সোমবার | আগস্ট ১০, ২০২০ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

বিশেষ সংখ্যা

কৃষি খাত

বাণিজ্য উদারীকরণ ও বাংলাদেশের শস্য

মাহবুব হোসেন

কৃষি এবং খাদ্যসামগ্রীর বিশ্ববাণিজ্যে বিদ্যমান বাজার বিকৃতি দূরীকরণের লক্ষ্যে ১৯৯৪ সালে কৃষিকে গ্যাট চুক্তির আওতায় আনা হয়। খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিবেচনায় কৃষি খাত অর্থনীতির অন্যান্য খাত থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। তাই কৃষি খাতকে এতদিন বাণিজ্যবিষয়ক আলোচনায় গ্যাটের বাইরে রাখা হয়। বাণিজ্য আলোচনায় উরুগুয়ে পর্ব শুরুর অনেক আগেই বিশ্বের অনেক দেশ কৃষি খাতকে মুক্ত করার পক্ষে দাবি জানায়। তাদের দাবি ছিল, উন্নত দেশগুলোয় বিদ্যমান মাত্রাতিরিক্ত রক্ষণশীলতার হাত থেকে কৃষি বাণিজ্যকে মুক্ত করে উন্নয়নশীল দেশের তুলনামূলকভাবে দক্ষ উৎপাদকদের সুযোগ দেয়া হোক। বাণিজ্য আলোচনার উরুগুয়ে পর্বে নেয়া বহুপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে গ্যাট সচিবালয়কে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা হিসেবে রূপান্তর করা হয়। গ্যাটের উরুগুয়ে পর্বে স্বাক্ষরিত কৃষি চুক্তির (Agreement on Agriculture-AOA) আওতাধীন প্রতিশ্রুতিগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়— ১. বাজার-প্রবেশাধিকার, ২. অভ্যন্তরীণ সহায়তা এবং ৩. রফতানি সহায়তা।

বাজার প্রবেশাধিকার সীমাসংক্রান্ত প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে অশুল্ক বাণিজ্য বাধাগুলোকে শুল্কে পরিবর্তন, শুল্কসীমা ক্রমান্বয়ে হ্রাসকরণ এবং যেসব পণ্যসামগ্রীর আমদানির জন্য কোটা রয়েছে, সেসব পণ্যের জন্য কম আমদানি শুল্ক ধার্যকরণ। যেসব পণ্যসামগ্রীর আমদানির পরিমাণ নগণ্য, সেসব পণ্যের প্রবেশাধিকার উন্নয়ন দেশগুলোয় ভিত্তি বছরের (১৯৮৬-৮৮) মোট ভোগের কমপক্ষে ৩ শতাংশ এবং উন্নত দেশগুলোয় কমপক্ষে ৫ শতাংশ হতে হবে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে এ ধরনের কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে হয়নি। তবে বাংলাদেশ তার শুল্কসীমা বাড়াতে পারবে না। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ যেসব কৃষিপণ্য আমদানি করে, তার মধ্যে ১৩টি পণ্য ছাড়া বাকি সব পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্কহারের উচ্চসীমা নির্ধারিত হয়েছে ২০০ শতাংশ। আর বিশেষ ১৩টি পণ্যের শুল্কসীমা নির্ধারিত হয়েছে ৫৫ শতাংশ। দুটি পণ্যের (গ্রিন ও ব্ল্যাক টি) ক্ষেত্রে শুল্কসীমা বিদ্যমান শুল্কের চেয়ে নিচে নির্ধারিত হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ সহায়তা ধারার আওতাভুক্ত দেশগুলোয় বাণিজ্যে বাজার বিকৃতিকারী সব ধরনের অভ্যন্তরীণ সহায়তাকে Agreegate Measure of Support (AMS)-এ রূপান্তর এবং ক্রমান্বয়ে তা হ্রাস করতে হবে। উন্নত দেশগুলোয় AMS কৃষি উৎপাদনের মোট মূল্যের ৫ শতাংশের অধিক হতে পারবে না এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য AMS হচ্ছে কৃষি উৎপাদনের মোট ১০ শতাংশ। যেসব সহায়তা কৃষি বাণিজ্যকে বিকৃত করে না, সেগুলোকে AMS হিসাবের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গবেষণা ও উন্নয়ন বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও বাজার তথ্য, পরিবেশরক্ষণ কর্মসূচি এবং কৃষকের আয়কে স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রদেয় ভর্তুকি (উৎপাদন এবং পণ্যের আবাদি এলাকা সীমিতকরণের জন্য সরাসরি কৃষককে প্রদেয় ভর্তুকি)। রফতানি সহায়তার আওতায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য দেশগুলো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয় যে, তারা ২২টি কৃষিপণ্যের রফতানির জন্য দেয়া ভর্তুকি কমাবে। উন্নত দেশগুলো রফতানি খাতে প্রদত্ত ভর্তুকির ৩৬ শতাংশ ছয় বছরের মধ্যে (১৯৯৫-২০০০) এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো রফতানি খাতে প্রদত্ত ভর্তুকির ২১ শতাংশ ১০ বছরের মধ্যে (১৯৯৫-২০০৪) হ্রাস করার প্রতিশ্রুতি দেয়। বাংলাদেশসহ সব স্বল্পোন্নত দেশ অভ্যন্তরীণ সহায়তা এবং রফতানি ভর্তুকির জন্য উপরোক্ত প্রতিশ্রুতির আওতায় পড়েনি।

কৃষি চুক্তি স্বাক্ষরের সময় থেকেই উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলো তাদের পণ্য উন্নত দেশে রফতানির জন্য বাজার-প্রবেশাধিকার সম্পর্কে তাদের উদ্বেগের কথা বলে আসছে। উন্নত দেশগুলো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কৃষি খাতে ভর্তুকি কমানোর পরিবর্তে বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা বাড়িয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থাভুক্ত (OECD) দেশগুলোয় ১৯৯৭ সালে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৩১ শতাংশ এবং ১৯৯৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ শতাংশে। খামার বিল ২০০২-এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আগামী ১০ বছরে ১৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি নতুন ভর্তুকি দিতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ধানচাষীরা সরকারের কাছ থেকে সরাসরি সহায়তা হিসেবে পরিবারপ্রতি বার্ষিক ৭৫ হাজার ডলার পেয়ে থাকে।

উল্লিখিত বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ তাদের কৃষি বাণিজ্যনীতিতে পরিবর্তন সাধন করছে এবং এ ধরনের পরিবর্তনের মাধ্যমে তারা কৃষি চুক্তির আওতায় কৃষি বাণিজ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিচ্ছে। তাই বাংলাদেশের জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী যে, এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের পরিবর্তনশীল নীতিমালাকে বিবেচনায় রেখে বাণিজ্যনীতি নির্ধারণ করা। বাণিজ্য নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে তার ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতিকেও বিবেচনায় রাখতে হবে।

. শস্য খাতের গুরুত্ব এবং বিবেচ্য বিষয়সমূহ

অন্যান্য স্বল্পোন্নত দেশের মতো বাংলাদেশেও শস্য খাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ১৩০ মিলিয়ন মানুষ তাদের প্রধান খাদ্যের জন্য এবং ১৩ মিলিয়ন কৃষক পরিবার তাদের জীবিকার জন্য প্রাথমিকভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ২০০০-০১ সালে শস্য এবং উদ্যান খাতের অবদান ছিল ৮ হাজার ৪৫০ মিলিয়ন ডলার, যা কিনা চলতি বাজারমূল্যে হিসাবকৃত জিডিপির ১৮ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পারিবারিক আয়-ব্যয় জরিপ ২০০০-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের ভোক্তারা শস্য খাতের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর জন্য ৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেন। অর্থাৎ বেসরকারি খাতের মোট ভোগ ব্যয়ের ২৫ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে শস্য খাতের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর পেছনে। শস্য উৎপাদনের জন্য ২ হাজার ৬৫ মিলিয়ন জন-দিবস কর্মনিয়োজন হয়ে থাকে। অর্থাৎ পূর্ণ সময় নিয়োগ হিসাবে ৭ দশমিক ৯ মিলিয়ন লোকের বার্ষিক পূর্ণ সময় কর্মসংস্থানের সমতুল্য। ১৯৯৮-২০০০ সালে শস্য খাতের পণ্যসামগ্রীর বার্ষিক গড় আমদানির পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, যা কিনা দেশের মোট রফতানি আয়ের ২৪ শতাংশ। তাই অভ্যন্তরীণ উৎপাদন এবং আমদানির পরিবর্তন দেশের ভোক্তা ও উৎপাদকের কল্যাণ, সরকারের রাজস্ব আয়, বাণিজ্য উদ্বৃত্ত এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

শস্য খাতের উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত সম্পদের অন্য কাজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনমনীয়তা এক্ষেত্রে একটি বড় বিবেচ্য বিষয়। উৎপাদনের একটি মূল উপকরণ হচ্ছে ভূমি। বিভিন্ন শস্য উৎপাদনের উপযোগী কৃষি-প্রতিবেশের জন্য উপযোগী ভূমি দরকার। তাই এক ফসলের আওতাধীন জমিকে অন্য ফসলের আবাদের আওতায় আনলে ফলনের ক্ষতি হয়। উদাহরণস্বরূপ, বর্ষা মৌসুমে পানিতে ডুবে থাকে এমন জমিতে কেবল আমন ধানেরই চাষ করা সম্ভব। তাই ধানের দাম যাই হোক না কেন, বর্ষাকালে এ জমিতে আমন ধান ছাড়া অন্য কোনো ফসলের আবাদ করা যায় না। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে তুলনামূলক দাম এবং লাভের ভিত্তিতে সফলের আবাদ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। শস্য খাত আবার ‘কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও শেষ আশ্রয়স্থল’ এবং নিরক্ষর ও স্বল্প শিক্ষিত জনগণ, যাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই বললেই চলে তারা জীবিকার জন্য শস্য খাতের ওপরই নির্ভরশীল। তাই মুক্ত বাণিজ্যের প্রবক্তাদের দাবি অনুযায়ী, শ্রমশক্তির অন্য খাতে নিয়োজনের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতার বিকাশ বাস্তবে সম্ভব নাও হতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কৃষকের আয় এবং কৃষি শ্রমিকের মজুরি হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে এবং এর ফলে দারিদ্র্যাবস্থার ক্রমাবনতি হতে পারে।

শস্য খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দাম এবং বাণিজ্যনীতির ক্ষেত্রে উৎপাদক ও ভোক্তার স্বার্থের সমন্বয় সাধনও একটি বড় সমস্যা। শস্য খাত প্রধান খাদ্য উৎপাদনেরও উৎস। এ খাতের মাত্রাতিরিক্ত সংরক্ষণ আন্তর্জাতিক বাজার দামের চেয়ে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়াবে অধিক হারে, যা ভোক্তার স্বার্থ হরণের মাধ্যমে উৎপাদকের স্বার্থ সংরক্ষণ করবে। অন্যদিকে সংরক্ষণের অবর্তমানে ভোক্তাদের সুবিধা হলেও উৎপাদকরা খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সরকারের জন্য একটা বড় চিন্তার বিষয় হচ্ছে খাদ্যশস্যের দামে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। কেননা দামের অস্থিতিশীলতা দরিদ্র মানুষের খাদ্যনিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করে। মাথাপিছু আয়ের হিসাবে নিচুতলার সর্বনিম্ন ৪০ শতাংশ গ্রামীণ পরিবার তাদের মোট ব্যয় বাজেটের প্রায় ৫২ শতাংশ শস্য খাতের সব পণ্যসামগ্রী ভোগের পেছনে ব্যয় করে এবং কেবল চাল ও গমের খাতে ব্যয় হয় ৩৫ শতাংশ। শহর এলাকার জন্য এ পরিমাণ হচ্ছে যথাক্রমে ৪২ ও ২৫ শতাংশ। মাথাপিছু আয়ের হিসাবে ওপরতলার সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ গ্রামীণ ও শহুরে পরিবার যথাক্রমে তাদের বাজেটের ১৮ শতাংশ এবং ১৩ শতাংশ শস্য খাতের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর জন্য ব্যয় করে। তাই শস্য খাতের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলের একটি বিশেষ উপাদান। এখানে বাণিজ্যনীতি এমন হতে হবে, যাতে খাদ্যে দরিদ্রদের যথেষ্টভাবে প্রবেশ ঘটে।

স্বল্প আয়ের ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কম দামে পণ্য ক্রয়ের সুযোগও খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং কম দামের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে দামের খুব বেশি ওঠানামার হাত থেকে ভোক্তাদের রক্ষা করাও দরকার। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে যাতে প্রধান খাদ্যশস্যের প্রবৃদ্ধি রক্ষা করা যায়, তার জন্য কৃষকরা যাতে ন্যায্য দাম পান তাও সরকারের দেখা জরুরি এবং একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে দামের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা দরকার। দারিদ্র্য বিমোচনের জন্যও কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়া দরকার। উল্লেখ্য, আমাদের দেশের দুই-তৃতীয়াংশ কৃষকের জমির পরিমাণ এক হেক্টরের কম এবং এ পরিমাণ জমি থেকে দারিদ্র্য নিরসনমূলক আয় অর্জন করা কষ্টসাধ্য।

. এককপ্রতি পাদনের খরচ এবং দাম

বর্তমান নিবন্ধে উল্লিখিত বাংলাদেশের শস্য উৎপাদনের আয়-ব্যয় সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করা হয় জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্বশীল এক জরিপ থেকে। এ জরিপের মাধ্যমে ১ হাজার ৮৮০টি খামার পরিবারের সাক্ষাত্কার গ্রহণ করা হয়েছে। এসব পরিবার বাংলাদেশের ৫৭টি জেলার ৬২টি গ্রাম থেকে নেয়া হয়েছে। ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্তরভিত্তিক দৈবচয়ন পদ্ধতিতে এ পরিবারগুলো নির্বাচন করে। ইউনিয়ন, গ্রাম এবং পরিবার পর্যায়ে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে নমুনা ঠিক করা হয়। ২০০০ সালে একই পরিবারগুলোর ওপর আরেকটি জরিপ করা হয়। এবারের জরিপটি ইরি-এর সমীক্ষার জন্য সোসিও কনসাল্ট লিমিটেড পরিচালনা করে। ভারতের উপাত্ত সংগৃহীত হয়েছে Commission for Agricultural Costs and Prices (CACP)-এর প্রতিবেদন থেকে এবং তা ১৯৯৮-৯৯ এবং ১৯৯৯-২০০০ সালের শস্য মৌসুমকে নির্দেশ করে। ইরি পরিচালিত শস্য আবাদের আয়-ব্যয় জরিপ ২০০০ থেকে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের ডাটা নেয়া হয়েছে এবং তা ২০০০ সালের শস্য মৌসুমকে নির্দেশ করে।

উৎপাদন খরচে কেবল পরিবর্তনীয় খরচ (সব উৎপাদন উপকরণ খরচ, সেচ খরচ ও মেশিনের ভাড়া) এবং বাজারমূল্যে নিজস্ব এবং পরিবারের মালিকানাধীন পশুর শ্রমের মূল্য ধরা হয়েছে। জমির ভাড়া এবং অন্যান্য স্থির সম্পদের অপচয় হিসাবের মধ্যে ধরা হয়নি। কেননা বিভিন্ন দেশের মধ্যে এসব খরচের তুলনা করা জটিল। ভারতের ডাটা থেকে দেখা যায়, ভূমি এবং অন্যান্য স্থির সম্পদের পেছনে অতিরিক্ত ৬০ শতাংশ খরচ হয়ে থাকে। জমি ও অন্যান্য স্থির সম্পদের জন্য হেক্টরপ্রতি রিটার্ন হিসাব করার জন্য খামার পর্যায়ের দাম থেকে একক উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে যে সংখ্যাটি পাওয়া গেছে তাকে হেক্টরপ্রতি ফলনের পরিমাণ দিয়ে গুণ করা হয়েছে। এভাবে প্রাপ্ত সংখ্যাটিই হচ্ছে ভূমি ও অন্যান্য স্থির সম্পদের জন্য নিট রিটার্ন। এভাবে হিসাব করা নিট রিটার্ন বিভিন্ন দেশের মধ্যে তুলনা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলনার জন্য নির্দিষ্ট বছরের বিনিময় হারে ডলারের অংকে আয় ও খরচকে হিসাব করা হয়েছে। পরিশিষ্ট সারণিগুলোয় খরচের বিস্তারিত বিবরণ এবং খামার পর্যায়ে খরচ দেয়া আছে।

ধানের আবাদের জন্য এককপ্রতি চলতি উৎপাদন খরচ সবচেয়ে কম হচ্ছে পাঞ্জাবে এবং তারপর ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে। বাংলাদেশের জন্য বোরো ধানের উৎপাদন খরচ আমন ধানের উৎপাদন খরচের তুলনায় বেশি। বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন খরচ পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় কম। এক্ষেত্রে অবশ্য আমাদের পাঞ্জাব ও অন্ধ্র প্রদেশের সঙ্গে তুলনা করা সমীচীন। কেননা ভারতের মোট উদ্বৃত্ত চালের বেশির ভাগের জোগানদাতা হচ্ছে এ দুটি রাজ্য। বিশ্ববাজারে সর্ববৃহৎ চাল রফতানিকারক দেশ থাইল্যান্ডের তুলনায় বাংলাদেশের উৎপাদন খরচ শুকনো মৌসুমে (বোরো ধান) ৬২ শতাংশ বেশি এবং বর্ষা মৌসুমে (আমন ধান) ১৮ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশে খামার পর্যায়ে ধানের দাম এবং লাভ (দাম এবং পরিবর্তনীয় খরচের পার্থক্য) ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের তুলনায় অনেক বেশি। থাইল্যান্ডের চাষীরা অন্য দেশের তুলনায় টনপ্রতি কম লাভে ধান বিক্রি করেন। তবুও তাদের টিকে থাকা সম্ভব। কেননা এশিয়ার অন্য দেশের তুলনায় তাদের খামার আয়তন অনেক বড়। উল্লেখ্য, থাইল্যান্ডের গড় খামার আয়তন হচ্ছে পাঁচ হেক্টর এবং বাংলাদেশের গড় খামার আয়তন হচ্ছে শূন্য দশমিক ৬৮ হেক্টর। তাই বাংলাদেশের চাষীদের তুলনায় টনপ্রতি লাভের পরিমাণ কম হলেও থাইল্যান্ডে পরিবারপ্রতি আয় বাংলাদেশের থেকে বেশি হতে পারে। ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের তুলনায় বাংলাদেশে ধানের খামার পর্যায়ে দাম ৫০ শতাংশ বেশি এবং ভারতের পাঞ্জাব ও অন্ধ্র প্রদেশের তুলনায় বাংলাদেশে খামার পর্যায়ে ধানের দাম যথাক্রমে ১৫ ও ২০ শতাংশ বেশি।

উল্লিখিত তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, বিরাজমান খরচ এবং বাজার দামে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। পরিবহন খরচ এবং ব্যবসায়ীদের লাভ হিসাবের মধ্যে ধরলে বাংলাদেশ ভিয়েতনামের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হলেও থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না।

গমের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তুলনায় ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশ অনেক সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। বাংলাদেশে গমের বাজার দাম ভারতের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেশি এবং পাঞ্জাব প্রদেশের তুলনায় বাংলাদেশের এককপ্রতি পরিবর্তনশীল উৎপাদন খরচ ১২৯ শতাংশ বেশি। ভারতের CCAP-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ফুড করপোরেশন অব ইন্ডিয়া কর্তৃক গম সংগ্রহের খরচ বিশ্ববাজার দামের তুলনায় অনেক বেশি। এভাবে চলতি দামে বাংলাদেশের চাষীরা বিশ্ববাজার থেকে আমদানিকৃত গমের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবেন না।

বাংলাদেশে আখের উৎপাদন খরচও গমের মতোই। বাংলাদেশে এককপ্রতি উৎপাদনের খরচ ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। রাই ও সরিষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এককপ্রতি উৎপাদন খরচ ভারতের রাজস্থান রাজ্যের তুলনায় অনেক বেশি। বাংলাদেশে রাইয়ের খামার পর্যায়ে দাম ভারতের তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি এবং সরিষার দাম ১৩ শতাংশ বেশি। উল্লেখ্য, ভারতও বাংলাদেশের মতোই ভোজ্যতেলের বড় আমদানিকারক দেশ। ভোজ্যতেলের অভ্যন্তরীণ বাজার দাম নিরূপিত হয় বিশ্ববাজার দাম এবং আমদানি শুল্কের পরিমাণের ওপর। এক্ষেত্রে দেশে পণ্যটির উৎপাদন খরচের ভূমিকা গৌণ।

কেবল মসুর ডাল ও পাটের ক্ষেত্রে ভারতের এককপ্রতি উৎপাদন খরচ ও দাম বাংলাদেশের সমপর্যায়ে রয়েছে।

. এককপ্রতি পাদন খরচে পার্থক্যের কারণ

বাংলাদেশে বেশির ভাগ শস্যের উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ার কারণ কী? এক্ষেত্রে কৃষি প্রতিবেশ এবং সেচ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ দুটো বিষয় শস্য উৎপাদনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে থাকে। এক্ষেত্রে অন্য বিবেচ্য বিষয় হলো, উন্নত বীজ ও উৎপাদন কলাকৌশলের ব্যবহার। উন্নত বীজ ও উৎপাদন কলাকৌশল শস্যের ফলনকে নির্ধারণ করে।

বাংলাদেশে উচ্চফলনশীল (উফশী) ধানের ফলন এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সমপর্যায়ে রয়েছে। অবশ্য আমন মৌসুমে ফলন আরো বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে এবং তা করতে পারলে এককপ্রতি উৎপাদন খরচ আরো কমবে। অন্যান্য শস্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ফলন ভারতের সর্বোচ্চ ফলনবিশিষ্ট রাজ্যগুলোর তুলনায় বেশ কম। ফলন পার্থক্য বেশি হচ্ছে গম ও আখের ক্ষেত্রে।

উৎপাদন খরচে পার্থক্যের অন্য উৎসটি হচ্ছে বিভিন্ন দেশে উৎপাদন উপকরণের দামের পার্থক্য। সারণি ৭-এ তিনটি প্রধান উৎপাদন উপকরণ যথা— ইউরিয়া সার, সেচ এবং শ্রমের দাম উপস্থাপন করা হয়েছে। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে ইউরিয়া সারের দাম বাংলাদেশের প্রায় সমান। কিন্তু ভারতে ইউরিয়া সারের দাম বাংলাদেশের চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ কম। যেহেতু রাসায়নিক সার বাবদ খরচ মোট উৎপাদন খরচের মাত্র ১৫ শতাংশ, সেহেতু সারের দামের পার্থক্য এককপ্রতি উৎপাদন খরচ পার্থক্যের জন্য কোনো বড় ফ্যাক্টর নয়।

কৃষি উপাদানের দাম

সূত্র: ভারতের ডাটার জন্য ভারত সরকার (২০০২); থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের ডাটার জন্য ইরি পরিচালিত শস্য আবাদের আয়-ব্যয় জরিপ ২০০০ এবং বাংলাদেশের ডাটার জন্য ইরি পরিচালিত শস্য আবাদের আয়-ব্যয় জরিপ ২০০০-২০০১।

আলোচ্য দেশগুলোয় শ্রমিকের মজুরিতে ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান। থাইল্যান্ডে দৈনিক মজুরি হচ্ছে ৫ দশমিক ২ ডলার এবং বাংলাদেশে দৈনিক মজুরি হচ্ছে ১ দশমিক ২ ডলার। কৃষকরা যেহেতু উচ্চমজুরি হারে কম শ্রমিক ব্যবহারের জন্য বেশি হারে যান্ত্রিকীকরণের ওপর নির্ভরশীল হন, সেহেতু উচ্চমজুরি হার সব ক্ষেত্রেই উৎপাদন খরচ বাড়ায় না। বাংলাদেশের কৃষকরা ধান উৎপাদনের জন্য যেখানে প্রতি হেক্টরে ১৪০ শ্রমদিবস ব্যবহার করেন, সেখানে ভিয়েতনামের কৃষকরা ব্যবহার করেন ৮০ শ্রমদিবস, আর থাইল্যান্ডের কৃষকরা হেক্টরপ্রতি মাত্র ছয় থেকে আট শ্রমদিবস ব্যবহার করেন। কৃষি যন্ত্রপাতির অধিক ব্যবহারের মধ্যমে মানব ও পশুশ্রম প্রতিস্থাপন সম্ভব হয়েছে, যার ফলে এককপ্রতি উৎপাদন খরচ কমে গেছে। থাইল্যান্ড ও ভারতের পাঞ্জাবে যান্ত্রিকীকরণের মাত্রা অনেক বেশি। যান্ত্রিকীকরণের কারণে এসব এলাকায় উৎপাদন খরচ সবচেয়ে কম।

বাংলাদেশে ধান আবাদ, বিশেষত বোরো ধান আবাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খরচের জন্য সেচ খরচ একটি বড় বিষয়। বাংলাদেশে ধান উৎপাদনের জন্য মোট পরিবর্তনীয় খরচের ২৮ শতাংশ হচ্ছে সেচ খরচ, যেখানে ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যে এর পরিমাণ ১৩ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ৮ শতাংশ ও ভিয়েতনামে ৬ শতাংশ। অন্যান্য দেশে সেচ খরচ কম পড়ার পেছনে রয়েছে ভর্তুকি দেয়া বিদ্যুৎ ব্যবহার (ভারত) এবং ভর্তুকির মাধ্যমে বৃহদাকার সেচ প্রকল্প স্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ। ভারতের পাঞ্জাবে সেচকার্যে ব্যবহূত নলকূপের জন্য বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় এবং সেচনালা থেকেও বিনামূল্যে সেচের পানি দেয়া হয়ে থাকে। বাংলাদেশে সেচকার্যের প্রধান উৎস হচ্ছে ব্যক্তিমালিকানাধীন অগভীর নলকূপ এবং পাওয়ার পাম্প। সেচকার্যে ব্যবহূত অধিকাংশ মেশিন ডিজেলচালিত। এভাবে কৃষিপণ্য উৎপাদনে ডিজেল একটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হয়েছে এবং বোরো ধানের উৎপাদন খরচ ডিজেলের দামের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।

. শস্য পাদনের তুলনামূলক সুবিধা

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অধীনে কোনো দেশ বাণিজ্য সুবিধা কাজে লাগাতে পারবে কি পারবে না, তা নির্ভর করবে পণ্যসামগ্রী উৎপাদনে দেশটির তুলনামূলক সুবিধার ব্যাপ্তির ওপর। অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশে সামাজিক বা অর্থনৈতিক লাভের পরিমাণ ব্যক্তিগত লাভের পরিমাণ থেকে আলাদা হয়ে থাকে। কেননা উপকরণ ও উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর বাজারে এবং মুদ্রা বিনিময় হারে প্রায়ই সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে বাজার বিকৃতি থাকে। একটা নির্দিষ্ট পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে তুলনামূলক সুবিধা হিসাব করা হয় পণ্যটির ওপর ‘সীমান্ত দাম’ আরোপ করে তার সঙ্গে সামাজিক খরচ এবং অতিরিক্ত এক একক পণ্যের জন্য উৎপাদনের সুযোগ খরচ প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচ, পরিবহন খরচ, পরিচালন এবং বিপণন খরচ যোগ করে। যদি সুযোগ খরচ সীমান্ত দাম থেকে কম হয়, তাহলে বুঝতে হবে শস্যটির উৎপাদনে দেশটির তুলনামূলক সুবিধা রয়েছে।

. বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতির জন্য তাত্পর্য

বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতির জন্য বর্তমান সমীক্ষায় প্রাপ্ত ফলাফলের গুরুত্বপূর্ণ তাত্পর্য রয়েছে। শস্য খাতের উৎপাদিত পণ্যগুলোর ক্ষেত্রে তুলনামূলক সুবিধাবিষয়ক সমীক্ষা থেকে জানা যায়, গম, আখ, রাই ও সরিষা, মরিচ এবং কতিপয় ডালজাতীয় শস্যের উৎপাদনে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা নেই। বাংলাদেশ এসব পণ্যের জন্য অবাধ আমদানির নীতি অনুসরণ করলে দেশের ভোক্তারা লাভবান হবে।

উফশী ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা থাকলেও এ অঞ্চলের অন্যান্য চাল রফতানিকারক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের এককপ্রতি উৎপাদন খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি। বর্তমানে ভারত চাল ও গম রফতানির প্রসার ঘটাচ্ছে রফতানিকারকদের বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে। এ প্রণোদনার মাধ্যমে চাল ও গমের অর্থনৈতিক দামের প্রায় অর্ধেকের জন্য সহায়তা পাওয়া যায়। বাংলাদেশ সরকারের বাংলাদেশী কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য এবং ভারতীয় চালের ডাম্পিংয়ের হাত থেকে অভ্যন্তরীণ বাজার রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। এজন্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় অনুমোদিত শুল্কসীমার মধ্যে শুল্কহার বাড়ানো যেতে পারে। অবশ্য শুল্কহার খুব বেশি করাটা সমীচীন হবে না। কেননা এর মাধ্যমে উৎপাদকদের স্বার্থ সংরক্ষিত হয় ভোক্তাদের অতিরিক্ত ব্যয়ের মাধ্যমে। আর খাদ্যদ্রব্যের দাম খুব বেশি হলে দরিদ্র পরিবারে খাদ্যগ্রহণের পরিমাণ কমে যায়। ভারতীয় চালের ডাম্পিং বন্ধের জন্য সরকার রেগুলেটরি ডিউটি বৃদ্ধি, এমনকি অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের বিষয়টিও ভেবে দেখতে পারে।

এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে উফশী ধানের এককপ্রতি উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ার পেছনে এ দেশের উচ্চ সেচ খরচ দায়ী। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে হেক্টরপ্রতি সেচ খরচ প্রায় ৫১ ডলার অথচ ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যে হেক্টরপ্রতি সেচ খরচ হচ্ছে প্রায় ৩২ ডলার, থাইল্যান্ডে ১৮ ডলার ও ভিয়েতনামে ২৬ ডলার। ভারত সেচকার্যে ব্যবহূত বিদ্যুতের জন্য প্রচুর পরিমাণে ভর্তুকি দেয়। তাই সেখানে সেচের খরচ কম। অন্যান্য দেশে সরকারি খাতের বৃহদাকার সেচ প্রকল্পের জন্য সরকার অনেক ভর্তুকি দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের সেচের মূল উৎস হচ্ছে ডিজেলচালিত ইঞ্জিন। বাংলাদেশ সরকার ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে ডিজেলের দাম আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এ অবস্থায় বর্তমানে বাংলাদেশের সেচ খরচ নিঃসন্দেহে আরো বেড়েছে। বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারকে তাই সেচ খরচ কমানোর জন্য ডিজেলে ভর্তুকি দিতে হবে এবং ডিজেলের একটি স্থিতিশীল দাম বজায় রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম কমে গেলে সরকার অতিরিক্ত মুনাফা তার কোষাগারে জমা রাখতে পারে। বাংলাদেশ দ্রুতগতিতে গ্রামীণ বিদ্যুতের সম্প্রসারণ করলে এবং সেচকাজে গ্রামীণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করার সুযোগ বাড়লে স্বল্প খরচে সেচ দেয়া সম্ভব হবে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ধানের জোগান বেশ কমে যায়। যার কারণে ধান-চালের দাম বেড়ে যায়, যা কিনা গ্রামীণ ভূমিহীন পরিবার এবং প্রান্তিক চাষীদের খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। সরকার এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য বেসরকারি খাতকে গম ও চাল আমদানিতে উৎসাহ জোগায়। তাই পূর্ববর্তী আমন ও বোরো ফসলের অবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজার দাম বিবেচনা করে সরকারকে বার্ষিক বাজেটে পরিবর্তনযোগ্য শুল্কহার আরোপের নীতি গ্রহণ করতে হবে।

ভারত বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্য সংস্থার মাধ্যমে খাদ্যশস্য আমদানি করছে। বাংলাদেশে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্য সংস্থার অতীত অভিজ্ঞতা পর্যালোচনার ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে, খাদ্যশস্য আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভারতের নীতি অনুসরণ করা ঠিক হবে না। এক্ষেত্রে সরকারের নিয়মিতভাবে খাদ্যশস্যের রফতানি ও আমদানি পরিবীক্ষণ করা দরকার এবং আমদানি ও রফতানিকে প্রভাবিত করার জন্য পরিবর্তনশীল শুল্কহার ও এলসি মার্জিন ব্যবহার করা দরকার।

[বিআইডিএস প্রকাশিত বাংলাদেশ উন্নয়ন সমীক্ষা থেকে পুনর্মুদ্রণ]

 

লেখক: কৃষি অর্থনীতিবিদ