সোমবার | আগস্ট ১০, ২০২০ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

বিশেষ সংখ্যা

সাইফুর রহমান ও শাহ এএমএস কিবরিয়া

অর্থনীতি রূপান্তরের দুই কাণ্ডারি

মামুন রশীদ

বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসে ১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল, তথা নব্বইয়ের দশক বিরাট আলোচনার দাবি রাখে। এ সময়ে দুটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় ছিল এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।

এ সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন হয়। রাজনীতির বাইরে থেকে বেশকিছু লোক সামনে আসেন, যারা দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে চান। অর্থনীতির ক্ষেত্রে বেশকিছু বড় কাজ হয়েছে। এ কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে রফতানির ক্ষেত্রে ব্যক্তিখাতের বিকাশ। ব্যক্তিখাত এখন একটি মহীরুহ জায়গায় পৌঁছে গেছে। ব্যক্তিখাতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে উন্নয়ন অংশীদার যেমন— বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইত্যাদি সহায়তা করেছে। সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন তিনটি বিষয় মনে রেখে করা হয়েছে। সেগুলো হলো, দারিদ্র্য বিমোচন, দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ব্যক্তিখাতে ব্যাপক প্রণোদনা দেয়া ও ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগকে সঠিক পথে পরিচালনা করা। এজন্য ওই সময় যে দুজন অর্থমন্ত্রী ছিলেন, তারা উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে গভীরভাবে কাজ করেছেন। আরেকটি বিষয় মনে রাখা উচিত, নব্বইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশ রফতানির ক্ষেত্রে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে একটি নাম হয়ে ওঠে। পোশাক রফতানির দিক থেকে চীনের সঙ্গে ব্যবধান বড় হলেও ইন্দোনেশিয়া, তুরস্কসহ এগিয়ে থাকা দেশগুলোকে হারিয়ে আমরা দ্বিতীয় স্থান অধিকার করি। এ অগ্রগতির জন্য পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা দুজন অর্থমন্ত্রীর অবদান উল্লেখ করেন— সাইফুর রহমান ও শাহ এএমএস কিবরিয়া।

বাংলাদেশের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের বাঁক পরিবর্তন ইতিহাসে সাইফুর রহমান মূল ভূমিকায় অবস্থান করবেন। বিশ্বব্যাংকের একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক একবার আমাকে বলেছিলেন, তোমরা ভাগ্যবান, কারণ ইন্দোনেশিয়া যেমন- শ্রীমূল্যানি ইন্নাভাতিকে অর্থমন্ত্রী হিসেবে পেয়েছে, তোমরাও তেমনি সাইফুর রহমানকে অর্থমন্ত্রী হিসেবে পেয়েছ। সম্ভবত ২০০৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল দিল্লিতে অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক বিদ্যুৎ নিয়ে এক কনফারেন্সে। মাত্র ১ মিনিটের সে দেখায় আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি জেনে তিনি বলেছিলেন, ‘তোমাদের সাইফুর রহমান ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্সের ক্ষেত্রে যে ধরনের কাজ করেছেন, তা আমি পারতাম না। তিনি মিরাকল করেছেন।’

বাংলাদেশ আজ এত সমস্যার মধ্য দিয়েও এগিয়ে যাচ্ছে। তার কারণ বাংলাদেশে একটি অত্যন্ত সক্রিয়, স্বয়ংক্রিয় ও বেগবান ব্যক্তিখাতের জন্ম হয়েছে। এ ব্যক্তিখাত বিভিন্ন সমস্যার মধ্যেও মানিয়ে নিতে পারে। সাইফুর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ হচ্ছে ব্যক্তিখাত। তিনি এটাও মনে করতেন, ব্যক্তিখাত হবে দায়িত্বশীল। তিনি                  মনে করতেন, আর্সেনিকের প্রভাব উন্নত বিশ্বের বানানো। পরে অবশ্য এ নিয়ে ভুল ভাঙে তার। তিনি গার্মেন্ট নিয়ে তীব্র সমালোচনা করতেন। কারণ তিনি মনে করতেন, এর ভ্যালু অ্যাডিশন খুব কম। এছাড়া তিনি গার্মেন্ট মালিকদের শুধু ঢাকায় কারখানা প্রতিষ্ঠা করা পছন্দ করতেন না। তিনি বলতেন, এরা সবাই কেন ঢাকাতেই কারখানা করছে? অন্য জায়গায় কারখানা করলে প্রয়োজনে আমি মালিকদের ইনটেনসিভ দিতাম। বিভিন্ন জায়গায় কারখানা হলে শ্রমিকরা ঢাকায় এসে ভিড় করতেন না। তিনি বছরের পর বছর লোকসান দেয়া আদমজী পাটকল বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং সেখানে ইপিজেড নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বাস্তবায়ন করা হয়।

সাইফুর রহমান বিশ্বব্যাংকের প্রতিটি মিটিংয়ে যাওয়ার আগে খুব ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতেন। নিজে অনেক পড়াশোনা করতেন। তিনি যেহেতু একটা সময় বিশ্বব্যাংকের গভর্নিং বোর্ডেরও চেয়ারম্যান ছিলেন, তাই মিটিংয়ে যাওয়ার আগে প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিশ্বব্যাংকের পরিচালকদের সঙ্গে আলোচনা করে নিতেন। বিশ্বব্যাংকের একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমাকে বলেছিলেন, সাইফুর রহমান বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বুঝতে পারতেন। সাইফুর রহমান বুঝতেন, কোন জায়গায় প্রণোদনা দেয়া যাবে, কোন জায়গায় দেয়া যাবে না। এজন্য আমরা দেখেছি, তিনি তৈরি পোশাক খাতকে নিয়ে সমালোচনামুখর ছিলেন। এ খাতে কতদিন প্রণোদনা দেয়া হবে, কবে পোশাক খাত দাঁড়াতে পারবে, তা নিয়ে তার দূরদর্শিতা ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটা পর্যায়ে এ খাতকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। আমরা ফরেন ক্যাপিটালকে আটকে রাখতে পারব না। সুতরাং আমাদের গভর্ন্যান্স মডেল ইম্প্রুভ করতে হবে, অর্থ ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ সুশাসনকে উন্নত করতে হবে ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের প্রাইভেট সেক্টর কীভাবে আন্তর্জাতিক প্রাইভেট সেক্টরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকতে পারবে, তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতেন সাইফুর রহমান। এজন্য তিনি বলেছিলেন, রফতানি যদি বাড়াতে হয়, তবে আমাদের আমদানি বাড়াতে হবে। এজন্য আমদানি উদারীকরণ করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি লড়াই শুরু করতে চেয়েছিলেন। সংসদে ঋণখেলাপিদের নাম ঘোষণা করা, এ-সংক্রান্ত ঋণ সংস্কার কমিশন গঠন ইত্যাদি উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। আজকের ব্যাংকিং খাতের নড়বড়ে অবস্থার জন্য দায়ী অর্থনীতি এগিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও, ব্যক্তিখাতের বিকাশ সত্ত্বেও আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা-নিয়মানুবর্তিতা ধরে রাখাতে না পারা। বিভিন্ন ধরনের চাপ থাকা সত্ত্বেও সাইফুর রহমান আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা-নিয়মানুবর্তিতার ক্ষেত্রে আপসহীন ছিলেন।&dquote;&dquote;

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য আমরা যে যাত্রা করেছিলাম এবং আজ যে পর্যায়ে এসেছি, তার পেছনে সাইফুর রহমান কাণ্ডারির ভূমিকা পালন করেছেন। এখনো আওয়ামী লীগের যারা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত, তারা সবাই সাইফুর রহমানকে উচ্চসম্মান করেন। সাইফুর রহমানের সময় মোবাইল ফোন আসাসহ বিভিন্ন পরিবর্তন এসেছে। তিনি উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে ব্যক্তিখাতের বিকাশ, দারিদ্র্য বিমোচেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্প খাতের উন্নয়ন ও বাণিজ্য বিকাশের জন্য নতুন ধরনের সম্পর্কে গিয়েছিলেন। এজন্য বিশ্বব্যাংকের আরেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক একবার বলেছিলেন, সাইফুর রহমান থাকার কারণে তারা অনেক ভালো কাজ করতে পেরেছেন। তারা পরিবর্তন, রূপান্তর ও সংস্কারকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন। সাইফুর রহমান যদিও সবাইকে চাপের মুখে রাখতেন, অত্যন্ত কর্তৃত্বশীল ছিলেন, তার পরও তিনি অন্যদের মতামত গ্রহণ করতেন। কেউ বিপরীত মতামত দিলে তিনি তা নিয়ে চিন্তা করতেন। বিভিন্ন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনার ধারা তিনিই শুরু করেন। পাবলিক সেক্টরকে দায়িত্বশীল করা, পাবলিক সেক্টরে লোকসান কমানোর ক্ষেত্রে সাইফুর রহমানের যে শক্তিশালী ভূমিকা দেখেছি, তা পরবর্তী সময়ে আর কোনো অর্থমন্ত্রীর ক্ষেত্রে দেখিনি।

আমি মনে করি, শাহ এএমএস কিবরিয়াও অনেকটাই সাইফুর রহমানের সফলতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিবরিয়া মুক্তিযুদ্ধের একজন পরোক্ষ সৈনিক ছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদেশে থেকে অনেক কাজ করেছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশ্রুতি কখনো ভোলেননি। একজন সরকারি কর্মকর্তা ও একজন অর্থনীতির ছাত্রের যতগুলো গুণাবলি থাকতে পারে, সেগুলোর সবই তার মধ্যে ছিল। ভালোভাবে কাজ করা, প্রচুর পড়াশোনা করা, বিদেশীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অ্যাকসেপট্যান্স ডেভেলপ করা ইত্যাদি তিনি বুঝতেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধ, গরিব মানুষ, বঙ্গবন্ধুর বিষয়টি কখনো ভোলেননি। তবে তিনি একটি কঠিন সময়ে অর্থমন্ত্রী হয়েছিলেন। টেকনোক্র্যাটমন্ত্রী হওয়ার জন্য তাকে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের মাধ্যমে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া শুরু করলেও, পরে নিজের কঠোর অবস্থান ধরে রাখতে পারেননি। এটি তার একটি ব্যর্থতা বলা যেতে পারে। এজন্য অবশ্য রাজনৈতিক চাপও দায়ী। তার প্রতিবাদের ভাষা ছিল অ্যাভয়েড করে যাওয়া। এগিয়ে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশকে জোরে ধাক্কা দিতে হতো, তা তিনি দিতে পারেননি। তিনি মনে করতেন, জোরে ধাক্কা দেয়া উচিত না। তিনি গ্রাম্য ও নাগরিক রাজনীতি বুঝতেন না। তিনি গ্রাউন্ড রিয়ালিটি অনেক সময় জানতেন না। এজন্য আমরা দেখেছি ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত সময়ে নেয়া তার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী বাতিল করে দিয়েছিলেন। কারণ প্রধানমন্ত্রী বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে অনেক বেশি অবগত ছিলেন। জীবনের একটি বড় অংশ দেশের বাইরে থাকার কারণে তার পক্ষে গ্রাউন্ড রিয়ালিটিকে বোঝা, গ্রাউন্ড রিয়ালিটিকে চ্যালেঞ্জ করে নিজেরটা চাপিয়ে দেয়া কঠিন ছিল। তিনি পরিবর্তনশীল অর্থনীতির কাণ্ডারি ছিলেন বটে, কিন্তু এজন্য প্রয়োজনীয় এনার্জি ও ব্যাকগ্রাউন্ড তার ছিল না। কিবরিয়া ছিলেন সজ্জন ও মৃদুভাষী ব্যক্তি। তিনি ছিলেন শিল্পবোদ্ধা ও সংস্কৃতিমনা। তিনি কোনো বাজে চিন্তা করতে পারতেন না। কিন্তু তিনি বিতর্ক, চ্যালেঞ্জগুলোকে শক্তিশালীভাবে মোকাবেলা করতে পারেননি। আমরা ওই সময় দেখেছি, অর্থ মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন একই সূত্রে গাঁথা ছিল না।

দুই অর্থমন্ত্রীই বলেছিলেন, সংসদের সদস্য না হলে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে অনেক সমস্যা দেখা দেয়। এজন্য দুজনই মনে করতেন, বাংলাদেশে টেকনোক্র্যাট অর্থমন্ত্রী হওয়া উচিত নয়। বাজেটকে জনগৃহীত করার জন্য সাইফুর রহমান যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, কিবরিয়া সাহেবও তা চালিয়ে গেছেন এবং এখন বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত সেই ধারাকে আরো বেগবান করার চেষ্টা করছেন।

 

লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক