সিল্করুট

সম্প্রসারিত হরিকেলের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ও সংযোগ

ড. সুচন্দ্রা ঘোষ

স্যার থমাস রোর সফরনামা অনুসারে আঁকা উইলিয়াম ব্লিউয়ের মানচিত্র ছবি: নোভাস অ্যাটলাস

বঙ্গোপসাগর একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চল, যা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে সংযুক্ত করেছে। নবম শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে আরবি ও ফার্সি ভ্রমণবৃত্তান্তে এর সরব উল্লেখ পাওয়া যায়। ৮৫১ খ্রিস্টাব্দে সুলায়মান তাজিরের সিলসিলাত আল-তাওয়ারিখ-এ আখ্যা দেয়া হয়েছে বাহর-ই-হারকান্দ নামে; এটিই এর নামকরণের সবচেয়ে পুরনো দৃষ্টান্ত।১ হারকান্দ নামটি এসেছে হরিকেল থেকে, যা ছিল বাংলার একটি অঞ্চল এবং এ হরিকেল বর্তমানের চট্টগ্রাম অঞ্চলকে বোঝায়। আর বঙ্গোপসাগরকে পরিষ্কারভাবে বাহর হারকাল বা হরিকেলের সমুদ্র নামে চিহ্নিত করা হয়েছে অজানা লেখকের হুদুদ আল-আলম-এ (৯৮২ খ্রি.)।২ এর মাধ্যমে হারকান্দকে (হরিকেল) ‘ন. মিয়াস’, উরশিন, সামান্দার ও আন্দ্রাসের সঙ্গে সাগরতীরবর্তী স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সামান্দারের সঙ্গে উপকূলীয় স্থান হিসেবে হারকান্দের উল্লেখ খুবই গুরুত্বপূর্ণ; এখানে হয় লেখক ভুল করে ভেবেছেন যে সামান্দার হরিকেল রাজ্যের মধ্যে অবস্থিত অথবা হরিকেল একটি রাজ্যের নাম ও একই সঙ্গে বর্তমান সময়ের চট্টগ্রাম স্থানটিরও নাম ছিল। হারকান্দ বা হারকেলের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয়ে আমরা একটি বন্দর পাই, যার নাম সামান্দার এবং এটা একই এলাকায় অবস্থিত।৩

মরোক্কোর পরিব্রাজক আল ইদরিসি দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে নুজহাতু-ই-মুশতাক-এ লিখেছেন—

সামান্দার একটি বড় বাণিজ্যিক ও ধনী শহর, এখানে ভালো মুনাফা করা যায়...এটি একটি নদীর তীরে অবস্থিত যা কাশ্মীর দেশ থেকে এসেছে। ধান ও বিভিন্ন দানাদার শস্য বিশেষত চমৎকার গম পাওয়া যায়।...কারমুত (কামরূপ) থেকে এখানে আগর আনা হয়, যা এখান থেকে নদীপথে ১৫ দিনের দূরত্বে অবস্থিত। এই নদীর পানি মিষ্টি।...শহর থেকে নৌকায় একদিনের দূরত্বে একটি বড় দ্বীপ আছে, এখানে অনেক মানুষের বাস এবং সব দেশের বণিকরা এখানে আসেন।৪

আল ইদরিসি তার লেখার বড় অংশ নিয়েছিলেন নবম শতাব্দীর শেষভাগে ইবনে খুরদাদবা রচিত কিতাবুল মাসালিক ওয়াল মামালিক (সড়ক ও রাজ্যের গ্রন্থ) থেকে। এ খুরদাদবাও সামান্দারের কথা উল্লেখ করেছেন। এসব বর্ণনা এটা নিশ্চিত করে যে সেকালে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার অন্যতম প্রধান বন্দর ছিল সামান্দার। তাই অনুমান করা যায় যে নবম শতাব্দীর মধ্যভাগ নাগাদ সাগর ও তার বন্দর আরবি ও ফার্সিভাষীয় লেখকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল এবং তা আরব দুনিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিল। সাগরের নামকরণ করা হয়েছিল একটি প্রশাসনিক অঞ্চলের নামে—হরিকেল। এ থেকে সেকালে অঞ্চলটির গুরুত্ব ও নাবিকদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

চীনা সন্ন্যাসী ও পরিব্রাজকরা আরো আগে হরিকেলের কথা উল্লেখ করেছেন। ইৎ-সিঙ বা আই-সিঙ৫ চুই কিং (৬৮৫) আমলের প্রথম বর্ষে নালন্দার কাছে উ-হিঙের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। হিঙ সিংহল থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে সাগরপথে যাত্রা করে হরিকেল এসেছিলেন, যা ছিল পূর্ব ভারতের ও জম্বুদ্বীপের পূর্ব সীমানা। এ থেকে ধারণা করা যায় হরিকেলের সীমান্তের মধ্যে অবশ্যই একটি উপকূল ছিল। একই সময়ে স্থানীয় উৎসেও হরিকেলের উল্লেখ পাওয় যায়: আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্পে (অষ্টম শতাব্দী) উল্লেখ আছে বঙ্গ, হরিকেল ও সমতট পৃথক শাসনাধীন অঞ্চল। হরিকেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল সমতটের, যা আজকের দিনের কুমিল্লা ও নোয়াখালী। ইৎ সিঙ উল্লেখ করেছেন হরিকেল কুমিল্লা ও নোয়াখালী জেলার পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। এভাবে সপ্তম শতাব্দীর মধ্যভাগ নাগাদ হরিকেল চিহ্নিত হয়েছিল চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকা হিসেবে যার অবস্থান ট্রান্স-মেঘনা অঞ্চলের মধ্যে। আমি হরিকেলের বাণিজ্য নেটওয়ার্কের বিষয়ে গুরুত্ব দিতে চাই। এর মাধ্যমে সমতট, কামরূপ ও আরাকান হরিকেলের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের সূত্রে আলোচনায় আসবে। 

মুদ্রা ব্যবস্থা

হরিকেলে আবিষ্কৃত দুটি তাম্রপাত্রের খোদাইয়ে ‘টন্ডক’ দেখে বোঝা যায়, জনপথে সে সময় লেনদেনে ব্যবহৃত প্রধান মুদ্রাকে টন্ডক বলা হতো। সমতট ও হরিকেল উভয় অঞ্চলেই মুদ্রা চালু থাকলেও সমতটের মুদ্রা ছিল প্রাথমিকভাবে রাজবংশীয় স্বর্ণমুদ্রা।৬ বিপরীতে হরিকেল জনপদে রৌপ্য মুদ্রায় থাকত ‘হরিকেল’ লেখা। এভাবে হরিকেল নাম খোদাই করে স্থায়ী রৌপ্য মুদ্রার প্রচলন সেখানকার অর্থনৈতিক চালচিত্রের বড় প্রমাণ। ক্রমে হরিকেলের মুদ্রা ছড়িয়ে পড়েছে সমতট ও অন্যান্য অঞ্চলে। সমতটের ময়নামতি, চট্টগ্রামের জোবরা, সিলেট, ত্রিপুরার বেলুনিয়া, দক্ষিণ আরাকানসহ বিভিন্ন স্থানে পাওয়া গেছে হরিকেলের মুদ্রা।৭ মুদ্রাটি সপ্তম থেকে দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত চালু থাকার মানে হরিকেল দীর্ঘ সময় ধরেই স্বতন্ত্রভাবেই আঞ্চলিক পরিচয়ে চিহ্নিত হতো।৮ তবে তার চেয়ে বড় কথা, হরিকেলের রৌপ্য মুদ্রা বিশুদ্ধতার দিক থেকে মানোত্তীর্ণ এবং তৈরিও হয়েছে আদর্শ পরিমাপে।

সম্প্রতি কান্তিদত্তের নাম খোদাই করা একটি মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে।৯ কান্তিদত্তই সম্ভবত চট্টগ্রাম তাম্রশাসনে উল্লিখিত কান্তিদেব। এটা প্রায় নিশ্চিত যে হরিকেল মুদ্রা হরিকেলে জনপদেই প্রস্তুত হতো। সেক্ষেত্রে অবশ্যই পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে কোনো বন্দর অবস্থিত ছিল। বিষয়টি অনুমান করা যায় দুটি পরোক্ষ উৎস থেকে। প্রথমত ইৎ-সিঙের বিবরণী থেকে আমরা জানি, উ-হিঙ সিংহল থেকে উত্তর-পূর্বে যাত্রা করে এবং হরিকেলে পৌঁছায়। সে সময়ে এটা পূর্ব ভারতীয় অঞ্চলের পূর্ব প্রান্ত ছিল। তখন তাম্রলিপ্ত বন্দর হওয়ার পরও উ-হিঙ হরিকেলে আসেন, যা স্বাভাবিক। তিনি সমুদ্রপথ ব্যবহার করছিলেন সফরে। দ্বিতীয়ত, হিউয়েন সাঙ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতির সঙ্গে সমতটের প্রসঙ্গ আলোচনা করেছেন। এক্ষেত্রে অবশ্যই হরিকেলে একটি বন্দর থাকাই প্রমাণ করে। সমতটের নিজস্ব কোনো সমুদ্রবন্দর ছিল না, দেবপর্বতের নদীবন্দর থেকেই তার যোগাযোগ হতো।১০ যখন হরিকেলের রৌপ্য মুদ্রা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে স্থানীয় অর্থনীতিতে, আরব বিশ্বের সঙ্গেও বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে ধারণা করা যায়। সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে তাদের যাতায়াত ও যোগাযোগ বেড়েছে। ১১২০ সালে বাংলা সম্পর্কে মারভাজির বিবরণীতে দেখা যায় হদকিরা (হরিকেল) নগরীতে স্বর্ণমুদ্রা ও কড়ি দিয়ে ব্যবসা হতো, যদিও শেষটিই ব্যবহার হয়েছে বেশি। আমরা জানি, এ কড়ি হরিকেলে আসত মালদ্বীপ থেকে। পরে সরবরাহ হতো পাল আমলের নানা অঞ্চলে, যেখানে ব্যবহার হতো বিকল্প মুদ্রা হিসেবে। অনেক পরে ইবনে বতুতার লেখায়ও এর সত্যায়ন মেলে।

জলপথে যোগাযোগ ও নৌ-বাণিজ্যের কেন্দ্র

দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার ক্ষেত্রে যদিও স্থানীয় পর্যায়ে বাণিজ্য কেন্দ্র নিয়ে আমাদের নির্দিষ্ট দলিল নেই। সম্ভবত বঙ্গ ও সমতটের বাণিজ্য কেন্দ্রগুলো বড় পরিসরে যুক্ত ছিল চট্টগ্রামের সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে। বাংলার অঞ্চলগুলো বড় পরিসরে জল যোগাযোগের ভিত্তিতেই পরিগঠিত। সমতট নামের অর্থই সমতল উপকূলীয় অঞ্চল। এর দক্ষিণভাগ গঠিত হয়েছিল বঙ্গোপসাগরের মাধ্যমে আর উত্তরের ভাগ তৈরি করেছে মেঘনায়। মেঘনা যুক্ত ছিল পদ্মা নদীর সঙ্গে, মেঘনা আবার মিলিত হয়েছে ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে। নদীগুলোর মধ্যে এ সংযোগের কারণে পরিণত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। এর মাধ্যমে অঞ্চলের ভেতর থেকে যোগাযোগ তৈরি হয়েছে সমুদ্র পর্যন্ত। নদীপথের সে যোগাযোগকে বোঝায় যায় নৌ শব্দের ব্যবহার ও অভিব্যক্তিতে। সেটা ট্যাক্সের ক্ষেত্রেই হোক কিংবা নৌকা ঘাটে রাখার ক্ষেত্রে। নৌবন্ধক ও নৌদণ্ডক ছিল বঙ্গ ও সমতটের যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্পর্কে ধারণা লাভের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। উদাহরণ হিসেবে সামনে আনা যায় শ্রী ধারণরাত (৬৬৫-৭৫ খ্রি.) কৈলান তাম্রশাসনের কথা। সেখানে নৌদণ্ডকের পাশাপাশি নৌপৃথ্বি, নৌস্থিরবেগ ও নৌযোগ খাতের কথা বলা হয়েছে। নৌপৃথ্বির শাব্দিক অর্থ নৌকাময় দুনিয়া। ফলে এটা কি বলা যায় না যে নৌপৃথ্বি দিয়ে দেবপর্বতের চারপাশে থাকা অজস্র নৌকার কথা বলা হয়েছে, যা ছিল সমতটের রাজধানী ও সে সময়ের বাণিজ্যিক কেন্দ্র?

শ্রীচন্দ্রের (৯২৫-৭৫ খ্রি.) সময়ে দেবপর্বতে প্রাপ্ত পশ্চিম ভাগ তাম্রশাসন আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন, যা লিখিত হয় শ্রীচন্দ্রের সিংহাসনে বসার পঞ্চম বছরে। সেখানে ক্ষিরোদা নদীর পাশে বহু নৌকার চলাফেরাকে তুলে ধরা হয়েছে। লালমবিভান বা লালমাইয়ে শত শত নাবিক নোঙর করত ঔষধি লতার জন্য। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয় দেবপর্বত নদীবন্দর ছিল।১১ মদনপুর তাম্রশাসনে বঙ্গসাগরসম্ভন্ডারিয়ক শব্দের কথা বলা হয়েছে জলমণ্ডলে। আর চক্রবর্তী বিষয়টিতে সামনে এনেছেন। তিনি বঙ্গসাগরসম্ভন্ডারিয়ককে সাভার বলে চিহ্নিত করেন, যা ঢাকার ১৭ মাইল উত্তর-পশ্চিমে। সেখান থেকেই তাম্রশাসনটি আবিষ্কৃত হয়েছে। বংশাই ও ধলেশ্বরীর মোহনায় স্থানটি একটি নদীবন্দর ও বৌদ্ধ ধর্মের কেন্দ্র ছিল। এখানে বোধিসত্ত্বের ছবি, পাথর ও ব্রোঞ্জের মূর্তি পাওয়া গেছে। বঙ্গসাগরসম্ভন্ডারিয়ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত নদীপথের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে। জলপথে যুক্ত করত ‘বঙ্গসাগর’-এর সঙ্গে।১২ সাভার ষষ্ঠ শতাব্দী থেকেই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল, যা ছিল দশম শতাব্দী পর্যন্ত। এখনো শীতলক্ষ্যা দিয়ে বাণিজ্য পণ্য ঢাকা থেকে বরিশাল নৌপথ ও নৌযাত্রা সেটাই প্রমাণ করে।

আরাকানের সঙ্গে যোগাযোগ

হরিকেল কিংবা আদি চট্টগ্রামের আলোচনা এলেই আরাকান উপকূলের প্রসঙ্গ আসে, যা হরিকেলের সম্প্রসারিত ধারণাকেই প্রমাণ করে। অঞ্চল দুটি জলবায়ু ও ভৌগোলিকভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা গঙ্গা ও ইরাবতীর তীরবর্তী সমভূমি অঞ্চল থেকে আলাদা। যোগাযোগ হতো নদীবিধৌত উপকূলীয় ভ্রমণ কিংবা বাণিজ্যে, স্থলপথে যোগাযোগ যথেষ্ট কঠিন ছিল, বার্মার মূল ভূখণ্ড থেকে আরাকানকে অনেকটা আলাদা করে ফেলেছিল আরাকান ইয়োমা পার্বত্য অঞ্চল। ঠিক এজন্যই পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো মুদ্রা পাওয়া যায়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের পশ্চিমে সমতল ভূমি নদীর মাধ্যমে বিভাজিত, যে নদীগুলো বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। উপকূলীয় চট্টগ্রামই প্রাচীন হরিকেল এবং বর্তমান রামু নগরীতেই ওই অঞ্চলের সবচেয়ে পুরনো বিহার অবস্থিত, বলা হয় সম্রাট অশোক তৈরি করেছিলেন বিহারটি। এটা যে প্রাচীন স্থাপনা, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিহারের ভেতরে জাদুঘরে মাটির পাত্র ও ইটের মতো কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা রাখা হয়েছে। আরাকানের কেন্দ্রীয় অংশ নদীর মাধ্যমেই যুক্ত ছিল মায়ু, কালাদান ও লেমরোর সঙ্গে, যার ধ্রুপদি নাম ধন্যবতী। ধন্যবতী হলের সঙ্গে যুক্ত ছিল।১৩

এ ভৌগোলিক সংযুক্তির কারণেই দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ গড়ে ওঠে বিভিন্ন দিক থেকেই। এছাড়া হরিকেলের মুদ্রায়ও আরাকানের চন্দ্রবংশীয় প্রভাব পড়েছে। ময়নামতিতে এ ধরনের মুদ্রা পাওয়ার অর্থ আরাকানের মুদ্রা প্রবেশ করেছিল বাংলার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে, প্রমাণ করে সমতটের অর্থনৈতিক তাৎপর্য এবং বঙ্গোপসাগরের বাণিজ্য নেটওয়ার্কে তার অংশগ্রহণ। সমতটে ধর্মবিজয়ের মুদ্রা পাওয়া গেছে, এর মধ্য দিয়ে মুদ্রাবিশারদরা মনে করেন, সম্ভবত অল্প সময়ের জন্য ধর্মবিজয় ছিলেন সমতটের অধীনে।১৪ কয়েন ছাড়াও ধর্মবিজয়ের নাম রয়েছে আনন্দচন্দ্র প্রশস্তিতে, যা আরাকান অঞ্চলে তার শাসন বিস্তৃত থাকার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এখন এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই, তার রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল আরাকান।

কামরূপ: সমতট ও হরিকেলের প্রধান পশ্চাদ্‌ভূমি

সমতট ও হরিকেলের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংযোগের সঙ্গে জড়িত ছিল ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে অবস্থিত কামরূপের নামও। আসাম ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক ঐক্যের পেছনে দুটি নদী ও একটি সমুদ্রবন্দর জড়িত। ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী আর সামান্দর বন্দর। ব্রহ্মপুত্র দক্ষিণ-পশ্চিমে ভারতের আসাম দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আরো দক্ষিণে গিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বদ্বীপের মধ্যে এটি মিলিত হয়েছে গঙ্গার প্রধান শাখা পদ্মা ও মেঘনায়, তারপর পতিত হয়েছে হরকন্ড সমুদ্রে। চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ইবনে বতুতা সফর করেন সুদকাওয়ান থেকে কামরূপ হয়ে হাবাঙ (বর্তমান হবিগঞ্জ) পর্যন্ত। বাংলায় প্রবেশ করে তিনি সুদকাওয়ানকেই প্রথম বন্দর হিসেবে উল্লেখ করেছেন, সমুদ্রের পাশেই এটি একটি বড় শহর। আর সমুদ্র বলতে অবশ্যই বঙ্গোপসাগর। ইবনে বতুতা সুদকাওয়ান হয়ে কামরুর (কামরূপ) পার্বত্য অঞ্চলে গিয়েছেন, যা ছিল এক মাসের সফর। তার মতে, এ পথ বাংলা১৫ ও লাখনৌতির১৬ পর্যটকরা ব্যবহার করত। দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার মানুষ কামরূপের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে ব্রহ্মপুত্র নদী ধরেই। যদি চতুর্দশ শতাব্দীতে ইবনে বতুতা এ জলপথ ব্যবহার করতে পারেন, তাহলে তার আগেও এর ব্যবহার ছিল। 

পশ্চিমভাগ তাম্রশাসনে চন্দ্রবংশীয় শাসক শ্রীচন্দ্র ঘোষণা করেছেন, তিনি কামরূপ জয় করেছেন।১৭ তাম্রশাসনের ১২তম লাইনে শ্রীচন্দ্রের ক্ষমতা ও কামরূপ জয় সম্পর্কে বলা হয়েছে, তারা লোহিত্য বা ব্রহ্মপুত্রের তীর ঘেঁষে প্রবেশ করেছিল। এর মধ্য দিয়ে নদীপথে যোগাযোগের পাশাপাশি ব্রহ্মপুত্র নদের পাশ দিয়ে স্থলপথেও যোগাযোগ ছিল। আল ইদরিসি ১১৬২ সালে বর্ণনা করেছেন, কামরূপ থেকে সমন্দরে সুগন্ধি কাঠ নেয়া হতো, যা ছিল ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর দিয়ে জলপথে ১৫ দিনের পথ।১৮ সমুদ্র থেকে যে কেউ মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যেতে পারত। আবু দুলাফ মিসার ইবনে মুহালহিল ইয়ানবুই তুর্কিস্তান থেকে চীনে সফর করেন ৯৪৩ সালে। সেখান থেকে তিনি ভারত আসেন কামরূপ হয়ে।১৯ কামরূপের সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিম চীন ও মিয়ানমারের বাণিজ্যের কথা লেখা হয়েছে আল মাসালিক ওয়াল মামালিক গ্রন্থে। সুগন্ধি কাঠের কথা বলা হয়েছে চীনা বিবরণীতেও। সে সময় সুগন্ধি কাঠের চাহিদা ছিল ব্যাপক। পারস্য থেকে চীন, রোম থেকে আব্বাসীয় দরবারে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল সুগন্ধি কাঠের প্রভাব। সিল্করোড ধরেই ছড়িয়ে পড়েছিল সুগন্ধি কাঠ, কামরূপ তার সমৃদ্ধির কারণেই ছিল যুক্ত।২০

শেষকথা

সামান্দার বন্দর ও পরবর্তীকালের চট্টগ্রাম বন্দর বঙ্গোপসাগরের সীমানাজুড়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে সংযোগে ট্রানজিট ট্রেড জোন হিসেবে ব্যবহার হতো। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গমস্থলে তাদের অবস্থান থেকে মনে হয় পূর্ব ভারতের বণিকরা চট্টগ্রামকে এন্ট্রিপট হিসেবে ব্যবহার করতেন। নাবিকদের, যেমন পঞ্চদশ শতাব্দীর ইবনে মাজিদের নেভিগেশনাল গাইডে চট্টগ্রামকে বাংলার বড় বন্দর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৪০৫ সালে চীনা রাজকীয় নৌবাহিনীর একটি বহর এ বন্দর ঘুরে গিয়েছিল।২১ বঙ্গোপসাগরের পূর্বাঞ্চলের লম্বা পথের বাণিজ্যে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় এন্ট্রিপট হিসেবে আবির্ভূত হয় নবম শতাব্দীতে, যখন সামান্দার বহর হারকান্দের বন্দর হিসেবে সক্রিয় হয়েছিল। সামান্দার একই সঙ্গে পশ্চাৎভূমির কৃষি উৎপাদক এবং দূর দেশে যাওয়া নাবিকদের মধ্যে লিংকেজ হয়ে উঠেছিল। এটি সম্প্রসারিত হরিকেলের কড়ি মুদ্রা ও ধাতব টাকার মধ্যে চমৎকার ভারসাম্যমূলক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব তুলে ধরে।

কেএন চৌধুরী দেখিয়েছেন ভারত মহাসাগর বাণিজ্য নেটওয়ার্কগুলো একটি আঞ্চলিক বাণিজ্য সংস্কৃতি দিয়ে সংহত ছিল, যা নিজস্ব একটি ইকোনমি-মঁদে তৈরি করেছিল। চৌধুরীকে অনুসরণ করে আমি একটি বিষয় প্রস্তাব করতে চাই যে হরিকেল অঞ্চলও নিজস্ব ইকোনমি-মঁদে গঠন করেছিল, যার একপাশে ছিল কামরূপ ও সমতট এবং অন্য অংশে ছিল আরাকান। আমি নির্দিষ্টভাবে ‘সম্প্রসারিত হরিকেল’ টার্মটি এ কারণেই ব্যবহার করেছি। 

গ্রন্থপঞ্জি

১. M. Reinaud (ed.), Silsilat al-Tawarikh of Sulayman al-Tajir and Abu Zaid Hasan al-Sirafi, Frankfurt: Johann Wolfgang Goethe University, 1994

২. V. Minorsky, ed. and tr., Hudud al ‘Alam, London: Gibb Memorial Trust, 1937

৩. For a detailed discussion on the port of Samandar see Ranabir Chakravarti, ‘Seafaring in the Bengal Coast: The Early Medieval Scenario, in Trade and Traders in Early Indian Society, New Delhi

৪. H.M. Elliot and J. Dowson, The History of India as Told by its Own Historians, Vol. I, Allahabad

৫. Takakusu, tr., A Record of the Buddhist Religion as Practiced in India and the Malay Archipelago (A.D. 671-95) by I-tsing, Oxford

৬. B.N. Mukherjee, Coins and Currency Systems of Post-Gupta Bengal (c. AD 550-700), New Delhi: Munshiram Manoharlal, 1993

৭. Nicholas Rhodes, ‘The Coinage of Samatața: Some Thoughts, The Quarterly Review of Historical Studies, Kolkata, 2002

৮. B.N. Mukherjee, ‘The Original Territory of Harikela, Bangladesh Lalitkala, vol. 1, no. 2, 1975

৯. Noman Nasir, ‘Coins of King Kantideva of Harikela Kingdom, Northeast Researches, vol. VII, March 2016,

১০. D. T. Watters, On Yuan Chwang’s Travels, Delhi: Motilal Banarsidass, 1961

১১. Chakravarti, ‘Seafaring in the Bengal Coast, p. 167; Suchandra Ghosh, ‘Economy of Samatața in the Early Medieval Period: A Brief Overview, in Prajna Dhara: Essays in Honour of Gouriswar Bhattacharyya, ed. Gerd Mevissen and Arundhati Banerjee, New Delhi: Manohar, 2008

১২. Chakravarti, ‘Vangasāgara-sambhāndāriyaka, pp. 144-7. Chakravarti gives a detailed analyses of both the terms Vangasāgara and Sambhāndāriyaka and shows that the eastern Sea or Bay of Bengal was called Vangasagara in the later tenth century.

১৩. For a detailed discussion on Arakan-Chittagong geographical continuum see S.E.A. van Galen, ‘The Economic Geography of the Arakan-Bengal Continuum, doctoral thesis, Leiden University. Arakan and Bengal: The Rise and Decline of the Mrauk U Kingdom (Burma) from the Fifteenth to the Seventeeth Century AD, 2008, 1-32

১৪. M. Mitchiner, The Land of Water: Coinage and History of Bangladesh and Later Arakan Circa 300 Bc to the Present Day, London: Hawkins Publication, 2000

১৫. Lakhnawati was obviously the capital of Gauda but what stood for Bengal is not clear.

১৬. Gibbs, Ibn Battuta, pp. 267-71.

১৭. D.C. Sircar, ‘Pashchimbhag Copper Plate of Srichandra, Year 5, Epigraphia Indica, XXXVII, 1967-8, pp. 289-304. Also ‘Paschimbhag Plate of Śricandra, Regnal Year 5, in Epigraphic Discoveries in East Pakistan, Calcutta, 1973

১৮. Chakravarti, ‘Seafaring in the Bengal Coast, pp. 165-7.

১৯. Fuat Sezgin ‘Studies on the Travel Account of Ibn Fudlan and Abu Dulaf, Islamic Geography (Collected and Reprinted) by M. Reinaud, Frankfurt: Johann Wolfgang Goethe University, 1994, pp. 262-5; cited in Tansen Sen, Buddhism, Diplomacy and Trade: The Realignment of Sino-Indian Relations, 600-1400, Asian Interaction and Comparisions, New Delhi: Manohar, 2004

২০. Rila Mukherjee (ed.), Pelagic Passageways: The Northern Bay of Bengal Before Colonialism, New Delhi: Primus Books, 2011

২১. G.R. Tibbetts, ‘Arab Navigation in the Indian Ocean before the Coming of the Portuguese, being a translation of Kitab al-Fawa’id fi usul al bahr wa’l-qawa’id of Ahmad b. Majid al-Najdi, London: The Royal Asiatic Society of Great Britain and Ireland, 1971


[লেখকের Understanding the Economic Networks and Linkages of an Expanded Harikela প্রবন্ধের সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন শানজিদ অর্ণব ও আহমেদ দীন রুমি। লেখকের অনুমতি সাপেক্ষে এখানে প্রকাশিত হলো]

ড. সুচন্দ্রা ঘোষ: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ 

হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়