সোমবার | আগস্ট ১০, ২০২০ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

বিশেষ সংখ্যা

বৈদেশিক খাত

রফতানিনির্ভর অর্থনীতির পথে যাত্রা

এম. ইসমাইল হোসেন, মোহাম্মদ আনিসুর রহমান, মোস্তাফিজুর রহমান

১৯৮০-র দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্মুক্তকরণ, বিনিয়ন্ত্রণ ও সার্বিক উদারীকরণের লক্ষ্যে যে সংস্কার কর্মসূচির সূচনা করা হয়, তা দেশের সামনে যেমন অনেক সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে, তেমনি দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে অনেক নতুন চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি হতে বাধ্য করেছে। ১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি জিডিপিতে বৈদেশিক খাতের (আমদানি ও রফতানি) অংশ ছিল ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ, ১৯৯৬ অর্থবছরে তা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে দাঁড়ায় ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশে। উরুগুয়ে রাউন্ড গ্যাট চুক্তি সম্পাদনের ফলে ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা প্রতিষ্ঠার পরবর্তীতে বিশ্ববাণিজ্যের ক্ষেত্রে যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সংগঠিত হচ্ছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর তার অভিঘাত হবে সুদূরপ্রসারী; অন্যদিকে আঞ্চলিক পর্যায়ে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার সম্প্রসারণ এবং এ অঞ্চলে আরো নিকট অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে বহির্বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনারও সৃষ্টি হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সংস্কার কার্যক্রম ও বহির্বিশ্বের প্রেক্ষাপটে সূচিত উল্লিখিত পরিবর্তনগুলোকে সঠিকভাবে নিজস্ব স্বার্থের অনুকূলে ব্যবহার করার সামর্থ্য অর্জনই বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সামনে বৈদেশিক খাতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষত ২০০২ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (সাফটা) প্রতিষ্ঠার যে সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক পর্যায়ে গৃহীত হয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে বৈদেশিক খাতের দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখার গুরুত্ব বহুমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে।

বর্তমান অধ্যায়ে তিনটি ইস্যুর ওপর মূলত দৃষ্টি দেয়া হয়েছে। প্রথম অংশে ১৯৯৬ অর্থবছরে বৈদেশিক খাতে অর্জিত সাফল্যকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে; দ্বিতীয় অংশে ১৯৯৬ অর্থবছরে বৈদেশিক খাতসংশ্লিষ্ট নীতিমালায় পরিবর্তন ও এ খাতের ওপর তার সম্ভাব্য প্রভাব সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। তৃতীয় অংশে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন ইস্যু আলোচিত হয়েছে এবং বিশ্লেষণের সুবিধার্থে যে গ্রেভিটি মডেল ব্যবহার করা হয়েছে, তার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়েছে।

বাংলাদেশের রফতানি খাতে সাম্প্রতিক প্রবণতাসমূহ

১৯৯৬ সালে রফতানি খাতে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার। যদিও পূর্ববর্তী ১৯৯৫ অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১১ দশমিক ৮ শতাংশ, তথাপি তার আগের বছরের ৩৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় তা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। রফতানির লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৯৯৬ সালে প্রাপ্তি ২ দশমিক ২ শতাংশ বেশি ছিল, কিন্তু আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধির হারের যে হ্রাস পরিলক্ষিত হয়, তা মূলত হয়েছে প্রচলিত রফতানি (ট্র্যাডিশনাল এক্সপোর্ট) দ্রব্য থেকে আয়ের প্রবৃদ্ধির হার ৪০ দশমিক ৭ থেকে মাত্র ৬ দশমিক ২ শতাংশে হ্রাস পাওয়ার কারণে। ১৯৯৬ সালের প্রথম তিন মাসে রাজনৈতিক আন্দোলনের ফলে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল, বৈদেশিক খাতও তা থেকে মুক্ত ছিল না।

১৯৯৬ সালে রফতানি আয় প্রবৃদ্ধির হার হ্রাসের পেছনে মুখ্য রফতানি পণ্য অর্থাৎ ওভেন তৈরি পোশাকের রফতানি হার হ্রাস একটা বড় কারণ। পূর্ববর্তী বছরে এ খাতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪২ শতাংশ, আর ১৯৯৬ অর্থবছরে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ৬ শতাংশ। কিন্তু এ কথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন, এ সময়কালে নিট তৈরি পোশাক খাতে রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় (পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় ৫২ শতাংশ), যা সামগ্রিক রফতানি আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ১৯৯৬ সালে ওভেন ও নিটওয়্যার পোশাক রফতানি খাতে সম্মিলিত আয় ছিল ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রফতানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। যদি প্রান্তিক রফতানি বৃদ্ধির কাঠামো বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যাবে এর ৫০ শতাংশ এসেছে একমাত্র নিটওয়্যার পোশাক রফতানি থেকে। তৈরি পোশাক খাতে অপেক্ষাকৃত কম মূল্য সংযোজনের (২৫-৫০ শতাংশ) কারণে বাংলাদেশের গ্রস রফতানি আয়ের সঙ্গে নিট রফতানি আয়ের বেশ বড় পার্থক্য দেখা যায়। যদিও আমরা ওভেন ও নিটওয়্যার খাতে প্রাপ্ত স্থানীয় মূল্য সংযোজন (যথাক্রমে গড়ে ২৫ ও ৫০ শতাংশ হিসাবে) হিসাব করে রফতানি পুনর্বিন্যাস করি, তবে দেখা যাবে সম্মিলিতভাবে মোট নিট রফতানিতে তৈরি পোশাক খাতের অবদান ৩৮ শতাংশ, আর পাট খাতের (কাঁচা ও প্রক্রিয়াজাত) অবদান ১৭ শতাংশ। নিটওয়্যার রফতানি খাতের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব একদিকে বেশ আশাপ্রদ। কিন্তু এ সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে জিএসপির অধীনে শুল্কমুক্ত রফতানির সুযোগ আগামীতে সুনিশ্চিত করতে হলে বাংলাদেশকে তৈরি পোশাক খাতে পশ্চাৎ সংযোগ বৃদ্ধির দিকে বিশেষভাবে মনোযোগ দিতে হবে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে রফতানি বৃদ্ধির পেছনে মূলত কাজ করেছে রফতানির পরিমাণগত বৃদ্ধি; এর বিপরীতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রফতানিজাত দ্রব্যসামগ্রীর মূল্যের বৃদ্ধির মাত্রা এ কালপর্বে খুবই সীমিত ছিল। শিল্পজাত দ্রব্যের (যা থেকে ৮৭ শতাংশ রফতানি আয় এসেছে) ক্ষেত্রে ১২ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পেছনে মূল্যসূচকের অবদান ছিল মাত্র ২ দশমিক ৭; বাকি ১০ দশমিক ১ শতাংশ এসেছে পরিমাণ সূচক (কোয়ান্টাম ইনডেক্স) বৃদ্ধি থেকে। কাঁচামাল রফতানির (যার অংশ মোট রফতানির ১৩ শতাংশ) ক্ষেত্রে ৫ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পেছনে মূল্যসূচকের অবদান ছিল ৯ শতাংশ, আর পরিমাণ সূচকের অবদান ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। বাংলাদেশের রফতানি যেহেতু স্বল্পসংখ্যক শিল্পজাত দ্রব্যের ওপর মূলত নির্ভরশীল, সেহেতু আগামীতে উত্তরোত্তর বৃদ্ধিমান প্রতিযোগিতানির্ভর আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশকে টিকে থাকতে হলে সস্তা ও শ্রমঘন রফতানি কাঠামো থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে একদিকে রফতানির বৈচিত্র্য বৃদ্ধি আর অন্যদিকে মূল্য সংযোজন সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সঙ্গে এটাও স্বীকৃত যে, বিগত এক দশকে বাংলাদেশের রফতানি কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। ১৯৮৬ সালে প্রচলিত ও অপ্রচলিত রফতানি আয়ের অনুপাত ছিল ৪০:৬০; ১৯৯৬ সালে তা পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়িয়েছে ১২:৮৮। কিন্তু আগেই উল্লিখিত হয়েছে, এর পেছনে বড় কারণ ছিল তৈরি পোশাক খাতের তাত্পর্যপূর্ণ আবির্ভাব। সাধারণভাবে বৈদেশিক মুদ্রার আয় এখন পর্যন্ত মাত্র কয়েকটি দ্রব্যের ওপরই মূলত নির্ভরশীল।

বলাবাহুল্য, বাংলাদেশের রফতানি বাজারও মূলত কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের ৫০ শতাংশ রফতানির গন্তব্যস্থল হচ্ছে তিনটি মাত্র দেশ— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানি; দুই-তৃতীয়াংশ রফতানি যায় সাকল্যে ১০টি দেশে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় প্রচলিত বাজারের বাইরে কেবল হংকং ও জাপানে বাংলাদেশের রফতানি প্রবৃদ্ধির হার ছিল উল্লেখ করার মতো। আমরা বাজার কেন্দ্রীভূতকরণের জন্য যে জিনি-হির্শম্যান মার্কেট কনসেনট্রেশন ইনডেক্স হিসাব করেছি তা থেকে দেখা যায়, ১৯৭৯-৮০ সালে এ সূচক ছিল শূন্য দশমিক ১২ আর ১৯৯৪-৯৫ সালে শূন্য দশমিক ৩২। মূলত এই কেন্দ্রীভূতকরণের পেছনে তৈরি পোশাক ও তার জন্য মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরশীলতাই কাজ করেছে বেশি। রফতানি দ্রব্যসামগ্রীর পাশাপাশি তাই বাজার বৈচিত্র্যকরণের দিকেও বাংলাদেশকে দৃষ্টি দিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় প্রণোদনা প্রদান ও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এখানে উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালের প্রথম তিন মাসের রাজনৈতিক আন্দোলন রফতানি খাতের প্রবৃদ্ধি হ্রাসের অন্যতম একটি কারণ। আমদের সংগৃহীত পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে মোট রফতানি আগের বছরের তুলনীয় সময় থেকে হ্রাস পেয়েছে যথাক্রমে ৮ দশমিক ১ ও ৫ দশমিক ৬ শতাংশ; তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে তা ছিল যথাক্রমে ১৮ দশমিক ১ ও ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ। জুন ১৯৯৬ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রফতানিকৃত ২১টি পণ্যের মধ্যে কোটা পূর্ণ করা সম্ভব হয়েছে মাত্র তিনটিতে— গ্লোভ, সপ-টাওয়েল ও নিট শার্ট। এ সময়ে রফতানিমুখী শিল্প-কারখানাগুলোকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। আইআরবিডি ’৯৬-এর জন্য পরিচালিত জরিপ থেকে দেখা যায়, জরিপকৃত তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর ২০ শতাংশের গড় ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৩৫ লাখ টাকা, ৫৪ শতাংশের ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৩৫ লাখ ও ৭০ লাখের মধ্যে, আর এক-চতুর্থাংশ কারখানার ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৭০ লাখ টাকার বেশি। ১৯৯৬ সালের মার্চে প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বৈদেশিক খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে যার মধ্যে ছিল— ক. বন্দরে নোঙর করা জাহাজপ্রতি ভাড়া হ্রাস, খ. রফতানি ঋণের সুদ হ্রাস, গ. রফতানি আয়ের ওপর আগাম কর্তন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা ইত্যাদি।

যদিও এপ্রিল-জুন কাল পর্বে রফতানি খাত আগের দুই মাসের ক্ষতি বেশ কিছুটা পুষিয়ে নিয়েছে তথাপি এটা অনস্বীকার্য যে, অন্তত মধ্যমেয়াদি পর্যায়ে রফতানি খাতের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব বজায় থাকবে। বাংলাদেশ থেকে সরবরাহের অনিশ্চিতের কারণ দেখিয়ে ক্রেতারা বাংলাদেশকে প্রদেয় সিঅ্যান্ডএম (কাটিং ও মেকিং) চার্জ বর্তমানে প্রায় ৫০ শতাংশ হ্রাস করে দিয়েছেন। ১৯৯৭ অর্থবছরে বাংলাদেশকে এ অবস্থা কাটিয়ে উঠে ক্রেতাদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সজাগ ও সচেষ্ট থাকতে হবে। আমাদের বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, বেশির ভাগ রফতানি দ্রব্যের ক্ষেত্রে মূল্য স্থিতিস্থাপকতা একের চেয়ে কম। এক্ষেত্রে প্রকৃত জাতীয় আয়ের বৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদনক্ষমতার সম্প্রসারণ রফতানি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নিয়ামক ভূমিকা পালন করবে।

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের আমদানি খাতের অবস্থা

১৯৯০ দশকের প্রথম থেকে আমদানি খাতে যে প্রলম্বিত স্থবিরতা দেখা যায়, তা ১৯৯৫ সালে কিছুটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছিল। সে বছর আমদানি ব্যয়ের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ, যা আগের দুই বছরের তুলনায় (যথাক্রমে ৭ দশমিক ৪ ও ৬ দশমিক ২ শতাংশ) ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ১৯৯৬ অর্থবছরে আমদানি খাতের প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ, কিন্তু রফতানি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তুলনা করলে (যা ছিল ১১ দশমিক ৮ শতাংশ) এ হার ছিল তাত্পর্যপূর্ণ।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত উপাত্ত থেকে দেখা যায়, ১৯৯৬ অর্থবছরে আমদানির জন্য মোট বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়েছে ৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। ১৯৯৬ অর্থবছরে আমদানিকৃত দ্রব্যসামগ্রীর কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, প্রাথমিক ও ভোগ্যপণ্যের আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ; পক্ষান্তরে কাঁচামাল ও মূলধনি পণ্য খাতে আমদানির বৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ২১ দশমিক ৫ ও ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ। ১৯৯৬ অর্থবছরে উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট আমদানির প্রবৃদ্ধির হার ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি। স্বাভাবিকভাবে আমদানি কাঠামোতেও তা প্রতিফলিত হয়েছে। ১৯৯৬ সালে মোট আমদানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ছিল উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাঁচামাল ও মূলধনি আমদানি। ১৯৯৬ সালে আমদানির প্রান্তিক বৃদ্ধির তিন-চতুর্থাংশই ছিল এ দুই খাতে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন, গত কয়েক বছরে খাদ্যশস্যের আমদানি তুলনামূলকভাবে বেশ দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৯২ সালে চাল ও গম আমদানিতে ব্যয় হয়েছে মোট আমদানি ব্যয়ের ১ শতাংশ, আর ১৯৯৬ সালে এর পরিমাণ ছিল ৮ শতাংশ। এ থেকে প্রকারান্তরে কৃষি খাতের সাম্প্রতিক স্থবিরতারই পরিচয় মেলে।

আমদানি কাঠামো বিশ্লেষণ করলে আরো দেখা যায় যে, বস্ত্র খাতসংশ্লিষ্ট আমদানি বেশ দ্রুত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি উভয় ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। তৈরি পোশাক শিল্পে পশ্চাৎ সংযোগ স্থাপন ও বস্ত্র শিল্পে আমদানি প্রতিস্থাপন— উভয় দিক থেকে এর গুরুত্ব বেশ তাত্পর্যপূর্ণ। ১৯৯৬ অর্থবছরে তুলা ও সুতার আমদানি বেড়েছে যথাক্রমে ৬৩ দশমিক ১ ও ১৪ দশমিক ২ শতাংশ হারে। ক ও খ ক্যাটাগরির মূলধনি আমদানি (যথাক্রমে যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য মূলধনি পণ্যাদি) বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ৪১ দশমিক ৩ ও ৬৩ দশমিক ৭ শতাংশ হারে।

আমদানি খাতের উল্লিখিত প্রবৃদ্ধি ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চের রাজনৈতিক আন্দোলন সত্ত্বেও ঘটেছে, যা তাত্পর্যপূর্ণ। যদিও এ দুই মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, তথাপি পরবর্তী সময়ে আমদানি কার্যক্রমে আবার চাঞ্চল্য ফিরে আসে। এখানে অবশ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৯৯৫-এর তুলনায় ১৯৯৬ অর্থবছরে খোলা এলসির মূল্য ৩ দশমিক ৪ শতাংশ কম; ২৭ হাজার ২২৮ কোটি টাকা থেকে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ২৬ হাজার ২৯৬ কোটি টাকায়। যদিও এলসি কাঠামোর বিশ্লেষণ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এটা হয়েছে মূলত খাদ্যশস্য আমদানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলসি কম খোলার কারণে। তথাপি ১৯৯৭ অর্থবছরে বিশেষ নজর রাখতে হবে, যাতে উৎপাদনমুখী আমদানি কোনো কারণে হ্রাস না পায়।

আমদানি খাতের উৎসগুলো অবশ্য রফতানি খাতের তুলনায় আরো বেশি বিস্তৃত। আমরা আমদানির জন্য যে জিনি-হির্শম্যান কেন্দ্রীয়ভূতকরণ সহগ হিসাবে করেছি তার মাত্রা শূন্য দশমিক ১৬, রফতানির ক্ষেত্রে এটা ছিল শূন্য দশমিক ২৭। আমদানির উেসর ক্ষেত্রে এর মাত্রা ছিল শূন্য দশমিক শূন্য ৭৯, যেখানে রফতানি বাজারের ক্ষেত্রে এটা ছিল শূন্য দশমিক ৩২। তবে এটা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আমদানির উৎস কাঠামোয় গত কয়েক বছরে বেশ গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ভারত বর্তমানে বাংলাদেশের আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস; অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বেশ কয়েকটি দেশের গুরুত্ব বিগত সময়ে কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। ১৯৯১ অর্থবছরে মোট আমদানিতে ভারতের অংশ ছিল ৬ শতাংশ, যা ১৯৯৫ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১২ শতাংশ। অন্যদিকে একই কাল পর্বে জাপানের অংশ ১০ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। আমদানি খাতে চীন ও হংকংয়ের গুরুত্ব অব্যাহত রয়েছে এবং এ দুই দেশের যৌথ অংশ হচ্ছে মোট আমদানির ১৪ শতাংশ। ভারত, চীন ও হংকংয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে সেসব দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক তাদের সামগ্রিক বাণিজ্য সম্পর্কের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক বাণিজ্যিক সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে কম। উল্লেখ্য, ভারতের ওপর আমদানি নির্ভরশীলতার একটা বড় কারণ হচ্ছে উৎপাদনমুখী কাঁচামাল আমদানি (রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য কাপড় ও সুতা আমদানি; যন্ত্রপাতি আমদানি ইত্যাদি)। এসব পণ্য ভারত থেকে বাংলাদেশের মোট আমদানির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিপুল ঘাটতির বিষয়টি এ আলোকেই বিচার হওয়া উচিত। তা সত্ত্বেও বিদ্যমান বিশাল ঘাটতি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য কাম্য নয় এবং ভারতে রফতানি বৃদ্ধির মাধ্যমে বাণিজ্য ভারসাম্য অনুকূল করার লক্ষ্যে বাংলাদেশকে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

আইআরবিডি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের আমদানি সাধারণভাবে মূল্য অস্থিতিস্থাপক; আমদানির ওপর বরং প্রকৃত জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধির হার বেশি প্রভাব রাখে। তাই উৎপাদনমুখী আমদানির বৃদ্ধি এসব দ্রব্যের মূল্যের তারতম্যের চেয়ে বরং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির গতিশীলতার ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভরশীল।

লেনদেন ভারসাম্য

১৯৯০-৯৪ কাল পর্বে বাণিজ্য ভারসাম্যের যে ইতিবাচক অবস্থা পরিলক্ষিত হয়, ১৯৯৫ থেকে তার পরিবর্তন শুরু হয়। বাণিজ্য ও চলতি উভয় হিসাবের ব্যালান্সেই ট্রেড ও কারেন্ট অ্যাকাউন্টস ব্যালান্স) এটা দেখা যায়। এক্ষেত্রে দুটো কারণ সবিশেষ উল্লেখযোগ্য— প্রথমত. আমদানি খাতে গতিশীলতা ও দ্বিতীয়ত. অদৃশ্য হস্তান্তরের বৃদ্ধি। চলতি হিসাবের ঘাটতি ১৯৯৫ সালের ১ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৯৬ অর্থবছরে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ পরিমাণ ছিল জিডিপির ৫ শতাংশ। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অবস্থার ওপর বেশ চাপের সৃষ্টি হয়। ১৯৯৫ সালের এপ্রিলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩ দশমিক ৪ বিলিয়িন ডলার, যা ১ বিলিয়ন ডলার হ্রাস পেয়ে ১৯৯৬ সালের জুনে দাঁড়ায় ২ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন ডলার। ১৯৯৭ অর্থবছরে এটা বাংলাদেশের আমদানি সামর্থ্যের ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যদিও ১৯৯৬ সালে এলসি কম খোলার কারণে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বৈদেশিক সাহায্য সাহায্য বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রবণতাসমূহ

১৯৯৫-এর তুলনায় ১৯৯৬ অর্থবছরে বাংলাদেশকে প্রদেয় সাহায্য প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে কিছু নেতিবাচক প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়, ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার থেকে সাহায্য প্রতিশ্রুতি ১৯৯৬ সালে ২০ শতাংশ হ্রাসপ্রাপ্ত হয়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারে। প্রকল্প সাহায্যের ক্ষেত্রে সাহায্য প্রতিশ্রুতি হ্রাস পায় ১২ শতাংশ, আর পণ্য সাহায্যের ক্ষেত্রে ৫৪ শতাংশ। সাহায্যের প্রকৃত বণ্টনের ক্ষেত্রেও এ হ্রাস পরিলক্ষিত হয়। ১৯৯৫ সালের ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার থেকে প্রকৃত বণ্টন ১৯৯৬ অর্থবছরে ১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে, যা ছিল আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ কম। বৈদেশিক সাহায্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুর্বলতা এর মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।

ঋণ পরিষেবার ভার বাংলাদেশের জন্য এখনো সহনীয় পর্যায়েই আছে। এটা মোট রফতানির ১০ শতাংশ নিচে এবং শুধু পণ্য রফতানি থেকে প্রাপ্ত বৈদেশিক আয়ের ১৫ শতাংশ। তবে মনে রাখতে হবে, সুবিধাপ্রাপ্ত ঋণের (কনসেশনাল ঋণ) সুযোগ বর্তমানে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে উত্তরোত্তর রফতানি বৃদ্ধির মাধ্যমে ঋণ পরিষেবার বিষয়টিকে মোকাবেলা করতে হবে এবং বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস করতে হবে।

বৈদেশিক খাতসংশ্লিষ্ট নীতিমালা: পরিবর্তন প্রবণতা

১৯৯৬ অর্থবছরে আমদানি শুল্কহারে পরিবর্তন

১৯৯৬ অর্থবছরে আগের এক দশকের অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি ও উদারকরণের ধারাবাহিকতায় বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হয়। আমদানি গুরুত্ব ভারিত শুল্কহার ১৯৯৫ সালে ছিল ২০ দশমিক ৯ শতাংশ, আর ১৯৯৬ অর্থবছরে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ। আমদানি শুল্কের নমিনাল হার ১৯৯১ সালের ৮৯ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ১৯৯৫ সালে দাঁড়ায় ২৫ দশমিক ৯ শতাংশে। আর ১৯৯৬ সালে তা আরো হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ২২ দশমিক ৬ শতাংশে। সর্বোচ্চ শুল্কহারও ১৯৯৫ সালের ৬০ শতাংশ থেকে নেমে ১৯৯৬ অর্থবছরে দাঁড়ায় ৫০ শতাংশে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের সংরক্ষণ হার এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্বনিম্ন।

সাম্প্রতিককালে বেশির ভাগ পরিমাণভিত্তিক প্রতিবন্ধকতাসমূহ তুলে নেয়া হয়েছে। ১৯৯৬ অর্থবছরে মাত্র ১১৯টি দ্রব্যের ওপর এ ধরনের সীমাবদ্ধতা আরোপিত ছিল। ১৯৯৬-৯৭ বাজেট অনুযায়ী চার ডিজিট পর্যায়ে এ সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১১৪, যদিও বাণিজ্যিক কারণে সীমিত আমদানিকৃত দ্রব্যের সংখ্যা ৪০ থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে ২৩-এ । পরিমাণভিত্তিক সংরক্ষণের আওতায় এখন পর্যন্ত যেসব দ্রব্য আছে, তার মধ্যে বস্ত্র শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পণ্যসামগ্রীই বেশি। শুল্কহার হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও আমদানি শুল্ক বাবদ রাজস্ব আয় ১৯৯৫ সালে ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা হয়েছে মূলত ওই বছর আমদানি ৩৮ শতাংশ বৃদ্ধির কারণে। তবে ১৯৯৬ সালে ২৫ শতাংশ আমদানি বৃদ্ধি সত্ত্বেও আমদানি রাজস্ব বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, আগামীতে আমদানি প্রবৃদ্ধির হার মোটামুটি ভালো থাকলেও আমদানি শুল্ক থেকে রাজস্ব আয় তুলনামূলকভাবে কম হারে বৃদ্ধি পাবে। সেক্ষেত্রে রাজস্বের অন্যান্য সূত্র থেকে প্রাপ্তি বৃদ্ধির দিকে বাংলাদেশকে বেশি মনোযোগী হতে হবে।

রফতানি নীতিমালায় পরিবর্তনের চিত্র

বাংলাদেশে সাধারণত তিন ধরনের প্রণোদনা দেয়া হয়— ক. আর্থিক প্রণোদনা, খ. রাজস্ব প্রণোদনা এবং গ. প্রাতিষ্ঠানিক প্রণোদনা। ১৯৯৫-৯৭ সালের রফতানি নীতিতে রফতানি খাতে উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে বেশকিছু প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। ১৯৯৬ সালে রফতানি আয়ের ওপর আগাম কর্তনের হার মোট রফতানি আয়ের শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে হ্রাস করে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ করা হয়। এর ফলে যেসব খাতে মূল্য সংযোজন অপেক্ষাকৃত কম, যেমন তৈরি পোশাক, সেসব খাতে প্রকৃত করভার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস। আরেকটি পদক্ষেপ ছিল শুল্প প্রত্যার্পণ-সংশ্লিষ্ট। এখন থেকে রফতানিকারকরা ডেডো (শুল্ক মওকুফ ও শুল্ক প্রত্যার্পণ) অফিস থেকে শুল্ক ফেরত না নিয়ে যেসব ব্যাংকের সঙ্গে তারা লেনদেন করেন, সেগুলোর মাধ্যমে শুল্ক ফেরত পাওয়ার সুযোগ গ্রহণ করতে পারবেন। এর ফলে শুল্ক ফেরত প্রাপ্তির প্রক্রিয়া জটিলতামুক্ত ও দ্রুত হবে বলে আশা করা যায়। এ পর্যন্ত শুল্ক প্রত্যার্পণের সুযোগ কেবল সরাসরি রফতানিকারকরাই গ্রহণ করতে সক্ষম হতেন, এখন প্রচ্ছন্ন রফতানিকারকরাও এ সুবািধার আওতায় অন্তর্ভুক্ত হবেন। চামড়া রফতানিতে উৎসাহ প্রদানের জন্য যেসব চামড়া রফতানিকারক মোট উৎপাদনের ৮০ শতাংশ রফতানি করেন, তারা এখন থেকে ১০০ শতাংশ রফতানিমুখী ইউনিটগুলোর সমপরিমাণ সুবিধা পাবেন। রফতানিকারকরা এখন অর্জিত মোট বৈদেশিক মুদ্রার ২০ শতাংশের পরিবর্তে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত নিজস্ব বৈদেশিক মুদ্রা অ্যাকাউন্টে রাখতে পারবেন।

যারা শুল্ক প্রত্যার্পণ অথবা বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুযোগ গ্রহণ করবেন না, তারা ক্যাশ কম্পেনসেশন স্কিমের অধীনে মোট রফতানি আয়ের ২৫ শতাংশ নগদ ফেরত পাবেন। আগে এ হার ছিল ১৫ শতাংশ। রফতানি খাতের পশ্চাৎ সংযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এ সুবিধা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হওয়ার কথা, যদিও এখন পর্যন্ত রফতানি খাতে স্থানীয় মূল্য সংযোজন তুলনামূলকভাবে কম। তৈরি পোশাক খাতে যে ২ বিলিয়ন বর্গমিটার কাপড় বাংলাদেশের প্রয়োজন, তার মধ্যে ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন বর্গমিটারই বিদেশ থেকে আমদানি হয়। ২০০৪ সালের পরবর্তীতে এমএফএ চুক্তি বাতিল হওয়ার প্রেক্ষাপটে মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি ব্যাপারে বাংলাদেশকে আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এটা না করা হলে কোটামুক্ত পরিবেশের সুযোগ নেবে মূলত সেসব দেশ, যারা এখন বাংলাদেশে কাপড় রফতানি করছে এবং অধিকতর বেশি মূল্য সংযোজনের কারণে তাদের রফতানি প্রতিযোগিতামূলক ক্ষমতা বাংলাদেশের তুলনায় বেশি। বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, তৈরি পোশাক খাতে পশ্চাৎ সংযোগ করতে হলে বাংলাদেশে ১৩৫টি স্পিনিং মিল, ৩৬০টি উইভিং মিল, ৩২৭টি ডায়িং মিল, এক হাজার নিটিং ইউনিট এবং দুই লাখ নতুন তাঁত প্রয়োজন। এর জন্য প্রয়োজন হবে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ বিনিয়োগ। এক্ষেত্রে গ্রামীণ চেকের সাফল্য অবশ্যই উৎসাহব্যঞ্জক। নিটওয়্যার রফতানিতে সাম্প্রতিক সাফল্য বাংলাদেশের সক্ষমতার উৎসাহপ্রদ একটি দিক। তবে মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি না করতে পারলে ইসিভুক্ত দেশগুলোয় প্রাপ্ত জিএসপি (শুল্কমুক্ত) সুবিধাপ্রাপ্তি অব্যাহত না থাকার আশঙ্কা আছে। প্রচ্ছন্ন ও সরাসরি রফতানি, ইপিজেড-বহির্ভূত ১০০ শতাংশ রফতানিমুখী ইউনিট ও ইপিজেড ইউনিট ইত্যাদির মধ্যে প্রণোদনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান পার্থক্যগুলো দ্রুত অবলুপ্ত করা প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত সম্মুখ সংযোগের ক্ষেত্রেও প্রচুর সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে, ৯০ শতাংশ বায়িং হাউজ বিদেশীদের নিয়ন্ত্রণে। এক্ষেত্রেও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উৎসাহ প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ব্যক্তিখাতে ইপিজেড স্থাপন ও রফতানিমুখী শিল্পে বৈদেশিক ও যৌথ বিনিয়োগ উৎসাহিত করার লক্ষ্যে সাম্প্রতিককালে যেসব উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে, সেগুলো ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে কিনা, তা নিকট ভবিষ্যতে বোঝা যাবে।

বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস করতে হলে বাংলাদেশকে বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে সবিশেষ গুরুত্বারোপ করতে হবে। একদিকে এটা রফতানি খাতে মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি, রফতানি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধার সম্প্রসারণ ও টাকার কাঙ্ক্ষিত বিনিময় হার বজায় রাখার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, অন্যদিকে আমদানিকৃত পণ্যের কাঠামো, উৎপাদন বৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতার উত্কর্ষ বৃদ্ধি ইত্যাদির সঙ্গে সম্পর্কিত। গত দুই বছরে রফতানি ও আমদানি খাতে যেসব ইতিবাচক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, সেগুলো আগামীতে আরো বেগবান করতে হলে রফতানি প্রণোদনাগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা ও রফতানি বৈচিত্র্যকরণের দিকে দৃষ্টিপাত করতে হবে। প্রতিযোগিতানির্ভর বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধার সর্বোচ্চ সুযোগ গ্রহণ করতে হলে একটি সঠিক রফতানি কৌশল প্রণয়ন ও সেটি বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। আঞ্চলিক সহযোগিতা হতে পারে এ কৌশলের অন্যতম একটি দিক। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, ১৯৯৭ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে প্রধান দুই রফতানিজাত পণ্য, তৈরি পোশাক ও চামড়া থেকে আয় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা কম অর্জিত হয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে একটা দুশ্চিন্তার কারণ।

[প্রবৃদ্ধি না স্থবিরতা? বাংলাদেশের উন্নয়ন পর্যালোচনা ১৯৯৬ থেকে পুনর্মুদ্রণ]

 

লেখকত্রয় অর্থনীতিবিদ