সিল্করুট

বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ

ফারিহা আজমিন

নিজের টেবিলে বসা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছবি: ওল্ড ইন্ডিয়ান ফটোজ

বঙ্গভঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা কেমন ছিল এ বিষয়ে রয়েছে নানা মত। বঙ্গভঙ্গের কারণ হিসেবে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দ্বারা বাংলা আরো সহজভাবে শাসনের ইচ্ছাকেই দায়ী করা হয়। ১৭৬৫ সালের পর থেকেই বাংলার সঙ্গে যুক্ত ছিল বিহার ও উড়িষ্যা। ব্রিটিশদের পক্ষে বিশাল এ বাংলাকে শাসন ও শোষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। এ কারণে ইংরেজরা বাংলাভাগের পরিকল্পনা করে এবং সেখান থেকেই বঙ্গভঙ্গ। তবে বঙ্গভঙ্গের পক্ষে-বিপক্ষে সবসময়ই শিক্ষিত সমাজ ও সমালোচকদের আলাদা কিছু মতামত ছিল। কেউ হয়তোবা নিজেদের স্বার্থ চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে দেশ ও জাতির কল্যাণকর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবেছেন কেউবা ধর্মীয় জায়গা থেকে বঙ্গভঙ্গকেই সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। তবে এ বিষয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেশকিছু কার্যক্রমও প্রভাব ফেলেছিল একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ওপর।

১৮৩৬ সালে বঙ্গের পূর্বাঞ্চল ভৌগোলিক ও অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পশ্চিমাঞ্চল থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল। বঙ্গের আয়তন ছিল সে সময় ১ লাখ ৮৯ হাজার বর্গমাইল। ১৮৩৬ সালে উত্তরাঞ্চলের প্রদেশগুলোকে বঙ্গ থেকে পৃথক করে একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নরের অধীনে ন্যস্ত করা হয়।

তবে উনিশ শতকের শেষভাগেই প্রজাসাধারণের উত্থানকে ভয় পাওয়া শুরু করে ব্রিটিশ সরকার। যেহেতু ভারতবর্ষে দীর্ঘ সময় ধরে মোগল শাসন চলার পরও হিন্দুদের কোনো বিদ্রোহ দেখা যায়নি বরং মোগল শাসকরা হিন্দুদের শাসনকার্যে কাজে লাগাতে পেরেছে। দরবারে উচ্চ পদের আশায় বহু হিন্দু ফার্সিও শিখে নিয়েছিল। তবে যখন ইংরেজরা মুসলমান শাসকদের কাছ থেকে শাসনদণ্ড গ্রহণ করেছে, তখন থেকেই মুসলমানরা কেন্দ্রীয় শাসনক্ষমতা থেকে দূরে সরে যায়। তাই এ সময়ে ব্রিটিশরা কাজে লাগিয়েছে দক্ষ, শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ হিন্দু সম্প্রদায়কে। হিন্দু সম্প্রদায়ও এক্ষেত্রে ইংরেজদের কাছ থেকে সব ধরনের শিক্ষা-চাকরিসহ নানা সুবিধাদি আদায় করে নিয়েছে। তারা মুসলমানদের চেয়ে অর্থবান-ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে। ফলে তৈরি হয় হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ভেদরেখা। 

বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের শুরুতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন না। কোনো সভা-সমাবেশে অংশ নিতে তাকে দেখা যায়নি। তার কোনো বক্তৃতা কিংবা প্রবন্ধও সামনে আসেনি। তবে ঠাকুরবাড়ির অনেকেই এ আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। এমনকি শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধেও রবীন্দ্রনাথ নীরব ছিলেন। অথচ এর চেয়েও কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথকে যথাসময়েই তার মত প্রকাশ করতে দেখা গেছে। এ সময়ে বঙ্গদর্শন পত্রিকার সম্পাদনা করছিলেন তিনি। তবে ১৯০৪ সালে তিনি মজফফরপুরে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে সাময়িক প্রসঙ্গ শিরোনামে বঙ্গবিচ্ছেদ ও ইউনিভার্সিটি বিল দুটি বিষয়েই তার নিজস্ব মত প্রকাশ করলেন। এ সময়ে লর্ড কার্জন কিছুদিন নীরব ছিলেন এবং প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য নয় ভেবে আন্দোলনকারীরাও নীরব হয়ে গেলেন। তবে এরপর রবীন্দ্রনাথের কার্যক্রম ভীষণভাবে বাঙালি মুসলিমদের মনে করিয়েছিল বঙ্গভঙ্গই শ্রেয়।  

১৯০৪  সালের শিবাজি উৎসব কবিতাটি যখন রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন তখন তিনি কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। একই সঙ্গে কলকাতার বুদ্ধিজীবী মহলেও তিনি সম্মানের সাথে সমাদৃত। এছাড়া শিবাজি উৎসবেও তিনি ১৯০৩ সালেই যোগদান করেন। বস্তুত এই শিবাজি উৎসবের সূত্র ধরেই বাংলায় সন্ত্রাসবাদী রাজনীতির এবং সাম্প্রদায়িক ভেদনীতির ভিত্তি স্থাপিত হয়। এর ফলে বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমান পরস্পর বিপরীত পথে ধাবিত হয়। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের দাবি, সন্ত্রাস আর সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দায়ভাগ পুরোপুরি বর্তায় হিন্দু জমিদার আর মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ওপর। 

শিবাজি উৎসব পালনের মধ্য দিয়ে সমগ্র বাংলায় যখন মুসলিম বিদ্বেষ আর সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও সমাজনীতির ভূমি নির্মিত হচ্ছে তখন বাঙালি মুসলিম সমাজ অর্থে, বিত্তে, শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়। আর পূর্ব বাংলায় বাঙালি মুসলিম জসংখ্যার সিংহভাগ জমিদারদের রায়ত বা প্রজা। বাংলার হিন্দুরা মুসলমানদের প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করলেও হিন্দু জমিদার আর মধ্যবিত্তের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠার শক্তি বা অবস্থা বাঙালি মুসলমানের ছিল না। কিন্তু বাস্তবে বিশ শতকের শুরুতে এই সাম্প্রদায়িক ‘শিবাজী উৎসব’ বাংলায় চালু হয়েছিল মুসলিমবিরোধিতা এবং মুসলিম বিদ্বেষকে পুঁজি করে। ফলে বিভক্ত বাংলাও ছিল মুসলিম বাঙালিদের সময়ের দাবি।  তবে বাংলায় হিন্দু-মুসলিম একত্রে অবস্থানই বাংলার শক্তি এমন ভাবনা বাঙালির মনে গেঁথে দিয়েই রবীন্দ্রনাথ তার রাখি বন্ধন কর্মসূচি পালন করেছিলেন। 

তবে তার আগে কবিতায় রবীন্দ্রনাথ শিবাজিকে ভারতের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন যে খণ্ড, ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত ভারত ধর্মের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করা ছিল শিবাজীর জীবনের উদ্দেশ্য। কবিতায় রবীন্দ্রনাথ শিবাজীর হিন্দুধর্ম উগ্র জাতীয়তাবাদের আদর্শে ভারতকে এক করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। যা ছিল পুরোপুরি সাম্প্রদায়িক, মুসলিম বিদ্বেষী এবং আবহমানকাল ধরে চলে আসা বাংলা ও ভারতের সমাজ ও সংস্কৃতি ধারার বিরোধী ছিল। এসকল কিছুর পরও রবীন্দ্রনাথের বঙ্গভঙ্গ রদ  আন্দোলন পূর্ববর্তি সভা-সমাবেশ কিংবা কর্মসূচির ব্যানার-পোস্টারেও ছিল হিন্দুত্বের ছাপ। তবে মুসলিমদের ক্ষোভ বুঝতে পেরে তিনি এ পরিস্থিতিতে দেশীয় ভাবনাকে আরো উদ্বুদ্ধ করতে ভিন্ন কিছু বিষয়ের আয়োজন করেছেন। তিনি বিলেতি ধরনের সভার বদলে দেশী ধরনের মেলা করার প্রস্তাব করেন। সেখানে যাত্রাগান, আমোদ-আহ্লাদে দেশের লোক দূরদূরান্ত থেকে একত্র হবেন। সেখানে দেশী পণ্য ও কৃষিদ্রব্যের প্রদর্শনী হবে। সেখানে কীর্তন-গায়ক ও যাত্রার দলকে পুরস্কার দেয়ার ব্যবস্থা থাকবে। হিন্দু-মুসলিমদের একত্রে নিজেদের যা কিছু বলার কথা আছে, যা কিছু সুখ-দুঃখের পরামর্শ আছে তা সবাই একত্রে মিলে সহজ বাংলা ভাষায় আলোচনা করা হবে। সবার সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন হিন্দু-মুসলিম মিলনই বঙ্গের শক্তি। 

বঙ্গভঙ্গ আইন কার্যকর হওয়ার প্রস্তাব পাস হওয়ার বিষয়টি যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন ভিন্ন এক প্রতিবাদের ভাষা ছিল রবীন্দ্রনাথের। রাখিবন্ধন কর্মসূচি ছিল তার একটি— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গিরিডি থেকে কলকাতায় এসে ১৯০৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সাবিত্রী লাইব্রেরি স্বধর্ম সমিতির বিশেষ অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে তিনি প্রস্তাব রাখেন ১৬ অক্টোবর তারিখ থেকে ব্রিটিশ সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী বঙ্গভঙ্গ আইন কার্যকর হলে, সেদিন কোনো বাঙালির বাড়িতে উনুন জ্বলবে না। বাঙালি জনসাধারণ অরন্ধন পালন করে উপোস থাকবে। সেই সঙ্গে বাঙালির ঐক্য বজায় রাখার জন্য দেশজুড়ে হবে রাখিবন্ধন উৎসব। দিনটিকে বাংলার হিন্দু-মুসলমানের মিলনের দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। রাজনৈতিক ব্যক্তিরা একই তারিখে রাজধানী কলকাতায় হরতাল আহ্বান করে।

এবং হিন্দু-মুসলমান সবার হাতে রাখি বেঁধে দেয়ার মধ্য দিয়ে বঙ্গভঙ্গবিরোধী একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূচনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯০৫ সালের ২০ জুলাই ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব ঘোষণা করে এবং সে বছরের ১৬ অক্টোবর প্রস্তাব পাস হলেই রাখিবন্ধনের মধ্য দিয়ে বঙ্গভঙ্গ রোধের বিরোধিতায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্য দিয়ে ভ্রাতৃত্ব, সাম্য, ঐক্য ও সম্প্রীতি তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। কলকাতার নাখোদা মসজিদের মুসল্লিদের হাতেও রবীন্দ্রনাথ সে সময় রাখি পরিয়ে দিয়েছিলেন। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়। সেদিন কলকাতায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালিত হয়। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন, ৩০ শে আশ্বিন প্রভাতে রবীন্দ্রনাথকে পুরোভাগে রাখিয়া বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি ও আপামর জনসাধারণ এক বিরাট শোভাযাত্রা করিয়া গঙ্গাতীরে সমবেত হইল। গঙ্গাস্নান করিয়া পরস্পরের হস্তে রাখিবন্ধন করিল।

সে বছর আইন পাস হয়ে যাওয়ার পর বাংলা বিভক্ত হয়ে গেলেও প্রচণ্ড চাপের মুখে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের কার্যক্রমের ছাপ-ব্রিটিশ সরকার ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ আবারো ১৯১১ সালে ২২ ডিসেম্বর বঙ্গভঙ্গ রদ করেছিল। তখনকার মতো বঙ্গভাগ রদ হলেও রাজনৈতিক আবর্তে ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে দেশ বিভাগ ও বঙ্গভঙ্গ মেনে নিয়েই।

ফারিহা আজমিন: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা