টেলিকম অপারেটর

গ্রাহক ও টাওয়ার বাড়লেও ভোগান্তি দুর্বল নেটওয়ার্কে

স্পেকট্রাম ব্যবহার বাড়ানোর নির্দেশ বিটিআরসির

আরফিন শরিয়ত

ফাইল ছবি

দেশের টেলিকম অপারেটর কোম্পানিগুলো বিভিন্ন সময় অফার ও ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস ছাড়ায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে গ্রাহকসংখ্যা। এরই মধ্যে তা ১৯ কোটি ছাড়ালেও সে অনুযায়ী বাড়েনি সেবার মান। উল্টো বেড়েছে কলড্রপ ও ইন্টারনেট বিড়ম্বনা। কথা বলার সময় একাধিকবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে সংযোগ। কখনো আবার সংযোগ থাকলেও অন্য প্রান্তের কথা শোনা যায় না। মাত্রাছাড়া এ কলড্রপ সেলফোন গ্রাহকদের ভোগান্তির পাশাপাশি বাড়াচ্ছে কথা বলার খরচও।  

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেলফোন ও ইন্টারনেট সেবার গ্রাহক বাড়লেও তাদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক সেবা নিশ্চিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসছে না অপারেটররা। কোম্পানিগুলোর নতুন বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে না আসা ও সেবার মান উন্নয়নে আগ্রহের অভাব এখন গ্রাহকদের জন্য বড় সমস্যার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। 

কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করছে, তাদের টাওয়ার সংখ্যা অপর্যাপ্ত। যদিও গত কয়েক বছরে দেশে টাওয়ারের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে। বর্তমানে দেশে টাওয়ারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজারের বেশিতে। গ্রাহকদের অভিযোগ, গ্রাহক ও টাওয়ারের সংখ্যা বাড়লেও নেটওয়ার্ক কাভারেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করেনি প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব কোম্পানি সাম্প্রতিক সময়ে প্যাকেজের দাম বাড়িয়েছে। যদিও সেবার মান ক্রমাগত কমছে। 

এ বিষয়ে বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘অপারেটরদের বিটিআরসি থেকে পর্যাপ্ত স্পেকট্রাম বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বরাদ্দকৃত স্পেকট্রামের যথাযথ ব্যবহার করছে না অপারেটররা। স্পেকট্রাম বরাদ্দের বিপরীতে অপারেটরদের বিনিয়োগ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে ও নতুন বিনিয়োগ করতে হয়। অপারেটররা বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয় না এক্ষেত্রে। যার কারণে নেটওয়ার্ক ব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে না।’

বিটিআরসি সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ৪২ হাজার ৫৯৩টি টাওয়ার ছিল দেশে। এরপর দেড় বছরের ব্যবধানে টাওয়ারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৫ হাজার ৩৯২টিতে। একই সঙ্গে অপারেটরদের টাওয়ার শেয়ারিংও বেড়েছে।

চলতি অর্থবছরের সর্বশেষ হালনাগাদকৃত তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত এপ্রিল শেষে মোট সেলফোন গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ১৯ কোটি ৩৭ লাখ ৩০ হাজার। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের গ্রাহক সংখ্যা ছিল ৮ কোটি ৩৯ লাখ ৫০ হাজার। এছাড়া রবি আজিয়াটার ৫ কোটি ৮৫ লাখ ১০ হাজার, বাংলালিংকের ৪ কোটি ৪৭ লাখ ২০ হাজার ও রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটকের ৬৫ লাখ ৫০ হাজার গ্রাহক রয়েছে। মোট মোবাইল গ্রাহকের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১২ কোটি ৫১ লাখ ৫০ হাজার। 

জানতে চাইলে বিটিআরসির কমিশনার প্রকৌশলী শেখ রিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘আমরা অপারেটর প্রতিষ্ঠানগুলোর সিইওদের (প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা) সঙ্গে আজ (গতকাল) বসেছি। তাদের সঙ্গে কলড্রপের সমস্যা নিয়ে কথা হয়েছে। তাদের আমরা যে স্পেকট্রাম বরাদ্দ দিয়েছি, তার পুরোপুরি ব্যবহার নিশ্চিতের জন্য বলা হয়েছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বিটিআরসিকে এ-সংক্রান্ত একটি রোডম্যাপ, ফোরকাস্টিং জানানোর জন্য বলা হয়েছে। থ্রিজি থেকে ফোরজিতে রূপান্তরের সময় কিছুটা কলড্রপ বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর কোথাও কলড্রপ শূন্যে নামিয়ে আনার মতো সমাধান নেই। আমরা আন্তর্জাতিক মানে কলড্রপের হারের দিক থেকে ২ শতাংশের নিচে আছি। এ সমস্যার সমাধানের জন্য কোম্পানিগুলোকে বলা হয়েছে। অপারেটরদের আমরা বলেছি, ওদের যে সুইচ আছে সেগুলো ঠিক করতে, যেখানে বিটিএস বসানো দরকার সেখানে বিটিএস বসাতে।’ 

সর্বশেষ ২০২২ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত আইএমটি তরঙ্গ নিলামে চারটি মোবাইল অপারেটরকে ৩৪৬ দশমিক ৬  মেগাহার্টজ তরঙ্গ বরাদ্দ দেয় বিটিআরসি। এর মধ্যে গ্রামীণফোনকে ১০৭ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ, রবিকে ১০৪ মেগাহার্টজ, বাংলালিংককে ৮০ মেগাহার্টজ ও টেলিটককে ৫৫ দশমিক ২ মেগাহার্টজ তরঙ্গ বরাদ্দ দেয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব তরঙ্গের পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারে না অপারেটররা। 

এর আগে ১ জুলাই গ্রামীণফোনকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয় বিটিআরসি। কলড্রপ সমস্যার সমাধান করতে না পারায় এ নোটিস প্রদান করা হয়। নোটিসে উত্তর দেয়ার জন্য সাত কর্মদিবসের সময় বেঁধে দিয়ে বলা হয়, এ সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারলে জরিমানা করা হতে পারে গ্রামীণফোনকে। এ সময়সীমা গতকালই শেষ হয়েছে। 

বিটিআরসি সূত্র জানায়, ভয়েস কল, ডাটা ও নেটওয়ার্কের কাভারেজ এলাকা—এ তিন মূল বিভাগে মোবাইল ফোন অপারেটরদের সেবার মান যাচাই করা হয়। আর এটি যাচাই করতে ‘কোয়ালিটি অব সার্ভিস ড্রাইভ টেস্ট’ চালায় বিটিআরসি। ড্রাইভ টেস্টে গ্রামীণফোনের ভয়েস ও ডাটা—দুটির কোনোটির কাঙ্ক্ষিত মানে পাওয়া যায়নি। বিটিআরসি এর কারণ জানতে চেয়েছে। এ বিষয়ে কমিশনের এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানান, প্রাথমিকভাবে গ্রামীণফোনের সেবা যাচাই করে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পাওয়া যায়নি। পরে রবি, বাংলালিংক ও টেলিটকের গ্রাহকসেবার মান যাচাই করা হবে। যদি তারা সঠিকভাবে কারণ ব্যাখ্যা দিতে পারে তাহলে তারা এবারের মতো মাফ পাবে। আর যদি সঠিকভাবে কারণ ব্যাখ্যা দিতে না পারে তাহলে বিটিআরসি ১ কোটি থেকে ৩০০ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারে।’

সোমবারও নেটওয়ার্ক সমস্যার মধ্যে পড়ে গ্রামীণফোনের গ্রাহকরা। দুপুরের পর থেকে গ্রাহকরা কিছু সময়ের জন্য নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন ছিলেন। তবে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান গ্রামীণফোনের হেড অব কমিউনিকেশনস শারফুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কারিগরি সমস্যার কারণে কিছুসংখ্যক গ্রাহক কল ও ইন্টারনেট সেবা ব্যবহার করতে কিছুটা সমস্যায় পড়েন, যা এরই মধ্যে সমাধান করা হয়েছে। এ অসুবিধার জন্য অপারেটরটি দুঃখ প্রকাশ করেছে।’ 

এ বিষয়ে জানতে রবি ও বাংলালিংকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য দিতে রাজি হয়নি। 


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন