শনিবার | আগস্ট ১৩, ২০২২ | ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯  

সম্পাদকীয়

অভিমত

বিশ্বব্যাপী ডলার সংকটের নেপথ্য কারণ

ড. মতিউর রহমান

মার্কিন ডলার বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশাল মুদ্রা। এটি বর্তমান বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা বিশ্বের মোট অর্থনৈতিক লেনদেনের প্রায় ৯০ শতাংশ মার্কিন ডলারের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে। এক হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রায় দশমিক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের কাগুজে ধাতব মুদ্রা ছড়িয়ে আছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য মার্কিন ডলার প্রায় অপরিহার্য।

প্রায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা করোনা মহামারী এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই টালমাটাল বিশ্ব পরিস্থিতি। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ছে, নিত্যপণ্যের দাম চলে যাচ্ছে হাতের নাগালের বাইরে। হঠাৎ আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় টান পড়েছে বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হচ্ছে কোনো দেশের আর্থিক কর্তৃপক্ষের হাতে থাকা লেনদেনযোগ্য বিদেশী মুদ্রার মজুদ। বেশির ভাগ দেশই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হিসেবে মার্কিন ডলার হাতে রাখে। এছাড়া ইউরোপের একক মুদ্রা ইউরো, চীনা রেনমিনবি, জাপানি ইয়েন, ব্রিটিশ পাউন্ড, সুইস ফ্রাঁও জমা রাখা হয়। এর সঙ্গে স্বর্ণের মজুদ, স্পেশাল ড্রয়িং রাইটস (এসডিআর) এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) রিজার্ভ পজিশনও হিসাবে ধরা হয়।

আমদানি ব্যয় মেটানো, দেশের আর্থিক বিপর্যয় মোকাবেলা, স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন রোধ, মুদ্রানীতি শক্তিশালীকরণ, বাজেট বাস্তবায়ন, বৃহৎ প্রকল্পে অর্থের জোগানসহ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ নিশ্চিত করতে ধরনের রিজার্ভ হাতে রাখে  যেকোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সাম্প্রতিক তথ্য দেখায় বিভিন্ন দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমছে। অধিকাংশ দেশ যেহেতু ডলারে রিজার্ভ করে সুতরাং ডলারেরও সংকট তৈরি হয়েছে। পরিসংখ্যান দেখায়বিশ্বের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে চীনের কাছে। ২০২২ সালের জুনে দেশটির রিজার্ভের পরিমাণ ছিল লাখ ২৪ হাজার ৬৫৯ কোটি মার্কিন ডলার। গত বছর একই সময়ের তুলনায় চীনের রিজার্ভ অবশ্য অনেকটাই কমেছে। সে সময় তাদের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় ছিল লাখ ৩৬ হাজার কোটি ডলারের।

একই অবস্থা শীর্ষ ১০- থাকা বাকি দেশগুলোরও। বর্তমানে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রিজার্ভ জাপানের। তাদের হাতে রয়েছে লাখ ৩১ হাজার ১২৫ কোটি ডলার। গত বছরের জুলাইয়ে দেশটির রিজার্ভ ছিল লাখ ৩৮ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার। তৃতীয় সুইজারল্যান্ডের, বর্তমান রিজার্ভ লাখ হাজার ২৬৬ কোটি ডলার। গত বছর সময়ে ছিল লাখ হাজার ৪৮৪ কোটি ডলার। বিশ্বের মধ্যে চতুর্থ এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে ভারতের। বছরের ১৫ জুলাই পর্যন্ত তাদের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় ছিল ৫৭ হাজার ২৭১ কোটি ডলার। আর গত বছর ছিল ৬১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।

শীর্ষ ১০- থাকা বাকি দেশগুলোর বর্তমান রিজার্ভের পরিমাণ যথাক্রমে রাশিয়ার ৫৬ হাজার ৫৩০ কোটি ডলার (গত বছর ছিল ৫৯ হাজার ২৪০ কোটি ডলার), তাইওয়ানের ৫৪ হাজার ৮৯৬ কোটি ডলার (গত বছর ৫৪ হাজার ১১১ কোটি ডলার), হংকংয়ের (চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল) ৪৬ হাজার ৫৭০ কোটি ডলার (গত বছর ৪৯ হাজার ৬০ কোটি ডলার), সৌদি আরবের ৪৫ হাজার ৬৭ কোটি ডলার (গত বছর ৪৪ হাজার ৭৩ কোটি ডলার), দক্ষিণ কোরিয়ার ৪৩ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার (গত বছর ছিল ৪৫ হাজার ২৩০ কোটি ডলার) এবং ব্রাজিলের ৩৪ হাজার ৯৫ কোটি ডলার (গত বছর ছিল ৩৬ হাজার কোটি ডলার)

বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৩ হাজার ৪৪৩ কোটি ডলার। তালিকায় বিশ্বের মধ্যে তাদের অবস্থান ১৩তম। গত বছর অবশ্য ১৪ হাজার ২২১ কোটি ডলার হাতে রেখে তাদের অবস্থান ছিল ২১তম। অর্থাৎ বিগত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ডলারের রিজার্ভ প্রচুর বেড়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরই রয়েছে বাংলাদেশ। গত জুন মাসে দেশটির রিজার্ভ ছিল হাজার ১৮২ কোটি ডলার। যদিও জুলাইয়ে তা আরো কমেছে। এরপর রয়েছে নেপাল। ৭৫তম স্থানে থাকা দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হাজার ৪৭ কোটি ডলার। বৈশ্বিক তালিকায় ৭৯তম অবস্থানে থাকা পাকিস্তানের রিজার্ভ বর্তমানে ৯৩২ কোটি ডলার।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সবশেষ পাওয়া তথ্য মতে, আফগানিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৯৪৪ কোটি ডলার। তালিকায় তারা রয়েছে পাকিস্তানের এক ধাপ ওপরে। ১২৩ কোটি মার্কিন ডলার রিজার্ভ রয়েছে ভুটানের। তালিকায় তাদের অবস্থান ১৩৪তম। ৭৬ কোটি ডলার রিজার্ভে রেখে তালিকার ১৪৬তম অবস্থানে রয়েছে মালদ্বীপ।

বছরের জুনের শেষে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করা শ্রীলংকার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ১৮৬ কোটি ডলার, যার মধ্যে চীনের সঙ্গে ১৫০ কোটি ডলার কারেন্সি সোয়াপও অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কম বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র কিরিবাতির। ২০২০ সালে তাদের হাতে ছিল মাত্র ৬০ লাখ মার্কিন ডলার (সূত্র: জাগোনিউজ২৪.কম)

উল্লেখ্য, ডলার কেনা বা বিক্রি করার সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অর্থনীতির কর্মক্ষমতা। একটি শক্তিশালী অর্থনীতি অনুমিত নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগের ওপর একটি গ্রহণযোগ্য হারে মুনাফা ফেরত পাওয়ার ক্ষমতার কারণে সারা বিশ্ব থেকে বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে।

যেহেতু বিনিয়োগকারীরা সর্বদা সর্বোচ্চ মুনাফা খোঁজেন যা অনুমানযোগ্য বা নিরাপদ, বিশেষ করে বিদেশ থেকে সুতরাং তারা বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে একটি শক্তিশালী মূলধন অ্যাকাউন্ট তৈরি এবং ফলস্বরূপ ডলারের উচ্চচাহিদা তৈরি করে।

অন্যদিকে আমদানি খরচ যা অন্যান্য দেশ থেকে পণ্য পরিষেবা আমদানির ফলে ডলার দেশের বাইরে চলে যায় অর্থাৎ আমদানি, রফতানির চেয়ে বেশি হলে, চলতি হিসাবের ঘাটতি থাকবে ফলে বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলারের ওপর চাপ বৃদ্ধি সংকট তৈরি করে।

মার্কিন ডলার বিশ্ব অর্থনীতির ভিত্তি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং অর্থের জন্য একটি সংরক্ষিত মুদ্রা। অন্যান্য ফিয়াট মুদ্রার মতো ডলারের আপেক্ষিক মূল্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কার্যকলাপ দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে।

যখন পণ্য বা পরিষেবা রফতানি করে, তখন এটি ডলারের চাহিদা তৈরি করে কারণ গ্রাহকের পণ্য পরিষেবার জন্য ডলারে অর্থ প্রদান করতে হয়। তাই পেমেন্ট করার জন্য ডলার কেনার জন্য তাদের নিজস্ব মুদ্রা বিক্রি করে ডলারে রূপান্তর করতে হবে।

উপরন্তু যখন মার্কিন সরকার বা বড় আমেরিকান করপোরেশনগুলো বিদেশী বিনিয়োগকারীদের দ্বারা ক্রয় করা মূলধন বাড়াতে বন্ড ইস্যু করে, তখন সেই অর্থ প্রদানও ডলারে করতে হবে। এটি -মার্কিন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে মার্কিন করপোরেট স্টক কেনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, বিদেশী বিনিয়োগকারীকে সে স্টক ডলার কেনার জন্য তাদের মুদ্রা বিক্রি করতে হবে।

উদাহরণগুলো দেখায় যে কীভাবে মার্কিন ডলারের জন্য আরো চাহিদা তৈরি করে এবং এর ফলে ডলারের সরবরাহের ওপর চাপ সৃষ্টি, ডলার কেনার জন্য বিক্রি হওয়া মুদ্রার তুলনায় ডলারের মূল্য বৃদ্ধি এবং ক্ষেত্রবিশেষে সংকট তৈরি করে।

সর্বোপরি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে মার্কিন ডলারকে একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাই মার্কিন অর্থনীতির কর্মক্ষমতার ওঠানামা সত্ত্বেও ডলারের চাহিদা প্রায়ই অব্যাহত থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যে ক্ষেত্রে মার্কিন অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের কারণে ক্রয় ক্ষমতা কমে যায় অর্থাৎ একটি সেলস-অফের সম্ভাবনার মুখোমুখি হয়, তখন বন্ড বা স্টক বিক্রি করে তাদের স্থানীয় মুদ্রায় ফিরে আসতে পারে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা যখন তাদের স্থানীয় মুদ্রা ফেরত বা কিনে নেয়, তখন ডলারের ওপর এর প্রভাব পড়ে।

ডলারের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি বা কম হবে কিনা, তা পরিমাপ করার দায়িত্ব মূলত ব্যবসায়ীদের। এটি নির্ধারণ করতে ডলারের মূল্যকে প্রভাবিত করতে পারেএমন কোনো খবর বা ইভেন্টে আমাদের মনোযোগ দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ, যেমন রির্জাভের তথ্য, বেতনের ডেটা, জিডিপি ডেটা এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক তথ্য যা অর্থনীতিতে শক্তি বা দুর্বলতা আছে কিনা তা নির্ধারণ করতে আমাদের সাহায্য করতে পারে।

মার্কিন ডলারের দাম বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কারণ রয়েছে, তবে প্রাথমিক ফ্যাক্টর হলো ডলারের চাহিদা। ডলারের চাহিদা বাড়লে তার মূল্যও বাড়ে। বিপরীতভাবে যদি চাহিদা কমে যায়, তাহলে মানও কমে যায়। ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি পায় যখন আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো, যেমন বিদেশী নাগরিক, বিদেশী কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বা বিদেশী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরো ডলার দাবি করে। ডলারের চাহিদা সাধারণত বেশি থাকে কারণ এটি বিশ্বের রিজার্ভ কারেন্সি। অন্য কারণগুলো যেগুলো অন্য মুদ্রার তুলনায় ডলারের দাম বাড়ে কিনা তা প্রভাবিত করে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে মুদ্রাস্ফীতির হার, বাণিজ্য ঘাটতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।

মুদ্রাগুলোর মধ্যে বিনিময়হারকে প্রভাবিত করে এমন কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে মুদ্রার রিজার্ভ অবস্থা, মুদ্রাস্ফীতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুদের হার, বাণিজ্য ঘাটতি উদ্বৃত্ত এবং পাবলিক ঋণ। একটি দুর্বল মুদ্রা হলো সেটি যার মূল্য অন্য মুদ্রার তুলনায় হ্রাস পায়। দুর্বল মুদ্রা অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সামাজিক ভঙ্গুরতার নির্দেশক হতে পারে। একটি দুর্বল মুদ্রা উচ্চস্তরের অসমতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং উচ্চস্তরের দুর্নীতি, সরকারি ঋণ এবং বাণিজ্য ঘাটতি থেকে উদ্ভূত হতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, বিশেষজ্ঞরা বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ডলার সংকটের পেছনে বিভিন্ন কারণের কথা বলছেন যেমনআমদানি-রফতানি ঘাটতি, রাশিয়া ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপসহ মিত্র দেশগুলোর সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে আসা, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপ, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি সরবরাহ কমে যাওয়া, উন্নয়নশীল দেশগুলোয় দুর্নীতি বিদেশে টাকা পাচার, অস্বাভাবিক মুনাফা লাভের আশায় ব্যবসায়ীদের দ্বারা অতিরিক্ত ডলার কিনে মজুদ করা ইত্যাদি।

 

. মতিউর রহমান: গবেষক উন্নয়নকর্মী

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন