ডব্লিউটিওর সতর্কবার্তা

বৈশ্বিক বাণিজ্যকে নাজুক করে তুলেছে সংরক্ষণবাদী নীতি

বণিক বার্তা ডেস্ক

চীনা ইভির ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের শুল্ক আরোপ নতুন বাণিজ্যযুদ্ধ উসকে দিয়েছে ছবি: রয়টার্স

বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির জীবনীশক্তি হিসেবে পরিচিতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় ভুগছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাবক হলো ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দেশগুলোর সংরক্ষণবাদী নীতি। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান আশঙ্কা এতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নাজুক পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্প্রতি সতর্ক করে দিয়েছেন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মহাপরিচালক . এনগোজি ওকোনজো-ইওয়েলা। তার ভাষ্যে, ‘ মুহূর্তে বৈশ্বিক বাণিজ্য ভালো কোনো সময় পার করছে না।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা ক্রমবর্ধমান সংরক্ষণবাদী অবস্থান দেখতে পাচ্ছি। এর কিছু ক্ষেত্রে ডব্লিউটিওর নীতিকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে; কিছু ক্ষেত্রে সংরক্ষণবাদী অবস্থান দেশগুলোর বাণিজ্যকে বিভক্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

তার মতে, কভিড-১৯-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রবৃদ্ধির জন্য বিশ্ব বাণিজ্য জীবনীশক্তি হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো উদ্বিগ্ন করার জন্য যথেষ্ট।

বিভক্তি সংরক্ষণবাদিতার উদাহরণ হিসেবে সাম্প্রতিক দুটি পদক্ষেপের উল্লেখ করা যায়। সপ্তাহখানেক আগে চীন থেকে আমদানীকৃত বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির (ইভি) ওপর ৩৭ দশমিক শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে ইউরোপ। এর আগে মে মাসে একই ধরনের পরিবহনের ক্ষেত্রে শতভাগ শুল্ক আরোপ করে বাণিজ্যযুদ্ধ উসকে দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

ব্রাসেলস ওয়াশিংটন দুই পক্ষই অভিযোগ তুলেছে, ইভি খাতের বিকাশে চীন অসংগতভাবে কোম্পানিগুলোকে সাহায্য করছে। কারণে কম দামে পশ্চিমা বিশ্বে ইভি রফতানি সহজ হচ্ছে, যা স্থানীয় পর্যায়ের চাকরির জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে মার্কিন আমদানি শুল্ক এখানেই থামছে না।ভবিষ্যৎ শিল্পকে সুরক্ষায় এরই মধ্যে অন্যান্য চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেছেন জো বাইডেন। যার মধ্যে রয়েছে ইভি ব্যাটারি এতে ব্যবহৃত খনিজ উপকরণ, সোলার প্যানেলের সেল কম্পিউটার চিপ। উল্টো দিকে ইনফ্লেশন রিডাকশন অ্যাক্টের আওতায় গ্রিন টেকনোলজিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করছে যুক্তরাষ্ট্র, যার লক্ষ্য চীনা আমদানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস করা।

অবশ্য ইইউ ট্রেড কমিশনার ভালদিস ডোমব্রোভস্কিস জানিয়েছেন, চীনের ইভির জন্য ইউরোপের বাজার পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া তাদের লক্ষ্য নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা আমদানি প্রতিযোগিতাকে স্বাগত জানাই। কিন্তু সে প্রতিযোগিতা হতে হবে ন্যায্যতার ভিত্তিতে।

ডব্লিউটিও বলছে, ৩০ বছরের মধ্যে ২০২৩ সালে বৈশ্বিক বাণিজ্য তৃতীয়বারের মতো কমেছে। এর মধ্যে দশমিক শতাংশ বাণিজ্য পতনের সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সুদহারের সম্পর্ক রয়েছে। চলতি বছরে দুটি ক্ষেত্রই পুনরুদ্ধার হতে পারে।

কিন্তু মূল্যস্ফীতি সুদহারের বাইরে আরো কিছু বিষয় রয়েছে, যা প্রাকৃতিক রাজনৈতিক সমস্যা। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ফার্স্ট ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর গীতা গোপীনাথ বলেন, ‘বিশ্ব বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গত কয়েক বছরে এমন কিছু বিষয় দেখা গেছে, যা স্নায়ুযুদ্ধের পর কখনো ঘটেনি।

তিনি জানান, গত কয়েক বছরে মহামারীসহ অসংখ্য ধাক্কা খেয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। এর একটি হলো ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ। ঘটনাগুলোর কারণে ক্রমবর্ধমানভাবে বিশ্বে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগের মাঝে পড়েছে। এখন কার সঙ্গে কে ব্যবসা করবে বা বিনিয়োগ করবে তা এসব ঘটনা দ্বারা নির্ধারণ হচ্ছে।

এসব ঘটনার সুদূরপ্রসারি প্রভাব রয়েছে। পেরু, ঘানা বা ভিয়েতনামের কথাই ধরা যাক। পশ্চিমা শক্তি বা চীনা-রাশিয়া জোট নানা পক্ষের দিকে তাকিয়ে বাণিজ্য সম্পর্কে নজর দিতে হয় দেশগুলোর। বিষয়ে ডব্লিউটিওর মহাপরিচালক  বলেন, ‘আমরা বাণিজ্য তথ্যে উদীয়মান যে বিভক্তি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমরা দেখছি যে সমমনা ব্লকের মধ্যে বাণিজ্য অন্য ব্লকগুলোর তুলনায় দ্রুত বাড়ছে।

ধরনের প্রবণতা বিশ্ব বাণিজ্যকে ব্যয়বহুল করে তুলবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চীনা ইভির ওপর ইইউর শুল্ক বাধার বিপরীতে পাল্টা ব্যবস্থার হুমকি দিয়েছে বেইজিং।

তবে বৈশ্বিক বাণিজ্যকে সহজ করতে আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা অতিক্রম করতে হবে। তা হলো দুটি বাণিজ্য রুটের কার্যকারিতা হ্রাস। একদম প্রাকৃতিক কারণে প্রায় বন্ধ হওয়ার দশায় রয়েছে পানামা খাল। অন্যদিকে হুথি হামলার কারণে সুয়েজ খালের ব্যবহার কমেছে প্রায় ৯০ শতাংশ। কারণে পরিবহন খরচ বেড়েছে গড়ে ৩০-৪০ শতাংশ। পুরো পরিস্থিতিভোক্তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করে বলে মত ডব্লিউটিওর মহাপরিচালকের।

এতসব উত্তেজনার মাঝেও বাণিজ্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে বলেও জানান তিনি। সঙ্গে এও স্বীকার করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সমস্যা মোকাবেলায় ডব্লিউটিওর কিছু নিয়ম পরিবর্তনের প্রয়োজন। কারণ কয়েক দশক আগে যখন নীতিগুলো প্রবর্তন করা হয়, তখন পরিস্থিতি এখনকার মতো ছিল না।

এছাড়া শুল্ক বাধা নিয়ে আশা করেন, বাণিজ্যযুদ্ধ ১৯৩০-এর দশকের পুনরাবৃত্তি হবে না। ওই সময়েপ্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপের কারণে সব পক্ষই হেরে গিয়েছিল। এনগোজি ওকোনজো-ইওয়েলা বলেন, ‘সুতরাং আমি আশা করি আমরা আর সে ধরনের যুগে প্রবেশ করব না।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন