সোমবার | আগস্ট ১০, ২০২০ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

বিশেষ সংখ্যা

পাট

আদমজীর মৃত্যু ঘটেছে, শিল্পের নয়

মাহ্বুব উল্লাহ্

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলায় পাট শিল্প নিজের অবস্থান তৈরি করে নিতে শুরু করে। ১৯০০-১৯০১ সালের মধ্যে কলকাতার হুগলি নদীর কোলঘেঁষে ৬৫ মাইল এলাকার মধ্যে ৩৫টি পাটকল গড়ে ওঠে। তত্কালীন সময়ে এই শিল্পে পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ছিল ৪১ মিলিয়ন টাকা, যার মূল্য ১.৬ মিলিয়ন পাউন্ড ছিল। এই মূলধনগুলো ব্রিটিশ স্টার্লিং ক্যাপিটাল ফার্মের দ্বারা প্রদত্ত ছিল। তখন এই পাটকলের সমন্বিত উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৩১৫,০০০ চরকা ও ১৫৩৪০ তাঁত। এই পাটকলগুলোতে শ্রমিক সংখ্যা ছিল ১১০,০০০। কলকাতার পাটকলগুলো ১২.২৬ মিলিয়ন মণ কাঁচা পাট (৪৫০,০০০ টন) ব্যবহার করেছিল। এটা মোট উৎপাদনের ৩৮ শতাংশ ছিল। ওই বছর ৪৪০,০০০ টন পাট পণ্য বিদেশে রফতানি করেছিল। রফতানিকৃত পণ্য থেকে সে বছর আয় হয়েছিল ৫২ মিলিয়ন টাকা। পাট রফতানি সে বছর মোট রফতানির ৭.৪ শতাংশ ছিল। পাট এককভাবে ৭৯ মিলিয়ন টাকা আয় করে। তত্কালীন সময়ে এই টাকা মোট জাতীয় আয়ের ০.৪ শতাংশ ছিল। কৃষি খাতে পাটের অভাবনীয় ভূমিকা ছিল তত্কালীন সময়ে এবং অর্থনীতিতে তার একটা প্রভাব আমরা দেখেছি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ভঙ্গুর অবস্থায় পাটের অবস্থান অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে পাট শিল্প অনেক এগিয়ে গিয়েছিল এবং ১৯০০-১৯০১ এবং ১৯৪৬-৪৭ এই সময়ে ৩৫ থেকে পাটকলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৬।

এই সময়ে চরকার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় চার গুণ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায় তিন গুণ। একই সময়ে স্থিতিশীল মূল্য চক্রবৃদ্ধি হারে ১.৩৪ শতাংশ বাড়ে।

নির্বাসিত স্কটসম্যানরা কলকাতার প্রায় সব পাটকলের মালিকানায় ছিল। শ্বেতাঙ্গ হওয়ায় তারা ডান্ডি মালিকদের সঙ্গে তেমন সুসম্পর্ক গড়ে তুলত না। তারা মূলত ডান্ডি মালিকদের দৃশ্যমান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। ১৯৩৪ সালে ডান্ডি মিল মালিকরা একটা অভিযোগ করে কলকাতা মিল মালিকদের বিরুদ্ধে যে তাদের মধ্যে যে একটা অসম প্রতিযোগিতা চলছে তার অন্যতম কারণ তারা তাদের শ্রমিকদের মজুরি কম দেয় এবং তাদের অমানবিক কর্মপরিবেশ প্রদান করছে। এছাড়া কলকাতার মিল মালিকরা কাঁচা পাট রফতানির ক্ষেত্রে পক্ষপাতমূলক শিপিং রেটের বিরুদ্ধে লবিং করে। কিন্তু ১৯৩০ সালে চরম মন্দাভাবের সময় কলকাতার মিল মালিকরা ওটাওয়া চুক্তি কার্যকর করে, যার অর্থ তারা সাম্রাজ্য শাসনের বাইরের রাষ্ট্রের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য করতে পারবে। এতে বিরোধিতা করে ডান্ডি শাসকরা। ১৯৩৭ সালে ডান্ডি মিল মালিকরা ভারতীয় পাটের ওপর ট্যারিফ এবং কোটা সীমাবদ্ধতা আরোপ করার আবেদন করে। কলকাতার মিল মালিকরাও একইভাবে সরকারের কাছে আবেদন করে ভারতীয়দের কাঁচা পাট এবং রফতানি খরচের ওপর অতিরিক্ত চার্জ উঠিয়ে নেয়ার।

বিংশ শতাব্দীতে পাট এবং বাংলার কৃষক

বিংশ শতাব্দীতে কৃষি ও কৃষকের জীবনে সার্বিক সমৃদ্ধি, যা তত্কালীন সময়ে পাটের অত্যধিক উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের মধ্য দিয়ে এসেছে বলে মনে করা হয়, সে বিষয়ে অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদদের মধ্যে একটা মতভেদ আছে। সৌগত মুখার্জি (১৯৭১, ১৯৭৬) মনে করেন ১৯০১ থেকে ১৯২১ সাল এই সময়ের মধ্যে দাদন, কাঁচা পাটের দাম পড়ে যাওয়া, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং ঋণগ্রস্ততা দুর্দশাই বয়ে এনেছিল। তিনি আরো দেখিয়েছেন যে জনসংখ্যায় কোনো তারতম্য না হয়েও সে সময়ে মাথাপিছু চালের জোগান কমে গিয়েছিল। যা ব্রিটিশ শাসনামলে রফতানিনির্ভর কৃষি অর্থনীতির ওপর আরোপিত বড় একটা অভিযোগ। যদিও ওমকার গোস্বামী সৌগত মুখার্জির মেথোডোলজিকে অস্বীকার করেছেন এবং সম্পূর্ণ বিপরীত একটি মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি (১৯৯১) বলেছেন, ‘১৯০০-১৯১৪ সালে পাট চাষ এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছিল, একরের পর একর পাট চাষ করা হয়েছিল, পাটচাষীরা পাটের বাজারমূল্য এবং লাভের টাকা নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন। এই সময়ে অর্থনীতি একটা উত্থানপর্বের মধ্য দিয়ে গিয়েছে এবং বেশির ভাগ পরিবারেই রায়তি ছিল। ছোট অর্থনীতিতে এটাও অনেক বড় একটা বিষয় ছিল এবং ওমকার গোস্বামী এই সূচকটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিগত বছরগুলোর পাট এবং ধান চাষের ওপর ভিত্তি করে। সেক্ষেত্রে তিনি কেবল যারা প্রকৃত জমির মালিক ছিলেন তাদের বিবেচনায় আনেন, যারা ১৯০০-১৯১৩ সালের মধ্যে অন্তত ৪ একর জমির মালিক ছিলেন। ১৯০০-১৯০১ সালে এই সূচকে সারপ্লাস ছিল ১০০। শুধু মধ্যে ১৯০৪-০৫ এবং ১৯০৫-০৬-এ সেই সারপ্লাস কমেছিল এবং সূচকে তা ৯৩ এবং ৭০ ছিল এবং ১৯১৩-১৪ সালে সেটা ২০০ হয়েছিল। পরবর্তী বছরগুলোতে এই সূচক সবসময় ভিত্তি সূচকের থেকে বেশি ছিল।

১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তানের শিল্পায়ন

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠানের পর পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে উল্লেখ করার মতো কোনো শিল্প-কারখানা ছিল না। দেশ ভাগের সময় ভারতের অংশেই ১১২টি পাটকল থেকে যায়, পাকিস্তানে একটি পাটকলও পড়েনি। পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) চাহিদার সিংহভাগ পাট উৎপাদন করলেও ব্রিটিশ শাসনামলে সম্পূর্ণ কলকাতার পাটকলের ওপরই নির্ভরতা ছিল এই অংশের।

৪০৭টি তুলা কারখানা, যার মোট উৎপাদনক্ষমতা ছিল ১১ মিলিয়ন চরকা এবং ২,০০,৫০০ তাঁত, এর মধ্যে মাত্র ১১টি তুলা কারখানা ছিল পূর্ব পাকিস্তানে, যার মোট উৎপাদনক্ষমতা ছিল মাত্র ৯৯,০০০ চরকা এবং ২,৫৮৩ তাঁত। এছাড়া মাত্র ৮টি তুলা কারখানা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে, যার উৎপাদনক্ষমতা ছিল মাত্র ৭৭,০০০ চরকা এবং ২,২১৭ তাঁত।  

১৬৬টি চিনিকলের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের অংশে পড়েছিল মাত্র ৫টি চিনিকল এবং পশ্চিম পাকিস্তানের অংশে পড়েছিল মাত্র ৫টি। ১৬৬টি চিনিকলের মোট উৎপাদনক্ষমতা ছিল ১.৫ মিলিয়ন টন, যার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের ৫টি কলের উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৩৯,০০০ টন আর পশ্চিম পাকিস্তানের ৫টি কলের উৎপাদনক্ষমতা ছিল ২৩,০০০ টন।

১৯টি সিমেন্ট কারখানার মধ্যে একটি কারখানা, যার উৎপাদনক্ষমতা ১০০,০০০ টন এবং দুটি কারখানা, যার উৎপাদনক্ষমতা ২০০,০০০ টন যথাক্রমে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অংশে পড়েছিল।

১৮টি স্টিল মিল এবং ১৬টি কাগজের মিলের কোনোটাই তত্কালীন পাকিস্তানের অংশে পড়েনি। পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) অংশে মাত্র ১২ শতাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল এবং একই সঙ্গে এই অবিভক্ত বাংলা ছিল তত্কালীন সময়ে সমগ্র শিল্পের কাঁচামাল জোগানদাতা।

বাংলাদেশের পাট শিল্পের উন্নয়ন

বাংলাদেশ যখন পাট শিল্পে পদার্পণ করে তখন ভারতের উৎপাদনক্ষমতা ১.৫ মিলিয়ন টনের বেশি। ভারতের ঝুলিতে ততদিনে ১০০ বছরের বেশি সময়ের উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণের অভিজ্ঞতা। আসলে ভারত ছিল বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী। ১৯৬৪-৬৫ সালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান পাট উৎপাদন করে ২৮৯,০০০ টন এবং রফতানি করে ২২৪,০০০ টন। একই বছর ভারত উৎপাদন করে ১.৩ মেট্রিক টন এবং রফতানি করে ৯৭০,০০০ মেট্রিক টন। এরপর বাংলাদেশের উৎপাদনক্ষমতা বাড়তে থাকে এবং ভারতের কমতে থাকে। ১৯৬৯-৭০ সালে এসে ভারতের উৎপাদনক্ষমতা নেমে আসে ৯৬৯,০০০ টনে এবং রফতানি নেমে আসে ৪৬৭,০০০ টনে। বিপরীতে বাংলাদেশের উৎপাদনক্ষমতা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮৭,০০০ টনে এবং রফতানি বেড়ে দাঁড়ায় ৪৯৮,০০০ টনে। ওই বছরই প্রথমবার বাংলাদেশের রফতানি ভারতের রফতানির থেকে বেড়ে যায়। ১৯৭১-৭২ সালে আবারো ভারতের পাট শিল্প জেগে ওঠে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে। ১৯৭৩-৭৪ ও ১৯৭৪-৭৫ সালে ভারতের উৎপাদন আবারো বেড়ে ৯৫০,০০০ টন এবং রফতানি ৫০০,০০০ টনে পৌঁছে, বিপরীতে বাংলাদেশ উৎপাদন করেছিল ৪৫০,০০০ টন এবং রফতানি করেছিল ৪০০,০০০ টন।

আদমজী জুটমিলের ইতিহাস

বাংলাদেশের প্রথম পাটকল প্রতিষ্ঠিত হয় খুলনায় ১৯৪৮ সালে। গত শতাব্দীতে পঞ্চাশ দশকের কোরিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এ অঞ্চলের পাট শিল্পের সম্ভাবনা তৈরি করে। গুল মোহাম্মদ আদমজী এবং তার পরিবার পূর্ব পাকিস্তানে পাটকল প্রতিষ্ঠা করে এবং একই সঙ্গে পাট শিল্পের বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ১৯৫১ সালে শীতলক্ষ্যার তীরে সুমিলপাড়ায় বিস্তৃত হয় এবং তাতে করে কারখানার সর্বমোট জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০০ একর। আদমজীর মোট চরকার পরিমাণ ছিল ৩,৩৫০ এবং তত্কালীন সময়ে আদমজী ছিল এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল।

কিন্তু আদমজী কখনই লাভের মুখ দেখেনি। এমনকি ব্যক্তিমালিকানায় যখন আদমজী নিজ হাতে পরিচালনা করেছেন তখনো আদমজী কখনো লাভ করেনি এবং ১৯৭০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ৩ কোটি টাকা লোকসান করেছিল পাটকলটি। ১৯৭১ সালের পর পাটকলটি সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ করা হয় অন্যান্য সব কলকারখানার সঙ্গে। পরবর্তী সময়েও লোকসানের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখে আদমজী। ২০০১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আদমজীর মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫১৪ কোটি টাকা। যদিও এই লোকসান নিয়ে অনেক রহস্য আছে। তবে আরেকটি সূত্রমতে এই লোকসানের পরিমাণ ১২০০ কোটি টাকা অর্থাৎ প্রতিষ্ঠার পর গড়ে প্রতি বছর এই পাটকল ৫০ কোটি টাকা লোকসান করে। শেষ অর্থবছরে সর্বোচ্চ লোকসানের রেকর্ডটি করে আদমজী ১১৬ টাকার।

বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশন ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে মোট ৩১.৪৩ কোটি টাকা লোকসান করে। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে তা গিয়ে দাঁড়ায় ৯৬.২০ কোটি টাকায়। ১৯৯৬-৯৭-এ ছিল ২৫১.৭১ কোটি টাকা, ১৯৯৭-৯৮-এ ২৭৫.৯০ কোটি টাকা, ১৯৯৮-৯৯-এ ২৯৪.৩৯ কোটি টাকা, ১৯৯৯-২০০০-এ ২৯৪.৩৯ কোটি টাকা, ২০০০-০১-এ ৩৮০.৩৬ কোটি টাকা এবং ২০০১-০২-এ ৪০৫.৭৭ কোটি টাকা। এ লোকসানের একটা বড় অংশই ছিল আদমজী এবং বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশন এই লোকসানের ভার বহন করেছে অনেক বছর।

মাইক্রোইকোনমিকসের একটি সাধারণ সংজ্ঞা বলছে, যে প্রতিষ্ঠান ভ্যারিয়েবল কস্ট যেমন শ্রমিকের মজুরি, কাঁচামালের মূল্য ও জ্বালানি ব্যয় বহন করতে পারে না সেই প্রতিষ্ঠানের বন্ধ হয়ে যাওয়া উচিত। তবে তারা চাইলে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে, যদি স্বল্প মেয়াদে লোকসান মেটাতে পারে কিন্তু সেক্ষেত্রে তাদের অবশ্যই ভ্যারিয়েবল কস্ট এবং কিছু ক্ষেত্রে ফিক্সড কস্ট বহন করতে হবে। কিন্তু অনন্তকাল লোকসান বহন করতে পারে না। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না।

আদমজীর কর্মপরিবেশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং যা সুস্থাবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। লুটপাট আর স্বজনপ্রীতির মতো বিষয়গুলো মরণব্যাধির মতো জেঁকে বসেছিল। কিন্তু যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে সরকারের নিযুক্ত নিয়ন্ত্রণ সংস্থা কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারেনি, বরং তারা কালক্ষেপণ করেছে। সেক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত আদমজী বন্ধের সিদ্ধান্ত ছিল ইতিবাচক এবং সরকার কখনই এই লোকসান অনন্তকাল বহন করতে পারত না। কিছু মানুষ অবশ্য বলে, সরকারি প্রতিষ্ঠানকে কখনই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো করে বিচার করা উচিত না। তাদের উদ্দেশে বলে রাখা ভালো, সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো এক্ষেত্রে আদর্শ রাষ্ট্র ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা, কিন্তু তা হয়নি।

পাকিস্তানের দিনগুলোয় পাট শিল্প

পাকিস্তান আমলে আসলে পাট শিল্প ব্যক্তিমালিকানায় কতটা লাভজনক ছিল, সেটা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে একটা বিতর্ক আছেই। আলমগীর এবং রহমান তাদের গবেষণা প্রবন্ধ ‘সেভিং ইন বাংলাদেশ; ১৯৫৯/৬০-১৯৬৯/৭০’তে দেখিয়েছেন ষাটের দশকে পাট লাভ করেছে বিনিয়োগের প্রায় ১৬ শতাংশ। কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ তার গবেষণায় দেখিয়েছেন ১৯৬৯-৭০ অর্থবছরে পাটকলগুলো পাটজাত পণ্য রফতানি করে ১২ শতাংশ লাভ করেছিল। দুটি গবেষণায়ই এক্সপোর্ট বোনাস দেখানো হয়েছে। সেক্ষেত্রে যদি এটা ধরা হয়, তাহলে আসলে পাটকলগুলো কোনো লাভ করেনি। ১৯৫৯ সালের জানুয়ারি মাসে পাকিস্তান সরকার এ এক্সপোর্ট বোনাস স্কিম ঘোষণা করে। স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের সঙ্গে বিদেশী বাণিজ্য করার বদৌলতে তারা এ সুবিধা ভোগ করত। রফতানিকারকরা স্থানীয় মুদ্রার দামে বিদেশী মুদ্রা কিনতে পারত সমান দামে একটি বোনাস ভাউচারের বিনিময়ে। ওই বোনাস ভাউচারের মাধ্যমে তারা তাদের আয়ের ২০ শতাংশ, ৩০ শতাংশ অথবা ৩৫ শতাংশ ব্যাংকে জমা দেয়ার মাধ্যমে স্কিমটি উপভোগ করত। এ বোনাস ভাউচারের রেট নির্ভর করত পাটজাত পণ্য রফতানির মাধ্যমে। এ ভাউচার বাইরে খোলাবাজারেও বিক্রি হতো। এক্ষেত্রে তারা ভাউচার দেখালে ভাউচার কেনার সময়ের একই হারে বৈদেশিক মুদ্রা কিনতে পারত। এছাড়া তারা ব্যবসায়িক এবং বাণিজ্যিক অফিস উদ্দেশ্যে বিদেশ ভ্রমণ করার ক্ষেত্রেও এ ভাউচারের জন্য বিশেষ সুবিধা ভোগ করত।

স্কিম চালু হওয়ার পরই পাট রফতানিকারকরা ভাউচার সুবিধা ভোগ করা শুরু করেছিল। পাট রফতানিকারকদের পাট রফতানির হার ছিল ২০ শতাংশ ১৯৬৭ সালের মার্চ পর্যন্ত। এপ্রিল ১৯৬৭ থেকে জুলাই ১৯৭০ পর্যন্ত ছিল ৩০ শতাংশ এবং জুলাই ১৯৭০ সালের পর ছিল ৩৫ শতাংশ। ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত প্রিমিয়াম হার প্রায় ১০০ শতাংশ থেকে ১৫০ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছিল। পরবর্তী বছরগুলোয় তা ছিল প্রায় ১৭০ শতাংশ থেকে ১৮০ শতাংশ ৩০ শতাংশ বোনাস হারের বিপরীতে প্রিমিয়াম হার ছিল ১৮০ শতাংশ। অর্থাৎ ডলারের বিপরীতে টাকার মান ছিল ৪ দশমিক ৭৬ টাকা। অর্থাৎ রফতানির ক্ষেত্রে যে টাকা আয় হতো, তা থেকে বেশি অর্থাৎ ৭ দশমিক ৩৩ টাকা আয় করা যেত। অফিশিয়াল রেটের থেকে প্রায় ৫৪ শতাংশ রেট বেশি ছিল। ১৯৭০ সালে প্রতি টন পাট রফতানিতে ৫০০ টাকা ক্ষতি হতো। কিন্তু এ হিসাবে মন্দাভাবের টাকা যুক্ত করা হয়নি এবং তা হলে সেটা হতো ৬৪৪ টাকা। পাকিস্তান আমলে যে পাটের ব্যবসা একেবারেই লাভজনক ছিল না, সেটা কাজী খলীকুজ্জমান আহমেদ তার গবেষণায় দেখিয়েছেন। সুতরাং এ খাতে বিনিয়োগ কখনই লাভজনক ছিল না, সেটাও প্রমাণিত হয়।

স্বাধীন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তানে বাস্তবিকভাবেই কোনো উল্লেখযোগ্য শিল্প ইউনিট ছিল না। পাকিস্তান সবসময় ছিল একটা শিল্প ব্যর্থ দেশ। এ অবস্থায় পাকিস্তান যা করতে পারত তাহলো, সরকারের কর্তৃত্বে শিল্প প্রতিষ্ঠা করা, যা তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশ করেছিল অথবা ব্যক্তিমালিকানায় শিল্প উদ্যোগকে জনপ্রিয় করতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা। পাকিস্তান দ্বিতীয় পথে হেঁটেছিল। সরকার উপমহাদেশের মুসলিম উদ্যোক্তাদের আমন্ত্রণ করেছিল পাকিস্তানে ব্যবসা পরিচালনা করতে, যারা এরই মধ্যে দেশের বাইরে ব্যবসা পরিচালনা করছিল সে সময়ে। সরকার একই সময়ে একটি কমিটি গঠন করে, যার কাজ ছিল একমাত্র উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করা এবং তাদের সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। উদ্যোক্তারা সমাজের সম্পদ। এবং সমাজকে প্রস্তুত থাকতে হবে সমাজের এ সম্পদকে সঠিক মূল্যায়ন করতে। পাকিস্তান সরকার যুক্তিসঙ্গত কারণেই সমাজের এ সম্পদকে মূল্যায়ন করতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। উপরন্তু, স্বাধীনতার পর স্বাধীন পাকিস্তানের অবস্থা স্বাধীন বাংলাদেশের থেকে অনেকটা আলাদা ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান ছিল পরিত্যক্ত অবস্থায়। এ অবস্থায় সরকারকে এসব প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। এছাড়া এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার মতো ব্যবস্থাপনা শক্তিও বাংলাদেশের ছিল না, যা একই সঙ্গে সরকারের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশের সব শিল্প প্রতিষ্ঠান সমাজতান্ত্রিক শাসনের মাধ্যমে সরকারের দ্বারা অধিগ্রহণ করার বিষয়টিও ছিল। এ সিদ্ধান্ত ছিল অবাস্তব ও অযৌক্তিক। মনে হতে পারে পাকিস্তানের ব্যবসায়ীরা স্বাধীনভাবে ব্যবসা পরিচালন করতে পেরেছিল, কারণ তাদের সে অভিজ্ঞতা ও জনবল ছিল। কিন্তু বিষয়টা এ রকম হয়নি, হতে পারত যদি না সেনা শাসনের আগ্রাসন পাকিস্তানকে গ্রাস না করত।

বাংলাদেশ এখন ব্যক্তিগত পুঁজিবাদী উন্নয়নের দর্শনে এগিয়ে যাচ্ছে। সব বৈদেশিক বিনিয়োগকে সাধুবাদ জানানো হচ্ছে এবং তারা মুক্তভাবে সব সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর একই দর্শনে বাংলাদেশের পথ চলার শুরু হলে কি খুব ভুল হতো! এ বিষয়ে কঠোর যুক্তি হলো, রাজনৈতিক পরিবেশ তখন প্রতিকূল ছিল এমন দর্শন গ্রহণ করার ক্ষেত্রে। যদিও মাওবাদীদের মতো চরমপন্থা মতাদর্শীরাও বিরাষ্ট্রীয়করণের পক্ষে ছিলেন। তারা ভালো করেই জানতেন জাতীয়তাবাদী পুঁজিবাদের কাছে জাতি আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের থেকে বেশি নিরাপদ থাকবে। তত্কালীন আওয়ামী লীগ তাদের এই ভুল বুঝতে পেরেছিল বলেই বিনিয়োগনীতি ঠিক করেছিল। কিন্তু পূর্ণ রাষ্ট্রীয়করণ প্রক্রিয়া শেষে তারা তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছিল যখন এ ব্যবস্থা একেবারেই স্থায়ী হয়েছিল। এখনকার আওয়ামী সরকার পূর্ণ ব্যক্তিখাতের পুঁজিবাদের উন্নয়নে বিশ্বাসী।

পাকিস্তান আমলে পাট একটি অলাভজনক ব্যবসা ছিল এবং এ বিষয়ে খলীকুজ্জমানের যুক্তিটি ছিল পেশাগতভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী কিন্তু অবাস্তব। এটা সত্য যে পাকিস্তান সরকারের শিল্প খাতে ঘোষিত নীতিগুলো ছিল বিকৃত। স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা এবং পৃষ্ঠপোষকতা করা ছিল সময়ের চাহিদা। প্রতিবেশী ভারত সরকার এ কাজ করতে পেরেছিল অনেক সহজেই। তারা পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল তাদের স্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের। যেসব দেশ শিল্প অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে এগিয়ে যাচ্ছে, তারা ডায়নামিক কম্পারেটিভ অ্যাডভান্টেজকে স্ট্যাটিক কম্পারেটিভ অ্যাডভান্টেজের থেকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। খলীকুজ্জমানের যুক্তির পেছনে যথাযথ উদ্দেশ্য ছিল কেননা তার রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৭ সালে এবং তত্কালীন সময়ে সবাই এমনকি সরকারি আমলা কর্মচারীরাও বিরাষ্ট্রীয়করণের পক্ষে ছিলেন। একটা খাতের অব্যাহত লোকসানের জন্য কেন আমরা শুধু রাষ্ট্রীয়করণকে দায়ী করব। কেননা বাংলাদেশের পাট শিল্প যখন ব্যক্তি মালিকানায় ছিল, তখনো এ খাতে লোকসান হয়েছে। আর এটা বিশ্বাস করা খুবই কঠিন যে দেশটি পাট চাষে এতটা সমৃদ্ধ এবং অধিকসংখ্যক পাটকল থাকা সত্ত্বেও তারা এ শিল্পে কোনো ধরনের দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেনি, বিশেষ করে কোনো মুনাফা করতে পারেনি।

সত্যি কি ভুল হয়েছে?

এই উপমহাদেশে পাট শিল্পে তথ্যপ্রযুক্তির অনুপস্থিতি এবং বিকল্প পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতার অভাব সবসময় উপস্থিত ছিল। ভারতীয় পাটকলগুলো কখনই তাদের পণ্য উন্নয়নে মনোযোগ দেয়নি। উৎপাদিত পণ্যের অগ্নিপ্রতিরোধক শক্তি, পানিপ্রতিরোধক শক্তি এবং পচনশীলতা প্রতিরোধে কোনো গবেষণা হয়নি। তারা বিকল্প পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য কিছুই করেনি। চল্লিশের দশকের শেষে আমেরিকা এবং লাতিন আমেরিকা পাটজাত পণ্যের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি করে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশে উত্তীর্ণ করে। ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া রজেলা ফাইবার ব্যবহার করে সুগার ব্যাগ তৈরি শুরু করে এবং যাবতীয় সুবিধা প্রদান করে ভারতীয় পাট পণ্যকে পেছনে ফেলতে।

বাংলাদেশের পাট শিল্পকে পাকিস্তান কিংবা ভারতের পাট শিল্পের মতো হয়তো তথ্যপ্রযুক্তির অনুপস্থিতিতে এতটা ভুগতে হয়নি তত্কালীন সময়ে, কিন্তু আজকে ৫০ বছর পর আমরা এটাকে পাট শিল্পের ধসের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখতেই পারি। অব্যাহত লোকসানের মুখে কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ ছিল না বিএমআরইর ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার। বিকল্প হিসেবে সিনথেটিকের ব্যবহার রোধ করা যায়নি। আরঅ্যান্ডডি নিয়ে কোনো কাজ হয়নি বাংলাদেশে এবং বিকল্প সিনথেটিকের পেছনে যত কাজ হয়েছে। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করা হয়নি কখনই। যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। অন্যদিকে আমাদের শাসকরাও গবেষণার বিষয়ে ছিলেন একেবারেই উদাসীন। তারা হয়তো জানেন না উন্নত বিশ্ব তাদের জিডিপির একটা বিশাল অর্থ আরঅ্যান্ডডিতে খরচ করে। এক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। বিশ্বের অন্যতম অর্থনীতির সাংবাদিক লা মিইন্ট বলেছেন, উচ্চ প্রবৃদ্ধির জন্য চারটি শর্ত আছে— (১) বিনামূল্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং নিম্ন শুল্কহার আয়ের জন্য; (২) প্রাথমিক রফতানি খাতে বিদেশী বিনিয়োগকে জনপ্রিয় করা; (৩) দেশের অভ্যন্তরে বিনামূল্যে বাজার ব্যবস্থা পরিচালনা করা অর্থনৈতিক প্রণোদনার ওপর ভিত্তি করে যা রফতানি খাতের উৎপাদন বাড়াবে কৃষি খাত, খনিজ খাত এবং উদ্ভিদ খাত থেকে; (৪) আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দরকার একটি সুষম বাজেট এবং স্বয়ংক্রিয় মুদ্রা বিনিময় হার ব্যবস্থা। মালয়েশিয়া এ চার শর্ত পূরণ করতে পেরেছিল। তারা উচ্চ প্রবৃদ্ধি হার বজায় রাখতে পেরেছিল এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানকে তারা গবেষণা এবং উন্নয়ন কাজে সুবিধা প্রদান করেছিল। একই সঙ্গে তারা তাদের স্থানীয় রাবার উৎপাদনে অনেক গবেষণামূলক কাজ করেছিল এবং বিশ্বে সিনথেটিক রাবারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে ছিল। তবে মিইন্টের চারটি শর্তের সঙ্গে কিন্তু সুশাসনকেও যুক্ত করতে হবে। এছাড়া কখনই শুধু উন্নয়ন ও গবেষণায় বিনিয়োগ করে একটি দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের এখন একটি বড় সুযোগ আবার পাটকে পুনর্জন্ম দেয়ার। কেননা বিশ্বে এখন পরিবেশ রক্ষা নিয়ে কাজ চলছে। শিল্পের পাশাপাশি পরিবেশের জন্যও কাজ করতে হবে বলছে সব দেশ। সেখানে আমাদের পাট ও পাটজাত পণ্যের একটা সম্ভাবনা আবার এসেছে। এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো একজন মানুষ মারা গেলে পুরো মানবগোষ্ঠী বিলুপ্ত যেমন হয় না, তেমনি একটি আদমজী মারা গেছে বলে পুরো পাট শিল্প বিলুপ্ত হয়ে গেছে, সেটাও ধরে নেয়া যাবে না।

[২০০৩ সালে অ্যাডর্ন পাবলিকেশন প্রকাশিত মাহ্বুব উল্লাহ্ রচিত Bangladesh Economy Turns of the decades গ্রন্থ থেকে নেয়া]

 

লেখক: সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ভাষান্তর: মুহাম্মাদ হাসান রাহিফ