কোটাবিরোধীদের সকাল-সন্ধ্যা ‘বাংলা ব্লকেড’

সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল রাজধানী দিনভর ভোগান্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক

ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী

সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলনে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা। সকাল ১০টা থেকে সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত চলা এ ‘‌বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচিতে ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের সড়ক ও রেল যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অবস্থান নিলে রাজধানীর ভেতরের যোগাযোগ ব্যবস্থাও কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ে যাত্রীরা। 

সড়কে অবরোধের কারণে যান চলাচল করতে না পারায় বাড়তি চাপ পড়ে মেট্রোরেলে। টিকিট সংগ্রহ ও ট্রেনে ওঠার জন্য তৈরি হয় যাত্রীদের দীর্ঘ লাইন। কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানেও সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন। এর মধ্যেই আজ দেশজুড়ে অর্ধদিবস ‘‌বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি দেয়া হয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে, যা শুরু হবে বেলা সাড়ে ৩টায়।

কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে গতকাল সকাল ১০টার পর ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অবস্থান নিতে শুরু করেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা। এর মধ্যে ‌বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে মিছিল নিয়ে এসে বেলা সোয়া ১১টার দিকে শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন। তারা সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত ওই এলাকা অবরুদ্ধ করে রাখেন। 

এদিকে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কারওয়ান বাজার রেলগেট ও মহাখালী রেল ক্রসিংয়ে কাঠের গুঁড়ি ফেলে রেলপথ অবরোধ শুরু করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এর ফলে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা-পদ্মা সেতু রুট বাদে ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত রেলপথ অবরোধ করে রাখেন। দীর্ঘ সময় ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় রেলের সময়সূচিতে বিপর্যয় দেখা দেয়, ভোগান্তিতে পড়ে যাত্রীরা। 

ঢাকা থেকে জামালপুরের মধ্যে চলাচলকারী ট্রেন অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় কমলাপুর স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে গতকাল ট্রেনটির যাত্রা বাতিল করতে বাধ্য হয় বাংলাদেশ রেলওয়ে। ৫-৭ ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্বে যাতায়াত করেছে সুবর্ণ, মহানগর ও চট্টলা, বনলতা, সিল্কসিটি, কালনী, উপকূল এক্সপ্রেসসহ বেশকিছু ট্রেন।

গতকাল সকাল ১০টা থেকে রাজধানী ঢাকার শাহবাগ, ফার্মগেট, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, মৎস্য ভবন ও মহাখালীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা; আগারগাঁওয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা; সায়েন্স ল্যাবে ঢাকা কলেজ শিক্ষার্থীরা এবং গুলিস্তানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দেন। 

শিক্ষার্থীদের অবরোধে রাজধানীজুড়ে দেখা দেয় তীব্র যানজট। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো শিক্ষার্থীরা অবরোধ করে রাখায় মেট্রোরেল স্টেশনগুলোয় দেখা দেয় উপচে পড়া ভিড়। সরজমিনে শাহবাগ, কারওয়ান বাজার ও মিরপুর-১০ স্টেশনে টিকিটের জন্য যাত্রীদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। এ সময় একাধিক যাত্রী জানায়, টিকিট পেতে তাদের দেড়-দুই ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে।

ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন স্থানে সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ করেছেন কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা। সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হাউজিং সোসাইটি (বিহাস) বাইপাস মোড়ে দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। চট্টগ্রামে টাইগারপাস ও দেওয়ানহাট এলাকায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রেলপথ অবরোধ করেন। এছাড়া খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাভুক্ত বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করেন।

শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের আন্দোলনের মুখে ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর সরকারি চাকরিতে ১০ শতাংশ নারী কোটা, ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও ১০ শতাংশ জেলা কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি করা হয়। ওই পরিপত্রের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২১ সালে রিট আবেদন করেন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান অহিদুল ইসলামসহ সাতজন। গত ৫ জুন সেই আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি কেএম কামরুল কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াতের হাইকোর্ট বেঞ্চ কোটা পদ্ধতি বাতিলে সরকারের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করেন। 

হাইকোর্টের রায়ের পর নতুন করে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে তারা কোটা বাতিলসহ চার দফা দাবিতে বিক্ষোভ করছিলেন। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার চার দফা থেকে দাবি এক দফায় নামিয়ে আনেন আন্দোলনকারীরা। তাদের এক দফা হলো সব গ্রেড থেকে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে এবং অনগ্রসর গোষ্ঠীর জন্য কোটাকে ন্যূনতম পর্যায়ে এনে সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে কোটা পদ্ধতি সংশোধন করতে হবে। 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন