বাগেরহাটের বিসিক শিল্পনগরী

২৬ বছরেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন হয়নি

বণিক বার্তা প্রতিনিধি, বাগেরহাট

ছাব্বিশ বছর অতিবাহিত হলেও অবকাঠামো উন্নয়ন হয়নি বাগেরহাটের বিসিক শিল্পনগরীতে। রাস্তাঘাটের বেহাল দশার কারণে ব্যবসায়ীদের নিয়মিত দুর্ভোগের পাশাপাশি বাড়ছে পরিবহন খরচ। সুপেয় পানি ড্রেনেজ সমস্যা নিত্যদিনের। ফলে দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে সম্ভাবনাময় বিসিকের ঘুরে দাঁড়ানোর পথ। অবস্থায় শিল্প-কারখানা টিকিয়ে রাখতে দ্রুত পানি সংকট নিরসন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী নেতা উদ্যোক্তারা। দ্রুত অবকাঠামো সংস্কারের দাবি ব্যবসায়ী নেতাদের।

তবে বিসিক কর্তৃপক্ষের দাবি, বিসিকে সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সাবমারসিবল পাম্প বসানোর জন্য দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এরই মধ্যে বিসিকের গেট একটি রাস্তার নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব অন্যান্য সমস্যা সমাধান করে বিসিক শিল্পনগরীকে ব্যবসায়ীবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

১৯৯৬ সালে শিল্প উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) বাগেরহাট শহরের ভৈরব নদের পাশে প্রায় ২১ একর জমির ওপর ক্ষুদ্র কুটির শিল্পনগরী গড়ে তোলা হয়। শিল্প নগরীতে ১২৩টি প্লটের সবকটিই বরাদ্দ নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য রয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ উপবিদ্যুৎকেন্দ্র। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে নারিকেল তেল, অটো রাইস ফ্লোয়ার, সরিষা, ডাল মিল, ইজিবাইক সেটিংস, পুরনো প্লাস্টিক প্রক্রিয়াকরণ, কোকোনাট ফাইবার মিলস অন্যতম।

বিসিক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠার পর ১৯৯৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত জমির লিজ বাবদ বিসিক কোটি ৪৩ লাখ ২০ হাজার টাকা আয় করেছে। সময়ে সার্ভিস চার্জ, পানির বিল ভূমি কর বাবদ আয় হয়েছে কোটি লাখ ৪৬ হাজার টাকা। এর মধ্যে ২০১৭ সালে শিল্পনগরীতে থাকা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সার্ভিস চার্জ, ভূমি উন্নয়ন কর পানির বিল বাবদ আয় ২০ লাখ হাজার টাকা, একই খাত থেকে ২০১৮ সালে লাখ ১৭ হাজার টাকা, ২০১৯ সালে ১০ লাখ ৬৯ হাজার টাকা, ২০২০ সালে ১০ লাখ হাজার টাকা, ২০২১ সালে ১৩ লাখ ১৮ হাজার টাকা। কোনো বছর বেশি আয়, আবার কোনো বছর কমের কারণ হিসেবে বকেয়া বিলের কথা উল্লেখ করেন বিসিকের উপব্যবস্থাপক।

অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের স্বার্থে বিসিকের অবকাঠামো খাতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল লাখ টাকা, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৯৮ লাখ ৭৯ হাজার টাকা এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ৪৫ লাখ টাকা। ২০১৯-২০ সালের বরাদ্দকৃত প্রায় কোটি টাকার মধ্যে ৩৫ লাখ টাকার বরাদ্দ দেয়া হয় পানি সমস্যা নিরসনের জন্য। তবে এখন পর্যন্ত তিনবার মাটি পরীক্ষা করলেও জায়গা নির্বাচন বা কাজ শুরু করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জামান এন্টারপ্রাইজ।

বিসিকের একাধিক শ্রমিক জানান, সুপেয় পানির কোনো ব্যবস্থা নেই বিসিকে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি খেলেও গরমের সময় পানি কিনে খেতে হয়। রান্না গোসলের জন্য পানির ব্যবস্থা করতে হয় বাইরে থেকে। আগের চেয়ে বেতন কম পান এখন। সেই বেতনে সংসার চালানো দায় তাদের।

বিসিকে অবস্থিত একটি বিস্কুট ফ্যাক্টরির মালিক মো. আজমীর বলেন, বিস্কুট তৈরির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সুপেয় পানি। অথচ এখানে পানির কোনো ব্যবস্থা নেই। অথচ প্রতি মাসে ঠিকই ২০০ টাকা করে পানির বিল দিতে হয়। আবার পানি কিনতে হয় বাইরে গিয়ে। ফ্যাক্টরিতে -১০ জন শ্রমিক কাজ করার সক্ষমতা থাকলেও পানির অভাবে মাত্র তিনজন দিয়ে কোনোরকম ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছি।

শিল্পনগরীতে অবস্থিত নারিকেল তেল প্রস্তুতকারক সাহা এন্টারপ্রাইজের মালিক জীবন কৃষ্ণ সাহা বলেন, সরকারকে ঠিকমতো ভ্যাট-ট্যাক্স দিলেও শিল্পবান্ধব কোনো পরিবেশ নেই বাগেরহাট বিসিকে। একটু বৃষ্টি হলে রাস্তায় পানি জমে যায়। ড্রেন থেকে পানি নিষ্কাশন হয় না।

সমস্যা সমাধানে রাস্তাঘাট সংস্কার পাইপলাইনের মাধ্যমে পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি মালিক শ্রমিকদের।

পেশা বদলে ফেলা বিসিকের অন্তত ছয়জন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাঁচ বছর আগে যে মজুরি পাওয়া যেত, এখনো তাই আছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কমেছেও। ফলে বাঁচার তাগিদে বাধ্য হয়েই পেশা বদল করছেন তারা।

বাগেরহাট বিসিক শিল্পনগরী মালিক সমিতির সভাপতি শিব প্রসাদ ঘোষ বলেন, একসময় বিসিক শিল্পনগরীতে ২৪ ঘণ্টা তিন শিফটে চলত বেশির ভাগ মিল। দম ফেলার ফুরসত ছিল না শ্রমিকদের। অনেক দূর থেকে শোনা যেত মেশিন চলার শব্দ। সেই দিন এখন অতীত। দেড় যুগের ব্যবধানে শিল্পনগরীর প্রতিষ্ঠান সংখ্যা ৫৭ থেকে ৩৭টিতে নেমে এসেছে। শ্রমিক সংখ্যা নেমে এসেছে দেড় হাজার থেকে ৭০০-তে।

বিসিক বাগেরহাট জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত) শরীফ সরদার বলেন, আমাদের বিসিকের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বেশ বরাদ্দ রয়েছে। আমরা বিসিকের গেট একটি রাস্তার নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেছি। অন্যান্য যেসব রাস্তা ভাঙাচোরা রয়েছে, সেগুলোও পর্যায়ক্রমে নির্মাণ করা হবে। এছাড়া বিসিকে সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সাবমারসিবল পাম্প বসানোর জন্য দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু মাটির নিচে পাথর থাকা এবং ডিজাইনে কিছু সমস্যা থাকায় কাজটি ব্যাহত হচ্ছে। ঠিকাদার নকশা সংশোধনের জন্য প্রধান কার্যালয়ে চিঠি দিয়েছেন। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে সাবমারসিবল পাম্পের কাজ শুরু হবে।

বিসিক শিল্পনগরীর বিষয়ে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বলেন, বিসিকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আন্তরিক হতে হবে। তাহলে সংকট নিরসন করে শিল্পনগরীতে আগের জৌলুস ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন