সোমবার | আগস্ট ১০, ২০২০ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

বিশেষ সংখ্যা

নব্বইয়ের টাস্কফোর্স প্রতিবেদন

সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে অঙ্গীকৃত হয়নি

মো. আনিসুর রহমান

নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের সম্ভাব্য উন্নয়ন কৌশলের ওপর টাস্কফোর্স প্রতিবেদনগুলোর প্রকাশনা নিশ্চিতভাবেই একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এমন উদ্যোগ গ্রহণের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা আমাদের অভিনন্দনের পাত্র। একই সঙ্গে অভিনন্দন দিতে হয় এসব প্রতিবেদনের রচয়িতা ২৫০ জনেরও বেশি বিশেষজ্ঞকে, যারা এ কাজের জন্য কোনো বৈষয়িক প্রণোদনা প্রত্যাশা না করে উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়নে দেশের নেতাদের সহায়তা করতে এগিয়ে এসেছেন।

অর্থনীতি, উন্নয়ন প্রশাসন, প্রযুক্তি, জ্বালানি, উন্নয়নে নারীর ভূমিকা, পরিবেশ প্রভৃতি দিক ঘিরে ২৯টি টাস্কফোর্স প্রতিবেদন রচিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদন শুধু উপরোক্ত খাতগুলোয় বিরাজমান পরিস্থিতিই তুলে ধরেনি, তাদের কাছে দেয়া উন্নয়ন কৌশলের তিনটি লক্ষ্যের (অর্থাৎ দারিদ্র্য দূরীকরণ, উত্তরোত্তর স্বনির্ভরতা এবং স্থায়িত্বশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন) আলোকে এসব প্রতিবেদন আগামী দিনের রূপরেখাও তুলে ধরতে প্রয়াসী হয়েছে। বলাবাহুল্য, উপরোক্ত তিনটি লক্ষ্যই এ দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এবং পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাগুলোয় বিঘোষিত হয়ে আসছে।

‘দারিদ্র্য দূরীকরণ’ বলতে যে ধারণা সচরাচর ব্যক্ত হয়ে থাকে, তা নিয়ে আলোচনা করার ক্ষেত্রে আমার একটি মৌলিক অসুবিধা রয়েছে। অন্যত্র বিষয়টি নিয়ে আমি আলোচনা করেছি। ‘দারিদ্র্য দূরীকরণ’ ধারণাটি সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকে ঋণাত্মক আত্মভাবমূর্তিতে দেখতে অভ্যস্ত করায়, সমস্যাটির সমাধান ভাবতে গিয়ে এক ধরনের ফবষরাবৎু ড়ত্রবহঃধঃরড়হ চলে আসে; অন্যদিকে যা অবহেলিত থেকে যায় তা হলো— জনগণকে উৎপাদনশীল সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব প্রদান সমেত তার সমূহ সৃষ্টিশীল সম্ভাবনাকে বিকশিত করার প্রসঙ্গ। যাহোক, এ নিয়ে এখানে আমি বিশদ অবতারণায় যাব না। সামগ্রিকভাবে বলব, টাস্কফোর্স প্রতিবেদনগুলোর মধ্য দিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রের ওপর যেসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সমাবেশ, বিশ্লেষণ ও সুপারিশমালা বিধৃত হয়েছে, তা এই প্রথমবারের মতো সহজলভ্যভাবে এক জায়গায় পাওয়ার সুযোগ ঘটল। আজ জাতির সম্মুখে উন্নয়নের যে চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান, টাস্কফোর্স প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট হয়ে বেরিয়ে এসেছে।

স্বাধীনতা-উত্তরকালের অর্থনৈতিক চালচিত্রের (এবং যে উপরিকাঠামো অর্থনীতেক পরিচালনা করছে তার) বিশ্লেষণ থেকে যেসব প্রবণতা উপরোক্ত প্রতিবেদনগুলোয় প্রতিফলিত হয়েছে, তা এক জায়গায় জড়ো করলে হতাশাব্যঞ্জক এক চিত্র বেরিয়ে আসে।

স্বাধীনতার দুই দশকে বার্ষিক গড়ে ৪ শতাংশ হারে জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতিশীলতা আনতে ব্যর্থ হয়েছে। খাদ্যশস্য উৎপাদন ও সমগ্র কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধির হার শ্লথতর হয়েছে। আশির দশকে এ প্রবৃদ্ধি হার ছিল বার্ষিক ২ শতাংশের কাছাকাছি, অর্থাৎ এই সময়কালের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের থেকে এর ছিল সামান্যই ব্যবধান। শিল্প খাতেও পরিলক্ষিত হয় স্থবিরাবস্থা। জাতীয় আয়ে শিল্প খাতের অবদান গত এক দশকে সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছেছিল ১৯৭৯-৮০ সালে, যা ১৯৮৮-৯৯তে নেমে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে। অবকাঠামো খাতেও পরিলক্ষিত হয় অনুরূপ অবস্থা। এ সবকিছুর একত্র ফলাফলস্বরূপ স্বাভাবিকভাবেই দারিদ্র্য ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয় না কোনো মৌল ধরনের উন্নতি, যদিও নির্দিষ্ট লক্ষ্য-গ্রুপ অভিমুখীন দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচি এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোয় খাদ্যশস্যের মূল্যের আপেক্ষিক অবনতির কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কতিপয় অংশের অবস্থার হয়তো উন্নতি হয়ে থাকবে।

অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের হার অত্যন্ত নগণ্য: সরকারি খাতে চলছে ক্রমাগত অবসঞ্চয়ের ধারা আর বেসরকারি খাতে সামান্যই সঞ্চিত হচ্ছে। দেশের উন্নয়ন বাজেটের বৈদেশিক সাহায্য-নির্ভরশীলতা ক্রমেই বেড়েছে এবং আজ তা সর্বাংশেই পরনির্ভরশীল। বৈদেশিক সাহায্য যা আসছে, তার অধিকাংশই গিয়েছে সাহায্য-প্রশাসনের সঙ্গে জড়িত rent-seekers-দের কাছে এবং একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিলীন হয়েছে সাহায্য-সংস্থা সমর্থিত বিস্তৃত বৈদেশিক কনসালট্যান্সির চক্রে। দেশের ভেতরে উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ড যা চলছে (যার মধ্যে নিতান্ত বেঁচে থাকার তাগিদে পরিচালিত সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের কর্মপ্রয়াসও অন্তর্ভুক্ত) তার নির্বিচার প্রসারও একপর্যায়ে উদ্বেগের সৃষ্টি না করে পারে না। ক্রমেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আগামী দিনগুলোয় অস্তিত্ব রক্ষার ও স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় মূল্যবান সম্পদগুলো: শিল্প খাতের দূষণ-প্রক্রিয়ায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে মত্স্যসম্পদ; জমির পুষ্টিসঞ্চারক উপাদানগুলো ক্ষয়ে যাচ্ছে; বিলীন হয়ে যাচ্ছে মানব-অস্তিত্বের অতিপ্রয়োজনীয় bio-diversity, ফলে কৃষি, বন ও মত্স্য উৎপাদনের স্থায়িত্বশীলতার প্রশ্নটি হয়ে পড়েছে অনিশ্চিত। এ তালিকায় যুক্ত হবে দ্রুত অপসৃয়মান বনজ সম্পদ। গাছপালার অধীনে জমি দেশের মোট জমির ২০-২৫ শতাংশে নেমে এলেই তাকে ‘বিপদসীমা’ বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে এ দেশে এ সূচকটি নেমে গেছে আশঙ্কাজনক ৫ দশমিক ১ শতাংশে।

বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, তাতে করে জাতির (একটি নিয়মানুবর্তী সমাজ হিসেবে) আগামী দিনের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নটি অনেকাংশে নির্ভর করছে এই শতকের শেষে জাতীয় আয়ের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হারকে ৬-৮ শতাংশে উন্নীত করার (এবং মোটামুটি একই পর্যায়ে তা অব্যাহত রাখতে পারার) সামর্থ্যের ওপর। বর্তমানে যেভাবে পরিবেশ-বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড চলছে, তাতে আমূল পরিবর্তন আনতে না পারলে এবং মাটির গুণাবলি ও bio-diversity রক্ষার্থে কৃষিপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জিত না হলে উপরোক্ত ধারায় দ্রুততর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রস্তাবনা পরিবেশের অবক্ষয়-প্রক্রিয়াকেই আরো বেগবান করবে। কার্যত সে রকম প্রবৃদ্ধিমুখীন কর্মকাণ্ড হবে আত্মধ্বংসী। এক কথায়, অচিরেই পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে প্রায় বৈপ্লবিক কোনো পরিবর্তন সাধিত না হলে দীর্ঘমেয়াদে জাতির টিকে থাকার প্রশ্নটি হয়ে পড়বে পুরোপুরি অনিশ্চিত।

অন্যদিকে জাতি আজ উন্নয়নের যেসব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, তার জন্য বিদ্যমান ‘উপরিকাঠামো’ কোনো ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে না। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো মূলত ‘কোটিপতিদের’ স্বার্থ রক্ষা করে থাকে, সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্ন সেখানে গৌণ। জাতীয় আত্মমর্যাদার ক্রমাবলুপ্তির দুঃখজনক প্রক্রিয়াটি আজ সর্বত্র প্রত্যক্ষ। সমস্যা নিরসনের ক্ষেত্রে নিজস্ব উদ্যোগ গ্রহণের পরিবর্তে বৈদেশিক সাহায্য সংগ্রহের সাফল্যকে দেখা হচ্ছে যোগ্যতার বলিষ্ঠ পরিচয় হিসেবে; বিদেশী পণ্যের প্রতি তীব্র আসক্তির কারণে স্থানীয় উদ্যোগ ও দেশজ পণ্যের উৎপাদন থেকে যাচ্ছে অবহেলিত।

উপরিকাঠামোর এই ঋণাত্মক ভূমিকার অংশ হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে সাহায্যদাতাদের রাজনীতি। সবকিছু বিচার করে মনে হয়, দেশের তাত্পর্যপূর্ণ উন্নয়ন ঘটানোর চেয়ে সাহায্যদাতাদের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থের সংরক্ষণই বৈদেশিক সাহায্যনীতির প্রধান উদ্দেশ্য। বৈদেশিক সাহায্য তহবিল অপব্যবহারের নানা রকম দৃষ্টান্তে পরিকীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সাহায্যদাতারা একের পর এক সরকারকে সাহায্য জোগানোর মাধ্যমে সমর্থন দিয়ে এসেছেন। তথাকথিত ‘উন্নয়ন প্রকল্প’ বাছাই ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেশের বিশেষজ্ঞদের চেয়ে সাহায্যদাতা দেশ ও সংস্থাগুলোর পরামর্শকরাই মুখ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। একদিকে এ দেশের শিল্পায়নের চাহিদার প্রতি দৃকপাত না করে প্রবর্তিত হয়েছে উদার আমদানীনীতি, অন্যদিকে ‘আবদ্ধ সাহায্য’ (অর্থাৎ যে ক্ষেত্রে সাহায্যপ্রাপ্তিকে সাহায্যদাতা দেশ থেকে পণ্য ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ আমদানির শর্তাধীন করে রাখা হয়) প্রদানের মাধ্যমে বস্তুত সাহায্যদাতা দেশগুলোর পণ্য (ও পরামর্শক) উৎপাদনকারী ‘শিল্প’কে পরোক্ষভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

‘উন্নয়নবিরোধী’ বিগত দুই দশকে সৃষ্ট যে শোচনীয় হতদ্দশা নিয়ে জাতি আজ রাজনৈতিক গণতন্ত্রের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, তার একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরার জন্য টাস্কফোর্স রচয়িতাদের অভিনন্দন। কিন্তু টাস্কফোর্স প্রতিবেদন থেকে এটাও পরিষ্কারভাবে বেরিয়ে আসে যে, উন্নয়ন কৌশলের পূর্বকথিত যে প্রধান তিনটি লক্ষ্য অর্জনে এ প্রতিবেদনগুলো রচিত হয়েছে, তার একটিও উপরিকাঠামোর আমূল পরিবর্তন ছাড়া বাস্তবায়িত করা সম্ভব নয়। কোটিপতিদের পরিবর্তে সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রকৃত প্রতিনিধিদের রাজনৈতিক ক্ষমতায় অধিষ্ঠান না হওয়া পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের প্রস্তাবাবলি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এবং অবশ্যই এর জন্য প্রয়োজন হবে অর্থনীতি ও সমাজজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আত্মমর্যাদার কৃষ্টি ও ভাবধারার প্রতিষ্ঠা করা। এর জন্য বৈদেশিক সাহায্যদাতাদের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্কেও আমূল পরিবর্তন সূচিত হতে হবে। ‘লেজুড়’ সরকারকে সাহায্য জুগিয়ে নিজ নিজ দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণের নীতির পরিবর্তে সাহায্যদাতাদের অবশ্যই দেশের জন্য কাঙ্ক্ষিত যে পরিবর্তন, সেই প্রক্রিয়াকে সহায়তাদানের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এসব পূর্বশর্তের কোনোটিই এখনো সৃষ্টি হয়নি। সম্ভবত রাজনৈতিক গণতন্ত্রের ধাপে উত্তরণের ভাবোচ্ছ্বাসময় মুহূর্তে টাস্কফোর্স এই কঠিন সত্যটি নিঃসংকোচে বলতে পারেনি। বলতে পারেনি যে, কোনো উন্নয়ন সমস্যারই সমাধান হয় না, যতক্ষণ পর্যন্ত তার পূর্বশর্তাবলি পূরিত না হচ্ছে। সেক্ষেত্রে সরকারের (ও বিরোধী দলগুলোর) কাছে উত্থাপিত সুপারিশমালা নিছক আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য।

টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনগুলোয় বিভিন্ন বিষয়ে যেসব সুপারিশ রাখা হয়েছে, তার অধিকাংশই যেকোনো দায়িত্বশীল সরকারের ঘনিষ্ঠ বিবেচনার দাবিদার। তবে এসব সুপারিশ কোনো একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে অঙ্গীকৃত হয়নি। যে স্বল্প সময়ের মধ্যে টাস্কফোর্সকে কাজ করতে হয়েছে, সে রকম একটি সমন্বিত কাঠামোর নির্মাণ দুঃসাধ্য বৈকি। এদিক থেকে দেখলে প্রতিবেদনগুলোয় প্রণীত বিভিন্ন সুপারিশগুচ্ছকে ‘partial equilibrium’ ধারার অভিমত বলেই মনে হয়। সুপারিশ প্রণয়নের ক্ষেত্রে অনেক প্রাসঙ্গিক বিবেচনাই অবহেলিত থেকে গেছে। উদাহরণত, শিল্পনীতি-সংক্রান্ত টাস্কফোর্স প্রতিবেদনে বেসরকারি খাতের অবাধ বিকাশের পক্ষাবলম্বন করতে গিয়ে, প্রস্তাবনায় সামাজিক অথবা পরিবেশগত তাত্পর্যগুলো বিবেচনায় নেয়া হয়নি। স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়েই জাতি ‘২০ পরিবারের’ ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছিল। যেসব কারণে সেদিন তা প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল, তার প্রাসঙ্গিকতা আজ বরং অনেক বেশি। চরম গণদারিদ্র্য এবং প্রকট বেকারত্বের পরিবেশে ‘কোটিপতিদের’ ধন-ঐশ্বর্যের প্রদর্শনী ক্রমবৃদ্ধিমান সামাজিক অস্থিরতার ধারাকে আরো উসকে দিচ্ছে। ফলে বেসরকারি খাতের অবাধ বিকাশমুখী শিল্পায়ন কৌশল যে শেষ পর্যন্ত স্থিতিশীলতা অর্জন করবে, তারও কোনো স্থিরতা নেই। পরিবেশ-সংক্রান্ত টাস্কফোর্স প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, বর্তমানে শিল্প (এবং নৌ-চলাচল) সম্পর্কিত দূষণ প্রতিরোধের নিশ্চয়তাদানকারী কোনো ব্যবস্থা-বিধি নেই। বেসরকারি খাতের বল্গাহীন বিকাশের পথে উদ্ভূত পরিবেশগত মাশুল বহন করার দায় কার ওপর বর্তাবে সে প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করা উচিত। শিল্পনীতি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনটিতে (প্রতিযোগিতামূলক) বাজার-সংকেতের প্রতি একপেশে ঝোঁক চলে আসার কারণে মনে হয় এ সত্য আমরা ভুলে গেছি যে, পরিবেশ-সমস্যা সম্পর্কে বাজার একেবারেই সংবেদনহীন। সঙ্গত কারণেই এ রকম সংবেদনহীন উন্নয়ন আর চলতে দেয়া চলে না। পরিবেশ (এবং প্রযুক্তি) সংক্রান্ত টাস্কফোর্স প্রতিবেদন থেকে দেখা যাচ্ছে, পরিবেশ বিধ্বংসী বেসরকারি উদ্যোগগুলোর ওপর কঠোর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া উপায়ান্তর নেই।

একটি মৌলিক অর্থনৈতিক প্রশ্ন টাস্কফোর্স প্রতিবেদনগুলোয় তোলা হয়নি। জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি হারকে ৪ থেকে ৬-৮ শতাংশে উন্নীত করতে হলে এবং ওই স্তরে বজায় রাখতে হলে যে প্রশ্নটি সামনে এসে দাঁড়ায় তা হলো, কোন অর্থনৈতিক শ্রেণীর (বা শ্রেণীসমূহের) এবং কোন ধরনের সমাজ-সংগঠনের (ব্যক্তিপর্যায়ী অথবা যৌথ প্রয়াসের) রয়েছে প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় ‘উদ্বৃত্ত’ সৃষ্টির এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে উৎপাদনমুখী ধারায় তা বিনিয়োগ করার সামর্থ্য? টাস্কফোর্সের সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলো এ প্রশ্নটি উত্থাপন করেনি এবং আলোচনা মূলত ব্যাপৃত ছিল এককালীন ধারায় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির (sequences of one time rises in production and employment) ওপর, যা আবশ্যিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি পরিসরে উচ্চহারে পুঁজি সঞ্চয় এবং প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে নিশ্চিত করে না। যদি প্রতিবেদনগুলোর বিপুল কলেবরের মধ্যে আমার চোখ এড়িয়ে গিয়ে না থাকে, তা হলে বলব যে, কেবল প্রযুক্তি-বিষয়ক টাস্কফোর্স প্রতিবেদনেই উদ্বৃত্ত সৃষ্টির জরুরি তাগিদ সম্পর্কে সচেতনতা দেখা যায়। ওই প্রতিবেদনে উদ্বৃত্ত বাড়ানোর তাগিদ থেকে চিরাচরিত গ্রামীণ কুটির শিল্প থেকে সরে এসে ক্ষুদ্রায়তন ধারার গ্রামীণ শিল্পায়নের ওপর গুরুত্ব আরো করা হয়েছে। পক্ষান্তরে, অন্যান্য টাস্কফোর্স প্রতিবেদনে যেখানে প্রবৃদ্ধি দ্রুততর করার কথা প্রস্তাবিত হয়েছে, সেখানে উদ্বৃত্ত সৃষ্টির প্রশ্নটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া প্রয়োজন ছিল। আর আমাদের মতো সমাজে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে প্রথমেই খুঁজে বের করতে হবে সমাজের কোন অংশের রয়েছে তাত্পর্যপূর্ণ মাত্রায় সঞ্চয়ের সম্ভাবনা এবং কীভাবে এ সম্ভাবনাটিকে সার্থক করা যায়। টাস্কফোর্স প্রতিবেদনগুলোয় যতগুলো সুপারিশ রাখা হয়েছে সব মিলিয়ে তা থেকে এই মর্মে কোনো যৌক্তিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না যে, উপরোক্ত সুপরিশমালা বাস্তবায়ন হলেই প্রবৃদ্ধি হারের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়ে যাবে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দারিদ্র্য দূরীকরণ-সংক্রান্ত টাস্কফোর্স প্রতিবেদনে ভূমি সংস্কারের ক্রমবিলীয়মান প্রয়োজনীয়তা এবং এ সম্পর্কে খাদ্য, কৃষি ও ভূমি প্রশাসন-সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলোয় প্রায় অভিন্ন ধারণা ব্যক্ত হলেও আগে উল্লিখিত মৌলিক প্রশ্নটিকে উপলব্ধির প্রচেষ্টা নেয়া হয়নি। আমার ধারণায়, যথার্থ সমাজ-সংগঠনের উপযোগী সামাজিক ব্যবস্থার আওতায় উচ্চহারে উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করতে সক্ষম এমন শ্রেণীর কাছেই কৃষিজ সম্পদ তুলে দিতে হবে। যথার্থ সমাজ সংগঠন বলতে আমি কৃষি খাতের খোদ উৎপাদনকারীদের দ্বারা সংগঠিত যৌথ চাষাবাদ, সংরক্ষণ, বিপণন এবং ঋণদান কর্মসূচিকেই বোঝাচ্ছি। যৌথতার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়ার কারণে economics of scale এবং সহযোগিতার পূর্ণ ফললাভ সম্ভব হবে। এছাড়া যৌথতার ভাবধারায় কৃষকের আত্মশক্তিরও বিকাশ ঘটানো যাবে যার মধ্য দিয়ে তাদের শ্রম সরাসরি রূপান্তরিত হবে (অবকাঠামোমূলক) পুঁজিতে। শেষোক্ত ধারার রূপান্তর একাধারে উদ্বৃত্ত সৃষ্টি এবং বিনিয়োগেরই একটি ধরন। যৌথতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই সমাজ সংগঠনের কারণে সাধারণ মানুষের ভোগের চাহিদা মেটানোর জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় মোট ব্যয়ের পরিমাণও কমে আসবে বলে ধারণা করা যায়। এর ফলে সাধারণ মানুষের গ্রুপগুলো পরিচালিত সম্ভাব্য বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রমে (যথা, সমবায়ী দোকানপাট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, প্রভৃতি) উদ্বৃত্ত সৃষ্টির সুযোগ আরো বেড়ে যাবে। এ পরিপ্রেক্ষিতেই গ্রামাঞ্চলে ভূমি-দরিদ্রদের নিয়ে শ্রেণী সংগঠন গড়ে তোলার কাজটি আমার কাছে অধিক তাত্পর্যপূর্ণ মনে হয় (যার উল্লেখ দারিদ্র্য দূরীকরণসহ অন্যান্য টাস্কফোর্স প্রতিবেদনে আছে)। এ থেকে কৃষি সংস্কারের একটি দিকনির্দেশনাও পাওয়া যায়, যা আমাদের জন্য কোনো ভাবাদর্শগত বিবেচনার বিষয় নয়, বরং নিতান্তই বাস্তব পরিসংখ্যান-উদ্ভূত একটি জরুরি তাগিদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

অন্য পর্যায়ে অবিলম্বে শুরু করা যায় এ রকম নির্দিষ্ট সুপারিশমালার মধ্যে আমি প্রথমেই নাম করব জ্বালানি-সংক্রান্ত টাস্কফোর্স প্রতিবেদনে উল্লেখিত উন্নত ধরনের চুল্লির কথা। এটি দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যের জন্য এবং biomass fuel-এর দ্রুত অবলুপ্তি রোধে একটি অত্যন্ত সহায়ক ব্যবস্থা। কোনো উন্নয়নমূলক সাহায্যের প্রতিশ্রুতির সাপেক্ষতা ছাড়াই বা ওপর থেকে নীতিনির্ধারণী কোনো সিদ্ধান্তের জন্য কালবিলম্ব না করেই সমাজ এ পদক্ষেপটি এখনই গ্রহণ করতে পারে।

তবে আমার জানামতে, গ্রামীণ ব্যাংকের মাঠ অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, এ ধরনের চুল্লির প্রসারে চুল্লির বর্তমান ডিজাইন এবং গ্রামে যে ধরনের জ্বালানি সরবরাহ বিদ্যমান (বিশেষত গ্রামের দরিদ্র মহিলারা যা সংগ্রহ করতে সক্ষম) তার মধ্যে বেশকিছুটা অসঙ্গতি এখনো রয়ে গেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে চুল্লিটির ডিজাইনে কিছুটা পরিবর্তন আনা আবশ্যক। আশা করব, গ্রামীণ ব্যাংকের অভিজ্ঞতার আলোকে চুল্লিটির নির্মাতারা দ্রুতই এর ডিজাইনে কিছু পরিবর্তন সাধন করে একে গ্রামের দরিদ্রদের জন্য আরো ব্যবহারোপযোগী করে তুলবেন। বৃক্ষরোপণের জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার বিষয়টিও আমার কাছে একই রকম গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। ভূমি প্রশাসন ও পরিবেশ-সংক্রান্ত টাস্কফোর্সে সামাজিক বনায়ন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে পুনর্বনায়নের যে প্রস্তাবনা করা হয়েছে, তা ও এক্ষেত্রে স্মর্তব্য। তবে এসব আলোচনার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বাদ পড়ে গেছে। ‘স্পিরুলিনা’ নামক যে শক্তিশালী পুষ্টিবর্ধক উপাদান রয়েছে, সেটি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি এখন আমাদের করায়ত্ত। এ কাজটি সম্ভব হয়েছে বিসিএসআইআরের কিছু মহিলা বৈজ্ঞানিকের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে। দেশ যখন রাজনৈতিক গণতন্ত্রের পুনর্জন্মের ধাপে প্রবেশ করছিল, প্রায় একই সময় এরা সাফল্যের সঙ্গে স্পিরুলিনা উৎপাদক প্রযুক্তিকে এ দেশের উপযোগী করে তুলতে সক্ষম হন। পুষ্টির ক্ষেত্রে একে একরূপ নবদিগন্ত বলা যেতে পারে এবং বর্তমান এটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের জন্য সম্পূর্ণ তৈরি। এই বিজ্ঞানীরা এখন দেশের প্রতিটি গৃহেই যেন স্পিরুলিনা algac উত্পন্ন হতে পারে এ রকম প্রযুক্তি উদ্ভাবনের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। আমি আশা করব, দেশের সব উন্নয়ন সংস্থা, সামাজিক কর্মী ও গণমাধ্যম এদের কাজকে যথাযথ স্বীকৃতি ও অনুপ্রেরণা দিতে এগিয়ে আসবে এবং ওরাল স্যালাইনের মতো স্পিরুলিনা প্রযুক্তিকেও ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে উদ্যোগী ভূমিকা রাখবে।

টাস্কফোর্সের অন্য সুপারিশমালা মূলত দেশের নীতিনির্ধারকদের বিবেচনার জন্য প্রণীত। এক্ষেত্রে আমি আগেই বলেছি, মূল প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে উপরিকাঠামোর ঋণাত্মক ভূমিকাজাত মৌলিক সমস্যা। এখনো পর্যন্ত আমরা এ রকম প্রমাণ পাইনি যে, দেশের শ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞদের ঐকান্তিক পরিশ্রমে রচিত প্রতিবেদনগুলো সংশ্লিষ্ট মহলের ওপর কোনো প্রভাব বা ছাপ রাখতে পেরেছে। কেন এমনটাই হচ্ছে তার শ্রেণীস্বার্থ-সংক্রান্ত কারণগুলো আমি আগেই উল্লেখ করেছি। এ পরিপ্রেক্ষিতে টাস্কফোর্সের সুপারিশমালার মধ্যে বোধ করি সবচেয়ে মূল্যবান হলো সেই বক্তব্যটি, যেখানে সামাজিক ও শ্রেণী সংগঠনগুলোকে গড়ে তোলা ও তাদের শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এসব সংগঠনের মধ্য দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর অভিমতকে প্রকাশ ও সেই অভিমতের পক্ষে অবস্থান নেয়ার অবকাশ মিলবে। সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ এসব সংগঠনের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে নিজেরাই উন্নয়ন-উদ্যোগগুলো গ্রহণ করতে পারবে। বলাবাহুল্য, এ সুপারিশটির বাস্তবায়নও নির্ভর করছে সমাজকর্মীদের প্রচেষ্টার ওপর। এ রকম সংগঠন-প্রক্রিয়া দানা বাঁধতে শুরু না করলে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের জন্য অর্থবহ কোনো উন্নয়ন প্রক্রিয়া সূচিত ও তা লালন করা অসম্ভব। যদি উপরোক্ত ধারার সামাজিক শক্তিগুলো আত্মপ্রকাশ পেতে শুরু করে, তা হলে আমাদের বিশেষজ্ঞ-গবেষকদের কাজ হবে এদের জন্য এবং এদের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থেকে কাজ করা। যাতে করে প্রয়োজনীয় নানা তথ্য, উপাত্ত ও বিশ্লেষণ (যেসব তথ্য সংগ্রহ, বাছাই ও বিশ্লেণের কাজে বিশেষজ্ঞরাই তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন) জুগিয়ে সমাজের অগ্রণী শক্তি হিসেবে সমাজকে বর্তমান অবস্থা থেকে উদ্ধার করার ক্ষেত্রে এদের সামর্থ্যকে আরো বাড়ানো যায়।

আপাতত টাস্কফোর্স প্রতিবেদনগুলোর রচয়িতারা পেতে পারে গোটা জাতির পক্ষ থেকে অজস্র ধন্যবাদ। অন্ততপক্ষে এটি অনস্বীকার্য যে, তাদের কাজটি জাতিকে বিরাজমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাদির মারাত্মক আকার ও সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সচেতন হতে সাহায্য করতে পারে। প্রযুক্তি ও পরিবেশ-সংক্রান্ত টাস্কফোর্স প্রতিবেদনগুলো পাঠ ছিল বিশেষভাবে আনন্দের এক অভিজ্ঞতা। দুটি প্রতিবেদনই আমাদের সামনে উন্নয়ন সমস্যার অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও প্রযুক্তিগত দিকগুলোর একটি সমন্বিত আলোচনা উপস্থাপন করতে প্রয়াসী হয়েছে। এ ধরনের প্রয়াসের মধ্য দিয়ে এ তিনটি শাস্ত্রের আবশ্যকীয় আন্তরসূত্রতা সম্পর্কে আমরা সজাগ হই। অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত— এ তিনটি দিকের মধ্যে ভারসাম্যতা রক্ষার general equilibrium চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই আমাদের খুঁজে নিতে হবে উন্নয়নের সেই সারবান অভিধা, যা শুধু উচ্চপ্রবৃদ্ধি হারেরই জন্ম দেবে না, সেই সঙ্গে দেবে সামাজিক ও পরিবেশগত বিচারে স্থায়িত্বশীল কাঙ্ক্ষিত এক সমাধান। যদি বেশকিছু টাস্কফোর্স প্রতিবেদন উপরোক্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পুরোপুরি সমর্থ না-ও হয়ে থাকে, তা হলেও যতটুকু তাদের অবদান তা-ও মূল্যবান বৈকি। এবং তা তিনটি কারণে প্রথমত. প্রয়োজনীয় তথ্যের উৎস হিসেবে; দ্বিতীয়ত. ফলপ্রসূ বিতর্কের সূত্রপাত হিসেবে এবং তৃতীয়ত. সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক আলোচনার ধারার অনালোচিত যেসব প্রসঙ্গ থেকে গেছে, সে সম্পর্কে আমাদের উন্নয়ন-ভাবনাকে প্রশ্নাকীর্ণ করে তোলে। অনালোচিত এসব প্রসঙ্গ যা অনুসন্ধানের অপেক্ষায় রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো— ১. বিভিন্ন অর্থনৈতিক শ্রেণী এবং আর্থসামাজিক ব্যবস্থার এবং স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন বা দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে গ্রহণযোগ্য সম্ভাব্য পদক্ষেপগুলোর, উদ্বৃত্ত সৃষ্টির চারিত্র্য ও সামর্থ্য, ২. অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে পরিবেশের ওপর প্রভাবজনিত cost benefits-এর অন্তর্ভুক্তি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই অন্তর্ভুক্তি যাতে যথাযথ গুরুত্ব পায় তার নিশ্চয়তা বিধান। সামগ্রিকভাবে বলতে হয়, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষাকারী উন্নয়ন কৌশল রচনার জন্য অতি প্রয়োজনীয় যে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, তার জন্য এ দেশের বিজ্ঞানীদের সমবেত উদ্যোগ রাখার জরুরি তাগিদের বার্তা বহন করছে টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনগুলো।

[বিআইডিএস প্রকাশিত বাংলাদেশ উন্নয়ন সমীক্ষা থেকে পুনর্মুদ্রণ]

 

লেখক: অর্থনীতিবিদ; প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য