তিন দফা বন্যায় ধস নেমেছে সিলেটের পর্যটন শিল্পে

নূর আহমদ, সিলেট

সিলেটের বিছনাকান্দি পর্যটন কেন্দ্র ছবি : নিজস্ব আলোকচিত্রী

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা সিলেট। চা বাগান, জলাবন, পাথুরে নদী, পাহাড়ের কোল থেকে নেমে আসা ঝরনা, দিগন্ত বিস্তৃত নীল জলরাশি হাওরসহ রয়েছে দৃষ্টিনন্দন সব পর্যটন কেন্দ্র। তবে পর্যটনের ভরা মৌসুমে সিলেটে বাগড়া দেয় দফায় দফায় বন্যা। ঘোষণা দিয়ে বন্ধ করে দিতে হয় পর্যটন কেন্দ্রগুলো। এর পরই ধস নামে পর্যটন শিল্পে। এখনো অনেকটা পর্যটকশূন্য সিলেট।

পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সবচেয়ে বেশি পর্যটক সমাগম ঘটে ঈদের সময়। ঈদুল আজহার ভরা মৌসুমেও কাঙ্ক্ষিত পর্যটক আসেনি সিলেট।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯ মে ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সিলেটে প্রথম বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ৮ জুনের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। বন্যার দ্বিতীয় ধাক্কা আসে ১৬ জুন। সেদিন আবার পাহাড়ি ঢলে সিলেটের সীমান্তবর্তী দুই উপজেলা বন্যার কবলে পড়ে। ধীরে ধীরে নগর এলাকাসহ জেলার ১৩টি উপজেলায় বন্যা দেখা দেয়। ১৯ জুন অতিবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ওইসব উপজেলায় বন্যা আরো বিস্তৃত হয়। ২৫ জুন বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে শুরু করে। তবে ১ জুলাই থেকে নদ-নদীর পানি বেড়ে বন্যা পরিস্থিতি গুরুতর আকার ধারণ করে।

সিলেট হোটেল মোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, জেলায় পাঁচ শতাধিক হোটেল মোটেল রয়েছে, যার বেশির ভাগ এখনো ফাঁকা। ঈদের দিন বন্যা শুরু হওয়ায় প্রশাসন পর্যটন কেন্দ্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়। এর পর থেকে দফায় দফায় বন্যায় সিলেটমুখী হয়নি পর্যটক। ঈদুল আজহা সামনে রেখে পর্যটক সমাগমের আশা থাকলেও বন্যার কারণে তা পূরণ হয়নি। উল্টো ভরা মৌসুমেও খরা যাচ্ছে পর্যটন শিল্পে। প্রতিদিন লোকসান গুনতে হয়েছে পর্যটনসংশ্লিষ্টদের।

সিলেট হোটেল মোটেল অ্যান্ড গেস্ট হাউজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমাইয়াত নুরী জুয়েল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দফায় দফায় বন্যার কারণে পর্যটকরা সিলেটমুখী হয়নি। ঈদুল আজহার সময় আমার হোটেলে কোনো গেস্ট আসেনি। হোটেলের রুম বুকিং ছিল একেবারে শূন্য। ঈদ মৌসুমে এ রকম অবস্থা আগে কখনো হয়নি। ঈদের বেশ কয়েক দিন চলে গেছে। বন্যার পানিও নেমে যাচ্ছে। এর পরও দেখা মিলছে না পর্যটকের। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা ক্ষতির মুখে পড়বে।’

সিলেট চেম্বারের সভাপতি তাহমিন আহমদ বলেন, ‘পর্যটনের সঙ্গে কেবল হোটেল নয়, অনেক বিষয় জড়িত। এর সঙ্গে পরিবহন, রেস্টুরেন্ট, শপিং মল ও নৌকার বিষয়টিও জড়িত। অর্থাৎ পর্যটক যেদিকে যাবে, সেদিকে আর্থিক বিষয় সম্পৃক্ত। পর্যটক না আসায় সব খাতেই এর প্রভাব পড়েছে। বন্যার কারণে পর্যটন খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।’

সিলেটের প্রধানতম পাথর কোয়ারি রয়েছে কোম্পানীগঞ্জে। সেখানে পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দিয়ে মেঘালয় রাজ্যঘেঁষা সাদা পাথর নামক জায়গাকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যেখানে বিনোদনের উদ্দেশে ভিড় জমায়। বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। সাদা পাথর ধীরে ধীরে ভেসে উঠছে, তবে এখনো পর্যটকদের দেখা মিলছে না।

কোম্পানীগঞ্জ ট্যুরিস্ট ক্লাবের সভাপতি আবিদুর রহমান জানান, দফায় দফায় বন্যায় পর্যটনের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। পানি নামতে শুরু করলেও পর্যটক আসা শুরু হয়নি। মাস খানেক ধরে সাদা পাথরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ। এতে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

অন্যদিকে সিলেট নগরীঘেঁষা পর্যটন কেন্দ্র এশিয়ার অন্যতম জলাবন রাতারগুল। ভরা মৌসুম হলেও এখনো পর্যটকের আনাগোনা বাড়েনি। শুধু রাতারগুলো নয়, বন্যার কারণে পুরো পর্যটন খাতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

সিলেট ট্যুরিজম ক্লাবের সভাপতি হুমায়ুন কবীর লিটন বলেন, ‘বন্যায় পর্যটন কেন্দ্রগুলোয় যাতায়াতের রাস্তা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেগুলো সংস্কার করা প্রয়োজন। না হলে অনেক পর্যটন কেন্দ্র পর্যটক হারাবে। বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। খবর পেয়ে কেউ কেউ বেড়াতে আসছে, তবে পর্যটন কেন্দ্রগুলো এখনো স্বরূপে ফেরেনি।’

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক শেখ রাসেল হাসান বলেন, ‘বন্যার কারণে শিল্প বাণিজ্যের সব খাতে কোনো না কোনোভাবে ক্ষতি হয়েছে। এখন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। পানি পুরোপুরি নেমে যায়নি। আশ্রয় কেন্দ্রে লোকজন অবস্থান করছে। পর্যটনসমৃদ্ধ উপজেলাগুলোর নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের। দ্রুত পর্যটন কেন্দ্রগুলো আবার মুখর হয়ে উঠবে বলে আশা করছি।’

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন