বিশেষ সংখ্যা

সিয়েরা লিওনে বাংলা ভাষার বিজয়কেতন

আহমেদ দীন রুমি

পর্তুগিজ নাবিক পেদ্রো দা সিন্ত্রা ১৪৬২ সালে যখন আফ্রিকার পশ্চিম তীরে নোঙর করলেন, তখন সেখানে ঝড়ো আবহাওয়ার তাণ্ডব চলছে। পার্বত্য উপদ্বীপ থেকে আসা বজ্রপাতের শব্দ ঠিক যেন সিংহের গর্জনের মতো। সেখান থেকেই অঞ্চলটির নামসিয়েরা লিওয়াবা সিংহের পাহাড়। পরবর্তীকালে ইংরেজ নাবিকদের মুখে বিকৃত হয়ে উত্পন্ন হয়েছে সিয়েরা লিওন নাম। ৭১ হাজার ৭৪০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের পশ্চিম আফ্রিকার দেশের জনসংখ্যা ৮০ লাখ। উত্তর উত্তর-পূর্বে অবস্থিত গিনি, দক্ষিণ দক্ষিণ-পূর্বে লাইবেরিয়া এবং পশ্চিমে বিস্তীর্ণ আটলান্টিক মহাসাগর। প্রায় ৭৮ শতাংশ মুসলমান এবং ২১ শতাংশ খ্রিস্ট ধর্মের দেশ সিয়েরা লিওনে ১৬টি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর বসবাস। অবশ্য আধিপত্যের দিক থেকে সবসময় এগিয়ে থেকেছে মেন্দে তেমনে জাতিগোষ্ঠী।

১৬৬০ সালে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় রয়েল আফ্রিকান কোম্পানি (আরএসি) আফ্রিকা থেকে আমেরিকা এবং ইউরোপে দাস নিয়ে যাওয়াই ছিল কোম্পানিটির প্রধান উদ্দেশ্য। ১৬৭২ সালে বাণিজ্যের খাতিরে সিয়েরা লিওনের বান্স আইল্যান্ড এবং ইয়র্কে দুর্গ প্রতিষ্ঠা করে আরএসি। চলতে থাকে মানুষকে পণ্য বানিয়ে বিক্রি করে দেয়ার নিষ্ঠুর ব্যবসা। আঠার শতকের শেষভাগে কয়েকজন হিতৈষীর প্রচেষ্টায় মুক্ত আফ্রিকানরা ফিরে আসে সিয়েরা লিওনের পশ্চিম ভাগে। সেখান থেকেই জায়গাটির নাম হয় ফ্রিটাউন। বর্তমানে এটিই দেশটির রাজধানী। ব্যবসার জন্য হোক কিংবা ধর্ম প্রচারের জন্য, আস্তে আস্তে সেখানে বসতি স্থাপন করে ইংরেজরা। বাড়তে থাকে স্থানীয় এবং বহিরাগতদের মধ্যে মেলামেশা। পুনর্গঠিত হতে থাকে সংস্কৃতি, ইতিহাস ভাষা। অবশ্য ব্রিটিশ প্রটেক্টরেটে প্রবেশ করে আরো পরে ১৮৯৬ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত অন্যান্য অঞ্চলের মতো অঞ্চলের স্বাধীনতাও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। অবশেষে ১৯৬১ সালের ১৯ এপ্রিল স্বাধীনতা লাভ করে সিয়েরা লিওন।

কয়েক বছরের জন্য গণতন্ত্রের ঘ্রাণ পেলেও ১৯৬৪ সালে আকস্মিক মৃত্যু ঘটে প্রধানমন্ত্রীর। ক্রমে দুর্নীতিতে তলিয়ে যায় সিয়েরা লিওন। ঘনীভূত হয় রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা। ১৯৬৭ সালে ক্ষমতায় আসা সিয়াকা স্টিভেন্স দীর্ঘ ১৮ বছরের অযোগ্যতা আর অপশাসনের পর ১৯৮৫ সালে থেকে সরে দাঁড়ান। মনোনীত করেন জোসেফ মোমোহকে। ফলে রাজা বদলালেও দেশের ভাগ্য বদলায়নি। ক্রমেই জটিল হতে থাকা রাজনৈতিক সমীকরণের ফলাফল হিসেবে ১৯৯১ সালে আত্মপ্রকাশ করে রেভল্যুশনারি ইউনাইটেড ফ্রন্টের (আরইউএফ) সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন সামরিক অফিসার সায়বানা সানকোহ। শুরু হয় গৃহযুদ্ধের অধ্যায়। ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আহমাদ তেজান কাব্বাহ ক্ষমতায় এলেও মাত্র এক বছরের মাথায় তাকে সরিয়ে দেয়া হয়। দফায় দফায় শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১৯৯৯ সালে হস্তক্ষেপ করে জাতিসংঘ। নিরাপত্তা পরিষদ থেকে শান্তিরক্ষী বাহিনী হিসেবে সিয়েরা লিওনের মাটিতে মোতায়েন করা হয় ছয় হাজার সেনা। তোড়জোড় চলে সামাজিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার।

২০০২ সালের দিকে জাতিসংঘের প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ শান্তিরক্ষী বাহিনী সিয়েরা লিওনের মাটিতে ছিল। বছরেই চুক্তি হয় কাব্বাহ বিদ্রোহী নেতাদের মধ্যে। ঘোষিত হয় গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন আহমাদ তেজান কাব্বাহ। সিয়েরা লিওনের ইতিহাসে সূচনা ঘটে নতুন যুগের। ঠিক সময়েই গঠিত নতুন সরকারের নেয়া একটা সিদ্ধান্ত সাড়া ফেলে দেয় ১০ হাজার কিলোমিটার দূরের ভূমি বাংলাদেশে। সিয়েরা লিওনের অনারারি অফিশিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয় বাংলাকে।

সিয়েরা লিওনে শান্তি প্রতীষ্ঠার জন্য প্রেরিত শান্তিরক্ষী বাহিনীতে যোগ দেয় ১৩টি দেশ। অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশও। ৭৭৫ জন সেনাসদস্যের প্রথম দলটি দায়িত্ব পায় লুঙ্গি নামক স্থানের। ক্রমে সেখানে যুক্ত হন নতুন সদস্যেরাও। ছড়িয়ে পড়েন সিয়েরা লিওনের নানা প্রান্তে। সংখ্যাটা এক সময় বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় হাজার ৩০০। ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত সাকুল্যে ১২ হাজার সেনাসদস্য সিয়েরা লিওনে শান্তিরক্ষী বাহিনীতে অংশগ্রহণ করেছেন। সিয়েরা লিওনে জাতিসংঘের শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণ করা বাংলাদেশী সেনাবাহিনীর অবদান তাত্পর্যপূর্ণ। ক্রমাগত রাজনৈতিক অস্থিরতা আর গৃহযুদ্ধে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পড়া ব্যবস্থায় তারা যেন প্রাণ ফিরিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হলেন। সফলতাও ধরা দিল অবিশ্বাস্যরূপে। গোত্রগত আর রাজনৈতিক সংঘাত কমতে থাকল, জনমনে ফিরে এল স্বস্তি। সামরিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সেনাবাহিনী সেখানকার মাটিকে প্রস্তুত করলেন পারস্পরিক নিরাপত্তা বোধের পাটাতন হিসেবে। ফলে দ্রুত সাধারণ মানুষের মনে তাদের অবস্থান অনেক উচ্চৈ আসীন হলো। আগ্রহ তৈরি হলো তাদের ব্যবহূত ভাষা বাংলাকে নিয়েও।

ভাষার দিক থেকে সিয়েরা লিওন কম সমৃদ্ধ না। যোগাযোগের প্রধান ভাষা হিসেবে ব্যবহার হয় ক্রিয়ো। মাত্র ১০ দশমিক শতাংশের মাতৃভাষা হলেও সেখানকার ৯৬ শতাংশ মানুষই কথা বলে ভাষায়। ভাষাটি গড়ে উঠেছে ইংরেজি নির্ভর পিজিন ইংরেজির সঙ্গে স্থানীয় তেমনে, মেন্দে অন্যান্য ভাষার মিশেলে। ইংরেজি নিজেও সেখানকার দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ব্যবহার হয়। দক্ষিণাঞ্চলে মেন্দে এবং রাজধানীতে তেমনে ভাষার প্রভাব ব্যাপক। এর বাইরে ব্যবহার হয় কোনো, কুরানকো, কিসি, ফুলা, লিম্বা সুসুর মতো অন্যান্য ভাষা। ক্রিম, বম শেরব্রোর মতো কয়েকটি স্থানীয় ভাষা প্রায় বিলুপ্তির পথে। এর মধ্যে সেখানে বাংলা ভাষাকে উপহার হিসেবে সঙ্গে নিয়ে হাজির হলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

গৃহযুদ্ধে জর্জরিত সিয়েরা লিওনে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ। বিদ্রোহীদের দখলকৃত অঞ্চল মুক্তকরণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে, কথা যেমন সত্য। স্থানীয় মানুষের সংস্কৃতি আর সমাজকেও অনুধাবন করেছেন তারা। খুব কাছ থেকে দেখতে চেষ্টা করেছেন তাদের সমস্যা। পথ খুঁজেছেন সমাধানের। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে নিজের খাবার ভাগাভাগি করে পর্যন্ত খেয়েছেন তারা। ফলে গড়ে উঠেছে অবিচ্ছেদ্য আন্তরিকতা। এভাবে ক্রমে সেখানে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি বাংলা ভাষাও ব্যবহার হতে থাকে। বেশ আগ্রহ নিয়ে সেই বাংলা রপ্ত করে সেখানকার মানুষ। পরিচিত হয় বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গেও। ২০০২ সাল নাগাদ দেখা যায় বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরা বাংলায় কথা বলতে সক্ষম। ক্রমেই বাংলা জনপ্রিয় হয় স্থানীয়দের মাঝে। বিভিন্ন সভা-সেমিনারে ভাষা হিসেবে বাংলাকে ব্যবহার করা শুরু করে স্থানীয়রা। বাঙালি নাচ বাংলা গান পরিবেশিত হতো স্থানীয়দের অনুষ্ঠানে।

দারুণ একটা সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়ে যায় এর মাধ্যমে। প্রথমত তাদের সঙ্গে সম্পর্কে গভীরতা আসে। দ্বিতীয়ত কর্তব্যরত অন্যান্য দেশের সেনাবাহিনীর চেয়ে যোগাযোগের দিক থেকে বাঙালি সেনাবাহিনী আরো ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখতে পারে। শান্তি প্রতিষ্ঠা আর দেশ পুনর্গঠনে এক ধাপ এগিয়ে থাকার সুযোগও হয় কারণে। বাস্তবিক অর্থে সেটাই হয়েছে। সেনাবাহিনী যখন রাস্তায় বের হতো, স্থানীয় শিশুরা ছুটে চলে আসত ট্যাংকের সামনে। দাঁড়িয়ে থাকত জিপের সামনে উঠে। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী দেখলেই শ্লোগান দিয়ে উঠতবাংলাদেশ, বাংলাদেশবলে। বিদেশের মাটিতে যেন অদ্ভুত এক ভালো লাগার দৃশ্য।

সিয়েরা লিওনের সরকার বাংলাদেশী সেনাবাহিনীর অবদানকে অস্বীকার করেনি। ২০০২ সালে ৫৪ কিলোমিটার রাস্তার কাজ সমাপ্ত হয় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর বাংলাদেশী সেনাবাহিনীর দ্বারা। প্রেসিডেন্ট আহমাদ তেজান কাব্বাহ শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাঙালি সেনাবাহিনীর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই সেই সময়েই সিয়েরা লিওনের অনারারি অফিশিয়াল ভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন বাংলাকে। আড়ম্বরের সঙ্গে পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ২০০৩ সালে সেখানকার রাস্তার নাম করণ করা হয় বাংলাদেশের নামে।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলা ভাষা। ২০০২ সালে দেশের মাটিতে যখন আন্দোলনের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন হচ্ছে, ১০ হাজার কিলোমিটার দূরে পশ্চিম আফ্রিকার মাটিতে সেই সময়েই পতপত করে উড়ছে বাংলা ভাষার বিজয়কেতন।