সিল্করুট

জমিদার ও কলকাতার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রতিক্রিয়া

আসরার আবেদিন

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা ভারতমাতা ছবি: কামাত

বঙ্গভঙ্গ নিয়ে বহু জনের বহু মতবাদ আছে। কেউ একে দেখেছেন বাংলাকে ভাগ করার ইংরেজ ষড়যন্ত্র হিসেবে, কেউ দেখেছেন মুসলমানদের উন্নত হওয়ার সম্ভাব্য সুযোগ হিসেবে। বিশেষত পূর্ব বাংলা বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে উপকৃত হবে, উন্নতি হবে এমনটাই বিশ্বাস করতেন পূর্ববঙ্গের মানুষ ও নেতারা। এ কথা সত্য যে এই বিভাগের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার একটি নিজস্ব পরিচিতি ও রাজশক্তির কাছে তার গুরুত্ব তৈরি হয়েছিল। সে কারণেই পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতাভিত্তিক শিক্ষিত শ্রেণী ও জমিদাররা এর বিরোধিতা করেছিল। বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার সময় থেকেই এ বিরোধিতা শুরু এবং দিনে দিনে বঙ্গভঙ্গ বাতিলের আন্দোলন শুরু হয়। এর সূতিকাগার ছিল ভাগীরথীর পশ্চিমের বাংলা। সেখানে এ আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিরা ছিলেন ধর্মে হিন্দু ও সমাজের উচ্চকোটির জনতা।

বঙ্গভঙ্গের অব্যবহিত পূর্বই ভারতে নানা ধরনের প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল বিভিন্ন গুপ্ত দল। তরুণরাই ছিল এদের প্রধান হাতিয়ার। বিভিন্ন ব্যায়াম সমিতিতে ছেলেরা তখন লাঠিখেলা শিখত, মুগুর ভাঁজত, ছোরা খেলার তালিম নেয়া ছিল নিয়মিত বিষয়। ছিল নানা ধরনের সাংস্কৃতিক উৎসবও। যেমন মহারাষ্ট্রে হতো শিবাজি উৎসব এবং তার আদলে ঠাকুরবাড়ির মেয়ে সরলা দেবী চৌধুরানী শুরু করেছিলেন প্রতাপাদিত্য উৎসব। এর মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী একটি বার্তা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই সঙ্গে ছিল ব্রিটিশদের বিরোধিতা ও নিজেদের জনপ্রিয় করে তোলা। ঠাকুরবাড়ি সে সময় ছিল অন্যতম ব্যবসায়ী ও জমিদার পরিবার। স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের কাজ ও বাণিজ্য ঠিক রাখার প্রয়োজন তাদের ছিল। সেই সঙ্গে এ পরিবারের ছিল একটি সাংস্কৃতিক পরিচিত। সেটিও রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন সবাই।

বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা হলে ঠাকুরবাড়ি শুরু থেকেই এ নিয়ে সচেতন ছিল। ঠাকুরবাড়ির পুরুষ সদস্যরা নানা সভা সমিতিতে এ নিয়ে আলোচনা করতেন। এমনকি ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর জোড়াসাঁকোর বাড়িতে একটি মিটিং হচ্ছিল। রবীন্দ্রনাথ নিজেও ছিলেন সে সভায়। সেদিনই রাখিবন্ধন করা হয়। এতে রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি ঠাকুরবাড়ির সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।

বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে ঠাকুরবাড়ি থেকে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। ১৯০৫ সালেই তিনি আঁকেন তার বিখ্যাত ছবি ‘বঙ্গমাতা’। সেটাই পরবর্তীকালে ভারতমাতা ছবি হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ছবিতে অবনীন্দ্রনাথ বঙ্গমাতাকে হিন্দু সম্পদের দেবী লক্ষ্মীর রূপে বৈষ্ণব সন্ন্যাসিনীর বেশভূষায় চিত্রিত করেছেন। ছবিটিতে ভারতের অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক বিষয় আছে—যেমন একটি বই, ধানের শিলা, সাদা কাপড়ের টুকরো এবং একটি মালা। এছাড়া ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রটির চারটি হাত রয়েছে, যা হিন্দু চিত্রের উদ্দীপক। পরবর্তী সময়ে এ ছবির নাম হয় ‘ভারতমাতা’। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের ‘মা’ থিমের সঙ্গে এ ছবির মিল আছে। দুটো ছবিই ব্রিটিশবিরোধিতা, হিন্দুত্ব ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে প্রভাব রেখেছিল। ছবিটি বঙ্গভঙ্গের সময়ে আঁকা এবং বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনেও ছিল এর ভূমিকা।

ঠাকুরবাড়ির পাশাপাশি কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজও বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিল। পূর্ববঙ্গে বঙ্গভঙ্গের শুরুতে এর বিরোধিতা দেখা দিলেও পরে একে স্বাগত জানায়। কিন্তু কলকাতাভিত্তিক শিক্ষিত হিন্দু সমাজ শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করে এবং দিনে দিনে আন্দোলন আরো বেগবান হয়।

বঙ্গভঙ্গের পর পরই কলকাতাকেন্দ্রিক রাজনীতিবিদ, আইনজীবী ও ধনী সমাজ এ বিভাগকে ধর্মীয়ভাবে উপস্থাপন করে। কলকাতার উচ্চ বর্ণের ও শিক্ষিত হিন্দু সম্প্রদায়ের জমিদার, রাজনীতিবিদ, শিল্পপতি, আইনজীবীরা বঙ্গভঙ্গের বিপক্ষে অবস্থান নেন। মনে রাখা প্রয়োজন বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে রাজনীতিতে প্রথম সারিতে ছিলেন আইনজীবীরা। এরা প্রত্যেকেই ছিলেন ধনী এবং অনেকেই জমিদার বা উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে আসা। বঙ্গভঙ্গ নিয়ে তাদের ন্যারেটিভ ছিল—বাংলা ভাগ করা বাঙালিবিরোধী, জাতীয়তাবাদবিরোধী ও বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদ।

১৭ জুলাই বয়কটের ডাক দেন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি। ১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট কলকাতার টাউন হলে কাশিম বাজারের জমিদার মহারাজা মহেন্দ্রচন্দ্র নন্দীর সভাপতিত্বে এক প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার মাধ্যমে এ প্রতিবাদে প্রায় এক লাখ লোক উপস্থিত থাকার কথা জানা যায়। নতুন প্রদেশে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল মহারাজার মাথাব্যথার মূল কারণ। এখানেই দেখা যাচ্ছে, বিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিলেন জমিদার, উকিল ও অন্য নেতারা। সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির সঙ্গে ছিলেন আনন্দমোহন বসু। 

বঙ্গভঙ্গ মূলত পূর্ব বাংলার মানুষের জন্য স্বরাজ বা স্বশাসনের সুযোগ ও সম্ভাবনা নিয়ে এসেছিল। দুই অঞ্চলের অভিজাতদের মধ্যেও এ নিয়ে তাই ছিল বিভেদ। কলকাতাভিত্তিক অভিজাতরা যদিও এর বিরোধিতা করেছিল, ঢাকার নবাব খাজা সলিমুল্লাহ একে স্বাগত জানিয়েছিলেন। পরে ঢাকার সাধারণ মানুষ ও কৃষকরাও বঙ্গভঙ্গ সমর্থন করতে শুরু করে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে ছিল নতুন কিছু পাওয়ার আশা। বঙ্গভঙ্গের পরই মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ে ১৯০৬ সালে গঠিত হয় মুসলীম লীগ। পূর্ব বাংলা প্রদেশ গঠনের সিদ্ধান্ত ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মুসলমানরাও স্বাগত জানিয়েছিল। মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি, মুসলিম সাহিত্য সমিতি, মোহামেডান প্রভিন্সিয়াল ইউনিয়নসহ বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনগুলো বঙ্গভঙ্গকে স্বাগত জানিয়েছিল।

কংগ্রেসের নেতারাও বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিলেন। বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলন তারাও এগিয়ে ছিলেন। এ সময় হিন্দু স্বার্থ সংরক্ষণের বিশেষ উদ্দেশ্য গঠিত হলো হিন্দু মহাসভা। বিষয়টি নিয়ে বদরুদ্দীন উমর লিখেছেন, ‘অনেক কংগ্রেস নেতাও হিন্দু মহাসভার প্রতিষ্ঠা সমর্থন করেন। কংগেসের উচ্চ নেতৃস্থানে অবস্থান করেও যারা হিন্দুরাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলতেন এ সমর্থন তারাই জ্ঞাপন করেন। এদের মধ্যে মদনমোহন মালব্য, লালা রাজপত রায়, বালগঙ্গাধর তিলক, বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ।’১

ফলে বঙ্গভঙ্গ একসময় হয়ে উঠেছিল বিভক্তির বিষয়। ব্রিটিশরা না যতটা ভাগ করেছেন, বঙ্গভঙ্গ নিয়ে আন্দোলন করতে গিয়ে দুই অংশের বিভক্তি আরো স্পষ্ট হয়। এর মধ্যে কেবল যে সামাজিক বিভক্তিই দেখা গেল, তা নয়। একটা অর্থনৈতিক বিভক্তিও স্পষ্ট। এতসবের মধ্যে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির হিন্দুত্ববাদী আচরণও স্পষ্ট। আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, ‘আমি কথা বলছিলাম যখন আমার চোখ মন্দির এবং প্রতিমার প্রতি নিবদ্ধ ছিল। পারিপার্শ্বিকতা আমার হৃদয়কে আবেগে পূর্ণ করে তুলেছিল। হঠাৎ আমি আবেদন জানালাম জনতার প্রতি, আপনারা উঠুন, চলুন, আমরা আমাদের পুণ্য দেবতার কাছে শপথ গ্রহণ করি। মন্দিরে শপথ বাক্য আমিই পাঠ করিয়েছিলাম। আমি শপথ বাক্য বলছিলাম, আর জনতা দাঁড়িয়ে আমার কথার পুনরাবৃত্তি করছিল।’২

অর্থাৎ, পুরো বিষয়টি একটা সময় ভিন্ন মোড় নেয়। বঙ্গভঙ্গ যতটা না প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক ছিল, তা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষার আন্দোলনে পরিণত হয়।

তথ্যসূত্র

১. ‘ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন’, বদরুদ্দীন উমর, পৃষ্ঠা ৮৯।

২. ‘Surendranath Banerjee’, পৃষ্ঠা ২২৮-২২৯ দ্রষ্টব্য ‘বঙ্গভঙ্গ’, মুনতাসির মামুন, পৃষ্ঠা ৫৯।

আসরার আবেদিন: লেখক