সিল্করুট

স্বদেশী আন্দোলনে হিন্দুরাষ্ট্র প্রকল্পের রূপরেখা

আহমেদ দীন রুমি

স্বদেশী আন্দোলনের সংগঠন অনুশীলন সমিতির কার্যালয় ছবি: বার্তা টুডে

স্বদেশী আন্দোলনে সক্রিয় অনুশীলন সমিতির নেতা জীবনতারা হালদার। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেশাত্মবোধক গান আমাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে।’

জীবনতারা হালদারের জবানে স্বদেশী আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের প্রভাবের একটা চিত্র উঠে আসে। চিন্তার দিক থেকেই হোক কিংবা সক্রিয় কার্যক্রমের দিক থেকে, বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা বিস্তর। অথচ সে স্বদেশী আন্দোলনেই নিহিত ছিল হিন্দুত্ববাদের শেকড়। সে শেকড়কে সংজ্ঞায়ন করতে আহমদ ছফার একটা উক্তিই যথেষ্ট। তিনি বলেছেন, ‘বিদ্যা, বুদ্ধি এবং সংস্কৃতি চেতনার দিক দিয়ে তুলনামূলকভাবে অগ্রসর হিন্দু সমাজের স্বাধীনতা প্রয়াসী তরুণ বিপ্লবীরা হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে মরণপণ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।’ আহমদ ছফার বক্তব্যের তাৎপর্য অনুসন্ধানে যেতে হবে পেছনে। কারণ স্বদেশী আন্দোলন নিজেও একটা দীর্ঘ যাত্রার বিকশিত রূপ। এ কথা বেশ চমৎকৃত হওয়ার মতো যে হিন্দুত্ব, ভারতমাতা ও বন্দে মাতরম ভারতীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে ক্রিয়াশীল এ তিন শব্দেরই জন্মস্থান বাংলা ও জন্মলগ্ন ব্রিটিশ আমল। 

১৮২০ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়, যা পরবর্তী সময়ে নাম নেয় প্রেসিডেন্সি কলেজ হিসেবে। মাত্র আট বছর পরেই সেখানকার প্রভাষক ডিরোজিও পরিণত হন পরিবর্তনের নায়কে। ডিরোজিওর নেতৃত্বে মুক্ত চিন্তা বিস্তার লাভ করছিল তখন। সে মুক্ত চিন্তার ঢেউয়ে অনেকেই প্রচলিত ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্ট কিংবা ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। তার পরিণামে হিন্দু ধর্ম থেকেই শুরু হয় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া। আওয়াজ আসতে থাকে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও শিক্ষার বিরুদ্ধে। নেতারা সরব হতে থাকেন হিন্দু সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ নিয়ে। সে শতাব্দীরই ষাটের দশকে ভারতকে মাতা হিসেবে চিহ্নিত করা শুরু হয়। ১৮৬৬ সালে প্রকাশিত ‘ঊনবিংশ পুরাণ’ এক্ষেত্রে ‘ভারতমাতা’ শব্দ ব্যবহারের প্রথম লিখিত নজির। বাঙালি হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী পণ্ডিত ভূদেব মুখোপাধ্যায় কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস ছদ্মনামে লিখেছিলেন বইটি। ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের সে সময় নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ভাষাবিদ সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় দাবি করেছেন, সে সময়টায় হাই স্কুল ও কলেজের পরিবেশ ‘বাঙালি মনন ও সংস্কৃতির’ জন্য অনুকূল ছিল না। উল্লেখ্য যে বাঙালি বলতে তিনি মূলত বাঙালি হিন্দুকেই বুঝিয়েছেন। 

১৮৬৭ সালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, নবগোপাল মিত্র ও রাজনারায়ণ বসুকে দিয়ে যাত্রা শুরু হয় হিন্দু মেলার। এ হিন্দু মেলাকে ক্রমে জাতীয় মেলাও বলা হতে থাকে। বার্ষিক এ মেলা শুরু হতো দ্বিজেন্দ্রনাথের ‘মলিন মুখচন্দ্র মা ভারত তোমারি’ গান দিয়ে, অর্থাৎ ভারতকে মা হিসেবে উদ্ধৃত দেখা যায়।

১৮৭৩ সালে ভারতমাতা নামে একটা নাটক মঞ্চস্থ হয় কলকাতায়, যার লেখক কিরণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৮৭৯ সালে রাজনারায়ণ বসু লিখেন ‘হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব’। সত্তরের দশকের শেষ দিকেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লেখেন ‘বন্দে মাতরম’। সংগীতটি হিন্দু মেলার উদ্বোধনী সংগীতের স্থানও দখল করে নেয়। ১৮৮২ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বাংলার ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকটি কথা’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন ‘বঙ্গদর্শন’-এ। সে বঙ্গদর্শন আবার সম্পাদনা করতেন খোদ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায়। বাংলার ইতিহাস বলতে তিনি বাঙালি হিন্দুর ইতিহাস ও বাঙালি বলতে বাঙালি হিন্দুকেই বুঝিয়েছেন। মুসলমান শাসনামলকে তিনি বাংলার ইতিহাসে ঠাঁই দিতে নারাজ। তার চোখে বাঙালির জাগরণ মানে বাঙালি হিন্দুর জাগরণ। সেই প্রবণতা নতুন মাত্রা যোগ করে ১৮৯২ সালে প্রকাশিত আরেক বাঙালি চন্দ্রনাথ বসুর বই ‘হিন্দুত্ব’। আনুষ্ঠানিকভাবে এটাই হিন্দুত্ব শব্দের প্রথম ব্যবহার। ১৮৯৪ সালে কলকাতা রিভিউ পত্রিকার জুলাই সংখ্যায় আড়াই পাতাজুড়ে লেখা হয় বইটির রিভিউ। বইটিকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে। 

স্বদেশী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন অনুশীলন সমিতির অরবিন্দ ঘোষ। তিনি লন্ডন ও কেমব্রিজে লেখাপড়া করেন ও ‘রাজনৈতিক বেদান্ত’ দর্শন নিয়ে তৎপরতা চালান। জাতীয় পরিচিতির সঙ্গে তিনিই যুক্ত করেন দেবী কালীকে। এদিকে ব্রাহ্ম পরিবারের দুই সন্তান বিপিনচন্দ্র পাল ও সরলা দেবী জাতীয় কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করেন কালী পূজা ও শিবাজি উৎসব। জয়া চ্যাটার্জির ভাষায়, ‘বাংলার সন্ত্রাসী দলগুলো পাশ্চাত্য শিক্ষিত লোকদের মধ্য থেকে দলীয় সদস্য সংগ্রহ করলেও যুবক অনুসারীদের শাক্ত দর্শন দ্বারা অনুপ্রাণিত ধর্মীয় শপথে আবদ্ধ করত। এমনকি বেশভূষায় পুরোপুরি ইংরেজের মতো দেখা গেলেও চিত্তরঞ্জন দাশ বৈষ্ণববাদ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন। বৈষ্ণব মরমি বা অতীন্দ্রিয়বাদী কবিতার ক্ষেত্রে তার অবদান বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। তার যুবক সহযোগী সুভাষ বসুও ছিলেন রামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্য। সুতরাং দেখা যায়, বাঙলার সামাজিক ইতিহাস বর্ণনার ক্ষেত্রে ‘পাশ্চাত্যকরণ’-এর বাছবিচারহীন ব্যবহার খুবই বিপজ্জনক। আবার আধুনিকতা ও অগ্রগতির মুখপাত্র হিসেবে ভদ্রলোকদের নিজেদের দাবি করাও বিজ্ঞজনোচিত নয়।

ভারতে একটি স্বাধীন জাতীয় রাষ্ট্র সৃষ্টির প্রয়াসকে ওপর থেকে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির মনে হলেও ওই প্রয়াসের ভিত্তি ছিল ‘ভারত’-এর সঙ্গে ‘হিন্দুত্ব’কে এক করে ফেলার দর্শন। আন্দোলনকারীদের কাছে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে সংগঠিত করার লক্ষ্য ছিল স্থবির হিন্দু জাতির পুনর্জাগরণ ও নতুন করে তাকে সবল করা। হিন্দু সাম্প্রদায়িক আলোচনায় ব্যবহৃত বাগধারা বা ভাষা জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারায়ও তাই চিহ্নিত করা যায়। এমনকি ‘বাঙলার রেনেসাঁ’র চিন্তা-চেতনা প্রকাশের ক্ষেত্রেও তাকে পাওয়া যাবে এবং এটি বিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত সাধারণ রেওয়াজে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী কয়েক দশকে এ বাগধারাগুলোকে সূক্ষ্মভাবে ঢেলে সাজানো হয়, বিষয়বস্তুর দিক থেকে ব্রিটিশবিরোধিতা থেকে সরে গিয়ে মননে-মেজাজে মুসলিমবিরোধিতাকে প্রাধান্য দেয়া হয়।

স্বদেশী আন্দোলনের আন্দোলনকারীরা গর্বের সঙ্গে বর্ণনা করতে লাগলেন মধ্যযুগের রাজা-রাজড়াদের বীরত্বকে, বিশেষ করে যারা মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। ফলে দেশপ্রেম বলে যা বিবেচিত হলো, তা মূলত হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদ ও মুসলিমবিরোধিতাই। জাতীয়তাবাদ বলতে যা ছিল, তা হলো হিন্দু জাতিস্বার্থের বিবেচনা। আহমদ ছফা এ বিষয়ে বলেছিলেন, ‘ভারতে বৃটিশ শাসন প্রবর্তিত হওয়ার পর থেকেই ভারতের আত্মবিস্মৃত হিন্দুরা হিন্দুসত্তা তথা ভারতীয় সত্তা ফিরে পেতে আরম্ভ করে। বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠে তার সূচনা এবং বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মাধ্যমে হিন্দুসত্তা চূড়ান্ত সার্থকতার সঙ্গে বিরাট একটা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে পেরেছে। একটি হিন্দু রাষ্ট্রের স্বপ্ন নির্মাণ করে ভারতীয় হিন্দুদের যথার্থ পথ প্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছেন বঙ্কিম।’

আহমদ ছফার দাবি, ‘অনুশীলন ও যুগান্তর দুটি সন্ত্রাসপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা এবং কর্মীরা বঙ্কিমকে তাদের গুরু ও আনন্দমঠ গ্রন্থটিকে প্রেরণাপুস্তক হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।’ আসলে ১৯০২ সালে প্রতিষ্ঠিত অনুশীলন সমিতির নামের উৎসই ১৮৮৮ সালে বঙ্কিমের লেখা প্রবন্ধ অনুশীলন। অন্যদিকে ১৯০৬ সালে জন্মলাভ করে যুগান্তর দল। তাদের অধিকাংশই ছিলেন ভদ্রলোক। তারা ভগবতগীতা থেকে অনুপ্রাণিত ছিলেন। তাদের অনুপ্রেরণা ছিল বঙ্কিমের রচনা, স্বামী বিবেকানন্দ, ভগিনী নিবেদিতা ও মাজিনির আত্মজীবনী। শেষটা পড়া হতো গেরিলা যুদ্ধের বিবরণীর জন্য। বাকি গ্রন্থগুলো উৎস ছিল হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী ধারণার। বিষয়টি আরো প্রমাণিত হয় তাদের সদস্য অন্তর্ভুক্তি প্রক্রিয়ায়। সংগঠনে যে মুসলিমদের ঠাঁই ছিল না, তা তুলে ধরেছেন বিপ্লবী ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ও হেমচন্দ্র কানুনগো। সদস্য হিসেবে দলে অন্তর্ভুক্ত করার সময় গীতা ছুঁয়ে শপথ নিতে হতো।

‘মুসলিম বাঙালি নয়’ এমন ধারণার পাশাপাশি ‘হিন্দুরা বিপদে আছে’ এমন একটি ধারণাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে ‘হিন্দুত্ববাদ’। সে যাত্রার শুরুও স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গেই। ১৯০৯ সালে প্রকাশ হয় ‘আ ডায়িং রেস’, বইটির লেখক কর্নেল উপেন্দ্রনাথ মুখার্জি। সেখানে উল্লেখিত প্রবন্ধগুলো আগে কলকাতাভিত্তিক ইংরেজি পত্রিকা ‘বাঙালি’তে প্রকাশ হয়েছে। আলোচনার মূল কথাই ছিল ‘হিন্দুরা বিপদে আছে’, ‘তাদের জেগে উঠতে হবে এবং দায়িত্ব পালন করতে হবে’। 

উপেন্দ্রনাথ মুখার্জির এ লেখাগুলো এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিল যে তাকে ১৯১১ সালে বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল কংগ্রেস কমিটিতে বক্তব্য দেয়ার জন্য দাওয়াত দেয়া হয়। পূর্ব বাংলার ফরিদপুরে সে সেশন হয়। মুখার্জির লেখাগুলো বাংলার ভেতরই কেবল নয়, বাইরের মানুষকেও প্রভাবিত করেছে ব্যাপকভাবে। স্বামী শ্রদ্ধানন্দ যিনি পরবর্তী সময়ে অখিল ভারত হিন্দু মহাসভার নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। শ্রদ্ধানন্দ সরাসরি উপেন্দ্রনাথ মুখার্জির লেখা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। ১৯১২ সালে তিনি কলকাতায় তার সঙ্গে দেখাও করেন। তার চিন্তা গড়ে তোলার পেছনে মুখার্জির যে অবদান আছে, সেটাও তিনি স্বীকার করেন ১৯২৫ সালে পাটনায় দেয়া এক ভাষণে। ১৯২৩ সালে সাভারকার তার ‘এসেনশিয়ালস অব হিন্দুত্ব’ লিখে হিন্দুত্ববাদের তাত্ত্বিক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। সেখানেও বিম্বিত হয় উপেন্দ্রনাথ মুখার্জীর প্রভাব। হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক এ সময় থেকেই তলানিতে নামতে শুরু করে, যা ১৯২২ সালের খেলাফত আন্দোলনের পর ভয়াবহ রূপ নেয়। 


তথ্যসূত্র

১. রবীন্দ্রনাথ ও বাংলার বিপ্লবী সমাজ, মঞ্জুশ্রী মিত্র, টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট

২. ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতার সংগ্রাম, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত

৩. শতবর্ষের ফেরারী: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, আহমদ ছফা, প্রাচ্যবিদ্যা প্রকাশনী

৪. Mission Bengal: A Saffron experiment, Snigdhendu Bhattacharya, Herper Collins, 

৫. বাংলা ভাগ হলো, জয়া চ্যাটার্জি, অনুবাদ, আবু জাফর দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড

৬. A dying Race, U. N. Mukerji, Calcutta, 

৭. রবীন্দ্রনাথ ও বিপ্লবী সমাজ, চিন্মোহন সেহানবীশ 

আহমেদ দীন রুমি: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা