সিল্করুট

বঙ্গভঙ্গের শেকড় সন্ধান

খুরশিদ জাহান

বামফিল্ড ফুলারকে সংবর্ধনা জানাতে ঢাকার ইসলামপুর রাস্তায় পূর্ববঙ্গের জনতা ছবি: ফ্রিৎজ ক্যাপ

ব্রিটিশ ভারত ও বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তৎকালে সমগ্র বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, মধ্যপ্রদেশ ও আসামের কিছু অংশ নিয়ে ছিল বাংলা প্রদেশ। ১৯০৫ সালে ভারতের তৎকালীন বড়লাট লর্ড জর্জ নাথানিয়েল কার্জন এ প্রদেশকে ভাগ করেন, যা ইতিহাসে বঙ্গভঙ্গ নামে পরিচিত। উত্তর ও পূর্ব বাংলাকে আসামের সঙ্গে সংযুক্ত করে পূর্ব বাংলা ও আসাম নামে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়। অন্যদিকে পশ্চিম বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে গঠন করা হয় বাংলা প্রদেশ। বঙ্গভঙ্গের মধ্য দিয়ে বাংলায় হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি হয়। সংগত কারণেই প্রশ্ন ওঠে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার বঙ্গভঙ্গ করল কেন! বর্তমান লেখায় সেদিকটিই আমরা জানার চেষ্টা করব।

১৭৫৭ সালে পলাশীতে যখন যুদ্ধ চলছিল, পাশের ক্ষেতে তখন কৃষকরা চাষাবাদ করছিলেন। এত বড় একটা ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, অথচ দেশের সাধারণ মানুষের সেখানে অংশগ্রহণ ছিল না। এ জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকেই ১৫০ বছরেরও কম সময়ে একটি শিক্ষিত, রাজনীতি সচেতন, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে। তাদের কর্মকাণ্ড ব্রিটিশ উপনিবেশ সরকারকে এতটাই চিন্তায় ফেলেছিল যে বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে তাদের দুর্বল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। বঙ্গভঙ্গের পেছনে প্রশাসনিক কারণও দায়ী ছিল, সে কথা অস্বীকার করা যাবে না। তবে ব্রিটিশদের প্রশাসনিক সমস্যার সুরাহার আড়ালে রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করা ছিল অন্যতম কারণ। যার মধ্য দিয়ে ভারতে দীর্ঘদিন ঔপনিবেশিক শাসন পরিচালনার নীলনকশা প্রণয়ন করেছিল ব্রিটিশরা। বঙ্গভঙ্গের কারণ বিশ্লেষণে ঐতিহাসিকরা উপর্যুক্ত দুটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। ব্রিটিশপন্থী ঐতিহাসিকরা প্রশাসনিক কারণকে বঙ্গভঙ্গের প্রধান কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। মেকলে, রিজলে, ইবেৎসেন, ফ্রেজার, গডলেক, লর্ড কার্জনসহ ব্রিটিশ কর্মকর্তারা মতটি প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অন্যদিকে বাঙালি ঐতিহাসিক ও জাতীয়তাবাদী নেতাদের বড় অংশই মনে করেন বঙ্গভঙ্গের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। অমলেশ ত্রিপাঠী, সুমিত সরকার প্রমুখ ঐতিহাসিক এ মতকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

প্রথমেই প্রশাসনিক কারণের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। ১৮৫৪ সালে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা ও আসাম নিয়ে বাংলা প্রদেশ গঠিত হয়েছিল। আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় প্রদেশ হওয়ায় বাংলায় শাসন পরিচালনা করা একজন গভর্নরের পক্ষে দুরূহ হয়ে পড়েছিল। বাংলায় নিযুক্ত কর্মকর্তারা এ অসুবিধার কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার তুলে ধরেন। ১৮৬৬ সালে উড়িষ্যার দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় সরকারের ব্যর্থতা অনুসন্ধানের জন্য ভারত সচিব স্যার স্ট্যাফোর্ড হেনরি নর্থকোট একটি কমিটি গঠন করেন। এ কমিটি দুর্ভিক্ষের প্রধান কারণ হিসেবে বাংলার প্রশাসনিক সমস্যাকে দায়ী করে বাংলা ভাগের সুপারিশ করে। ১৮৬৭ সালে বাংলার ছোট লাট উইলিয়াম গ্রে আবারো বাংলা প্রদেশ বিভক্তির সুপারিশ করেন। ১৮৭২ সালে ভারতের প্রথম আদমশুমারিতে বাংলা জনবহুল এলাকা হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রশাসনিক অসুবিধার থেকে উত্তরণের জন্য ছোট লাট ক্যাম্বেলের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৭৪ সালে আসামকে সিলেট, কাছাড় ও গোয়ালপাড়া চিফ কমিশনারের অধীনে এনে বাংলা থেকে পৃথক করা হয় (এ ব্যবস্থা পরবর্তী সময়ে ব্যর্থ হয়েছিল)। ১৮৯৬ সালে আসামের চিফ কমিশনার উইলিয়াম ওয়ার্ড ঢাকা, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম জেলাগুলোকে আসামের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করেন। ১৮৯৮ সালে লর্ড কার্জন ভারতের বড় লাট হয়ে এলে এ সুপারিশগুলো বিবেচনায় নেন। ১৯০৩ সালে স্বরাষ্ট্র সচিব হাবার্ট রিজলে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলাকে আসামের সঙ্গে সংযুক্ত করে চিফ কমিশনারের অধীনে ন্যস্ত করার প্রস্তাব দেন। বাংলার শিক্ষিত হিন্দু সমাজ এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। তবে বিভিন্ন সংস্থা, ব্যক্তিদের স্বার্থ অপেক্ষা প্রশাসনিক স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ—এ যুক্তিতে কার্জন বঙ্গভঙ্গ করেন। বঙ্গভঙ্গের আগে লর্ড কার্জন নিজেও পূর্ব বাংলা সফর করেন। বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে নতুন প্রদেশের রাজধানী ঢাকা করার প্রস্তাব দেন। যাতে এ অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন সাধন করা যায়।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলো বঙ্গভঙ্গের মধ্য দিয়ে তারা পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার মধ্যকার বৈষম্য দূর করতে চায়। কলকাতায় রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে সব প্রশাসনিক কার্যক্রম পশ্চিম বাংলাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছিল। কলকাতাকে কেন্দ্র করেই বাংলা প্রদেশের সব ধরনের অর্থনৈতিক বিকাশ, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ ও প্রশাসনিক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এবং পূর্ব বাংলা দীর্ঘকাল ছিল অবহেলিত। পূর্ব বাংলার সরবরাহকৃত কাঁচামালে সচল ছিল কলকাতার শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো। বঙ্গভঙ্গ হলে পূর্ব বাংলায় নিজস্ব শিল্প কারখানা গড়ে ওঠা, পাটসহ অন্যান্য কাঁচামালের নায্যমূল্য প্রাপ্তি, সেই সঙ্গে বেকার জনসংখ্যার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা যায়।

অর্থনৈতিক বৈষম্যের জন্য অন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণটি ছিল জমিদারি প্রথা। পূর্ববঙ্গের জমির মালিকরা অধিকাংশই কলকাতায় বসবাস করতেন। তাদের নিযুক্ত লোকজন কৃষকের ওপর অমানবিক শোষণ চালিয়ে কলকাতায় জমিদারদের অর্থের জোগান দিত। বঙ্গভঙ্গ হলে কৃষকরা জমিদারের অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। এদিকে পূর্ব বাংলায় জনকল্যাণ ও অগ্রগতির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় হতো না। পূর্ব বাংলার যোগাযোগ, পুলিশ ও ডাক ব্যবস্থা অত্যন্ত সনাতন প্রকৃতির ছিল। ফলে এখানকার মানুষের নিরাপত্তা যেমন হুমকির মুখে পড়েছিল, পূর্ব বাংলার উন্নয়ন কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছিল। এভাবেই পশ্চিম বাংলা এগিয়ে গেলেও সব দিক থেকে পূর্ব বাংলার ক্রমেই পিছিয়ে পড়া ব্রিটিশ সরকারের দৃষ্টিগোচর হয়। এছাড়া রাজস্ব আহরণ, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রসার আরো নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় প্রশাসনকে। প্রদেশের শাসনকার্য সুচারুভাবে পালন করতে বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নরের দায়িত্ব লাঘব করা দরকার হয়ে পড়েছিল। বাংলা প্রদেশ ভাগ করে দুটি আলাদা প্রদেশ গঠিত হলে প্রশাসকদের পক্ষে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সামগ্রিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এ যুক্তিতেই ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ অপরিহার্য বলে সিদ্ধান্ত নেয়।


সহায়ক গ্রন্থাবলি

১. বাংলাদেশের ইতিহাস, ড. মুহাম্মদ আবদুর রহিম, ড. আবদুল মমিন চৌধুরী, ড. এবিএম মাহমুদ ও ড. সিরাজুল ইসলাম

২. বাংলাদেশের ইতিহাস ১৯০৫-১৯৭১, ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেন

৩. বাংলাদেশের ইতিহাস ১৯০৫-৪৭, ড. মো. মাহবুবুর রহমান

খুরশিদ জাহান: প্রভাষক, ইতিহাস বিভাগ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ