সোমবার | আগস্ট ১০, ২০২০ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

বিশেষ সংখ্যা

কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি

নব্বইয়ের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, অতনু রব্বানী

বাংলাদেশ প্রথম ৩৫টি দেশের অন্যতম, যারা ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি (এসএপি) গ্রহণ করেছিল। যদিও সহায়তা শর্তাবলির সঙ্গে আমাদের দেশের অভিজ্ঞতা নতুন নয়। বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠানগুলোয় যোগ দিয়েছিল ১৯৭২ সালের ১৭ আগস্টে।

২০০০ সালের ৩০ জুন নাগাদ শূন্য দশমিক ৩১ শতাংশ বেড়ে আলোচ্য ব্যাংকে বাংলাদেশের ৪ হাজার ৮৫৪টি শেয়ার ছিল, যেখানে ৫ হাজার ১০৪ সংখ্যার আমাদের ভোটিং পাওয়ার মোট ভোটের শূন্য দশমিক ৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল। ২০০০ সালে ব্যাংকটির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকে ২০০০ সালের জুন নাগাদ ওই ব্যাংক থেকে উন্নয়ন ঋণ হিসেবে বাংলাদেশ ৭ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে ১ হাজার ১১২ মিলিয়ন ডলার ছাড়বিহীন (আনডিজবার্সড) রয়ে যায়।

১৯৯৬ অর্থবছরে যদিও আইডিএর ঋণের পরিমাণ ছিল নামিক জিডিপির শতাংশ হিসাবে শূন্য দশমিক ১৬ শতাংশ। তবু বিশ্বব্যাংক নিজেকে প্রধান ঋণদাতা ও ধারণার পাইকারি জোগানদাতা (পার্ভেয়র) হিসেবে চিত্রিত করে। আলোচ্য ব্যাংক অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতেই অর্থছাড় করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় শিল্প ও শিক্ষা খাতে ঋণদান কমলেও (সেকুলার ডিক্লেইন) জনসংখ্যা ও বন্যা ব্যবস্থাপনা বা নিয়ন্ত্রণ খাতে ব্যাংকটি ঋণের নিজের অংশ অব্যাহত রেখেছে।

২০০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আইএমএফের সাধারণ সম্পদ হিসেবে বাংলাদেশের সম্পদ ছিল ৫৩৩ দশমিক ৩০ মিলিয়ন এসডিআর, যেখানে মুদ্রার ফান্ড হোল্ডিং ছিল ৬৩১ দশমিক ২৪ মিলিয়ন এসডিআর, যা বাংলাদেশ কোটার ১১৮ দশমিক ৪ শতাংশ। ইএসএএফ ব্যবস্থা ও ক্রেডিট ট্রাঞ্চেসের অধীনে বাংলাদেশের অপরিশোধিত ক্রয় ও ঋণ ছিল যথাক্রমে ৬৭ দশমিক ৪৪ ও ৯৮ দশমিক ১৩ মিলিয়ন এসডিআর। ১৯৮৫-৯০ মেয়াদে সর্বসাম্প্রতিক আর্থিক ব্যবস্থার (ইএসএএফ, এসএএফ ও স্ট্যান্ডবাই) অধীনে বাংলাদেশ ৭২৬ দশমিক ২৫ মিলিয়ন এসডিআর নিয়েছিল। সম্পদের বিদ্যমান ব্যবহার ও এসডিআরের বর্তমান হোল্ডিংয়ের ভিত্তিতে আইএমএফের কাছে প্রজেক্টেড অবলিগেশন ২০০১, ২০০২, ২০০৩, ২০০৪ ও ২০০৫ সালে যথাক্রমে ছিল ৫৪ দশমিক ৮, ৭২ দশমিক ৫, ৫৫ দশমিক ৫, ২ ও ২ মিলিয়ন এসডিআর।

কাঠামোগত সমন্বয় প্রবর্তন

বাংলাদেশের জন্য সহায়তা শর্তাবলির অংশ হিসেবে নীতি সংস্কারের অভিজ্ঞতা নতুন নয়। ১৯৭২-৮৬ সময়ে বাংলাদেশ সরকার মোট ১ হাজার ১৬৫ মিলিয়ন ডলারের ১৩টি ইমপোর্ট প্রোগ্রাম ক্রেডিটসের (আইপিসি) চুক্তি করেছিল। বিশ্বব্যাংকের (১৯৮৬) মতে, প্রথম তিনটি আইপিসি স্বাধীনতা-পরবর্তী কঠিন পুনর্বাসন প্রয়োজনে ব্যাপক সমর্থন জুগিয়েছিল। অন্য সব ঋণে খাতওয়ারি, ব্যষ্টিক অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের শর্ত ছিল।

বিশ্বব্যাংকের রিভিউ অব দি এক্সপেরিয়েন্স উইথ পলিসি রিফর্মস ইন দ্য নাইনটিনথ এইটিজ অনুযায়ী আইপিসিতে চিহ্নিত নীতি ইস্যু ‘বার্ষিক আইপিসি কাঠামোর চেয়ে অধিক সম্প্রসারিত সংলাপ ও গভীরতর খাতভিত্তিক কাজে’ রূপান্তরিত হলো। এভাবে বিশ্বব্যাংক তাদের বার্ষিক কর্মসূচি ঋণের কোর্স খাত সমন্বয় ঋণে রূপান্তর ও ১৩তম আইপিসির পর আইপিসিগুলোর অবসায়ন করল।

আইএমএফের ঋণদান ব্যবস্থা

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (এসএএফ) কাঠামো সমন্বয় সুবিধার তিন বছরভিত্তিক ব্যবস্থার অধীনে বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৬-৮৭ সালে একটি মধ্যমেয়াদি সমন্বয় কর্মসূচি গ্রহণ করে এবং বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন খাত সমন্বয় ও বিনিয়োগ ঋণ অব্যাহত রাখে। কাঠামোগত সমন্বয়ে পৃষ্ঠপোষকতা জোগাতে নিম্ন আয়ের দেশগুলোয় ব্যাপক ছাড়মূলক অথচ ভয়াবহ শর্তভিত্তিক ঋণ প্রদানের লক্ষ্যে ১৯৮৬ সালে আইএমএফ কর্তৃক গঠিত এসএএফের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ প্রথম ৩৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। জাতীয় সংস্থা বা এজেন্সিগুলোর খুবই সামান্য ইনপুট নিয়ে তিন বছর মেয়াদে (অর্থবছর ১৯৮৭-৮৯) বাংলাদেশ সরকারের নীতির জন্য আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের তৈরি করা পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক পেপার্স (পিএফপি) দেয়া হয়। আইএমএফের সম্প্রসারিত কাঠামোগত সমন্বয় সুবিধার অধীনে আরো তিন বছরের জন্য ১৯৮৯ সালের আগস্ট, ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারি ও ১৯৯০ সালের মে মাসে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় এবং অবশেষে সেটি কার্যকর হয় ১৯৯০ সালের ১ জুলাই। ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে শুরু করা ইএসএএফ গ্রহণকারী আবারো প্রথম ২৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল অন্যতম।

স্বল্পমেয়াদি সামষ্টিক স্থিতিশীলতা নীতিগুলোর পরিবর্তে পিএফপিতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পরামর্শকৃত নীতিগুলো কাঠামোগত নীতিগুলোকে বিস্তৃত করেছে। পিএফপি অনুযায়ী নীতিগুলোর উদ্দেশ্য ছিল সম্পদ ব্যবহারের কার্যকারিতা উন্নয়ন, ব্যক্তিখাতের ভূমিকা সম্পসারণ এবং অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় ও বিনিয়োগের উচ্চহার বাস্তবায়ন। প্রস্তাবিত সংস্কারের মধ্যে ছিল মূল্য প্রণোদনায় পরিবর্তন, বিনিয়োগ বিধির সহজীকরণ, করনীতি ও প্রশাসনের শক্তিশালীকরণ, সরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, বাজারমুখী আর্থিক নীতি হাতিয়ারের ওপর বৃহত্তর নির্ভরতা, খেলাপি ঋণের পুনরুদ্ধার কর্মসূচি গভীরকরণ ও সম্প্রসারণ, নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা এবং বাণিজ্য ও বিনিময় উদারীকরণ।

বিশ্বব্যাংকের সমন্বয় ঋণদান

বিশ্বব্যাংকের সফট-টার্ম লেন্ডিং উইন্ডো ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) বিভিন্ন খাত সমন্বয় ও বিনিয়োগ ঋণ দ্বারা সমন্বয় কর্মসূচি পৃষ্ঠপোষকতা পায়। এসব ঋণ দেয়া হয় ‘কাঠামোগত ও খাতভিত্তিক সমন্বয় ঋণ’ (এসএএল ও এসইসিএএল) নামে। বিশ্বব্যাংকের এসব ঋণ চুক্তিতে কঠোর শর্তাবলি আরোপ করা হয়, যার অধীনে সেগুলো যথাযথ পরিপালনসাপেক্ষে অর্থছাড় করা হয়। ১৯৮০ থেকে ১৯৯৬ অর্থবছর সময়ে বাংলাদেশে আইডিএর মোট ঋণ অঙ্গীকারের এক-তৃতীয়াংশ ছিল সমন্বয় ঋণ। ওই সময় ৯৩টি প্রকল্পে বাংলাদেশে আইডিএর ঋণ প্রতিশ্রুতি ৫ দশমিক ৯৬৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। আর একই সময়ে ঋণ ছাড় করা হয়েছিল মোট ৪ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার।

সমন্বয় ঋণদানের মাত্রা নব্বইয়ের দশকে প্রায় ১৫ শতাংশ কমে আসে। বিশ্বব্যাংক সরাসরি বলল, ভবিষ্যতে সমন্বয় ঋণদান কমানো হবে। ব্যাংকটির বিবৃতি ছিল এমন, ‘সুনির্দিষ্ট খাতে (যেমন আর্থিক খাত) প্রধান সংস্কার উদ্যোগের অনুপস্থিতিতে নিঃসন্দেহে (সমন্বয় ঋণদান) আরো কমানো হবে।

ছয়টি এসএএল ও এসইসিএএলের মধ্যে তিনটি (যেমন দ্বিতীয় শিল্প সমন্বয় ঋণ, পাট খাত সমন্বয় ঋণ, সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থাপনা সমন্বয় ঋণ) ওইসব ঋণের সঙ্গে যুক্ত নীতিশর্ত পরিপালনে ব্যর্থতার কারণে বাতিল করা হয়।

) প্রধান সামষ্টিক অর্থনৈতিক সমন্বয় নীতিগুলো

সরকারি সম্পদ সঞ্চালন

পিএফপিতে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ সরকারি রাজস্ব জিডিপির ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছিল। ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠানগুলো কর প্রশাসনের উন্নয়ন করে বাণিজ্যসংক্রান্ত কর থেকে অভ্যন্তরীণ আউটপুট বা চাহিদাভিত্তিক করের দিকে তাদের নীতি রূপান্তর ঘটিয়েছিল। একটি ব্যাপকভিত্তিক, স্থিতিস্থাপক ও প্রগতিশীল কর কাঠামোর দিকে এগোনোর পরামর্শও দেয়া হয়েছিল। বিশ্বব্যাংক মূল্য সংযোজন কর প্রবর্তন, ভ্যাটের ভিত্তি সম্প্রসারণ ও কর অব্যাহতি কমানোর কথা বলেছিল।

সরকারি ব্যয়নীতি

সরকারি ব্যয়নীতিগুলোর লক্ষ্য ছিল বাজেট ঘাটতি কমানো এবং সরকারি ব্যয়ের যৌক্তিকীকরণ নিশ্চিত করা। সরকারি ব্যয়নীতি সম্পর্কে পরামর্শ দেয়া অন্য পদক্ষেপগুলো হলো, সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা বা কার্যকারিতা বৃদ্ধি, চলতি ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও যৌক্তিকতা নিশ্চিত, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, বাজেট বাস্তবায়ন ও পর্যালোচনা উন্নয়ন এবং বহু বছরভিত্তিক বাজেটিং ব্যবস্থা উন্নয়ন ও প্রকল্প বাস্তবায়নে মানোন্নয়ন।

বহিঃখাত নীতি

বহিঃখাত ব্যবস্থাপনার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল লেনদেনে ভারসাম্য অবস্থান শক্তিশালী করা। যেমনটা পরামর্শ দেয়া হয়েছিল, রফতানি বৈচিত্র্যকরণ উন্নয়নে বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা নমনীয় রাখতে হবে। এক্ষেত্রে অন্য এজেন্ডা ছিল দ্বৈত বিনিময় হার বাজারের একীভূতকরণ, ঋণসেবা বাধ্যবাধকতা টেকসই পর্যায়ে সীমিত করা, সহায়তা পাইপলাইনের ব্যবহার হার বৃদ্ধি ও বহু মুদ্রাগত চর্চা বিলোপ করা।

) সামষ্টিক অর্থনৈতিক কর্মকৃতি বা নৈপুণ্য

অর্থনীতির সম্পদে ভারসাম্যহীনতা

আশঙ্কাজনক মাত্রায় দেশের সম্পদ ভারসাম্য অবনতি হওয়ায় বাংলাদেশকে আইএমএফের সফট লোন নেয়ার দিকে যেতে হয়েছিল। পরবর্তী বছরগুলোয় সম্পদ ভারসাম্যে উন্নয়ন হয়েছিল। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সম্পদ ভারসাম্যে নিম্মমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। ১৯৮০-এর দশকের দিনগুলোয় ঘাটতি মেটানো হয়েছিল স্বল্পমেয়াদি ঋণ ছাড়ের মাধ্যমে। সেটি অবশ্য অব্যাহত রাখা যায়নি সাম্প্রতিক সময়ে সহায়তাপ্রাপ্যতার সীমাবদ্ধতার কারণে। কেউ হয়তো বলতে পারেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ফেরানো সম্ভব হয়েছিল বিনিয়োগ, বিশেষ করে সরকারি ব্যয় কমানো দ্বারা। এভাবে অর্থনীতির উৎপাদন সম্ভাবনা দমিত করা হয়েছিল।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি

গত দুই দশকে বাংলাদেশ বাংলাদেশ ৪ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হার অর্জন করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় প্রবৃদ্ধি হার বেড়ে আসছে। এসএপি-পূর্ব সময়ের তুলনায় এসএপি-পরবর্তী সময়ে প্রবৃদ্ধি হার ১ পয়েন্ট বেড়েছে। প্রবৃদ্ধি হার বেশ অস্থিতিশীল। কিছু সময় বেড়েছে, কিছু সময় কমেছে ও ভেদমান বেশ উচ্চমাত্রার। উচ্চপ্রবৃদ্ধি হারের দিক থেকে অর্থনীতির সাম্প্রতিক কর্মকৃতিতে বিপুল ফলন দ্বারা প্রধানত কৃষি খাত বড় অবদান রেখেছে, যা অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তরের ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরে। অধিকন্তু প্রতিবেশী দেশগুলোর ৮-৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হারের তুলনায় আমাদের বার্ষিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হার মোটেই চমকপ্রদ নয়।

সঞ্চয়

যেকোনো এলডিসিভুক্ত দেশের প্রাসঙ্গিকতায় সঞ্চয় সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বিবেচিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। মধ্য আশির দশকে সম্পদ ভারসাম্যহীনতা প্রকট হওয়ার এটি অন্যতম প্রধান কারণ। আশির দশকে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় কোনো চমকপ্রদ ধাপ অর্জন করতে পারেনি এবং সেটি ছিল জিডিপির কেবল ২ দশমিক ৩ শতাংশ। দুই দশকের অধিক সময়ে মোট অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় (জিডিএস) ছিল কেবল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ, যার কারণে সম্পদ ব্যবধান পূরণে বৈদেশিক অথার্য়ন প্রয়োজন হয়। প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের কারণে জিডিএসের তুলনায় জাতীয় সঞ্চয় তুলনামূলক ভালো।

সঞ্চয় হারে সাম্প্রতিক স্থবিরতা উদ্বেগের বিষয়, যেমন যেটি আগের সময়ের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অর্জনে বিপরীত অবস্থার প্রতিফলন ঘটায়। সরকারি সম্পদ সঞ্চালনে দুর্বল প্রচেষ্টা দ্বারা এটি ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রবণতার বিপরতী অবস্থার কারণে এটি আরো বাড়তে পারে। অভ্যন্তরীণ কর প্রচেষ্টা শক্তিশালীকরণের অনুপস্থিতিতে আমদানি উদারীকরণও অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় থেকে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। সঞ্চয়য়ের প্রধান ব্যাখ্যামূলক চলক ও সঞ্চয় বাড়াতে প্রধান নীতি হাতিয়ার হওয়ায় সমন্বয়ের স্ট্যান্ডার্ড তত্ত্ব ঐতিহ্যগতভাবে নির্ভর করেছে সুদের প্রকৃত হারের ওপর (আরআরআই)। অবশ্য ইকোনমেট্রিক এক্সারসাইজে দেখা যায়, দেশের সঞ্চয় হারে আরআরই তার প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে সমর্থ হয়নি। প্রধান ব্যাখ্যামূলক চলক হলো দেশের আয় মাত্রা, বাংলাদেশের মতো নিম্ন আয়ের দেশের জন্য যা বেশ যৌক্তিক। তবে যথাযথ সংগ্রহ কিংবা অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের সঠিক চ্যানেলিং ছাড়া দেশের উৎপাদিকতা ভিত্তি সম্প্রসারণ সম্ভব নয়। এটি পর্যায়ক্রমে দেশের আয় প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দুর্বল করে। সঞ্চয় উন্নয়নে ঘাটতি দেশের ধারাবাহিক কাঠামোগত দুর্বলতা নির্দেশ করে।

সঞ্চয় বিনিয়োগ ব্যবধান

পুরো সময়জুড়ে সঞ্চয় ও বিনিয়োগে ধারাবাহিক ব্যবধান অব্যাহত ছিল। কিছুটা চক্রাকার ধরনে এ ব্যবধানে উত্থান-পতন দৃশ্যমান। এটা আবারো দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা নির্দেশ করে। ইকোনমেট্রিক এক্সারসাইজে আরো দেখা গেছে, সরকারি বিনিয়োগ দেশের বিনিয়োগের প্রধান নির্ধারক। ব্যক্তিখাতেক ঋণ যদিও তাত্পর্যপূর্ণ ১০ শতাংশ মাত্রায় ছিল, এটি প্রত্যাশিত সংকেত দিতে পারেনি। এটি বিনিয়োগ ফাংশনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব উন্মোচন করে। এটি ইঙ্গিত দেয়, বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ মোতাবেক রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভূমিকা সংকোচনের বিপরীতে সরকারি বিনিয়োগ বাংলাদেশের উৎপাদিকতা সক্ষমতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

রাজস্ব ঘাটতি

সরকারি ভোগ সৃষ্ট রাজস্ব ঘাটতি সনাতনী নীতি নকশায় (অর্থোডক্স পলিসি ডিজাইন) ভয়াবহ সমালোচনার মুখে পড়েছিল। ১৯৮০-এর দশকজুড়ে রাজস্ব ঘাটতি বিস্তৃত হয়। এ ঘাটতি কমে আসে ১৯৯০-এর দশকের প্রথম দিকে। তবে পরিস্থিতি আবারো খারাপ হয় এবং ১৯৯৮-এর বন্যার কারণে এ ব্যবধান আরো বেড়ে যায়।

নিকট অতীতে সার্বিক বাজেট ঘাটতিতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে, যদিও ১৯৯৯ অর্থবছরে আবারো এক্ষেত্রে নৈপুণ্যে বিপরীত প্রবণতা দেখা দেয়। রাজস্ব ক্ষেত্রগুলোয় দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বে কিছু ক্ষেত্রে এটি দুর্বলতা ইঙ্গিত করে। নিকট অতীতে সহায়তার অর্থছাড় কমেছে।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) স্থানীয় মুদ্রার অর্থায়ন ১৯৮০-এর দশকের প্রথম দিকের চেয়ে জিডিপিতে অধিক বড় অংশ ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়, যা আগে সহায়তানির্ভর ছিল।

আর্থিক খাত থেকে সরকারের মোট ঋণে একটি সেকুলার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। এটি প্রমাণ হতে পারে, ব্যক্তিখাত থেকে সরকার অব্যাহতভাবে বেশি সম্পদ আহরণ করছে।

বহিস্থ ভারসাম্য

এটি স্পষ্ট যে, এসএপি-পূর্ব সময়ে বাংলাদেশ বিশ্বের সঙ্গে কেবল সীমিত একীভূতকরণে সীমাবদ্ধ ছিল। রফতানি ছিল জিডিপির শুধু ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। এসএপি-পরবর্তী সময়ে জিডিপির ১২ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায় বাণিজ্য। আর জিডিপিতে সার্বিক রফতানির অবদান ছিল কেবল ৯ দশমিক ৭ শতাংশ, যা নিকট অতীতে রফতানিমুখী দেশগুলোয় বিরাজমান সাফল্যের দিক থেকে বেশ অসন্তোষজনক ছিল।

অন্যদিকে উল্লিখিত পুরো সময়জুড়ে আমদানি অনেক বেশি ছিল (পুরো দুই দশকে এর অংশ জিডিপির ১৯ শতাংশ)। সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি আবার বেড়েছে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে।

বাণিজ্যের শর্ত

সমন্বয় প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ একপাক্ষিকভাবে তার আমদানি ব্যবস্থা উদার করেছে। প্রায়ই বলা হয়, দেশের বিদ্যমান শিল্পায়ন অবস্থার চেয়ে উদারীকরণ দ্রুতগতিতে এগিয়েছে।

যেকোনো বাণিজ্য কৌশলের লক্ষ্য বাণিজ্য শর্ত অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের অনুকূলে রাখা। ১৯৯০-এর দশকে এসএপি-পূর্ব সময়ের তুলনায় বাণিজ্যে শর্তের অবনতি ঘটেছে। ১৯৯৯ অর্থবছর বাণিজ্য শর্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

বাণিজ্য শর্ত বাংলাদেশের রফতানি ও আমদানির ওপর আদৌ কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে কিনা, সেটি পরীক্ষা করা হয়। একটি ইকোনমেট্রিক এক্সারসাইজে দেখা গেছে, রফতানি মূল্য স্থিতিস্থাপকতা ধনাত্মক ও পরিসংখ্যানগভাবে তাত্পর্যপূর্ণ। তার মানে হলো, বাণিজ্য শর্তের যেকোনো অবনতি দেশের উন্নয়ন প্রচেষ্টা ব্যাহত করতে পারে।

চলতি হিসাব ঘাটতি

১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝিতে চলতি হিসাব ঘাটতি জিডিপির ৯-১০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। চলতি হিসাব ভারসাম্যে কোনো সেকুলার প্যাটার্ন ছিল না। যদিও গড়ে চলতি হিসাব ঘাটতির অবনতি ঘটে চলছিল।

বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতি

ধারাবাহিক চলতি হিসাব ঘাটতি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতিতে চাপ সৃষ্টি করে। ১৯৯০-এর দশকের প্রথমার্ধে বৈদেশিক মুদ্রার নজিরবিহীন সঞ্চিতি তৈরি হয়েছিল। উন্নয়নকে স্থিতিশীল নীতিগুলোর ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। কিন্তু এটি এ বিষয়টিও নির্দেশ করে যে, ভয়াবহ চাহিদা ব্যবস্থাপনা নীতিগুলোর দিক থেকে অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। অবশ্য এ অবস্থা পরিবর্তন হয় ১৯৯৪-৯৫-এর পরে। ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে বৃদ্ধি পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চিতি মনে হয় অবনতিশীল টেরিটরিতে যাত্রা করেছে।

) সরকারি সম্পদ সঞ্চালন

রাজস্ব প্রবৃদ্ধি

দুই দশকজুড়েই বাংলাদেশে ধারাবাহিক রাজস্ব ঘাটতি অব্যাহত ছিল। গত দশকে এ ঘাটতি বন্ধ হলেও আলোচ্য ঘাটতি দুটি সমস্যা ইঙ্গিত করে। এক. বিনিয়োগ ঋণের প্রাপ্যতার ওপর চাপ সৃষ্টিপূর্বক এ ঘাটতি অর্থায়ন করা হয় ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেয়ার মাধ্যমে। উচ্চঋণ ও উচ্চসুদ পরিশোধের ভিত্তিতে এ ঘাটতি বহিঃস্থ আর্থিক সহযোগিতা দ্বারাও অর্থায়ন করা হয়। দুই. এ ঘাটতি সামাজিক ও অবকাঠামোর মতো অগ্রাধিকার খাতে বিনিয়োগের সরকারি সামর্থ্যকে দুর্বল করেছে।

গত দুই দশকে নামিক জিডিপির শতাংশ হিসাবে মোট রাজস্ব আহরণ দুই অংকে পৌঁছেনি। মোট কর আহরণে বাংলাদেশের জন্য প্রত্যক্ষ বা আয়কর রয়েছে খুবই অতাত্পর্যজনক পর্যায়ে। এটি ১৫-১৬ শতাংশে স্থবির থেকেছে এবং প্রত্যক্ষ কর আহরণ ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে কমেছে। সম্পূরক কর, আমদানি কর ও মূল্য সংযোজন করের মতো পরোক্ষ কর আলোচ্য ঘাটতি পূরণ করেছে, যখন প্রত্যক্ষ (এবং প্রগতিশীল কর) নিজের দৃঢ় অবস্থান প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হয়নি। ১৯৯২ সালে এসব কর উপাদান প্রবর্তনের পর মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক করই হয়ে উঠল মোট কর আহরণের প্রধান অংশ। ১৯৯৫-পরবর্তী এসব করের অংশ ছিল মোট কর আহরণের ৫০ শতাংশ। বলা হয়, প্রকৃতির দিক থেকে এসব কর নিবর্তনমূলক। কারণ এগুলো ভোগ্যপণ্যের ওপর আরোপ করা হয়।

সরকারি ব্যয়

সরকারি ব্যয় সংস্কার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র, যেখানে এসএপি সক্রিয়ভাবে অনুসরণ করা হয়। চাহিদা ব্যবস্থাপনা নীতির বিপক্ষে অন্যতম প্রধান সমালোচনা হলো, কৃচ্ছ্রতা নীতিগুলো গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন খাতে সরকারের ব্যয় কাটছাঁট করেছে।

বেশ কয়েক বছর সরকারের রাজস্ব বাজেট বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে। রাজস্ব বাজেটে প্রধানত রয়েছে সরকার পরিচালনার চলতি খরচের ব্যয়। এর মধ্যে বড় অংশ সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও সম্পর্কিত লাইন আইটেম। অন্যদিকে এসএপি-পূর্ব সময়ের তুলনায় উন্নয়ন বাজেট কমানো হয়েছে।

আর্থিক খাত

চাহিদা দিক ব্যবস্থাপনা আর্থিক সমষ্টির প্রবৃদ্ধিতে সংকোচন ঘটায়। আর্থিক সংকোচন নীতি নেয়া হয় সম্পদ ভারসাম্যহীনতা বা অর্থনীতিতে ঘাটতি দূর ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে। অভ্যন্তীণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বহিঃখাতে ভারসাম্য বজায় রাখতে আইএমএফের ফিন্যান্সিয়াল প্রোগ্রামিং মডেলের ভিত্তিতে আর্থিক ও ঋণ সম্প্রসারণের টার্গেট নির্ধারণ করা হয়। ক্রাউডিং আউটের লক্ষণ যাচাইয়ে সরকারি খাতে ঋণও সীমিত করা হয়। রেকর্ডে দেখা যায়, সুর্নিদিষ্ট ক্ষেত্রে আর্থিক ও বহিস্থ ঘাটতি একটি সামর্থ্যযোগ্য পর্যায়ে রাখতে সামষ্টিক চাহিদা ব্যবস্থাপনা সফল হয়েছে।

আইএমএফ কর্তৃক ব্যবহূত অর্থকেন্দ্রিক মডেল একটি স্থির অর্থের গতি অনুমান করে, কিন্তু অর্থের গতি সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। এটি আর্থিক খাত সামলোচনায় অধিক কাঠামোবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটায়। বাংলাদেশের প্রাসঙ্গিকতার ওপর অভিজ্ঞতালব্ধ গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে অর্থকেন্দ্রিক অ্যাপ্রোচ একাই মূল্যস্ফীতি আচরণ ব্যাখ্যা করতে পারে না। এক্ষেত্রে ব্যয় প্রভাবিত চাপ, ওয়েজ-ইনডেক্সেশনের মতো কাঠামোবাদী বিষয়গুলোও প্রাসঙ্গিক।

মূল্যস্ফীতি ১৯৮০-এর দশকের দুই অঙ্কের ইতিহাস থেকে বেরিয়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসে। ১৯৯৯ সালের আপেক্ষিক উচ্চমূল্যস্ফীতির বছরকে আগের বন্যা আক্রান্ত বছরের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। মূল্যস্ফীতিমূলক চাপ মোকাবেলায় চাহিদা ব্যবস্থাপনা নীতি সফল হয়েছে।

অন্যদিকে নিম্নমূল্যস্ফীতি হারে অবশ্য বোঝা যায়, অর্থনীতি একটি স্বল্পমেয়াদি মন্দার মুখোমুখি। ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নিতে যেহেতু সরকার নিরুৎসাহিত হয়, সেহেতু বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্য বিনিয়োগ তহবিল অসঙ্গতভাবে গড়ে উঠতে পারে।

মূল্যস্ফীতির জন্য মোট দেশজ উৎপাদন, আমদানি মূল্য সূচক ও ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহকে গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক মনে করা হলেও একটি ইকোনমেট্রিক হিসেবে দেখা যায়। এ তিনটি চলক পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য নয়, একই ফল আগের লেখায়ও পাওয়া যায়। এভাবে মূল্যস্ফীতি টার্গেটিংয়ের সনাতনী নীতির বিপরীতে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির আর্থিক প্রকল্প যথাযথ হতে পারে না। তবে এটি বলা যেতে পারে, উচ্চপ্রবৃদ্ধি হার বাংলাদেশে নিম্নমূল্যস্ফীতি বজায় রাখতে সহায়ক হবে। অর্থ সরবরাহের প্রতিকূল প্রভাব (যদি কোনো প্রভাব থাকে) উচ্চতর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্বারা ধারণ হতে পারে।

আউটপুটের ডিকম্পোজিশন

গতানুগতিক জ্ঞান বা প্রজ্ঞা বলে, কাঠামোগত রূপান্তর দ্বারা কোনো অর্থনীতির ডাইনামিকস নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যেখানে সেবা খাতে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে অবদানের অংশের দিক থেকে শিল্প খাত প্রাধান্যশীল হয়।

এটি খুব স্পষ্ট, কৃষির অংশ কমেছে। কৃষির অবদান জিডিপির প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। এসএপি-পূর্ব ও এসএপি-পরবর্তী সময়ের মধ্যে শিল্প খাতের অবদানের একটি তুলনামূলক সমীক্ষায় দেখা যায়, জিডিপিতে আলোচ্য খাতের অবদান কেবল শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। দুই দশকে জিডিপিতে শিল্পের অবদান দাঁড়িয়েছে কেবল ১০ দশমিক ৪ শতাংশ।

বৃহদায়তন শিল্পের অবদান বেড়েছে, যেখানে ক্ষুদ্র শিল্পের অবদান ধীরে ধীরে কমেছে। নির্মাণ ও জ্বালানি খাতের অবদান জিডিপিতে বেড়েছে। গত ২০ বছরে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশের খুবই সামান্য বেড়ে পরিবহন খাত ইতিবাচক অবদান রেখেছে।

অর্থনীতির কর্মকৃতি

বিভিন্ন খাতের প্রবৃদ্ধি ধরন বিবেচনায় পরবর্তী সময়ে আরো গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। মজার বিষয় হলো, অর্থনীতিতে বড় নৈপুণ্যকারী খাত হলো জ্বালানি (১৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ) ও মাইনিং (৩০ দশমিক ৬৬ শতাংশ)। অন্য ভালো নৈপুণ্যকারী হয়েছে জনপ্রশাসন ও প্রতিরক্ষা, যেগুলোকে অর্থনীতির অনুৎপাদনশীল খাত বলা হয়। শিল্প ৪ দশমিক ৯ শতাংশের প্রবৃদ্ধি হার অর্জন করেছে।

পর্যবেক্ষণ

বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে নিজেদের প্রধান ঋণদাতা ও রাজনীতি-অর্থনীতিতে কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বিভিন্ন নীতির পাইকারি জোগানদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

ভয়াবহ সম্পদ ভারসাম্যহীনতার পথ ধরে বাংলাদেশের সামরিক সরকার অর্থনীতিব্যাপী নয়া উদারবাদী নীতি গ্রহণে ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। ন্যূনতম ন্যাশনাল ইনপুট, সরকারি জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কোনোরূপ আলোচনাবিহীন ও সংস্কারের নকশা প্রণয়নে জনগণের অংশগ্রহণবিহীন এ প্রক্রিয়া অনেকটা ‘এতিম পদমর্যাদায়’ পর্যবসিত হয়েছে।

সরকারের অর্থনৈতিক ভূমিকা সংকোচনপূর্বক ব্যক্তিখাতকে কেন্দ্র করে বিনিয়ন্ত্রণ ও উদারীকরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে মূলত এসএপি প্যাকেজ গ্রহণ করা হয়।

এসএপি-পূর্ব সময়ে কেবল ১ শতাংশ উচ্চতর আউটপুটের সম্প্রসারণ ঘটেছে। অর্থনীতির সাম্প্রতিক নৈপুণ্যের সম্ভব হয়েছে কৃষি খাতে বিপুল ফলনের কৃতিত্বের কারণে। তার মানে হলো, কাঠামোগত রূপান্তরে যাত্রার ক্ষেত্রে এখনো দুর্বলতা রয়ে গেছে।

সঞ্চয় হারে সাম্প্রতিক স্থবিরতা চিন্তার কারণ এবং সরকারি সম্পদ সঞ্চালন হয়েছে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। গত দুই দশকে নামিক জিডিপির শতাংশ হিসেবে মোট কর আহরণ দুই অংকে পৌঁছেনি। বাংলাদেশের মোট কর আহরণে প্রত্যক্ষ বা আয়কর রয়ে গেছে খুব অতাত্পর্যজনক অংশে। এটি স্থবির থেকেছে এবং নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে প্রত্যক্ষ কর আহরণ কমেছে। অভ্যন্তরীণ কর প্রচেষ্টা শক্তিশালীকরণের অনুপস্থিতিতে আমদানি উদারীকরণ অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়েও প্রতিকূল প্রভাব ফেলে থাকতে পারে।

সঞ্চয়-বিনিয়োগ ব্যবধান বিদ্যমান। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরকারি বিনিয়োগ কাটছাঁটের সনাতনী অ্যাপ্রোচ অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনতে সমর্থ হয়নি; যেহেতু ইকোনমেট্রিক এক্সারসাইজে দেখা যায়, বাংলাদেশে সরকারি বিনিয়োগই বিনিয়োগের প্রধান নির্ধারক।

যেকোনো বাণিজ্য কৌশলের লক্ষ্য বাণিজ্য শর্ত অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের অনুকূলে রাখা। ১৯৯০-এর দশকে এসএপি-পূর্ব সময়ের তুলনায় বাণিজ্যে শর্তের অবনতি ঘটেছে। বাণিজ্য শর্তের অবনতি দেশের উন্নয়ন প্রচেষ্টা সাংঘাতিকভাবে ব্যাহত করতে পারে; যেমনটা একটি এক্সারসাইজে দেখা যায়, রফতানি মূল্য স্থিতিস্থাপকতা ধনাত্মক ও পরিসংখ্যানগতভাবে অতাত্পর্যজনক। আরেকটি এক্সারসাইজে দেখা যায়, দেশে অনুসরিত হওয়া গতানুগতিক বিনিময় ব্যবস্থাপনা নীতি রফতানি আচরণের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে সমর্থ হয়নি। বাংলাদেশের বাস্তবতায় মূল্যস্ফীতির আর্থিক প্রকল্প যথাযথ মডেল হতে পারে না।

গত দুই দশকে জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান কেবল ১০ দশমিক ৪ শতাংশ। বৃহৎ ও মাঝারি শিল্প বেড়েছে। ক্ষুদ্র শিল্পের অবদান ধীরে ধীরে নিঃশেষিত হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নীতি পদক্ষেপসহ সংস্কার প্যাকেজ অবশ্যই প্রত্যাশিত। কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় সেটি নেয়া হয়েছে, তা বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। তথাপি এটি বলা যেতে পারে, যেসব ধারণার ভিত্তিতে নীতিগুলো বাস্তবায়ন করা হয়, তা বাস্তবতা থেকে বহুদূরে। কাঠামোগত ও কেইনসীয় মতবাদগুলো উপেক্ষা করে নেয়া নয়া উদারবাদী নীতিগুলো বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারবে না। অধিকন্তু বিশেষ করে খণ্ডিত ও অসম্পূর্ণ বাজার কাঠামোর বাস্তবতায় রাষ্ট্রের ভূমিকা পুনর্নির্ধারণ করা দরকার। অস্বীকারের উপায় নেই, বাজারে নিয়ন্ত্রণ দরকার এবং ব্যাপকতর অপশাসনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা উচ্চপ্রাধিকার হওয়া উচিত।

সর্বোপরি এসব এজেন্ডার মালিকানা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের ইনপুট নিয়ে সম্মুখদর্শী কৌশল প্রয়োজন। অন্যথায় সেগুলো বাস্তবায়ন কঠিন হবে বৈকি।

[২০০১ সালে ‘স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট পার্টিসিপেটরি রিভিউ ইনিসিয়েটিভ’-এর অধীন ‘বাংলাদেশেস এক্সপেরিয়েন্স উইথ স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট লার্নিং ফ্রম আ পার্টিসিপেটরি এক্সারসাইজ’ গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ]

 

লেখকত্রয় অর্থনীতিবিদ গবেষক

ভাষান্তর— হুমায়ুন কবির