এক দফা দাবিতে আজ সকাল-সন্ধ্যা অবরোধের ঘোষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গতকাল ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী

সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের এক দফা দাবিতে আবারো ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। সকাল ১০টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ঢাকাসহ সারা দেশে তারা এ কর্মসূচি পালন করবে বলে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে জানান ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন চলমান এ আন্দোলনের সংগঠকদের অনেকেই। 

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘২০১৮ সালের পরিপত্র যদি ফিরে আসে, তাহলে কোটা নিয়ে আবার ঝামেলা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আমরা সরকার ও নির্বাহী বিভাগের কাছে সম্পূর্ণ সমাধান চাই। আমরা চাই সংসদে আইন পাস করে সরকারি চাকরির সব গ্রেডে সব ধরনের বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে শুধু পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনায় রেখে কোটাকে ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসা হোক। সে দাবিতেই বুধবার সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা তথা সূর্যাস্ত পর্যন্ত সড়ক ও রেলপথ অবরোধ চলবে।’

কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে বছর ছয়েক আগে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে আন্দোলন গড়ে তোলেন শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা। এর প্রেক্ষাপটে ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর কোটা পদ্ধতি বাতিল করে পরিপত্র জারি করে সরকার। পরে ২০২১ সালে সেই পরিপত্রের মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের অংশটিকে চ্যালেঞ্জ করে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান উচ্চ আদালতে রিট করেন। রিটের প্রাথমিক শুনানির পর হাইকোর্ট ওই বছরের ৬ ডিসেম্বর রুল জারি করেন। রুলে পরিপত্রের পাশাপাশি এর আগে দেয়া হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের আদেশ প্রতিপালন না করা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্য অধিকারের প্রতি অবজ্ঞার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। চূড়ান্ত শুনানি শেষে রুল অ্যাবসলিউট (যথাযথ) ঘোষণা করে গত ৫ জুন রায় দেন হাইকোর্ট। 

হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করে, যা আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত হয়ে ৪ জুলাই আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির জন্য ওঠে। রিট আবেদনকারী পক্ষের সময়ের আরজির পরিপ্রেক্ষিতে সেদিন আপিল বিভাগ নট টুডে বলে আদেশ দেন। পাশাপাশি রাষ্ট্রপক্ষকে নিয়মিত লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করতে বলা হয়। এ অবস্থায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে গতকাল দুই শিক্ষার্থী আবেদন করেন। 

একই সঙ্গে কোটা পদ্ধতি বাতিলসহ চার দফা দাবিতে ১ জুলাই থেকে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা। সর্বশেষ কোটা বাতিলের এক দফা ঘোষণা করে গত রোববার থেকে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করছেন তারা। 

রাজপথে আন্দোলন করে অবশ্য কোটা বাতিল করা যাবে না বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। সচিবালয়ে গতকাল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘ঘটনা ঘটেছে আদালতে। যদি তারা (কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা) রাজপথে আন্দোলন করে বা চেঁচামেচি করে বকাবাদ্য করে, এটার কিন্তু নিরসন হবে না। এটা করলে যেটা হয়, একটা পর্যায়ে হয়তো আদালত অবমাননাও হয়ে যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট করেই বলেছেন, সরকারের সিদ্ধান্তের ব্যাপার এখন নেই। কোটার ইস্যুটা এখন সর্বোচ্চ আদালতের কাছে। আামি মনে করি, সর্বোচ্চ আদালত অবশ্যই সবদিক বিবেচনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত দেবেন। সেক্ষেত্রে আমি আজকে (গতকাল) দেখছি যে একটা ইতিবাচক পদক্ষেপ (পক্ষভুক্ত হওয়ার দরখাস্ত) তারা নিয়েছে। আমি এটাকে সাধুবাদ জানাই। তাদের বক্তব্য তারা আদালতে দেবে। আমি আশা করব, যেহেতু তারা আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারা আন্দোলন উইথড্রো (স্থগিত) করবে।’

এদিকে কেন্দ্রীয়ভাবে গতকাল কোনো কর্মসূচি না থাকলেও জাহাঙ্গীরনগর ও রাজশাহীসহ দেশের বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল, সড়ক অবরোধ ও জনসংযোগের মতো কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থীরাও গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে চলমান এ আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন। 

এদিকে চলমান আন্দোলন সরকার পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গতকাল তিনি বলেন, ‘আমরা যতটুকু জানি, কোটা সংস্কারের যে আন্দোলন শিক্ষার্থীরা করছেন, আজকে (মঙ্গলবার) তাদের নির্ধারিত কোনো কর্মসূচি নেই। সে জন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই।’ 

ছাত্রলীগকে সতর্কভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার নির্দেশনা দিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘কোনো অবস্থায়ই উসকানি দেয়া যাবে না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও নেত্রী (শেখ হাসিনা) নির্দেশ দিয়ে গেছেন, যেন তাদের পক্ষ থেকেও উসকানি না দেয়া হয়।’

কোটা নিয়ে আদালত থেকে সমাধানযোগ্য আদেশ আসবে বলে প্রত্যাশা করে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, ‘কিছু বিষয় রাজপথে সমাধান সম্ভব নয়। কোটা নিয়ে নির্দেশনা দ্রুত আসবে। বুধবার উচ্চ আদালতে এ-সংক্রান্ত একটি শুনানি রয়েছে। আশা করছি, সেখানে সমাধানযোগ্য কোনো আদেশ আসতে পারে।’


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন