সোমবার | আগস্ট ১০, ২০২০ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

বিশেষ সংখ্যা

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি

দারিদ্র্য দূরীকরণের হাতিয়ার

তোফায়েল আহমেদ

সময় ও অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে উন্নয়ন ধারণা, উন্নয়নের ভাষা-পরিভাষা পরিবর্তিত হয়। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকের ‘ত্রাণ’ ও ‘পল্লী উন্নয়ন’ কার্যক্রম ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দুই দশকে ‘দারিদ্র্য বিমোচন’ কার্যক্রমে রূপান্তরিত হয়। পরবর্তী সময়ে পিআরএসপি ও এমডিজির প্রভাবে তা এক ধরনের বিস্ময়কর বৈশ্বিক বিষয় হয়ে দাঁড়ায় এবং এর প্রভাবে সামাজিক বিজ্ঞান, বিশেষত উন্নয়ন অর্থনীতির বুদ্ধিবৃত্তিক প্রসারে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। ষাট ও সত্তরের দশকে তেমনিভাবে ‘পল্লী উন্নয়ন’ গবেষণা বিশেষ মাত্রার উচ্চতায় আরোহণ করেছিল। ১৯৮০-এর দশকের পর থেকে সনাতনী পল্লী উন্নয়ন বুদ্ধিবৃত্তিক মনোযোগ হারিয়ে ফেলে এবং ‘দারিদ্র্য’ নতুন মনঃসংযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়। ২০০০ থেকে এমডিজি কার্যক্রমের এ দেড় দশক দারিদ্র্য গবেষণার বিস্ফোরণের যুগ বলা যাবে। দারিদ্র্য এখনো জাদুঘরে না গেলেও এখন দারিদ্র্যকেন্দ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা প্রায় স্তিমিত। এমডিজির পরপর জাতিসংঘ কর্তৃক এসডিজির ধারণা তুলে ধরা হলেও বাস্তবায়ন পর্যায়ে বাস্তব অগ্রগতি এখনো দৃশ্যমান নয়। বাংলাদেশসহ বহু স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে এসডিজিকে নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হলেও বিপরীতে সে ধ্রুপদী ‘প্রবৃদ্ধি’ (গ্রোথ থিওরি) তত্ত্ব এখন অনেক বেশি গুরুত্বসহকারে আলোচিত হয়। এসব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের মধ্যেও বাংলাদেশে মাঝামাঝি আরো একটি বিষয়, ‘সামাজিক নিরাপত্তা’, ক্ষণে ক্ষণে আলোচিত হয়। তবে আলোচিত হলেও তা এখনো পূর্বতন ত্রাণ, পল্লী উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন এ তিন তত্ত্বের আবহকে অতিক্রম করতে পারছে না। বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে পঁচিশটি মন্ত্রণালয়ের সামাজিক নিরাপত্তা খাতে একশ তেতাল্লিশটি কর্মসূচি, তার বিপরীতে বিশাল বরাদ্দ। কিন্তু কার্যক্রমগুলো বিশ্লেষণ করে দেখলে তাতে ওই তিন কার্যক্রমের ছায়া স্পষ্ট। সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম একেবারে নেই, তা বলা যাবে না। কিন্তু সংখ্যা, পরিমাণ ও পদ্ধতিগতভাবে সামাজিক নিরাপত্তার প্রবণতা নিষ্প্রভ। সরকারের গৃহীত সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলের প্রতিফলন বাস্তব কর্মকাণ্ডে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি। নীতি প্রণীত হলেও নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কার্যক্রম গ্রহণে দুর্বলতা রয়েই যাচ্ছে। বৃহত্তর বিভাজনে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের একটি তালিকা করলে দেখা দেখা যায়, ১. সামাজিক সুরক্ষা (১৭), ২. সামাজিক ক্ষমতায়ন (২), ৩. নগদ অর্থ হস্তান্তর (৩), ৪. খাদ্যনিরাপত্তা (১০), ৫. ক্ষুদ্র ঋণ, ৬. অন্যান্য সামাজিক ক্ষমতায়ন-১ (৮), ৭. অন্যান্য সামাজিক ক্ষমতায়ন (১১), চলমান উন্নয়ন প্রকল্প (৮২) এবং নতুন প্রকল্প (৭)—এভাবে ২০১৭-২০১৮ সালে ৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকার বাজেটে ৪৮ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় দেখানো হয়, যা মূল বাজেটের প্রায় ১৩ শতাংশ এবং প্রকল্প সংখ্যা ১৪৩। ২০১৮-২০১৯ সালের বাজেটে তা বেড়ে ৬৪ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা হয়েছে। কিন্তু কার্যক্রম, প্রকল্প ও পদ্ধতি একই রয়ে গেছে। এখানে কোনো মৌলিক পরিবর্তন নেই।

‘সামাজিক নিরাপত্তা’ নতুন করে কোনো চাকা আবিষ্কারের গল্প নয়। উন্নত বিশ্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সামাজিক নিরাপত্তার রীতিনীতি ও কার্যক্রমগুলো গড়ে ওঠে। আমাদের দেশে এমডিজি-পরবর্তী সময়কে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের শুরুর কাল হিসেবে ধরে নেয়া যেতে পারে। টেকসই দারিদ্র্য বিমোচন ও মধ্যম আয়ের চৌকাঠে পা রাখার সময়কাল থেকে ‘কল্যাণরাষ্ট্র’ হয়ে ওঠার প্রবল ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিসর বৃদ্ধির যুক্তিসঙ্গত কারণ। তবে এ খাতে জাতীয় বাজেটের বরাদ্দ বৃদ্ধির চেয়েও এখানে প্রয়োজন কার্যক্রমের ব্যাপকতা ও গভীরতা বৃদ্ধি। এ লক্ষ্যে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্রে (২০১৫) যথাযথ দিকনির্দেশনা রয়েছে। ওই নির্দেশনাকে পাশ কাটিয়ে না গেলেই হয়। যেমন ধরা যাক, উপরের এক নম্বর ক্রমিকের সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের অধীনে মোট সতেরোটা প্রকল্প এবং মোট বাজেট বরাদ্দ ২৩ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা। এর মাধ্যমে ৭৮ লাখ ১২ হাজার মানুষ উপকৃত হবে (২০১৭-২০১৮) বলে প্রাক্কলন ছিল। দেখা গেল, এ খাত থেকে ৬ লাখ (৮ শতাংশ) সরকারি চাকরিজীবীর অবসর ভাতা বাবদ ব্যয় ধরা হলো প্রায় ১৭ হাজার কোটি (৭৩ শতাংশ) টাকা। এর মধ্যে বয়স্ক ভাতা, দুস্থ মহিলা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, শিক্ষাবৃত্তি ইত্যাদি নেই তা নয়। তবে এগুলোর পরিমাণ, বিস্তৃতি, ব্যাপকতা সামাজিক নিরাপত্তার ধারণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এগুলো মূলত ত্রাণজাতীয় কার্যক্রম হয়েই থাকল, অধিকার হয়ে এল না। আর সরকারি চাকরিজীবীর পেনশন সামাজিক নিরাপত্তার অংশের চেয়েও বেশি চাকরির শর্ত বা সুবিধা। এ সুবিধার জন্য তাদের রাষ্ট্রীয় তহবিলে কোনো চাঁদা দিতে হয় না। আগে বেতনের জন্য আয়করও দিতে হতো না। এখন অবশ্য আয়কর দিতে হচ্ছে।

উন্নয়ন প্রকল্প বিশেষত ৮৯টি প্রকল্পকে (প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার বাজেট) সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে এক করে দেখার অবকাশ নেই। এসব প্রকল্প দরকার নেই, তাও বলা হচ্ছে না। এসব প্রকল্প মানুষের আর্থিক ও সামাজিক উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদিতে অবদান রাখবে। সামাজিক নিরাপত্তা হবে একটি ধারাবাহিক স্থায়ী কর্মসূচি, এটিকে প্রকল্প চক্রে বেঁধে নেয়া ঠিক হবে না। সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্রে জীবনচক্রভিত্তিক কর্মসূচি বা পদ্ধতির উল্লেখ আছে। এ পদ্ধতির আওতায় রাষ্ট্র একজন নাগরিককে শিশু অবস্থা থেকেই নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা দেবে এবং তা জীবনব্যাপী চলবে। সে মায়ের গর্ভে থাকাকালীন স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদে ভূমিষ্ঠ হওয়া, আশৈশব পরিচর্যা, বিভিন্ন বয়সে শিক্ষা, কর্ম, অবসর সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত হবে। পাশাপাশি, স্বাস্থ্য, আবাসন, বিনোদন সবকিছুও চলবে। প্রশ্ন হতে পারে, রাষ্ট্র এত সম্পদ কোথায় পাবে। কর্মজীবনের আয়-উপার্জন ও উৎপাদনশীলতা থেকে নাগরিকরাই এ সম্পদের জোগান দেবে। প্রতিজন কর্মশীল মানুষ সাধ্য অনুযায়ী তার কর-রাজস্ব-চাঁদার মাধ্যমে এ তহবিলের অর্থ সংস্থান করবে।

এ দেশে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক বিত্তবান আয়কর দেন না, দিলেও যা দেয়ার বা যে পরিমাণে দেয়ার তা দেন না। এখানে যে ঘুষ-দুর্নীতি সে প্রসঙ্গে নাই বা গেলাম। যদি প্রশ্ন করা হয়, কর দিয়ে করদাতার লাভ বা সুবিধা কী? কেউ বলবেন সুবিধার প্রশ্ন কেন আসবে, এটি তার কর্তব্য বা দায়িত্ব। এখানেই এ প্রশ্নের উত্তর। প্রতিটি দায়িত্বের অপর পিঠে অধিকারের বিষয় জড়িত। করদাতা কর দিয়ে করের বিনিময়ে রাষ্ট্রের কাছ থেকে ন্যায্য অধিকার বা সুবিধা চাইতেই পারে। এ দেশে কর আয় সীমার উপরের করপোরেট সেক্টরের সব চাকরিজীবী আয়কর পরিশোধ করে থাকে। সে আয়কর প্রদানের জন্য তাদের কোনো বিশেষ সুবিধা নেই। সরকারি চাকরিজীবীর মতো তার চাকরির নিরাপত্তা তত মজবুত নয়। সারা জীবন চাকরি করার পর অবসর জীবনে কোনো অবসর ভাতা নেই। সন্তানের সরকারি বিদ্যায়তনে শিক্ষার নিশ্চয়তা, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা, রাজউক-সিডিএ-আরডি-কেডিএতে প্লট, পোষ্যের চাকরি কোটা কিছুই নেই। তাহলে এখানে একজন বেসরকারি চাকরিজীবীর কর প্রণোদনা কী হতে পারে? শুধুই রাষ্ট্রের প্রতি কর্তব্য পালন!

একটি আদর্শ সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংবলিত কল্যাণরাষ্ট্র হওয়ার জন্য একটি ‘আদর্শ কর ব্যবস্থা’ থাকা প্রয়োজন। প্রতিজন কর্মক্ষম মানুষের কর নিবন্ধন যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে রাষ্ট্রীয় কল্যাণ সুবিধা জালে অন্তর্ভুক্তি। সামাজিক ন্যায়বিচার, সুযোগের সমতা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান প্রভৃতি মৌলিক চাহিদার সঙ্গে রাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম হবে এক ধরনের গ্যারান্টি বা অঙ্গীকার। এক্ষেত্রে পশ্চিম ইউরোপ, উত্তর আমেরিকার কিছু দেশ এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোর কর ব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমকে পাশাপাশি দেখা যেতে পারে। তাই উপসংহারে বলতে চাই, সামাজিক নিরাপত্তা রাষ্ট্রের দান-দক্ষিণা নয়, রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক দায়-দেনা অধিকার-কর্তব্যের অন্তর্গত বিষয়। আমাদের রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘গণতন্ত্র’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। একটি আদর্শ কর ব্যবস্থা ও তার অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজের পূর্বশর্ত। দক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গণতন্ত্র সুরক্ষার রক্ষাকবচ হতে পারে।

 

লেখক: স্থানীয় শাসন-বিষয়ক গবেষক