সিল্করুট

প্রত্নলেখমালায় হরিকেল রাজা দেবাতিদেব কান্তিদেব ও অত্তাকরদেব

খুরশিদ জাহান

অত্তাকরদেবের তামার ফুলদানিতে উৎকীর্ণ লিপি ছবি: শরিফুল ইসলামের নিউ লাইট অন দ্য হিস্ট্রি অব অ্যানসিয়েন্ট সাউথ-ইস্ট বেঙ্গল

হরিকেল মেঘনাসংলগ্ন আর একটি আলাদা উপ-অঞ্চল, যা সুনির্দিষ্টভাবে সমতটের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে সম্পর্কযুক্ত। পণ্ডিতরা অতীতে ভুলবশত একে শ্রীহট্ট বলে শনাক্ত করেছিলেন। এ প্রমাদ ঘটেছে রূপচিন্তামণিকোষ ও কল্পদ্রুকোষের সংস্কৃত পাণ্ডুলিপির ওপর ভরসা করার কারণে। বিএন মুখার্জি স্পষ্ট দেখিয়েছেন আজকের চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম সন্নিহিত কিছু এলাকা হরিকেল রাজ্যভুক্ত ছিল। উপকূলবর্তী চট্টগ্রাম ও নিকটবর্তী এলাকাগুলো নিয়ে প্রাচীনকালে খুব সম্ভবত একটি পৃথক রাজনৈতিক সত্তা গড়ে ওঠে।...রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আয়তন বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় ভারতের ত্রিপুরা ও বাংলাদেশের নোয়াখালী, কুমিল্লা ও সিলেট হরিকেল রাজ্যভুক্ত হয়। এ স্থানগুলো অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় হরিকেল একটি সুনির্দিষ্ট প্রাকৃতিক পরিসীমার অধিকারী হয়: দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্ব ও উত্তর-পূর্বে চট্টগ্রাম, ত্রিপুরা, কাছাড় ও লুসাই পাহাড় শ্রেণী, এর উত্তরে জৈন্তা পাহাড়। মেঘনা ও সুরমা হরিকেলের পশ্চিমে সীমান্ত রচনা করেছে।... (আবদুল মমিন চৌধুরী)

আধারো-হরিকেল-রাজ-ককুদছত্র-স্মিতানাম-শ্রীয়াম

যশচন্দ্র-উপপদে বভূব-নৃপতির-দ্বীপে-দিলিপোপমঃ

শ্রীচন্দ্রের তাম্রশাসনে পিতা ত্রৈলোক্যচন্দ্রকে নিয়ে উপর্যুক্ত শ্লোকের আলোকে হরিকেলের সঙ্গে চন্দ্র বংশের সম্পর্কের ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শ্লোকের ‘আধার’ শব্দটিকে আগার ব প্রধান অবলম্বন অর্থে ধরে নিয়ে বলা যায় ত্রৈলোক্যচন্দ্র হরিকেলের শাসকের প্রধান অবলম্বন ছিলেন। তার সঙ্গে হরিকেলের শাসকের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কারণেই তিনি হরিকেলের রাজাকে সামরিক সুরক্ষা দিয়েছিলেন। ত্রৈলোক্যচন্দ্র যেহেতু মহারাজাধিরাজ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। এ থেকে বোঝা যায় তিনি নিজেই ছিলেন সামন্ত প্রভু, কোনো সামন্ত রাজা নয়। অর্থাৎ চন্দ্ররা হরিকেল শাসকের অধস্তন ছিলেন না। হরিকেলের শাসক চন্দ্র রাজার অধস্তন হোক বা বন্ধুই হোক কে বা কারা ছিল হরিকেল রাজা? এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে অকালপ্রয়াত প্রাচীন বাংলা গবেষক মো. শরিফুল ইসলামের বক্তব্যে—

‌হরিকেলের রজনৈতিক ইতিহাস এখনো খুব একটা স্পষ্ট নয়। ১৯২০ সালে চট্টগ্রামের একটি পুরনো মন্দিরে একটি অসম্পূর্ণ তাম্রশাসন পাওয়া যায়। মন্দিরটির স্থানীয় নাম বড় আখড়া। এই মন্দিরে প্রাপ্ত তাম্রশাসন থেকে প্রাচীন রাজ্য হরিকেল মণ্ডলের কান্তিদেব নামে একজন রাজার কথা জানা যায়। এটিই হলো এ-যাবতকালে প্রকাশিত হরিকেল রাজ্যের ইতিহাসের একমাত্র লিখিত প্রমাণ। তবে ১৯৯১ সালে গৌরীশ্বর ভট্টাচার্য দুটি তাম্র পুষ্পাধারে উৎকীর্ণ লিপি প্রকাশ করেন, যেখানে হরিকেলের আরো দুজন রাজার নাম প্রকাশ পেয়েছে; যথাক্রমে দেবাতিদেব ও অত্তাকরদেব। এই লেখ দুটি হরিকেলের রাজনৈতিক ইতিহাসের অনেক নতুন তথ্য প্রদান করেছে।... 

(শরিফুল ইসলাম)

১৯৬৮ সালে ঢাকার কাছে একটি দোকান থেকে উৎকীর্ণ লিপিসহ একটি ধাতব পাত্র ঢাকা জাদুঘরের সংগ্রহে আসে। গৌরীশ্বর ভট্টাচার্য লিপিটি পাঠোদ্ধার করে প্রকাশ করেন। এ থেকে দেবাতিদেব নামে প্রাচীন হরিকেল রাজ্যের একজন রাজার নাম জানা যায়। তিনি অনার্য খশ উপজাতির লোক। তার রাজ্যের নাম উল্লেখ করা হয়েছে খশমক এবং তার কার্যালয়ের নাম অশেষ-খশমক-অধিকরণ। ধাতব পাত্রে উৎকীর্ণ লিপিটি একটি ভূমিদানমঞ্জুরি। এর মাধ্যমে কয়েক পাটক জমি দান করেছেন মুখ্য প্রশাসক ও মুখ্যমন্ত্রী মহাযশস্ক নয়াপরাক্রমগোমিন। রাজা দেবাতিদেবও রাজকীয় কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে হরিতক-ধর্মসভা বিহারকে ৩৩ পাটক ভূমিদান করেছিলেন বুদ্ধের পূজায় নিরত বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের উপকারার্থে ও বিহারের সংস্কার কাজের জন্য। লিপিটিতে আরো দুটি জমি দানের উল্লেখ রয়েছে। যে ভূমিদান করা হয়েছে তা হরিকেল রাজ্যের আওতাধীন ছিল। এ থেকে ধারণা করা যায় দেবাতিদেব হরিকেলের রাজা ছিলেন। লিপিটিতে রাজা দেবাতিদেবের পূর্বসূরি বা উত্তরাধিকারীদের কোনো উল্লেখ নেই। এমনকি উৎকীর্ণ লিপিতে তার নামের সঙ্গে কোনো রাজা, মহারাজা বা মহারাজাধিরাজ উপাধি না থাকলেও তাকে শ্রীমদ দেবাতিদেব ভট্টারক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভট্টারক উপাধিই ইঙ্গিত দেয় যে তিনি একজন স্বাধীন রাজা ছিলেন। লিপিটির ‘শ্রীমদ দেবাতিদেব-ভট্টারকস্য-প্রবর্ধমান-বিজয়-রাজ্যে-সপ্ত-সপ্ততেমার্গশীর্ষে-সম্বৎসরে’ লাইন থেকে গৌরীশ্বর ভট্টাচার্য ধারণা করেন লেখটি ৭১৫ সালে উৎকীর্ণ হয়ে থাকবে।

একটি অসম্পূর্ণ তাম্রশাসনের ভিত্তিতে কান্তিদেব নামে হরিকেলের অন্য একজন রাজার সম্পর্কে জানা যায়। তাকে বর্ণনা করা হয়েছে পরমসৌগত, পরমেশ্বর ও মহারাজাধিরাজ বলে। পরমসৌগত শব্দ দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না যে তিনি একজন বুদ্ধ অনুসারী ছিলেন। তবে তার মাতা ছিলেন শিবের উপাসক। লিপিটিতে কান্তিদেবের পিতা ধনদত্ত ও পিতামহ ভদ্রদত্তের নাম উল্লেখ থাকলেও তাদের নামের সঙ্গে কোনো রাজ উপাধি যুক্ত না থাকায় ধারণা করা যায়, কান্তিদেবই এ বংশের প্রথম রাজা। তিনি মহারাজাধিরাজ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন, যা তাকে একজন স্বাধীন শাসক হিসেবেই উপস্থাপন করে। লিপিটিতে বর্ণিত আছে তাম্রশাসনটি জারি করা হয়েছিল রাজধানী নগর বর্ধমানপুর থেকে এবং সনদটি তিনি হরিকেল মণ্ডলের ভবিষ্যৎ রাজাদের রক্ষার আহ্বান জানিয়েছিলেন। অতীতে পণ্ডিদের মধ্যে এ বর্ধমানপুরের বর্তমান অবস্থান নিয়ে নানা মত থাকলেও বর্তমানে তা চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার বড় উঠান বা বড়োধন গ্রাম বলে শনাক্ত করা হয়েছে। কান্তিদেবের চট্টগ্রাম তাম্রশাসনে কোনো তারিখ পাওয়া যায়নি। এ কারণে তার শাসনকাল নির্ধারণ করাও দুরূহ। একমাত্র লিপিবিজ্ঞানের ভিত্তিতে তার সময় নির্ণয়ের প্রয়াস পাওয়া যায়। কান্তিদেবের সময় নবম শতাব্দীর শেষার্ধে ছিল বলে মত দেন শরিফুল ইসলাম।

১৯৮৯ সালে লন্ডনের বিখ্যাত নীলাম হাউজ সথবি’স-এর ক্যাটালগে ওঠা একটি ধাতব পুষ্পাধার থেকে অত্তাকরদেব নামক এক রাজার নাম জানা যায়। এতে সংস্কৃত ভাষায় উৎকীর্ণ লিপি থেকে জানা যায় অত্তাকরদেব রাজাধিরাজ উপাধি ধারণ করেছিলেন। তিনি সমতটের আদি দেব রাজাদের মতো সমর-মৃগাঙ্ক উপাধি ধারণ করেন। সমতটের এ দেব রাজারা স্বাধীন ছিলেন। হরিকেল ছিল সমতট রাজ্যসংলগ্ন একটি পৃথক রাজনৈতিক সত্তা। হরিকেলের রাজা অত্তাকরদেবের সমর-মৃগাঙ্ক উপাধি ধারণ তাকে একজন স্বাধীন রাজা হিসেবে উপস্থাপন করে। একই সঙ্গে ত্রিপুরা, আরাকান ও চট্টগ্রাম এলাকা থেকে তার নামে উৎকীর্ণ বহুসংখ্যক রৌপ্য মুদ্রার প্রাপ্তি প্রমাণ করে তিনি একজন স্বাধীন রাজা ছিলেন। মুদ্রার মুখ্য দিকে শায়িত ষাঁড়ের প্রতিকৃতি ও ত্রিশূল চিহ্ন এবং ষাঁড়ের ঠিক ওপরে ‘আকর’ শব্দ উৎকীর্ণ—এরূপ মুদ্রা অত্তাকরদেব ছাড়াও আরো বেশ কয়েকজন রাজা জারি করেছিলেন। মুদ্রায় উৎকীর্ণ লিপি থেকে জানা যায় মুদ্রাগুলো জারি করেছিলেন ললিতাকর, আর্য্যাকর, অন্তাকর, ভদ্রাকর, কল্যাণাকর, প্রদ্যুম্নাকর, ধর্মাকর, রামাকর, সদাকর, বপ্পাকর, মহেন্দ্রাকর ও রত্নাকর প্রমুখ ‘আকর’ রাজবংশের শাসকেরা। সম্ভবত অত্তাকরদেব এ বংশেরই একজন শাসক ছিলেন।

উৎকীর্ণ লিপিতে অত্তাকরদেবকে পরমসৌগত অর্থাৎ বুদ্ধের ভক্ত বলা হয়েছে। তবে তার মুদ্রায় ষাঁড় ও ত্রিশূলের প্রতীকায়ন দেখে পণ্ডিত মহলের ধারণা তার পূর্বপুরুষরা সম্ভবত শৈব ছিলেন এবং পরে তারা বোদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। অন্যথায় এগুলো তাদের বংশগত প্রতীকও হয়ে থাকতে পারে। অত্তাকরদেব তার রাজধানী বর্ধমানপুর থেকে রাজ্য শাসন করতেন বলে লিপিতে উল্লেখ আছে, যা বর্তমান চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার বড় উঠান বা বড়োধন গ্রাম বলে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে লিপিটিতে কোনো তরিখের উল্লেখ না থাকায় অত্তাকরদেবের সময় নির্ণয় নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। লিপিবিজ্ঞানের ভিত্তিতে গৌরীশ্বর ভট্টাচার্য প্রস্তাব করেন তার শাসনকাল ছিল দশম শতাব্দীতে।

হরিকেলের রাজবংশীয় ইতিহাস বলতে আমরা তিনটি পৃথক লিপিসাক্ষ্য হতে উপরোক্ত তিনজন রাজার নাম পাচ্ছি কেবল। যেখানে তাদের বংশপরিচয় নিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য নেই। এ কারণে প্রাচীন হরিকেলের রাজাদের কালানুক্রমিক বংশলতিকা আজও তৈরি করা সম্ভব হয়নি। একই বিষয় লক্ষ করা যায় প্রাপ্ত হরিকেল মুদ্রাগুলোর ক্ষেত্রে, যেখানে রাজার নাম ছাড়া আর কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। সম্ভবত দীর্ঘকাল ধরে হরিকেলের পৃথক রাজনৈতিক সত্তাই এজন্য দায়ী। যদিও সবসময় হরিকেল সম্পূর্ণভাবে পৃথক ছিল বলে মনে হয় না। বঙ্গ-সমতট শাসনকারী চন্দ্রবংশীয় রাজাদের সঙ্গে হরিকেলের সম্পৃক্ততার কথা জানা যায়, চন্দ্রদের লিপি প্রমাণ থেকে সে তথ্য আগেই বিধৃত হয়েছে। পরে হরিকেলে সেনদের প্রভাব বিস্তারের প্রমাণও রয়েছে। হরিকেলের রাজা দেবাতিদেব, কান্তিদেব ও অত্তাকরদেবদের মধ্যে সম্পর্ক এবং তাদের শাসন ব্যবস্থা, সময়কাল নিয়ে বিস্তারিত জানার সুযোগ আমাদের এখনো হয়নি। চট্টগ্রাম এলাকায় ব্যাপক প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান পরিচালনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে হরিকেলের রাজনৈতিক ইতিহাস বিনির্মাণের পর্যাপ্ত তথ্য প্রাপ্তি ঘটতে পারে।

তথ্যসূথ

১) বাংলাদেশের ইতিহাস আঞ্চলিক পরিপ্রেক্ষিতে আদি বাংলা (আনু. ১২০০ সা. অব্দ পর্যন্ত), (আবদুল মমিন চৌধুরী সম্পাদিত), এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ১ম খণ্ড, ঢাকা: ২০১৯

২) Shariful Islam, New Light on the History of Ancient South-East Bengal, Asiatic Society of Bangladesh, Dhaka, 2014.

খুরশিদ জাহান: প্রভাষক, ইতিহাস বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ