সিল্করুট

বঙ্গভঙ্গ ও রবীন্দ্রনাথ

মাহমুদুর রহমান

শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ছবি: বেঙ্গল গেজেট

ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনামলের অন্যতম বড় ঘটনা বঙ্গভঙ্গ। ১৯৪৭ সালের ভারতভাগের আগে আরেক ভাগের উদাহরণ এটি। তবে কোপটা পড়েছিল সরাসরি বাংলার ওপর। সে সময় পূর্ব বাংলা বা পশ্চিম বাংলা বলে আলাদা কিছু ছিল না। কিন্তু চরিত্রগতভাবে ছিল। পূর্ব তথা ভাগীরথীর পূর্ব পাড়ের জনগোষ্ঠীতে মুসলিমরাই ছিল গরিষ্ঠ। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের জমিদার শ্রেণী, তাদের ঘর থেকে তৈরি হওয়া শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের সঙ্গে ও পূর্ববঙ্গের কৃষিভিত্তিক সমাজ ও জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণেও ছিল পার্থক্য। এসব মাথায় রাখার পাশাপাশি শাসনের সুবিধার জন্য লর্ড কার্জন বাংলাকে প্রশাসনিকভাবে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এর প্রতিবাদ উঠেছিল এবং তার বেশির ভাগটাই ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক। স্বাভাবিকভাগেই এর প্রভাব পড়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর। বঙ্গভঙ্গ নিয়ে তার নিজস্ব মত ছিল। তিনি একটা সময় এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন।

বাংলাকে দ্বিভক্ত করার প্রস্তাব আসে ১৯০৩ সালের জিসেম্বরে। এর পরই নানা প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বাংলাভাগের চূড়ান্ত ঘোষণা হলে নানা মহল থেকে প্রতিবাদ আসতে শুরু করে। ধীরে ধীরে শুরু হয় বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুরুতে এতে যোগ না দিলেও ধীরে ধীরে তিনিও আন্দোলনের অংশ হয়ে পড়েন। রবীন্দ্রনাথ কোন পক্ষে ছিলেন তা স্পষ্ট। তিনি বঙ্গভঙ্গের বিপক্ষেই আন্দোলন করেছেন। রবীন্দ্রনাথের মতাদর্শ ছিল অখণ্ড বাংলার। বাংলাকে এক রাখা ও বাঙালিত্ব নিয়েই আগ্রহ ছিল তার। সে সময়ের রাজনীতির নানা দিক ও মতবাদের মধ্যে তিনি বাংলাকে এক রাখার জন্য বেশকিছু সাংস্কৃতিক আন্দোলন শুরু করেছিলেন।

বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল ১৯০৩ সাল থেকেই। রবীন্দ্রনাথ এর প্রথম পর্যায়ে তেমন কিছু বললেন না। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ চূড়ান্ত হওয়ার শুরু থেকেই রবীন্দ্রনাথ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সরব ছিলেন। তা শুরু হয়েছিল রাখি বন্ধন থেকে। ১৬ অক্টোবরের বিষয়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন—

‘ঠিক হল সকালবেলা সবাই গঙ্গাস্নান করে সবার হাতে রাখি পরাব। এই সামনেই জগন্নাথ ঘাট, সেখানে যাব—রবিকাকা বললেন, সবাই হেঁটে যাব, গাড়িঘোড়া নয়।—রওনা হলুম সবাই গঙ্গাস্নানের উদ্দেশ্যে। রাস্তার দুধারে বাড়ির ছাদ থেকে আরম্ভ করে ফুটপাত অবধি লোক দাঁড়িয়ে আছে—মেয়েরা খই ছড়াচ্ছে, শাঁখ বাজাচ্ছে, মহা ধুমধাম—যেন একটা শোভাযাত্রা, দিনুও সঙ্গে ছিল, গান গাইতে গাইতে রাস্তা দিয়ে মিছিল চলল—বাংলার মাটি, বাংলার জল বাংলার বায়ু, বাংলার ফল পুণ্য হউক পুণ্য হউক পুণ্য হউক হে ভগবান।’

বোঝা যাচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের প্রাথমিক এ প্রচেষ্টা বা কর্মযজ্ঞ ছিল সাংস্কৃতিক। তিনি হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সদ্ভাব ও সম্প্রীতি বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর জানিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ নিজে মুসলিম সহিসদের রাখি পরান। এছাড়া চিৎপুরে জামা মসজিদেও মুসলমানদের হাতে রাখি পরানো হয়।

ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার এ বিষয় উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ সজনীকান্ত দাশকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, সামনে যাকে পেতাম, তারই হাতে বাঁধতাম রাখি। সরকারী পুলিস এবং কনস্টেবলদেরও বাদ দিতাম না। মনে পড়ে, একজন কনস্টেবল হাত জোড় করে বলেছিল, মাফ করবেন হুজুর, আমি মুসলমান।’

অর্থাৎ তার মূল লক্ষ্য ছিল সবাইকে এর সঙ্গে যুক্ত করা। একটি বাঁধনে বাঁধা। সেখানে ধর্ম লক্ষ্য করেননি রবীন্দ্রনাথ।

 মূলত, যতই প্রশাসনিক বলা হোক না কেন, বঙ্গভঙ্গের একটা ধর্মীয় চরিত্র ছিল। পূর্ববঙ্গে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও পশ্চিম বাংলায় হিন্দুরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফলে বঙ্গভঙ্গ হয়ে উঠেছিল হিন্দু ও মুসলিমদের আলাদা রাজ্যের একটি ম্যানিফেস্টো। বিশেষত পূর্ব বাংলায় মুসলিমরা এতে খুশিই হয়েছিল। সে সময় রবীন্দ্রনাথ সে ধর্মীয় চরিত্র ধরতে পেরেই কোনো ধরনের সভা বা বক্তৃতায় প্রশাসনিক কোনো আলাপ না করে সরাসরি হিন্দু-মুসলিম মিলনের দিকে মন দেন। তার এ প্রাথমিক কার্যকর্ম ছিল ধর্ম ও মানুষকেন্দ্রিক। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শিক্ষা ও একাত্মতা। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক প্রিয়াংকা মিত্র লিখেছেন, ‘Rabindranath Tagore, the most famous poet-philosopher of the time at that moment of crisis asserted “Education” and “Unity” as the two sole reasons he wanted to propagate by joining this movement. By singing patriotic songs in a procession and tying Rakhi on everyone’s hand Kaviguru evoked the spirit of national sentiment in the heart of every people who gained vigour, vitality, strength, solidarity and an aspiration to achieve freedom.’

রবীন্দ্রনাথ বঙ্গ বিভাগকে দেখেছিলেন রাজশক্তির চাপিয়ে দেয়া একটি সিদ্ধান্ত হিসেবে। তৎকালীন রাজনীতির প্রতি রবীন্দ্রনাথের কিছুটা বিরাগ ছিল। তিনি মনে করতেন কংগ্রেস যা কিছু করে তা মূলত রাজশক্তির অধীনে থেকেই করে। শিক্ষার ক্ষেত্রে তার একটি মনোভাব ছিল বিশ্ববিদ্যালয় ও ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে দেশীয় শিক্ষার মূলোচ্ছেদ করা হচ্ছে এবং বাংলাভাগের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকেও দুর্বল করে দেয়া হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথরা ‘বাঙালি’ বলতে যে জনগোষ্ঠীকে বুঝতেন তা এক ধরনের আদর্শ মধ্যবিত্ত বাঙালি। তাদের জন্যই আন্দোলন সংগ্রাম করতেন সবাই। এক্ষেত্রেও পূর্ব বাংলার কথা তারা চিন্তা করেননি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আসলে সহজবোধ্য নন। বিশেষত তার কাজগুলোর বিচার বাইনারি ন্যারেটিভে করা সম্ভব না। তিনি বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজ মত ও বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছেন কিন্তু সেসবে একপক্ষীয় ন্যারেটিভ ছিল দুর্লভ। চাইলে কোনো একটি বিষয় ধরে সেটিকে মূল বিবেচনায় প্রকাশ করা যায় কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নিজে তা করেননি। এদিকে ভিন্নভাবে বঙ্গভঙ্গ প্রসঙ্গে তাকালে দেখা যাবে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ না থাকলেও তিনি বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন সেই ১৯০৩ থেকেই। কেননা ১৯০৪ সালের জুনে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় দীনেশচন্দ্র সেনের সাহিত্য প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘এই বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ফলে বিলিতি সভ্যতার মোহ কেটে গিয়ে আমাদের দেশ যথানিয়মে আমাদের হৃদয়কে পাইতেছে। ইহাই পরম লাভ। ধনলাভের চেয়ে ইহা অল্প নহে।’ অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ এখানে স্বদেশী একটি সমাজ গঠন, স্বরাজের চিন্তা করছেন। তা তিনি আসলেও করেছিলেন এবং স্বদেশী আন্দোলনেও তার প্রাথমিক ভূমিকা ছিল। সেদিকে যাওয়ার আগে রবীন্দ্রনাথের গানের দিকে একটু মন দিতে হয়।

রবীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালের অক্টোবরের আগে গিরিডিতে ছিলেন। সেখানেও আন্দোলনের ঢেউ লেগেছিল। সেখানে বসে রবীন্দ্রনাথ বেশকিছু গান লিখেছিলেন। এগুলো অনেক গবেষক স্বদেশী গান হিসেবে উল্লেখ করেন। ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা, মা কি তুই পরের দ্বারে পাঠাবি কি তোর ঘরের ছেলে, এবার তোর মরা গাঙ্গে বান এসেছে, যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক আমি তোমায় ছাড়ব না মা, যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে, তোর আপন জনে ছাড়বে তোরে, সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে; এমন মোট ২১টি গানকে স্বদেশী গান হিসেবে উল্লেখ করা হয়। 

রবীন্দ্রনাথের এসব গান পশ্চিমের সঙ্গে পূর্ব বাংলায়ও প্রভাব ফেলেছিল। রবীন্দ্রনাথের সরাসরি অংশগ্রহণের তুলনায় তার সাহিত্যকর্ম, গান বেশি প্রভাব রেখেছিল। এসব গান অনেকের মনেই ভাবাবেগ সৃষ্টি করার পাশাপাশি বঙ্গভঙ্গবিরোধী একটি মনোভাব তৈরি করে। বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব থেকেই পূর্ববঙ্গের নেতারা একে স্বাগত জানিয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের যোগদান আবার একটি ভিন্ন প্রভাব তৈরি করে। সাংস্কৃতিক বলয়ের একটি অংশ রবীন্দ্রদর্শনে প্রভাবিত হয়ে মনে করতে থাকেন বঙ্গভঙ্গ আসলে বাঙালিকে ভাগ করারই একটি উপায় এবং সে কাজই করছে ব্রিটিশ সরকার।

এদিকে রবীন্দ্রনাথের বেশকিছু ধারণা ছিল বঙ্গ বা বাংলা নিয়ে। এ নিয়েই তিনি রচনা করেছিলেন ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধ। এতে বলা হয়েছিল ইংরেজ তথা বিদেশী শাসন থেকে বেরিয়ে আসার কথা। স্বরাজের একটা ধারণাও ছিল। তিনি বলেছিলেন বিদেশীরা যে অভাব তৈরি করেছে তা থেকে বেরিয়ে আসার। এটিও অনেকটা সংস্কার আন্দোলনের মতো ছিল। কেননা তিনি মনে করতেন বাঙালির চিত্ত বাহিরমুখী হয়েছে। স্বদেশের সমাজ সংস্কার করার জন্য বেশকিছু পদক্ষেপের প্রস্তাব করেন তিনি। এর মধ্যে ছিল কৃষি মেলার আয়োজন, হিন্দু-মুসলমান মিলন, ধর্মীয় দূষিত মেলা সংস্কার ও নতুন ধরনের নেতৃত্বের সন্ধান। এসব ১৯০৪ সালের কথা কিন্তু বঙ্গভঙ্গের সময় বিষয়গুলো আবার সামনে আসে।

বেশকিছু প্রশ্ন তৈরি হয়। প্রথমত, রবীন্দ্রনাথ কি সে সময় এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন যে তার যোগদান বড় ভূমিকা রাখে? উত্তরে বলা যায়, ১৯১৩ সালে নোবেল পাওয়ার আগে রবীন্দ্রনাথ ‘ফেনোমেনা’ তৈরি হওয়ার আগেও জোড়াসাঁকো ও কবিতা সূত্রে তার প্রভাব ছিল। আবার সে সময় এখনকার মতো প্রভাব না থাকলেও তার গানগুলো জনমানসে প্রভাব ফেলেছিল।

আবারো ফেরা যাক রমেশচন্দ্র মজুমদারে। তিনি লিখেছেন, ‘দুপুর সাড়ে তিনটার সময় ২৯৪ আপার সার্কুলার রোডে ফেডারেশন হল ভিত্তি প্রস্তর অনুষ্ঠানে প্রায় পঞ্চাশ হাজার লোক উপস্থিত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ সে অনুষ্ঠানের ঘোষণাপত্রটির বঙ্গানুবাদ পাঠ করেছিলেন। সভার শেষে সেই বিশাল জনতা পায়ে হেঁটে সার্কুলার রোড ধরে বাগবাজারে চলে যায়। ঐ মিছিলে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন। মিছিলে সহস্র কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ রচিত স্বদেশী সঙ্গীত গীত হচ্ছিল।’ অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অ্যাকটিভিজম’ মানুষকে ‘মোটিভেট’ করেছিল।

দ্বিতীয়ত, বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের যোগদান ও ভূমিকার পরবর্তী প্রভাব আসলে কী ছিল? এটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা বিরোধী আন্দোলনের জের ধরেই সাত বছর পর বঙ্গভঙ্গ রদ হয়। রদ হওয়ার ফলে প্রথমত পূর্ববঙ্গের নেতা ও সচেতন মানুষ আশাহত হন। কেননা বঙ্গভঙ্গ হওয়ার ফলে পূর্ববঙ্গে বেশকিছু সুবিধা আসার কথা। অনেকে বলে থাকেন বাংলা ভাগ হলে পূর্ব বাংলার ওপর পশ্চিমবঙ্গ ও সেখানকার এলিটদের স্বার্থ বিঘ্নিত হতো বলেই তারা এর বিরোধিতা করেছিল। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির রবীন্দ্রনাথও সে এলিটদের একজন। ফলে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে তাদের জমিদারি ও অন্যান্য আয় রোজগার ও ব্যবসা-বাণিজ্য ঠিকঠাক চলেছিল।

প্রভাবের আরেকটি দিক, তার গানগুলো স্বদেশী আন্দোলনকে বেগবান করেছিল। স্বদেশী আন্দোলনের একটি বড় অংশ ছিল ধর্মীয় মতবাদ থেকে উৎসারিত। অনুশীলন সমিতি থেকে শুরু করে আন্দোলনে যুক্ত অনেকেই কালীর নামে শপথ করতেন। বঙ্কিমের উপন্যাসে (আনন্দমঠ) স্বয়ং দুর্গাকেই আনা হয়েছে দেশমাতৃকা হিসেবে। মজার ব্যাপার বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের লেখা গানও স্বদেশী আন্দোলনকে বেগবান করেছিল। বন্দে মাতরম ধ্বনির পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের গানও তাদের উদ্দীপিত করত।

তবে একটা সময় রবীন্দ্রনাথ নিজে ইংরেজ তোষণ করেছেন বলেও কথিত। বিশেষত পঞ্চম জর্জের সম্মানে তিনি রচনা করেছিলেন ‘জন গণ মন’। নোবেল পুরস্কারের সঙ্গেও ইংরেজ তোষণ প্রসঙ্গ যুক্ত করেন অনেকে। ১৯০৫ সালের মনোভাব পরে আর রবীন্দ্রনাথের মধ্যে ছিল না, কেননা ঘরে বাইরে উপন্যাসে আমরা দেখি তিনি পাচুর মুখে বিদেশী পোশাক পোড়ানোর বিরুদ্ধে কথা বলিয়েছেন। পুরো উপন্যাসে স্বদেশী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন দেখা গেলেও কর্মপন্থায় লেখকের দ্বিমত স্পষ্ট। এটিকে অনেকে রাজভক্তির নিদর্শন মনে করেন। আবার ভুলে গেলে চলবে না জালিয়ানওয়ালাবাগের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ নাইটহুড ত্যাগ করেছিলেন।

এতসবের পর মোটামুটি এমন একটা মতে পৌঁছনো যায়, রবীন্দ্রনাথ যোগ দিয়েছিলেন বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে এবং বিষয়টি তার জন্য ছিল সময়ের দাবি। তিনি এ আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত ছিলেন মাত্র তিন মাস। এর আগে-পরে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে তার অংশগ্রহণ নেই। কিন্তু স্বদেশী গান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে তার মত ও সর্বোপরি বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তার অবস্থান এক ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব সত্যিই সৃষ্টি করেছিল। এতে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে গতি এসেছিল। তার ফলেই রদ হয়েছিল বঙ্গভঙ্গ। ফলে বঞ্চিত হয়েছে পূর্ববঙ্গ ও মুসলিম সমাজ।

মাহমুদুর রহমান: লেখক ও সাংবাদিক