সিল্করুট

রাখিবন্ধনের দিনে রবীন্দ্রনাথ

বঙ্গভঙ্গ রোধে ঐক্যের আহ্বান পৌঁছে দিতে ‘বঙ্গচ্ছেদে রাখীবন্ধন’ শীর্ষক ইশতেহার প্রকাশ হয় বঙ্গদর্শনে। পত্রিকাটির সম্পাদক তখন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রকাশিত সে ইশতেহারে তিনি ছাড়াও স্বাক্ষর করেছিলেন ভূপেন্দ্রনাথ বসু, সুরেন্দ্র নাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী ও বিপিন চন্দ্র পাল। তাতে বলা হয়, ‘আগামী ১৬ই অক্টোবর, ৩০শে আশ্বিন, সোমবার আইন দ্বারা আমাদের বাঙ্গলা দেশ বিভক্ত হইবে। আসুন, আমরা ঐ দিনকেই আমাদের সমস্ত বাঙ্গালীর ঐক্যবন্ধনের দিন করি। ঐ দিনে আমরা পরস্পরের হাতে হরিদ্রাবর্ণের সূতার ঘরে ঘরে অথবা প্রকাশ্যস্থলে সম্মিলিত হইয়া, রাখী-বন্ধন করিয়া, আমাদের অখণ্ড ভ্রাতৃভাব সকল বাঙ্গালী মিলিয়া প্রকাশ করি। এই শুভ বন্ধনের স্থায়িত্ব কামনায় ঐ দিন আমরা সংযম গ্রহণ করিব... ঐ দিনকেই প্রতি বৎসর বাঙ্গালীর রাখী-বন্ধনের দিন করিয়া স্মরণীয় করিয়া রাখিব। আশা করি, বঙ্গের জমিদার-সম্প্রদায় প্রজাগণকে, গ্রামের প্রধানেরা গ্রামবাসীদিগকে, বিদ্যালয়ের ছাত্রগণ তাহাদের প্রতিবাসীদিগকে এই অনুষ্ঠানের তাৎপর্য্য বুঝাইয়া দিয়া, যাহাতে বঙ্গের প্রত্যেক গ্রামে জাতীয় ঐক্যবন্ধনোৎসব সুচারুরূপে সম্পাদিত হয়, অবিলম্বে তাহার আয়োজন করিবেন।’

১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর। মিছিলের আয়োজন করেছিল বন্দে মাতরম সোসাইটি। পূর্ব ঘোষণা অনুসারেই হয় সবকিছু। গঙ্গায় একটা ডুব দিয়ে শুরু হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দিন। তিনি এগিয়ে গেলেন সামনে। সেদিন হিন্দু ও মুসলমান সবার হাতে রাখি পরিয়ে দিলেন রবীন্দ্রনাথ। রাস্তার দুপাশের সব মানুষকে রাখি পরাতে পরাতে এগিয়ে গেলেন নাখোদা মসজিদের দিকে। কবির সঙ্গে তখন বিপুল রাখি। তিনি যখন মসজিদের চত্বরে যেতে চাইলেন, তখন অনেকেই বিষয়টিকে বাড়াবাড়ি মনে করেছিলেন। কিন্তু কবি চাচ্ছিলেন, সেখানকার মৌলভিদের হাতে রাখি পরিয়ে দিতে। সেটাই হলো। চিতপুর রোডে মানুষের উৎসাহ ও ভালোবাসা নিয়ে তিনি গড়ে তুললেন এক ‘অনন্য রাখীবন্ধন উৎসব।’ প্রতি বছর এ দিনকে, ‘আমাদের জাতীয় সম্মেলনের এক মহাদিন বলিয়া গণ্য করিব’ বলে ঘোষণা করলেন। সেদিন জোড়াসাঁকো থেকে পায়ে হেঁটে রবীন্দ্রনাথ এলেন আপার সার্কুলার রোড (বর্তমান এপিসি রোড) ফেডারেশন হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে। ফেডারেশন হলের অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিলেন তিনি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও বঙ্গের মানুষকে একত্র করার জন্য ‘অখণ্ড বঙ্গ ভবন’ তৈরির চিন্তা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

সেদিন বিকাল ৪টার দিকে ভিত্তি স্থাপন করা হয় ফেডারেশন হলের। সেখানে যাওয়ার পথেই দীর্ঘ হয়ে যায় মিছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এগিয়ে চললেন। তার কণ্ঠে গান। ছাদ থেকে উঁকি দিচ্ছেন নারীরা। ফেডারেশন হলটি বাঙালির ঐক্যের প্রতীক হিসেবেই চিহ্নিত হয়েছিল। ব্যারিস্টার আনন্দমোহন বসু ছিলেন অনুষ্ঠানের সভাপতি। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন সে সময়। তার ভাষণ প্রায় ৫০ হাজার লোকের সামনে ইংরেজিতে পাঠ করে শোনালেন আশুতোষ চৌধুরী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সে ভাষণের বাংলা পড়ে শোনালেন। সে সভার শেষে ঘোষণা দেয়া হলো, ‘বাঙালি জাতির সার্বিক প্রতিরোধের পরও যেহেতু সরকার বাংলাকে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেখানে আমরাও জনগণের তরফ থেকে ঘোষণা করছি, এ দুষ্কর্ম ঠেকাতে আমাদের সাধ্যের মধ্যে থাকা সব ধরনের প্রচেষ্টা আমরা চালিয়ে যাব। বাংলা ভাগ করাকে ঠেকানো ও ঐক্য রাখার জন্য।’ 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পুরো ঘোষণা বাংলায় পড়ে শোনালেন। সভা শেষ হলে নতুন উদ্যমে মিছিল রওয়ানা হলো পশুপতি বসুর বাসভবনের দিকে। সবার তখন খালি পা। সবার মুখেই রবীন্দ্রনাথের নতুন লেখা গান- 

ওদের  বাঁধন যতই শক্ত হবে ততই বাঁধন টুটবে,

       মোদের ততই বাঁধন টুটবে,

   ওদের  যতই আঁখি রক্ত হবে মোদের আঁখি ফুটবে,

       ততই মোদের আঁখি ফুটবে।

আজকে যে তোর কাজ করা চাই,  স্বপ্ন দেখার সময় তো নাই

   এখন  ওরা যতই গর্জাবে, ভাই তন্দ্রা ততই ছুটবে,

       মোদের   তন্দ্রা ততই ছুটবে ॥

গন্তব্যে পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। সেখানেও পরবর্তী কার্যক্রম বিষয়ে আলোচনা চলে। ভাষণ দেন বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। স্বদেশী আন্দোলন ও বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনের জন্য খোলা হলো জাতীয় তহবিল। জনতার কাছ থেকে সহযোগিতাও কামনা করা হয়। মুহূর্তেই উঠল কয়েক হাজার রুপি। সে ফান্ড ব্যয় করার ঘোষণা দেয়া হয় বাঙালি ছাত্রদের উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য বিদেশ পাঠানোর পেছনে। এর মধ্য দিয়ে তাদের বিশ্বাস বিদেশী পণ্যের প্রতি অতিনির্ভরশীলতা সময়ের ব্যবধানে কমে যাবে। এদিনে পরে বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলন যেন ছড়িয়ে পড়তে থাকে নতুন করে। সে আন্দোলনের তীব্রতাই ব্রিটিশ সরকারকে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।