ঢাকা-বেইজিং ২১ দলিল সই ও সাত প্রকল্প ঘোষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক

ছবি : সংগৃহীত

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠক হয়েছে। গতকাল বিকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে এ বৈঠক হয়। এর আগে সকালে একই স্থানে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। এরপর ২১টি দলিল ও সমঝোতা স্মারক এবং সাতটি প্রকল্পের ঘোষণাপত্রে সই করেন দুই দেশের কর্মকর্তারা।

শি জিনপিং ও লি চিয়াংয়ের সঙ্গে শেখ হাসিনার বৈঠকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়গুলোর পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে আলোচনা হয়। শি জিনপিং ও শেখ হাসিনার বৈঠকের বিষয়ে গতকাল বেইজিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘চীনের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশকে অনুদান, সুদমুক্ত ঋণ, রেয়াতি ঋণ ও বাণিজ্যিক ঋণ—এ চার উপায়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। জিনপিং জানান, বাংলাদেশের উন্নয়নে কীভাবে এসব সহায়তা দেয়া হবে, সে ব্যাপারে দুই দেশের কারিগরি কমিটি একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেবে। চীন থেকে একটি কারিগরি কমিটি শিগগিরই বাংলাদেশ সফর করবে বলেও জানান জিনপিং।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘শি জিনপিং বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক সুবিধার প্যাকেজ ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দৃঢ় সহায়তার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এছাড়া চীনের প্রেসিডেন্ট নিজ থেকেই বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি প্রয়োজনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, এমনকি আরাকান বিদ্রোহীদের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান।

এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর শতভাগ সফল। চীনের প্রেসিডেন্ট বৈঠকের সময় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়নকে অভূতপূর্ব বর্ণনা করেন এবং চীনের সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন। জিনপিং জানান, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে দ্বিতীয় পর্যায়ে উন্নীত করতে তারা ২০২৫ সালে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছরপূর্তি উদযাপনকে অর্থবহ করে তুলতে প্রস্তুত রয়েছেন।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘গুড গভর্ন্যান্স নিডস গুড পার্টি’ বা ‘সুশাসনের জন্য ভালো দল প্রয়োজন’ বলে মন্তব্য করেন চীনের প্রেসিডেন্ট। তিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যোগাযোগ বৃদ্ধি ও সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করার বিষয়ে জোর দেন। 

ড. হাছান মাহমুদ জানান, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনের জন্য বরাদ্দকৃত ৮০০ একর জমিসহ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও আইটি ভিলেজগুলোয় বিনিয়োগের জন্য জিনপিংকে আহ্বান জানান। তিনি বাংলাদেশ থেকে পাট ও চামড়াজাত পণ্য, ফার্মাসিউটিক্যালস, সিরামিক, আম ও অন্যান্য ফলসহ আমদানি বৃদ্ধির মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনারও আহ্বান জানান। জবাবে চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ থেকে আমসহ আরো পণ্য আমদানি করব।’ 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো জানান, প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে বাংলাদেশকে ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) রেনমিনবি বা ইউয়ানের (প্রায় ১ হাজার ৬১৫ কোটি টাকার সমান) অর্থনৈতিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং। 

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান ও প্রেস সচিব নাঈমুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র হিসেবে পরিচিত গ্লোবাল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠককালে শি জিনপিং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রতি সমর্থন জানান। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের কারো হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেন। অন্যদিকে শেখ হাসিনা তাইওয়ান ইস্যুতে বেইজিংয়ের ‘এক চীন’ নীতির প্রতি সমর্থন জানান। এছাড়া তিনি চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেন। 

শি জিনপিংয়ের সঙ্গে শেখ হাসিনার সর্বশেষ বৈঠক হয় ২০২৩ সালের ২৩ আগস্ট। দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে ১৫তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের এক ফাঁকে বৈঠকে বসেন উভয় নেতা। শেখ হাসিনা এর আগে ২০১৪ ও ২০১৯ সালে চীন সফর করেন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঢাকা সফর করেন ২০১৬ সালে। সে সময় উভয় দেশ ‘কৌশলগত অংশীদারত্বে’ পৌঁছার কথা বলেছিল। শেখ হাসিনার এবারের সফরের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব থেকে কৌশলগত বিস্তৃত সহযোগিতা অংশীদারত্বে’ উন্নীত করার কথা বলছে সরকার।

গতকাল সই হওয়া ২১টি দলিলের মধ্যে ডিজিটাল অর্থনীতিতে বিনিয়োগ সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক রয়েছে। একটি সমঝোতা স্মারক রয়েছে চায়না ন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল রেগুলেটরি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনএফআরএ) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে ব্যাংকিং ও বীমা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে। বাংলাদেশ থেকে চীনে আম রফতানির জন্য উদ্ভিদ স্বাস্থ্য সম্পর্কিত (ফাইটোস্যানিটারি) উপকরণ বিষয়ে একটি প্রটোকলেও সই করে দুই দেশ।

এর বাইরে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নীতিসহায়তা; বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহায়তা; বাংলাদেশে চায়না-এইড ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টারের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা; চীনের সহায়তায় ষষ্ঠ বাংলাদেশ-চায়না মৈত্রী সেতু সংস্কার প্রকল্প; নাটেশ্বর প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা পার্ক প্রকল্পে চায়না-এইড কনস্ট্রাকশনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা; চীনের সহায়তায় নবম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু প্রকল্প; মেডিকেল সেবা ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ে সহযোগিতা শক্তিশালীকরণ; অবকাঠামোগত সহযোগিতা জোরদার; গ্রিন অ্যান্ড লো-কার্বন উন্নয়ন এবং বন্যার মৌসুমে ব্রহ্মপুত্রের হাইড্রোলজিক্যাল তথ্য সরবরাহবিষয়ক দলিলে সই করেন দুই দেশের কর্মকর্তারা। 

এছাড়া চীনের জাতীয় বেতার ও টেলিভিশন প্রশাসনের সঙ্গে বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। একটি সমঝোতা স্মারক সই হয় চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি) ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) মধ্যে। সিএমজি ও বিটিভির মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। সিনহুয়া নিউজ এজেন্সির সঙ্গেও একটি সমঝোতা স্মারক সই করে বিটিভি। সিনহুয়া ও বাসসের মধ্যে হয় একটি স্মারক। আরেকটি দলিলে সই করে সিনহুয়া ও বিটিভি।

সই হওয়া সাতটি ঘোষণাপত্রের মধ্যে রয়েছে চীন-বাংলাদেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বিষয়ে যৌথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সমাপ্তি ঘোষণা; চীন-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি ত্বরান্বিতকরণ নিয়ে আলোচনা শুরুর ঘোষণা; ডিজিটাল কানেক্টিভিটি প্রকল্পে টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্কের আধুনিকীকরণের সমাপ্তি ঘোষণা; ডাবল পাইপলাইন প্রকল্পের সঙ্গে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিংয়ের ট্রায়াল রান সমাপ্তি ঘোষণা; রাজশাহী ওয়াসা সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট চালুর ঘোষণা; শানদং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই এবং বাংলাদেশে লুবান ওয়ার্কশপ নির্মাণের ঘোষণা।

চারদিনের সফরে সোমবার বেইজিং পৌঁছান শেখ হাসিনা। সে হিসেবে আজ সকালে তার দেশের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সফর সংক্ষিপ্ত করে গতকাল রাতেই দেশের উদ্দেশে রওনা হন তিনি। সফর সংক্ষিপ্ত করার কারণ হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের আসার কথা ছিল। কিন্তু অসুস্থতার কারণে তিনি আসতে পারেননি। তিনি এখনো অসুস্থ। সফর সংক্ষিপ্ত করার ব্যাপার নয়, প্রধানমন্ত্রীর শুধু এখানে রাতটাই থাকার কথা ছিল, সেটি না করে ঢাকায় অসুস্থ মেয়েকে সময় দেয়ার জন্য তিনি রাতেই দেশে ফিরছেন।’

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন