ শিল্প টিকে আছে এবং ২০০৮-০৯ সালে উন্নত বিশ্বে মন্দার সময়ও রফতানি বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। ২০০৯-১০ সালে বাংলাদেশে রফতানি আয় ৪১ শতাংশ বেড়েছিল, যা গত এক দশকে সবচেয়ে বেশি।

যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে, সস্তা শ্রমিকই পোশাক শিল্প গড়ে ওঠার অন্যতম কারণ। স্বল্প মজুরি চলতি বাজারে টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট না হলেও শ্রমিকরা দলে দলে যোগ দিয়েছেন এবং এ শিল্পকে এগিয়ে নিয়েছেন। তবে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, অনিয়মিত বেতন-ভাতা ও কাজের সুষ্ঠু পরিবেশের অভাবের কারণে শ্রমিক অসন্তোষ বাড়ছে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো নিরাপত্তাহীনতা। একের পর এক অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় শ্রমিকরা আজ নিরাপত্তা নিয়েই বেশি আতঙ্কিত। বিশেষ করে ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১০০ জনেরও বেশি শ্রমিক নিহত ও অসংখ্য আহত হওয়ার ঘটনা শুধু দেশের ভেতরই নয়, সারা বিশ্বে পোশাক শিল্পের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এর আগেও অগ্নিকাণ্ডে শত শত শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটেছে, অথচ প্রতিকারের তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

পূর্বাভিজ্ঞতা ছাড়াই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে তড়িঘড়ি করে আবাসিক বাসাবাড়িতে দ্রুত কারখানা করা হয়েছে। বিল্ডিং কোড মেনে কারখানা তৈরি করে পোশাক শিল্প শুরু হয়নি। সুযোগ বা সময় অথবা পুঁজি বা কারিগরি দক্ষতা তেমন ছিল না। কিন্তু ৩৫ বছরে এ শিল্প-কারখানার বিপুল সংখ্যায় বৃদ্ধির পর পুরনো এ যুক্তি অচল। এটা শুধু পোশাক শিল্পের জন্য ক্ষতি নয়, বরং মালিক-শ্রমিক তথা গোটা অর্থনীতির জন্যও ক্ষতি। একটার পর একটা দুর্ঘটনা ঘটছে, কিন্তু বিচার হচ্ছে না। প্রতি ঈদে লঞ্চডুবিতে শত শত মানুষ মরলেও যেমন মালিকের বিচার হয় না, তেমনি পোশাক শিল্পেও যেন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। জাতির অস্তিত্বের স্বার্থেই সব দুর্ঘটনার তদন্ত ও সুষ্ঠু বিচার হওয়া প্রয়োজন।

শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির কথা উঠলেই বাজার হারানোর প্রশ্ন আসে। যখন বেতন ৬০০ টাকা ছিল, তখনো একই প্রশ্ন বারবার এসেছে। অনেক শিল্পমালিক শ্রমিকের সস্তা মজুরিই টিকে থাকার উপায় মনে করেন, যা উদ্যোক্তাসুলভ আচরণ নয়। যিনি কম দামে মানসম্পন্ন পণ্য বাজারে ছাড়তে পারবেন, তিনিই টিকে থাকবেন। এজন্য প্রয়োজন উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি। তার জন্য প্রয়োজন গবেষণা, উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষ শ্রমিক। কিন্তু শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধির কোনো উদ্যোগ নেই। শুধু পরিবার চালানোর জন্য ৪-৫ ঘণ্টা যদি ওভার টাইম করতে হয় এবং এতে যদি পুষ্টিহীনতায় ভোগে, তবে তাকে দিয়ে আর যা-ই হোক, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির আশা করা যায় না। বেশকিছু কারখানায় দেখা গেছে, শ্রমিকদের দুপুরের খাবার, চিকিৎসা, ডে-কেয়ার সেন্টার এবং কিছুটা হলেও বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। সেখানে মালিকদের মুনাফা হ্রাস পায়নি এবং সেখানে শ্রমিক অসন্তোষও অনেক কম।

আমাদের পোশাক শিল্পের আরেকটি দুর্বলতা হলো গুটিকয়েক বাজারনির্ভরতা। সাম্প্রতিক দুর্ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বিদেশী ক্রেতারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন এবং কমপ্লায়েন্স না মানলে পণ্য ক্রয় না কেনার হুমকি দিয়েছেন। ক্রেতাগোষ্ঠী বাংলাদেশে পৃথিবীর সবচেয়ে নিম্নমজুরির শ্রম ক্রয় করে ১০ ডলারের শার্ট ৪০ ডলারে বিক্রি করে সর্বোচ্চ মুনাফা করছে। দুর্ঘটনার পর তাদের মায়াকান্নার শেষ নেই। কিন্তু তাদের মুনাফার ১ শতাংশের অর্ধেক শ্রমিকের কল্যাণে ব্যয় করলে শ্রমিকের কর্মস্থলের নিরাপত্তা বৃদ্ধি পেত। অনেক কোম্পানি আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা পালন করেনি। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশ আমেরিকায় পোশাক রফতানিতে ফ্রান্সের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি ট্যাক্স দেয়। অর্থাৎ বাংলাদেশ ৬ বিলিয়ন ডলার রফতানি করে যে ট্যাক্স দেয়, ফ্রান্স ৩০ বিলিয়ন ডলার রফতানি করে একই পরিমাণ ট্যাক্স দেয়। অর্থাৎ যদি ফ্রান্সের সমান ট্যাক্স দিত, তাহলে বাংলাদেশ প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করতে পারত, যা দিয়ে ৪০ লাখ পোশাক শ্রমিকের নিরাপত্তা অনেকাংশে নিশ্চিত করা যেত।

পোশাক শিল্পের চ্যালেঞ্জ

প্রায় সাড়ে তিন দশক আগে শুরু করে দুর্বল অবকাঠামো, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা কমবেশি আজো বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও গার্মেন্টস টিকে আছে। কিন্তু এত দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতার পরও কি এ শিল্প শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পেরেছে? এ প্রশ্নের জবাব কঠিন। তবে যখন দেখি, শুরুতে যেভাবে বিদেশী ক্রেতারা এ শিল্পের প্রতিটি বিষয়ে নাক গলাত এবং ডিকটেট করত, এখনো তেমনই করছে। তার অর্থ, এখনো ক্রেতানির্ভরশীলতা কাটেনি। তবে একেবারেই যে কাটেনি, তা নয়। কয়েক বছর আগে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিরা পোশাক শিল্পের মালিকদের উদ্দেশ করে বলেছিলেন, বাংলাদেশ যেহেতু তুলা উৎপাদন করে না, তাই পশ্চাৎ সংযোগ (ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ) শিল্পের প্রয়োজন নেই। এমন উদ্ভট যুক্তি শোনামাত্রই আমাদের শিল্পপতিরা তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন এবং বলেছিলেন, যেসব দেশে পোশাক শিল্প গড়ে উঠেছে, তারা অধিকাংশই তুলা উৎপাদন করে না। এমনকি যেখানে পোশাক শিল্প দিয়েই শিল্প বিপ্লব হয়েছে কিংবা দেশকে শিল্পায়িত করেছে, তারা কেউ তুলা উৎপাদনকারী দেশ নয়। পরে অবশ্য উপদেশ দানকারীরা তাদের বক্তব্য তুলে নিয়েছিলেন।

তবে তিন দশকের বেশি সময় পার হওয়ার পরও আমাদের পোশাক শিল্প এখনো টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত। এত দীর্ঘ সময়েও যদি এ শিল্পকে টিকে থাকার সংগ্রাম করতে হয়, তাহলে এখনো উদ্যোক্তারা উদ্যোক্তার বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে পারেননি। এখনো নিজস্ব ব্র্যান্ডের কোনো পণ্য বিশ্ববাজারে পরিচিত করাতে পারেননি। অবশ্য অনেক উদ্যোক্তাই আন্তর্জাতিক বাজার দখলে ক্রেতাদের সহযোগিতা ছাড়াই সফল হয়েছেন। তবে তাদের সংখ্যা স্বল্প। অথচ চীন একই সময়ে বাংলাদেশের পাশাপাশি স্বল্পমূল্যের পোশাক দিয়ে শুরু করেছিল। তারা আজ উচ্চমূল্যের উন্নত ও বৈচিত্র্যময় পণ্য তৈরি করছে। আর আমাদের তাদের ছেড়ে দেয়া পণ্যের বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছে। অর্থাৎ চীনে শ্রমমজুরি বেড়ে যাচ্ছে এবং বায়াররা তাদের ছেড়ে সস্তা শ্রমের দেশে চলে যাচ্ছে। এটা চীনাদের সংকট নয়, বরং তারা এক ধাপ ওপরে উঠে যাচ্ছে আর আমরা সেই গুটিকয়েক স্বল্পমূল্যের পণ্য নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছি। চীনের মতো দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানও একইভাবে দেশকে শিল্পায়িত করেছে। তাই আমাদেরও কৌশল পাল্টাতে হবে। শুধু সস্তা শ্রমমূল্যের ওপর নির্ভর না করে উৎপাদনশীলতা ও গুণগত মান বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে। সেই সঙ্গে প্রয়োজন পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ, বহুমুখীকরণ ও বাজারের সম্প্রসারণ বা সমান্তরাল সম্প্রসারণ।

উৎপাদনশীলতা ও গুণগত মান বৃদ্ধির ক্ষমতাকে বলা হয় উন্নয়নের ইঞ্জিন। এ ইঞ্জিন কাজ করে উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষ শ্রমশক্তি— এ দুইয়ের সমন্বয়ে। আমাদের নিজস্ব প্রযুক্তি নেই, প্রযুক্তি আমদানিনির্ভর। তবে প্রযুক্তি আমদানি করলেই উৎপাদনশীলতা বাড়বে না। প্রযুক্তির কার্যকারিতা নির্ভর করে তার প্রায়োগিক সাফল্যের ওপর। প্রযুক্তি আমদানি করে আত্মস্থ বা আত্মীকরণ ও সফল প্রয়োগের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য প্রয়োজন দক্ষ প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, টেকনিশিয়ান ও দক্ষ শ্রমিক ও প্রয়োজন আরঅ্যান্ডডিতে ব্যাপক বিনিয়োগ।

জাপান ১৮৬৮ সালে মেইজি পুনর্বাসনের সময় প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে ইউরোপের তুলনায় ১০০ বছর পিছিয়ে ছিল। কিন্তু তারা প্রযুক্তি উদ্ভাবনে না গিয়ে আমদানিকৃত প্রযুক্তি আত্তীকরণ করে জাপানি পরিবেশে সফল প্রয়োগ ঘটায়, যার নাম দিয়েছিল পশ্চিমা প্রযুক্তি জাপানি উদ্দীপনা। এ কৌশল গ্রহণ করে মাত্র ৩০ বছরে শত বছর পিছিয়ে পড়া জাপান উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছেছিল। ঠিক অনেকটা একই কায়দায় না হলেও তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়া গবেষণার মাধ্যমে উন্নত দেশের প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে দেশকে শিল্পায়িত করেছে।

আমাদের শ্রম উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ, উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের জন্য দক্ষতা বৃদ্ধি ও কাজের পরিবেশ উন্নয়নের বিকল্প নেই। এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শ্রমিকের বেতন বৃদ্ধি এবং তার নিরাপত্তা ও জীবনের মানোন্নয়নের বিষয়টিও অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।

এতদিন গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ প্রধান সমস্যা ছিল। এখন তার কিছুটা উন্নতি হলেও এখনো এটি এক নম্বর সমস্যাই আছে। এখনো বেশকিছু উৎপাদক কারখানা স্থাপন করে গ্যাসের অভাবে উৎপাদনে যেতে পারছেন না। সেই সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন হাইওয়ে ও ডাবল রেললাইল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন করা প্রয়োজন। এছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এখনো বিনিয়োগকারীরা আস্থা অর্জন করতে পারছেন না। আগামীতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপর এ শিল্পের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে।

উপসংহার

পোশাক শিল্প দেশের শিল্পায়নে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ৪০ লাখ শ্রমিককে উৎপাদনশীল কাজে অন্তর্ভুক্ত করে দারিদ্র্য বিমোচনে অবদান রেখেছে। এ শিল্পের সম্ভাবনা প্রচুর। পোশাকের চাহিদা কোনো দিনই কমবে না। বর্তমানে বিশ্বে এ পণ্যের বাজার ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের। চীন একাই ১৬০ বিলিয়ন ডলার বা ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। সে তুলনায় বাংলাদেশের অংশ ৫ দশমিক ৪ শতাংশ (২৪ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার)। প্রথম দিকে যেনতেনভাবে কারখানা গড়ে উঠেছে। শ্রমিকের মজুরি, নিরাপত্তা, পৃথক গার্মেন্টস ভিলেজ ও প্রযুক্তি উন্নয়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়নি। এতদিন ক্রেতাদের চাহিদামতো পণ্য তৈরি হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ গুরুত্ব পায়নি। উপেক্ষিত হয়েছে পণ্য বৈচিত্র্যকরণ, দক্ষতা ও গবেষণা। ফলে আজো কেবল টিকে থাকার চেষ্টাই চলছে। আসলে উন্নয়ন ঘটে একটি ‘ভিশন’ সামনে রেখে। এ ‘ভিশন’ মূলত দীর্ঘমেয়াদি। তেমনি একটি ‘ভিশন’ সামনে রেখে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ নিরূপণ করা এবং সে অনুযায়ী অগ্রসর হওয়া জরুরি।

 

লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়