রফতানি গরমিল

নগদ প্রণোদনা যথাযথ ব্যবহার হয়েছে কিনা তা নিরীক্ষা করা দরকার

ছবি : বণিক বার্তা

বৈশ্বিক রফতানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে ও রফতানির পরিমাণ বাড়াতে রফতানি আয়ের বিপরীতে সরকার নগদ প্রণোদনা দেয়। এছাড়া দেশে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার কমানো যায় না। সে কারণেও রফতানিকারকদের উদ্বুদ্ধ করতে এ নগদ সহায়তা দেয়া হয়। কিন্তু এ প্রণোদনার অর্থ বিতরণে ঘটছে নানা অনিয়ম, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। গত বছর রফতানির বিপরীতে নগদ সহায়তা কার্যক্রমের ওপর মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি কমপ্লায়েন্স অডিট পরিচালনা করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে ২০১৬-১৭ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করা নগদ প্রণোদনা কার্যক্রম যাচাই করে সংস্থাটি। এতে নিরীক্ষার ভিত্তিতে বেশকিছু অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। এসব অনিয়মের মধ্যে রয়েছে শতভাগ রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠান না হওয়া সত্ত্বেও নগদ প্রণোদনা গ্রহণ, আবেদনের নির্ধারিত সময়সীমা অতিবাহিত হওয়ার পরও প্রণোদনা নেয়া, এলসির মাধ্যমে আমদানি করা সুতার মূল্য বাদ না দিয়ে নগদ সহায়তা গ্রহণ, ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে কেনা সুতা রফতানি হওয়া তৈরি পোশাকে ব্যবহার না করে প্রণোদনা নেয়া, ইএক্সপি ইস্যু, পণ্য জাহাজীকরণ ও রফতানি মূল্য প্রত্যাবাসনের আগেই আবেদনের বিপরীতে নগদ সহায়তা প্রদান ইত্যাদি। এ অর্থ বিতরণের অনিয়মে যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে দেশের প্রচলিত আইনের আওতায় আনা জরুরি। পাশাপাশি বিতরণের ক্ষেত্রেও নিশ্চিত করতে হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। কেননা রিজার্ভ বৃদ্ধিতে রফতানি আয়ের ভূমিকা অন্যতম। 

সাধারণত রফতানিতে প্রণোদনা পেতে হলে রফতানি মূল্য প্রত্যাবাসন হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রমাণসহ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে আবেদন করতে হয়। আবেদন পাওয়ার পর ব্যাংকের পক্ষ থেকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্মের মাধ্যমে নিরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়। এ নিরীক্ষা শেষে দেয়া সনদের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক রফতানিকারককে নগদ সহায়তার অর্থ বিতরণ করে। অথচ প্রণোদনা প্রদানের বিভিন্ন ক্ষেত্রেই নিয়মটির ব্যত্যয় ঘটছে। বেশকিছু রফতানিকারক রফতানি মূল্য প্রত্যাবাসন হওয়ার ছয় মাস পরও নগদ প্রণোদনার জন্য আবেদন করেছেন। এর ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক প্রণোদনার অর্থ বিতরণও করেছে। এছাড়া নিরীক্ষকের জাল সনদের মতো গুরুতর অপরাধের মাধ্যমেও প্রণোদনার অর্থ তছরুপের নজির রয়েছে। এ ধরনের অনিয়ম বন্ধে কর্তৃপক্ষকে এখনই শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। 

দেশে রফতানি আয় নিয়ে নিয়মিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করে বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও বাংলাদেশ ব্যাংক। একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি থেকে শুরু করে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক নির্ধারণ এবং অর্থনৈতিক নানা নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়নে রফতানি আয়ের প্রকৃত হিসাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেজন্য সঠিক পরিসংখ্যান অপরিহার্য। কিন্তু রফতানি হওয়া পণ্যের মূল্য দেশে আসছিল না এবং রফতানির তথ্য নিয়েও রয়েছে অতিরঞ্জনের অভিযোগ। এ দুইয়ের প্রভাবে দেশের প্রকৃত রফতানি আয়ের তথ্য নিয়ে তৈরি হয়েছিল বিভ্রান্তি। বিষয়টি নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর বক্তব্যও ছিল পরস্পরবিরোধী। এমন অবস্থায় ইপিবির রফতানির তথ্য থেকে এক ধাক্কায় ১৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৩৮০ কোটি ডলার বাদ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টের (বিওপি) হিসাবায়ন করতে গিয়ে এ সংশোধনী আনা হয়। রফতানির মতো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর একটি খাতকে নিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভুল তথ্য প্রকাশের ঘটনা বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক। ফলে দেশটির জিডিপি, মোট জাতীয় উৎপাদন (জিএনপি), বিদেশী বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ঋণ গ্রহণের নীতি লেনদেনের ভারসাম্যসহ অর্থনীতির অনেক সূচক এবং নীতির যথার্থতা নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠছে। যেহেতু রফতানি আয়ের হিসাব সংশোধনের কারণে প্রকৃত আয় কমে গেছে, তাই এ খাতে নগদ প্রণোদনার বিষয়টিও নিরীক্ষা করা দরকার। তাহলে রফতানির বিপরীতে গত পাঁচ অর্থবছরে মোট ৩৬ হাজার ৫১১ কোটি টাকার নগদ প্রণোদনার অর্থে অতিরঞ্জিত রফতানি আয়ের প্রভাবগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠবে। 

গত ৩০ জানুয়ারি পোশাকসহ ৪৩টি খাতে পণ্য রফতানিতে নগদ সহায়তা কমিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৬ সালে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ ঘটবে। এজন্য পর্যায়ক্রমে সব ধরনের রফতানিতে প্রণোদনা কমানোর একটি পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন ঘোষণার পর সর্বোচ্চ হার ১৫ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে রফতানি আয়ের ওপর ১ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ সহায়তা দেয়া হতো, যাতে রফতানিকারকদের উৎসাহিত করা যায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের আরো প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা যায়। 

কিন্তু অনেকেই মনে করছেন, টেকসই রফতানি খাত গড়ে তোলার অন্যতম অন্তরায় হচ্ছে রফতানি প্রণোদনা। তৈরি পোশাকসহ কিছু পণ্য রফতানি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলেও বিশেষ সুবিধা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। বরং সরকারের আর্থিক সহায়তার ওপর খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের অতিনির্ভরতা বেড়ে যাচ্ছে। ফলে রফতানি খাতের সম্প্রসারণ, বহুমুখীকরণ ও গুণগত মানোন্নয়নে উদ্যোক্তার উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও ঝুঁকি মোকাবেলার নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে উঠছে না। নগদ প্রণোদনা দিয়ে রফতানি আয় বাড়ানোর চেষ্টা মোটেও স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ ব্যবসা হচ্ছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক। নিজের চেষ্টাতেই তা মেলে ধরতে হবে। সেখানে বছরের পর বছর কোনো খাত বা খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা প্রণোদনায় ভর করে চললে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা হ্রাস পায়। এতে সরকারের প্রণোদনা দেয়ার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যও ব্যাহত হচ্ছে। 

যেহেতু রফতানি আয়ের হিসাব সংশোধন হয়েছে, তাই এ খাতে নগদ প্রণোদনার বিষয়টিও নিরীক্ষায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। প্রণোদনার অর্থ বিতরণে নিয়মের যেসব ব্যত্যয় ঘটেছে, সেসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ কাম্য। ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হবে দেশ, তাই এখন দরকার রফতানিবান্ধব শুল্কনীতি ও অনুকূল বিনিময় হার। উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হলে একদিকে যেমন স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা থেকে রফতানির ক্ষেত্রে প্রাপ্ত সুবিধাদি থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত হবে, অন্যদিকে তেমনি প্রণোদনা দিয়ে পণ্য রফতানিতে নেমে আসবে অ্যান্টি-ডাম্পিং ও কাউন্টারভেইলিং নিষেধাজ্ঞা। রফতানি খাতকে আরো শক্তিশালী করতে সরকার পদক্ষেপ নেবে বলে প্রত্যাশা করি।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন