নতুন অর্থবছরের বাজেটে মুদ্রানীতির চ্যালেঞ্জ

মো. জুলহাস উদ্দিন

ছবি : বণিক বার্তা

টালমাটাল বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণভাবে আমাদের কিছু দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি নানা দিক থেকেই একটা চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করছে। বিশ্বায়নের এ যুগে প্রতিনিয়ত কারিগরি ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুনভাবে আধিপত্যবাদ বিস্তারের প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা আমাদের মতো স্বল্পোন্নত ও উন্নয়শীল দেশগুলোয় চ্যালেঞ্জ আরো বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ রকম প্রেক্ষাপটে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেই সরকার ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট পাস করেছে। মুদ্রানীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে নতুন অর্থবছরের বাজেটের বেশকিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। ইতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে বাজেটের আকার খুব বেশি না বাড়ানো, মূল্যস্ফীতির চাপ নিরসনে বেশকিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর কমানো, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বাড়ানো ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তথাপি বাজেটে রাজস্ব আয় বাড়াতে অনেকটাই গতানুগতিক পন্থা অবলম্বন এবং ঘাটতি মোকাবেলায় ব্যাংক খাতের ওপর অতি নির্ভরতা মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির ক্ষেত্রে এরই মধ্যে যেসব চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি করেছে এবং সামনের মাসগুলোয়ও যেসব চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে তা চিহ্নিত করা এবং তা থেকে উত্তরণের সম্ভাব্য কিছু পথ দেখানোই এ নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটির সর্বশেষ অনুষ্ঠিত সভায় বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে যে দুটো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে তা হলো—অব্যাহত উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ক্ষয়। যদিও আপাতত রিজার্ভের ক্ষয় কিছুটা রোধ করা গেছে বলেই মনে হচ্ছে। অর্থনীতিতে একদিকে যেমন মূল্যস্ফীতির চাপ অন্যদিকে ব্যাংকগুলোয় পর্যাপ্ত তারল্যেরও অভাব রয়েছে। এর ফলে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় মুদ্রাবাজারে আমানত ও ঋণের সুদহার অব্যাহতভাবে বাড়ছে। পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, সাম্প্রতিককালে ব্যাংক খাতে নগদ তারল্যের যে দৈন্যদশা চলছে তার পশ্চাতে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ঋণের প্রবৃদ্ধি বহুলাংশে দায়ী। বেশ কয়েক বছর আমানতের সর্বনিম্ন সুদহার ৬ শতাংশ ও ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশে সীমিত থাকায় আমানতের প্রবৃদ্ধি ক্রমান্বয়ে শ্লথ হওয়ার বিপরীতে ব্যক্তি খাতে ঋণের চাহিদা ও প্রবৃদ্ধি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি করোনা-পরবর্তী সময়ে আমদানি ব্যয়ও অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। ফলে সার্বিকভাবে দেশের লেনদেন ভারসাম্যের ঘাটতিও মাত্রাতিরিক্তভাবে বৃদ্ধি পায়, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্ষয় এবং এবং ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহে শ্লথ প্রবৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি আমানত ও ঋণের ওপর আরোপিত সুদহারের পরিসীমা প্রত্যাহার এবং আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ এবং বৈশ্বিক নানা কারণে লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতির ফলে দেশের ব্যাংক খাতে নিট বৈদেশিক সম্পদ হ্রাস ও ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহের শ্লথ প্রবৃদ্ধির এ ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে। মুদ্রা সরবরাহের শ্লথ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে আমাদের অর্থনীতিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে সরকারের উন্নয়ন বাজেটের ঘাটতি মোকাবেলায় সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ব্যাংক খাত থেকে নিট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। 

উল্লেখ্য যে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যাপক অর্থ সরবরাহের প্রবাহ ১ হাজার ৪৭২ দশমিক ২ বিলিয়ন টাকার বিপরীতে অর্থনীতিতে করোনার ক্ষতিকর প্রভাব রোধকল্পে গৃহীত প্রণোদনা প্যাকেজগুলো বাস্তবায়নের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৬২৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন টাকায় দাঁড়ায়। এছাড়া উল্লিখিত অর্থবছরে পাবলিক সেক্টরসহ সরকারি খাতে নিট ঋণ গ্রহণের পরিমাণও দাঁড়ায় ৬৯৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন টাকা। যার অর্থ দাঁড়ায়, সামগ্রিকভাবে ওই অর্থবছরে ব্যাপক অর্থ সরবরাহের যে প্রবাহ ছিল; সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলে দেশের মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবাহ তার চেয়ে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেশি ছিল। বলা বাহুল্য যে, ২০২২-২৩ এবং সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও মুদ্রা সরবরাহের তুলনায় দেশের মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবাহ বেশি হারে বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকে। এমনকি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটেও ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সঞ্চয় স্কিমগুলো থেকে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তাতে রিজার্ভের ক্ষয়রোধ করে নিট বৈদেশিক সম্পদ উল্লেখযোগ্যভাবে প্রবৃদ্ধির ধারায় না ফিরলে দেশে মোট ব্যাপক অর্থ সরবরাহের তুলনায় মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবাহ বেশি হারে বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকবে বলেই অনুমিত হয়। 

বস্তুত সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সামগ্রিকভাবে দেশের লেনদেন ভারসাম্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ঘাটতির দরুন বৈদেশিক সম্পদের ঋণাত্মক প্রবাহ একদিকে যেমন ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহের প্রবৃদ্ধিকে শ্লথ করে দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমন অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিশীলতা বজায় রাখতে সরকারি-বেসরকারি সব খাতকেই অভ্যন্তরীণ সম্পদ বা ঋণপ্রবাহের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। নিট বৈদেশিক সম্পদের হ্রাসমান ধারা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক সাম্প্রতিককালে গৃহীত সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরকারের রাজস্বনীতিতে প্রয়োজনীয় মাত্রায় আয় বাড়ানো কিংবা পর্যাপ্ত ব্যয় সংকোচন করতে না পারার কারণেই ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহের প্রবাহের তুলনায় বেশি হারে মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবাহ বাড়ছে। ফলে সরকারের বিল ও বন্ডগুলোর সুদের হার নির্দেশক ইল্ড কার্বের দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী স্থানান্তর ঘটছে এবং ঋণের দায় পরিশোধে সরকারের ব্যয়ও অব্যাহতভাবে বাড়ছে। সাময়িকভাবে এ পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক এবং সহনীয় হিসেবে বিবেচনা করা হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা কোনোভাবেই সহনীয় নয়। এছাড়া অর্থনীতিতে সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত সরকারি বিল ও বন্ডগুলোর ইল্ড/সুদের হার, যা ৩৬৪ দিন ও তদূর্ধ্ব মেয়াদি বিল ও বন্ডগুলোর ক্ষেত্রে এরই মধ্যে ১২ শতাংশ অতিক্রম করেছে, তা সামনের মাসগুলোয় আরো বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক সাধারণ ঋণের সুদের হার ১৪ শতাংশের মধ্যে ধরে রাখতে তফসিলি ব্যাংকগুলোকে এর আগে যে নৈতিক মন্ত্রণা দিয়েছে তা ব্যাংকগুলোর জন্য পরিপালন করা অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। দীর্ঘ ৩৩ বছরেরও অধিককাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চাকরির অভিজ্ঞতায় দেখেছি যে, নৈতিক মন্ত্রণার আওতায় দেয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনাগুলো অনেকটাই অলিখিত বা সার্কুলার-ভিত্তিক না হওয়ায় তা বাস্তবায়নে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলো তেমন একটা গুরুত্ব দেয় না বা গুরুত্ব দেয়ার কোনো বাধ্যবাধকতাও আছে বলে মনে করে না। এজন্য নৈতিক মন্ত্রণার আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেয়া নির্দেশনাগুলোকে অনেকেই অকার্যকর হাতিয়ার হিসেবেও অভিহিত করে থাকেন। আসলে নৈতিক মন্ত্রণার আওতায় দেয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দিক নির্দেশনাগুলো বাস্তবতাবিবর্জিত ও সম্মুখাভিমুখী শর্তযুক্ত না হলে তা বাস্তবায়নযোগ্যও হয় না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সরকারের স্বল্পমেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদের হার বেড়ে যদি ১৩ শতাংশ অতিক্রম করে তাহলে নৈতিক মন্ত্রণার আওতায় ব্যাংকগুলোকে ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশে সীমিত রাখার জন্য দেয়া নির্দেশনা অনেকটা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাস্তবায়নযোগ্যতা হারায়। আবার অর্থবাজারে বিদ্যমান সুদের হার পরিস্থিতি নৈতিক মন্ত্রণার আওতায় দেয়া ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ বা তার নিচে সীমিত রাখার জন্য দেয়া নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য অনুকূলে থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যাংক যদি তা বাস্তবায়ন না করে তাহলে ওই ব্যাংককে কী ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে, সে ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা অনুপস্থিত থাকলে ব্যাংকগুলো তা পরিপালনে আগ্রহী না হওয়াটাই স্বাভাবিক। শাস্তির মধ্যে থাকতে পারে, যেসব ব্যাংকের ঋণের হার সর্বোচ্চ সুদের হার নৈতিক মন্ত্রণার আওতায় দেয়া নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করবে, তাদের নির্ধারিত সীমার মধ্যে ফিরে না আসা পর্যন্ত নতুন শাখা-উপশাখা খোলার অনুমতি না দেয়া, পুনঃঅর্থায়নের সুবিধাগুলো স্থগিত রাখা ইত্যাদি। 

ব্যাংক খাতে বৈদেশিক সম্পদ হ্রাস কিংবা নগদ তারল্য সংকোচনের ক্ষেত্রে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমানের অস্বাভাবিক অবচিতি এবং আমানতকারীদের মধ্যে আস্থার পরিবেশের ঘাটতিও একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ। পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিশেষ করে ইসলামী ধারার কিছু ব্যাংকের অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটে বৈদেশিক মুদ্রায় আমানত হিসাবগুলোয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে উদ্বৃত্ত তারল্য বিদ্যমান ছিল। এছাড়া ওই অর্থবছরে বিভিন্ন স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নিট বিনিয়োগ হিসাবগুলোয় উদ্বৃত্ত থাকায় সামগ্রিকভাবে দেশের বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যের আর্থিক হিসাবে মোট উদ্বৃত্তের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ১৫ দশমিক শূন্য ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে ঐতিহাসিকভাবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে দিতে সহায়তা করেছিল। কিন্তু পরবর্তী অর্থবছর থেকেই বৈশ্বিকভাবে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভসহ (ফেড) উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক কঠোরতর মুদ্রানীতির অবলম্বন, ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ এবং বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বিরোধের ফলে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত অস্বাভাবিকভাবে হ্রাসের পাশাপাশি রফতানি আয় ও দেশে রেমিট্যান্সের অন্তর্মুখী প্রবাহ হ্রাসের ফলে লেনদেন ভারসাম্যের চলতি হিসাবে ঘাটতি বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমানে অবচিতির চাপ তৈরি করে। তবে ডলারের বিপরীতে টাকার অবচিতি এবং লেনদেন ভারসাম্যের আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত হ্রাসের পেছনে শুধু যে বৈদেশিক উৎস হতে পর্যাপ্ত ঋণ ও বিনিয়োগ না আসার কারণে ঘটেছে বিষয়টি এমন নয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় আমদানি ব্যয় হ্রাস এবং প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি সত্ত্বেও মূলত রফতানি আয় হ্রাসের ফলে বাণিজ্য ঘাটতি এবং ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ সেবা খাতে ঘাটতি বাড়ার দরুন লেনদেন হিসাবের চলতি হিসাবে বিদ্যমান ঘাটতি বেড়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের জুলাই ’২৩ থেকে এপ্রিল ’২৪ পর্যন্ত সময়কালে বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যের আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত হ্রাসের ক্ষেত্রে ট্রেড ক্রেডিট হিসাবে ঘাটতি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। উল্লেখ্য অতিসম্প্রতি বিশেষত ট্রেড ক্রেডিট সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত ব্যাপকভাবে সংশোধনের পরও গত অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়কালে এ হিসাবে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যা তার পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়কালে ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত ছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সাধারণভাবে রফতানি আয় দেশে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট একটা সময়সীমা বেঁধে দেয়া থাকে। কিন্তু দৈবাৎ কোনো কারণে ওই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রফতানি আয় দেশে প্রত্যাবাসন সম্ভব না হলে লেনদেন ভারসাম্যে হিসাবের বিদ্যমান নিয়ম বা ম্যানুয়াল অনুযায়ী তা সরবরাহকারক কর্তৃক ক্রেতাকে স্বল্প সময়ের জন্য সুদবিহীন ট্রেড ক্রেডিট প্রদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বলা বাহুল্য যে, প্রথমে করোনা এবং পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ কর্তৃক নীতি সুদহার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি ও বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাণিজ্য বিরোধজনিত কারণে ডলারের সংকট ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লেনদেন ব্যবস্থা অনেকটাই ভেঙে পড়ে। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পৃথিবীব্যাপীই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ট্রেড ক্রেডিটের পরিমাণ বেড়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে এ হিসাবে ঘাটতি দেশের বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তবে আশার কথা এই যে, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক অতিসম্প্রতি ক্রলিং পেগ নীতি ঘোষণার মাধ্যমে বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানোর প্রয়াস, অফশোর ব্যাংকিং আইন প্রণয়ন, বিলম্বে রফতানি আয় প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে স্পট রেট কার্যকরকরণ ইত্যাদি ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে এরই মধ্যে অনেকটা অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। তথাপি ব্যাংক ও রফতানিকারকভিত্তিক বিলম্বে রফতানি আয় প্রত্যাবাসনের জন্য ট্রেড ক্রেডিট প্রদানের অর্থবছরভিত্তিক তথ্য প্রস্তুত এবং তা যথাশিগগির দেশে আনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ, সরকারের কাস্টমস ও অন্যান্য বিভাগের উপযুক্ত পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি স্ট্যান্ডিং কমিটি করার বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে। এছাড়া কোনো রফতানিকারক কর্তৃক যে পরিমাণ ট্রেড ক্রেডিট প্রদান করা হয়েছে তা ক্রমান্বয়ে দেশে প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত তার ঠিক ওই পরিমাণ দেশে এরই মধ্যে প্রত্যাবাসিত রফতানি আয়ের ওপর প্রণোদনা প্রদান স্থগিত রাখা এবং রফতানির মাধ্যমে সরাসরি বিদেশে মূলধন পাচার কিংবা ভুয়া রফতানি আয় দেখানোর প্রয়াস প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থাদি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

শ্রেণীকৃত ঋণ বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে ইদানী পত্রপত্রিকায় যেসব সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে তা খুবই একপেশে বলে মনে হচ্ছে। অতিসম্প্রতি ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির সংজ্ঞা নির্ধারণ, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবার থেকে পরিচালক হিসেবে মনোনীত সদস্যের সংখ্যা সর্বোচ্চ চারজন থেকে তিনজনে নামানো, সীমাহীনভাবে অসংখ্য বার ঋণ পুনঃতফসিলের বিদ্যমান সুবিধা সর্বোচ্চ চারবারে সীমিতকরণ ইত্যাদি শৃঙ্খলা আনয়নের চেষ্টার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিকভাবে ব্যবসা পরিস্থিতির অবনতিই সাম্প্রতিককালে শ্রেণীকৃত ঋণ বৃদ্ধির মূল কারণ বলে ধারণা করা যায়। এক্ষেত্রে বাংলদেশ ব্যাংক কর্তৃক ব্যাংকগুলোকে অনাদায়ী ঋণ আদায়ে বিশেষ কমিটি গঠন এবং প্রয়োজনে দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ব্যাংকগুলোর কাছে জামানত হিসেবে রক্ষিত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে অনাদায়ী ঋণ আদায়ের যে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে তা খুবই সময়োপযোগী। তবে এক্ষেত্রে শুধু নির্দেশনা জারি করাই যথোপযুক্ত নয়। বরং কমিটিগুলো যথাযথভাবে গঠিত ও কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখছে কিনা তা বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো কর্তৃক নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়ায়ও সমীচীন হবে। ব্যাংকগুলোর কাছে জামানত হিসেবে রক্ষিত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ বিক্রির বিষয়টি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ও অনেকটা চ্যালেঞ্জিং হলেও একদিকে তা যেমন ব্যাংকের নগদ তারল্য বৃদ্ধি করতে পারে, অন্যদিকে তা তেমন সমাজে সম্পদ মূল্যের বুদ্বুদ কমাতেও সহায়ক হতে পারে। 

পরিশেষে বলতে চাই যে চ্যালেঞ্জের উল্টো দিকেই সম্ভাবনা লুক্কায়িত থাকে। মুদ্রানীতির ক্ষেত্রে বর্তমানে নগদ তারল্যের অভাব ও মুদ্রাবাজারে সুদের হার ঊর্ধ্বমুখী ধারায় থাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সাময়িকভাবে কিছুটা স্তিমিত বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিছুটা শ্লথ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তা মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো সহায়ক হবে বলেই প্রত্যাশা করা যায়। তবে সরকারের উন্নয়ন বাজেটের ঘাটতি মোকাবেলায় ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরতা হ্রাসের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নয়নের অন্য কোনো বিকল্প নেই। এজন্য নতুন অর্থবছরের মুদ্রানীতিতেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়ে সংকোচনমুখী নীতি অব্যাহত রেখেই দৈনন্দিন তারল্য ব্যবস্থাপনা এমনভাবে করতে হবে যাতে আর্থিক খাত সংস্কার কর্মসূচির আওতায় বিশেষত ব্যাংকের ঋণের সুদের হার হ্রাসে গত তিন দশকেরও অধিককালের প্রচেষ্টায় অর্জিত সাফল্য সহজেই বিলীন হয়ে না যায়।

মো. জুলহাস উদ্দিন: পিআরএলে অবস্থানরত বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক এবং আর্থিক ও মুদ্রানীতি বিশ্লেষক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন