কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী থাকলেই জনমিতিক লভ্যাংশের সুবিধা পাচ্ছি—ধারণাটি ভুল

ছবি : বণিক বার্তা

ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান। পিএইচডি করেছেন জনবিজ্ঞান বিষয়ে চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং পোস্ট-ডক্টরেট করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য বিষয়ে কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। জনবিজ্ঞান পাঠ ও গবেষণায় কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য ‘ফার্স্ট প্রাইজ অব একাডেমিক এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর গ্লোবাল হেলথ কাউন্সিল (ইউএসএ) কর্তৃক তিনি ‘নিক সাইমন্স স্কলার’ নির্বাচিত হয়েছিলেন জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণার জন্য। আজ বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে তিনি জনসংখ্যার গতিশীলতা এবং এর ওপর জলবায়ুর প্রভাব, জনমিতিক রূপান্তরসহ টেকসই উন্নয়নের নানা দিক নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবরিনা স্বর্ণা

১৯৯৪ সালে কায়রোয় অনুষ্ঠিত হয় জনসংখ্যা ও উন্নয়নবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন (আইসিপিডি)। যেখানে জনসংখ্যাকে কেবল সংখ্যায় বিবেচনা না করে গুণগত দিককে প্রাধান্য দেয়া হয়। দেশের স্বাধীনতার ৫৩ বছর পেরিয়েছে; জনসংখ্যা বহুগুণে বেড়েছে। দেশে এ পর্যন্ত জনসংখ্যার গুণগত মান কতটা বজায় রাখা হলো?

ওই সম্মেলনে জনসংখ্যার গুণগত দিক যেমন—প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার, জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন এসব বিষয় মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। সংখ্যার বিচারে দেশের জনসংখ্যার আকার বেড়েছে কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছে। পরিবার-পরিকল্পনায় আমাদের সফলতা রয়েছে। আগে একজন নারী জীবদ্দশায় গড়ে প্রায় সাতজন সন্তান প্রসব করতেন। কিন্তু বর্তমানে দেশে প্রজনন হার ২ দশমিক ৩, যেটি প্রায় প্রতিস্থাপনযোগ্য প্রজনন হারের (২ দশমিক ১) কাছাকাছি। গুণগত বিষয়টি মূলত আপেক্ষিক। আমাদের শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার কমেছে; মানুষের আয়ুষ্কাল, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার হার, শিক্ষার হার, গড় আয়ু বেড়েছে। এগুলো ইতিবাচক। কিন্তু এর পাশাপাশি কিছু নতুন চ্যালেঞ্জও আবির্ভূত হয়েছে। শুরুতেই জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির কথা বলেছি। এছাড়া বাল্যবিবাহ, কিশোরী মাতৃত্ব, পরিবার-পরিকল্পনার অপূর্ণ চাহিদা তো রয়েছেই। এখনো মাতৃমৃত্যুর হার অপেক্ষাকৃত বেশি। পাশাপাশি অসংক্রামক রোগ বেড়েছে যা মানুষের মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি ঠিক যে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, মানব উন্নয়ন সূচকে অগ্রগতি ঘটেছে কিন্তু মানবসম্পদ উন্নয়নে বা মানুষের দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে আমরা এখনো পিছিয়ে। স্থানীয় ও বৈশ্বিক শ্রমবাজারের জন্য দরকার দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি। সামগ্রিক বেকারত্বের হার কমলেও যুব বেকারত্বের হার এখনো বেশি। বিদ্যমান নিষ্ক্রিয় তরুণ-তরুণীর সংখ্যাও বড় চ্যালেঞ্জ। জনসংখ্যার আকার বেড়েছে কিন্তু গুণগত মানে, বিশেষ করে শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মানদণ্ডে আমরা এখনো কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছতে পারিনি।

কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছতে আমরা কী করতে পারি?

প্রথমত, জনসংখ্যা ও এর উপগোষ্ঠীগুলোর চাহিদা নির্ধারণ এবং সে মোতাবেক বিনিয়োগ করতে হবে। বাংলাদেশে এখন কর্মক্ষম জনসংখ্যা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ফলে এ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজারে কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। এজন্য বাড়াতে হবে বিনিয়োগ। বিনিয়োগ আকর্ষণে শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনে ও জনসংখ্যার গুণগত উন্নয়নে জাতীয় জনসংখ্যা নীতি ২০১২-এর হালনাগাদ ও বাস্তবায়ন জরুরি। বর্তমান নীতিতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে কিন্তু জনসংখ্যার ব্যবস্থাপনায় অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। জনসংখ্যাকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে আমাদের পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।

বিবিএসের ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২৩ জরিপের তথ্যানুসারে, বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ১৫ লাখ। জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনায় কীভাবে আরো জোর দেয়া যায়?

শুরুতেও একবার বলেছি জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছে আমাদের। কিন্তু জনসংখ্যার যে উপগোষ্ঠীগুলো রয়েছে সেখানে নানা সমস্যা ক্রমে বাড়ছে। ১৮ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে বাল্যবিবাহের হার ও ১৯ বছরেই মা হয়ে যাওয়া কিশোরীর সংখ্যা অনেক বেশি, ১৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে শিক্ষা, কাজ ও প্রশিক্ষণে নেই এমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে আমাদের দেশে দ্রুতগতিতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। অর্থাৎ এখন আমরা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ধাবিত হচ্ছি। কাজেই আমি মনে করি, জনসংখ্যার গুণগত মান উন্নয়নে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এক্ষেত্রে জনসংখ্যার উপগোষ্ঠীগুলোয় বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তাদের চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করতে হবে। 

গত পাঁচ বছরে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়লেও দেশ এখন জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সময় পার করছে। তবে পরিসংখ্যান বলছে দেশে বয়স্ক তথা নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আরো বাড়বে। তখন জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের পরিবেশ কি আমাদের অনুকূলে থাকবে বা কীভাবে অনুকূলে রাখতে পারি?

হ্যাঁ, বাংলাদেশ এখন জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সময় পার করছে। দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যা বেশি। তবে একসময় এ সংখ্যা কমে নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়ে যাবে। বিভিন্ন পরিসংখ্যান মতে, প্রথম জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের পরিবেশ আমাদের অনুকূলে থাকবে সর্বাধিক ২০৩৫-৩৬ সাল পর্যন্ত। পরবর্তী সময়ে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা যখন বেড়ে যাবে তখন তাদের সঠিকভাবে ব্যবহার করে অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে পারলে সেটি হবে দ্বিতীয় জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জন। তবে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী থাকলেই জনমিতিক লভ্যাংশের সুবিধা পাচ্ছি—এ ধারণা ভুল। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী থাকলেও যদি তাদের সুশিক্ষা, সুস্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক নীতি-কৌশল, এমনকি সুশাসন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও পর্যান্ত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জন করা সম্ভব নয়। ফলে জনমিতিক লভ্যাংশ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করতে হবে। যেমন স্বল্পমেয়াদে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদে বাড়ন্ত বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে কর্মক্ষম রাখতে সুস্বাস্থ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা ‍নিশ্চিত করে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের কৌশল নিতে হবে। একই সঙ্গে সবাইকে ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারে, অর্থাৎ প্রযুক্তিভিত্তিক শ্রমবাজারের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। 

জনমিতিক রূপান্তরের ফলে আমরা নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে যাচ্ছি। আমাদের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাও (এসডিজি) রয়েছে। জনমিতিক রূপান্তর ও টেকসই উন্নয়নকে সমন্বিতভাবে সফল করা কি সম্ভব?

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হচ্ছে, কাউকে পেছনে ফেলে নয়, মানে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন করতে হবে। জনসংখ্যায় জন্ম, মৃত্যু ও স্থানান্তরের পরিবর্তনে জনসংখ্যায় রূপান্তর ঘটছে। জনসংখ্যার উপগোষ্ঠীগত, যেমন শিশু, যুব, নারী, বয়স্ক গোষ্ঠী, নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী, স্থানান্তরিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরিবর্তন আসছে। এ রূপান্তরের ফলে জনমিতিক বৈচিত্র্য সৃষ্টি হচ্ছে, আলাদা চাহিদা তৈরি হচ্ছে। ফলে সবার জন্য চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে পর্যাপ্ত সমসুযোগ তৈরি করতে হবে গুণগত অন্তর্ভুক্তিমূলক উপাত্তের ভিত্তিতে। মোট কথা, জনসংখ্যার কাঠামো ও উপগোষ্ঠীগত জায়গায় কেমন পরিবর্তন আসছে সেগুলো বিবেচনায় রেখে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন তখনই সম্ভব যখন উন্নয়নকে বজায় রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া যাবে, যখন মানুষের অধিকার নিশ্চিত ও পছন্দ বাস্তবায়ন হবে। কায়রোর জনসংখ্যা ও উন্নয়ন সম্মেলনে এটিই বলা হয়েছিল যে উন্নয়নের কেন্দ্রে থাকতে হবে অধিকার ও পছন্দ। এগুলো বজায় রাখতে পারলে আশা করা যায়, বাংলাদেশ একসময় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছবে। 

আমরা জানি জনসংখ্যার গতিশীলতার ওপর জলবায়ু প্রভাব বিস্তার করে। দেশের বন্যা পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে। প্রতি বছরই একটি নির্দিষ্ট সময় আমরা বন্যার কবলে পড়ি। বন্যাজনিত কারণে আমাদের জনসংখ্যার গতিশীলতায় কেমন প্রভাব পড়েছে বা পড়বে?

জনসংখ্যার গতিশীলতার ওপর জলবায়ুর প্রভাব রয়েছে। এ মুহূর্তে বন্যাও ব্যাপক প্রভাব রাখছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ১৫টি জেলা-উপজেলা বন্যাকবলিত এবং প্রায় ২০ লাখ মানুষ বন্যা আক্রান্ত অবস্থায় রয়েছে। জনসংখ্যার গতিশীলতার প্রেক্ষাপট থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, জন্ম, মৃত্যু ও স্থানান্তর—এ তিন মৌলিক জনমিতিক প্রক্রিয়াকেই বন্যা পরিস্থিতি প্রভাবিত করে। প্রথমত, বন্যার কারণে মানুষ বাস্তুচ্যুত হয় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যায়। অর্থাৎ স্থানান্তর ঘটে এবং এক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ স্থানান্তরই মুখ্য। দ্বিতীয়ত, বন্যার কারণে মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও প্রজনন স্বাস্থ্যের অন্তর্ভুক্ত মানুষ বেশি মৃত্যুঝুঁকির সম্মুখীন হয়। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। তৃতীয়ত, বন্যাকবলিত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কিত সেবা প্রদান বাধগ্রস্ত হয়। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণে জন্মহার বৃদ্ধিসহ নানা ঝুঁকি থাকে। অর্থাৎ সামগ্রিক পরিসরে বলতে গেলে জনসংখ্যার গতিশীলতায় বন্যার প্রভাব রয়েছে। বন্যার ফলে আক্রান্ত অঞ্চলে মানুষের জীবন দুর্বিষসহ হয়ে উঠছে। 

দেশে বাস্তুচ্যুত বা স্থানান্তরের ঘটনা কি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে?

বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিতে রয়েছে এবং ঝুঁকি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। সে প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যতে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আরো বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। মানুষ বাস্তুচ্যুত হয় মূলত দুটি কারণে। এক. প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত (যেমন বন্যা, খরা, নদীভাঙন বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ) কারণেও মানুষ গ্রাম থেকে শহরমুখী হচ্ছে। স্থানান্তরের হার বাড়ছে। দুই. মনুষ্যসৃষ্ট কারণে। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কথা বলা যায়। 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন