কক্সবাজার আইকনিক রেলওয়ে স্টেশনের ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণকাজ

ছাদ চুইয়ে ভবনের ভেতর পড়ে বৃষ্টির পানি

সুজিত সাহা ও ছৈয়দ আলম

কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশন ভবনের ভেতরের অংশ ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী

পাঁচ তারকা হোটেল সুবিধা নিয়ে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে নির্মাণ হয়েছে বাংলাদেশের প্রথম আইকনিক রেলওয়ে স্টেশন। ২১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ঝিনুকের আদলে তৈরি স্টেশন ভবনটির কাজ শেষ পর্যায়ে। বর্তমানে এর কার্যক্রম চলছে স্বল্প পরিসরে। এর মধ্যেই সামনে আসছে নির্মাণকাজের নানা ত্রুটি। বৃষ্টি হলেই ছাদ চুইয়ে পানি ঢুকে পড়ছে স্টেশন ভবনের ভেতর। ড্রেনেজের পানি উপচে প্লাবিত হয় প্লাটফর্ম। এতে বিঘ্নিত হচ্ছে পরিচালন কার্যক্রম। ব্যয়বহুল আইকনিক স্টেশন ভবনটির নির্মাণকাজের মান নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।

চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি) সঙ্গে যৌথভাবে স্টেশন ভবনটি তৈরি করেছে বাংলাদেশের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। তাদের দাবি, সমস্যাগুলো দ্রুতই সমাধান করা হবে। এরই মধ্যে কাজও শুরু হয়েছে।

কক্সবাজার আইকনিক রেলওয়ে স্টেশনের ভেতর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টির পানি প্রবেশের ঘটনাটি ঘটে গত শনিবার। ওইদিন পানি গড়ায় স্টেশনমাস্টারের রুম পর্যন্ত। এ ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকরা ভবনটির নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। রেলওয়ের একটি প্রতিনিধি দলও স্টেশনটি পরিদর্শন করেছে। 

রেলওয়ের কর্মীরা জানিয়েছেন, কক্সবাজার আইকনিক স্টেশন ভবনের পাশাপাশি প্লাটফর্মেও বৃষ্টির পানি প্রবেশ করে। এতে বৃষ্টির সময় যাতায়াতে ভোগান্তিতে পড়ছে যাত্রীরা। নিকটবর্তী দোহাজারী ও চকরিয়া স্টেশনের প্লাটফর্মেও বৃষ্টির পানি প্রবেশের ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছেন রেলসংশ্লিষ্টরা। 

কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, বৃষ্টিতে স্টেশনের ভেতরে পানি প্রবেশের বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত। বর্ষা মৌসুমে প্লাটফর্মেও বৃষ্টির পানি প্রবেশ করায় যাত্রীরা ভোগান্তির মধ্যে পড়ছে। বিষয়টি প্রকল্প ও রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে পানি প্রবেশের বিষয়টি সমাধানে ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা। তবে ২০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত অত্যাধুনিক রেলওয়ে স্টেশনের ভেতরে এভাবে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের মান নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলছেন।

কক্সবাজার স্টেশনের ভেতরে বৃষ্টির পানি প্রবেশের ঘটনাটি স্বীকার করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স। এরই মধ্যে সমস্যাটি সমাধান করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের প্রকল্প ব্যবস্থাপক আহমেদ সুফি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌আইকনিক রেলওয়ে স্টেশনটির কাঠামো ও নকশা অন্য যেকোনো উঁচু ভবনের চেয়ে আলাদা। স্টেশন নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে। এবারই প্রথম ভারি বৃষ্টির মুখোমুখি হয়েছি আমরা। ছাদ থেকে কোনো একটা বা একাধিক লিকেজ দিয়ে ভবনের অভ্যন্তরে পানি প্রবেশ করতে পারে। আমরা বিষয়টি নিয়ে সজাগ রয়েছি। এরই মধ্যে প্লাটফর্ম ও স্টেশন ভবনে পানি প্রবেশ নিয়ে সৃষ্ট ত্রুটিগুলো সংশোধন করা হয়েছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে স্টেশন ভবনটি বুঝিয়ে দেয়ার সময় এ ধরনের ত্রুটি থাকবে না।’

স্টেশনটি তৈরি করা হচ্ছে দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের মাধ্যমে। ছাদ চুইয়ে ভবনে পানি প্রবেশের ঘটনাকে অবশ্য ‘‌সামান্য বিষয়’ বলে মনে করছেন এ প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ সুবক্তগীন। জানতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ের হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাজ বুঝে নেয়া হয়নি। তাছাড়া বৃষ্টির সঙ্গে প্রবল ঝড় হলে এমনিতেও প্লাটফর্মে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করতে পারে। স্টেশন এলাকার পানি নির্গমনের স্থানে ঘাসের কারণে বৃষ্টির পানি স্টেশনমাস্টারের রুমে প্রবেশ করেছে। এটি সামান্য বিষয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিষয়টি নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ায় এ ধরনের সংকট আর হবে না।’

দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথটি ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ট্রেন চলাচল শুরু হয় ১ ডিসেম্বর থেকে। বর্তমানে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে সরাসরি দুটি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে। এর বাইরে গত ঈদুল ফিতর থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের মধ্যে একটি বিশেষ ট্রেন পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে সব ছাপিয়ে এখন আইকনিক রেল স্টেশন ভবনে বৃষ্টির পানি প্রবেশের বিষয়টি আলোচনায়। 

স্টেশনের প্লাটফর্মগুলোয় বৃষ্টির পানি প্রবেশের জন্য ছাদের অধিক উচ্চতাকে দায়ী করছেন রেলওয়ের কর্মীরা। বিষয়টি উঠে এসেছে রেলপথ পরিদর্শন অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণেও। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে রেলপথ পরিদর্শন অধিদপ্তরের সরকারি রেল পরিদর্শক মামুনুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রায় এক মাস আগে আমরা স্টেশন ইন্সপেকশন করেছি। ওই সময়ে আইকনিক স্টেশন ভবনের অভ্যন্তরে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করে কিনা সে বিষয়ে পরীক্ষার কোনো সুযোগ ছিল না। তবে আমরা ওয়াটারিং সিস্টেমসহ প্লাটফর্মের উচ্চতা বেশি হওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। ডাবল ডেকার ট্রেন প্রবেশের সুবিধা রেখে প্লাটফর্মের ছাদের উচ্চতা রাখা হয়েছে। এ কারণে বৃষ্টিতে পানি প্রবেশ করতে পারে। তবে স্টেশন ভবন কিংবা প্লাটফর্মে পানি প্রবেশ মাত্রাতিরিক্ত হলে ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ডের সময়ে সেটি ঠিক করে দেয়ার সুযোগ রয়েছে।’

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন