৪৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা কমিশনের মামলা

দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক

অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে ৪৪ ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা কমিশন মামলা করেছে। কমিশনের পক্ষ থেকে নিকট অতীতে নেয়া সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ এটি। বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করায় বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে বাড়তি গুরুত্ব লাভ করেছে। ফলে ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ভোক্তারা একে গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ, মজুদ মূল্য স্বাভাবিক রাখতে সরকারের নেয়া উদ্যোগের অংশ হিসেবে কমিশন ব্যবস্থা নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম জোগানে মারাত্মক অস্থিরতা দেখা দেয়। সেটি তদন্ত করতে গিয়ে প্রতিযোগিতা কমিশন ব্যাপক অনিয়ম পাওয়ায় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কথা সত্য, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি এবং ডলারের অতিমূল্যায়নের কারণে আমদানি পণ্যের দাম বেড়েছে। কিন্তু বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দেশে পণ্যমূল্যের বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে বেশি, এমনকি স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত পণ্যের দামও অনেক বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা এর জন্য ব্যবসায়ীদের অতিমুনাফা লাভের মানসিকতা বাজার সিন্ডিকেট বা কারসাজিকে দায়ী করছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়াই যুক্তিযুক্ত। এক্ষেত্রে কোনো ব্যবসায়ী যেন হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

অভিযোগ উঠেছে, দ্রব্যমূল্য বাড়ার পেছনে দেশের বড় বড় করপোরেট গ্রুপ এবং সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরাই জড়িত। এরই মধ্যে কিছু প্রমাণ পেয়েছে কমিশন। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি), বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই), ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখেছে প্রতিযোগিতা কমিশন। এতে ক্রেতাকে ঠকিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে।  কারণেই মামলার মুখোমুখি দেশের ভোগ্য নিত্যপণ্যের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো। অভিযোগ প্রমাণ সাপেক্ষে বার্ষিক টার্নওভারের -১০ ভাগ পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হবে। প্রতিযোগিতা কমিশন আইন অমান্যে ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হবেন ব্যবসায়ীরা।

বাজারে অনেক সময়ই জোটবদ্ধতার সৃষ্টি হয়, যা কারটেল নামে পরিচিত। বাংলাদেশে অনেকেই তাকে সিন্ডিকেট বলেন। অবস্থায় গুটিকতক বিক্রেতা বাজার নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে জোট তৈরি এবং বাজারে সরবরাহ সংকট সৃষ্টি করেন। ফলে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। ব্যবস্থা কাম্য নয়। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রচলিত আইনে সম্ভব হয় না। কারণ তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। ফলে সরকার বিব্রত হয় আর ক্রেতাদের ক্ষোভ বাড়ে। বাংলাদেশেও তা নানা সময়ে পরিলক্ষিত হয়েছে। কোনো কোনো সময় সরকার নিজেদের রক্ষা করতে গিয়ে হয়রানিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু কার্যত তা সবসময়ই ব্যর্থ হয়েছে। ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে প্রতিযোগিতা আইন অত্যন্ত কার্যকর। পৃথিবীর বহু দেশে জোটবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে প্রতিযোগিতা কমিশন সফল হয়েছে। বাজারে উৎপাদনকারী নানা সময়ে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়ে থাকে, যার মাধ্যমে খুচরা বিক্রেতারা অন্য উৎপাদনকারীর পণ্য বিক্রয় করতে পারেন না। ধরনের চুক্তি বা শর্ত নানাভাবে জুড়ে দেয়া হয়। ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা হ্রাস পায়। ভোক্তারা অধিক দামে সেই পণ্য কিনতে বাধ্য হন। অন্য প্রতিযোগী না থাকায় ভোক্তার পক্ষে বোঝা দুষ্কর পণ্যটির মূল্য ন্যায্য কী ছিল। প্রতিযোগিতা কমিশনের উদ্দেশ্য হলো বাজারে অনৈতিক মুনাফার লোভে ষড়যন্ত্রমূলক প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করা। ধরনের কমিশন মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) শতাংশ অবদান রাখতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি কার্যকরভাবে ভূমিকা রাখতে পারলে প্রতিযোগিতামূলক দামে বা ন্যায্যমূল্যে ভোক্তারা পণ্য বা সেবা পাবেন। ব্যবসায় সুষ্ঠু পরিবেশ এলে বিনিয়োগ বাড়বে।

প্রতিযোগিতা কমিশনকে বুঝতে হবে, তাদের মূল উদ্দেশ্য বাজারে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করা কিংবা বাজারকে অপ্রতিযোগিতামূলক অবস্থান থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। তাদের গৃহীত পদক্ষেপ আর ১০টি কর্তৃপক্ষের মতো নয়। কমিশনকে জানতে হবে কোন পণ্যে কীভাবে প্রতিযোগিতা হ্রাস পাচ্ছে। তাদের গৃহীত পদক্ষেপের মাধ্যমেই সৃষ্টি হবে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ স্পৃহা, উদ্ভাবিত হবে নতুন পণ্য কিংবা আসবে নতুন উৎপাদক। কমিশনের নেয়া ব্যবস্থাই হবে বাজারে সুলভ মূল্যে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার একমাত্র পথ। তাতে দেশ জাতি উপকৃত হবে। তবে তাদের মনে রাখতে হবে, বাজার ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য একটি প্রয়োজনীয় লক্ষণ। তাই বিভিন্ন পণ্য বা সেবায় একই ব্যবস্থা কার্যকর হবে না। আর এজন্যই কমিশনকে নির্ভর করতে হবে গবেষণার ওপর। বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব হয়েছে কিনা, তা নির্ধারণ না করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতাকে ধ্বংস করতে পারে। সত্য অনুধাবন করে প্রতিযোগিতা কমিশনকে হতে হবে বিবেচক বিচক্ষণ। কমিশনকে বুঝতে হবে, তাদের গৃহীত ব্যবস্থায় উৎপাদনকারী পাবেন নির্ভরযোগ্যতা আর ভোক্তা পাবেন স্বস্তি।  

অস্ট্রেলিয়া কম্পিটিশন অ্যান্ড কনজিউমার কমিশন খুবই শক্তিশালী একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিযোগিতার নিয়ম ভঙ্গ করায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও তাদের ব্যবস্থা নেয়ার উদাহরণ রয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠানটি দেশের রাষ্ট্রপতির কাছে জবাবদিহিতা করে। ফলে কারো মুখাপেক্ষী হয়ে তাদের কাজ করতে হয় না। কারণে অস্ট্রেলিয়ায় কারসাজি করে পণ্যের দাম বাড়ানো বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বলতে গেলে বন্ধ হয়ে গেছে। তারা এখন বাজার ব্যবস্থাকে অন্য স্তরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এমনকি কোনো পণ্যের দাম বাড়াতে বা পরিমাণে কম দিতে হলেও প্রতিযোগিতা কমিশনের অনুমতির প্রয়োজন হয়। কমিশনের কাছে গ্রহণযোগ্য যুক্তি তথ্য উপস্থাপনা না করতে পারলে সেটি বাতিল হয়ে যাওয়ার উদাহরণও রয়েছে।  বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কম্পিটিশন কমিশনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পণ্যমূল্য, প্রতিযোগিতা নিশ্চিতকরণ, একচেটিয়া প্রভাব নিয়ন্ত্রণসহ নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগিতা কমিশন বড় ভূমিকা রাখছে। ১৮৯০ সালের পর পৃথিবীর ১৪০টির মতো দেশে ক্রমে একই ধরনের আইন তৈরি হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য বাজারে উৎপাদক ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করা। মনে রাখতে হবে বাজারে উৎপাদকের স্বার্থ সুরক্ষিত না হলে উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। প্রায় ১৩০ বছর পর আজ যখন বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা ভাবছেন, তখন জল বহুদূর গড়িয়েছে। বাজার ব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। বাজারে অপ্রতিযোগিতামূলক অবস্থা এখন আর খালি চোখে দেখা যায় না। বাজারে ভোক্তা বা উৎপাদকের গৃহীত কোনো ব্যবস্থায় যদি দেখা যায় যে শেষ পর্যন্ত দেশের সার্বিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কেবল তখনই তাকে অপ্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা বলা যেতে পারে। 

বাজারে প্রতিযোগিতা অবাধ তথ্যপ্রবাহ থাকলে সিন্ডিকেট গড়ে উঠতে পারে না। সরকারকে প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সবসময় সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। ক্ষেত্রবিশেষে বাজারে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। মজুদ আইন ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। একসময় চালের বড় আড়তদারদের হাতে অনেক ক্ষমতা ছিল। গত ছয় মাস চাল মজুদ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। কিন্তু চালের বাজার আর ভোজ্যতেলের বাজার এক রকম নয়। ভোজ্যতেলের বাজার গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। বলা হচ্ছে, সয়াবিন পাম অয়েলের সরবরাহ আছে। কিন্তু বাজারে নেই। সরবরাহ থাকলে বাজারে থাকবে না কেন। এক্ষেত্রে কারা সম্পৃক্ত, কোন পর্যায়ে গিয়ে পণ্য সরবরাহ হচ্ছে না, সেগুলো বের করা দরকার। যারা সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ ব্যাহত করে বাজার অস্থিতিশীল করবে, তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বর্তমানেও বাজারে মনিটরিং হচ্ছে, তবে তা হচ্ছে অ্যাডহক ভিত্তিতে। এটি অ্যাডহক ভিত্তিতে রাখা যাবে না। কৃষি, বাণিজ্য খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ও জরুরি। সঠিক তথ্য-উপাত্তও জরুরি। উৎপাদক, বিপণনকারী, ভোক্তা থেকে শুরু করে সর্বত্র সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করে। বাজারে প্রতিযোগিতা পরিপন্থী কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রতিযোগিতা আইনের যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের আস্থায় এনে কাজ করতে হবে। তারা যেন অযথা হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রেক্ষাপটে শুনানির আয়োজন নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজারে নজরদারি বাড়ানো দরকার। প্রতিযোগিতা কমিশন ভোক্তা অধিকার কমিশনসহ বাজার নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। সরকারের আইনগত নীতিগত অবস্থান শক্তিশালী হলে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা কমিশনের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেবা প্রদানকারী সেবা গ্রহণকারীর মধ্যে যাতে কোনো দূরত্ব সৃষ্টি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। প্রতিযোগিতা কমিশনের সাফল্য নির্ভর করবে মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়ন, ব্যবস্থাপনা প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলোর সঠিক প্রয়োগের ওপর। প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতি অনিয়ম কমে আসবে। প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে বাজারসংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতনকরণ, সম্পৃক্তকরণ আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব। সরকারের দক্ষ নেতৃত্বগুণে অর্থনীতি ব্যবস্থা এগিয়ে যাচ্ছে সমৃদ্ধির পথে, প্রয়োজন সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন