রবিবার | আগস্ট ১৪, ২০২২ | ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯  

আন্তর্জাতিক খবর

গোতাবায়া: নন্দিত বীর যেভাবে ধিকৃত খলনায়ক

বণিক বার্তা অনলাইন

শ্রীলংকার উত্তরাঞ্চলে অবস্থান করে উত্তর এবং পূর্বাংশ নিয়ে পৃথক ও স্বাধীন তামিল রাষ্ট্র গঠন করতে চেয়েছিল তামিল টাইগার নামে পরিচিত বিচ্ছন্নতাবাদী একটি সংগঠন। এতে আশির দশকে দেশটির সরকারের সঙ্গে সংগঠনটির যুদ্ধে ৭০ থেকে ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে আরো কয়েক হাজার। স্বাধীনতার পর ভারত মহাসাগরের এই ছোট্ট দ্বীপ দেশটির অবস্থা তৎকালীন সময়ে ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। প্রায় তিন দশক ধরে চলে আসা এলটিটিই বনাম শ্রীলংকার গৃহযুদ্ধের নির্মম অবসান ঘটিয়ে শান্তি ফিরিয়ে এনেছিলেন গোতাবায়া রাজাপাকসে। সিংহলি বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠরা তাকে ‘যুদ্ধের নায়ক’ হিসেবেই মনে করে। সেই সুসময় এখন অতীত।

এক দশকের বেশি সময় ধরে শ্রীলংকার রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র রাজাপাকসে পরিবার। কিন্তু স্থানীয়-আন্তর্জাতিক সংকটের ফলে এবং রাজাপাকসে পরিবারের একের পর এক ভুল সিদ্ধান্তে ভেঙে পড়েছে দেশের অর্থনীতি। সেই দায় মাথায় নিয়ে প্রতাপশালী এই রাষ্ট্রনেতাকে ক্ষমতা ছাড়তে হচ্ছে প্রবল গণবিক্ষোভের মধ্যে। শুধু ক্ষমতাই নয়, রাতের আধারে তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। আশ্রয় নিয়েছেন মালদ্বীপে। 

কয়েক মাস ধরে টানা বিক্ষোভের মধ্যে গত মে মাসে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয় তার বড় ভাই মাহিন্দা রাজাপাকসেকে। বিক্ষোভকারীরা তাতে সন্তুষ্ট ছিলেন না, তাদের জনপ্রিয় স্লোগান হয়ে উঠেছিল ‘গোতা, গো হোম’। কিন্তু নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন গোতাবায়া রাজাপাকসে।

যেভাবে বীর থেকে হলেন খলনায়ক: মোটামুটি দুই দশক ধরে শ্রীলংকার রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন মাহিন্দা রাজাপাকসে। দেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী- দুই পদেই তিনি ছিলেন। গোতাবায়া রাজনীতির দৃশ্যপটে এসেছেন পরে, আর সেটা ভাইয়ের হাত ধরেই।

২১ বছর বয়সে গোতাবায়া শ্রীলংকার সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। দুই দশক সেখানে চাকরি করেন। চাকরি জীবনে তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল ছিলেন। পরে পাড়ি দেন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে তথ্য প্রযুক্তিতে কাজ করেন তিনি।

২০০৫ সালে বড় ভাই মাহিন্দা রাজাপাকসে শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট হলে দেশের রাজনীতিতে শুরু হয়ে গোতাবায়ার অধ্যায়। সে সময় তাকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দেন মাহিন্দা। স্বাধীনতাকামী লিবারেশন টাইগার্স অফ তামিল ইলমের (এলটিটিই) দীর্ঘ গেরিলা যুদ্ধের অবসান ঘটানোই ছিল তার মিশন।

২৬ বছর ধরে সংঘাতের পর ২০০৯ সালে সরকারের ভয়ানক আক্রমণে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এলটিটিই। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার ধারণা, সে সময় যুদ্ধে প্রায় ৪০ হাজার বেসামরিক তামিল নিহত হয়েছিলেন। তবে শ্রীলংকা সরকার তা অস্বীকার করেছিল। মাহিন্দার সরকার দাবি করেছিল,হাজার হাজার বেসামরিক মানুষকে মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়িয়েছে তামিলরা। সিংহলি বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠরা গোতাবায়াকে যুদ্ধের নায়ক হিসাবে দেখেন। অনেকে তাকে জাতীয় বীর বলেও আখ্যা দিয়েছিল।

২০১৫ সালে মাহিন্দা রাজাপাকসে ক্ষমতা হারালে গোতাবায়াও পদত্যাগ করেন। কিন্তু ২০১৯ সালের ইস্টার সানডেতে মুসলমান জঙ্গিদের আত্মঘাতী বোমা হামলায় ২৫০ জনের মৃত্যুর পর ফের রাজনীতির মাঠে ফেরেন চরমপন্থার বিরুদ্ধে কঠোর হিসাবে পরিচিত রাজাপাকসেরা।

দুই মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট পদে না থাকার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে মাহিন্দা সরে দাঁড়ালে রাজাপাকসের পরিবার ও শ্রীলংকার পডুজানা পার্টির পক্ষে প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হন গোতাবায়া। ২০১৯ সালের নভেম্বরের ভোটে বিপুল ব্যবধানে জয় পান গোতাবায়া।

২০১৯ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর গোতাবায়া তার আগের সরকারের সমালোচনা করে বলেছিলেন, গৃহযুদ্ধের সময় তার তৈরি করা একটি বিস্তৃত গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়া হয়েছে, যার ফল হিসেবে সংগঠিত হতে পেরেছে জঙ্গিরা। তিনি জাতিগত ও ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে গোটা শ্রীলংকার প্রতিনিধিত্ব করার প্রতিশ্রুতি দেন।

২০২০ সালের আগস্টে পার্লামেন্টে গোতাবায়ার দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বেড়ে দুই-তৃতীয়াংশে উন্নীত হয়। প্রেসিডেন্ট পদে দুই মেয়াদে থাকা ও প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করার আইন বাতিল করেন। পরে গোতাবায়া তার বড় ভাই মাহিন্দাকে প্রধানমন্ত্রী পদে ফিরিয়ে আনেন এবং আত্মীয়দের মন্ত্রিপরিষদে জায়গা দেন, যার ফলে শ্রীলংকার স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাসে রাজাপাকসে পরিবারের প্রভাব পাকাপোক্ত হয়। কিন্তু এত ক্ষমতাও বেশি দিন টিকল না।

মহামারীর প্রভাব এবং শুল্ক কমানোর মাশুল শ্রীলংকাকে ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়। করোনায় শ্রীলংকার প্রবাসী কর্মীদের রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার পাশাপাশি অনেকে তাদের চাকরিও হারিয়েছেন। যদিও শ্রীলংকা ভারতের মতো প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ক্রেডিট লাইন পেয়েছে, তবুও তারা নিয়মিত জ্বালানি এবং প্রয়োজনীয় খাবার আমদানির জন্য অর্থ প্রদান করতে পারেনি। রাসায়নিক সারের ওপর নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে ২০২১ সালে রাজাপাকসের মূল বিষয় ছিল জৈব চাষ। কিন্তু এর ফলে সূত্রপাত হয়েছিল কৃষক বিক্ষোভের এবং সমালোচনামূলক চা ও ধান উৎপাদনও হ্রাস পেয়েছিল।

বৈদেশিক-বিনিময় আয় কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাহ্যিক ঋণ পরিচালনা করতে হিমশিম খাচ্ছিল দেশটি। উচ্চাভিলাষী অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য চীন থেকে ঋণের কারণে সেই বোঝাও কিছুটা বেড়েছে। ক্রমশ যখন দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছিল তখন নীতি নির্ধারকরা ঋণদাতাদের জানান, শ্রীলংকা তার ঋণ পুনর্গঠন না হওয়া পর্যন্ত অর্থপ্রদান করতে সক্ষম হবে না। এই পরিস্থিতির পর গত ১৯ মে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নন্দলাল ওয়েরাসিংহে দেউলিয়ার ঘোষণা দেন।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি এবং মূল্যস্ফীতির কারণে হাজারো মানুষ রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়। জ্বালানি, বিদ্যুৎ, রান্নার তেল-গ্যাসসহ নিত্যপণ্যের সংকটে প্রায় সোয়া দুই কোটি মানুষের জীবন অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়। এই দ্বীপরাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষোভ কেন্দ্রীভূত হয় প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে ও তার পরিবারের ওপর।

দেশকে অর্থনৈতিক সংকটে ফেলার জন্য এপ্রিলের শুরু থেকে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে এবং তার বড় ভাই প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে বিরোধীরা। 

বিক্ষোভকারীরা রাষ্ট্রপতির সরকারি সমুদ্র উপকূলের বাসভবনে হামলার পর সংসদের স্পিকার মাহিন্দা ইয়াপা আবেবর্দেনা ঘোষণা করেছিলেন, রাজাপাকসে পদত্যাগ করবেন। রাজাপাকসের ভাই মাহিন্দা পদত্যাগ করার পর মে মাসে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন রনিল বিক্রমাসিংহে, তিনিও পরে পদত্যাগ করেন।

সর্বশেষ খবর অনুযায়ী সোমবার গণবিক্ষোভের মুখে বাধ্য হয়ে পদত্যাগপত্রে সই করেন রাজাপাকসে গোতাবায়া, এরপর থেকেই দেশ ছেড়ে পালাতে মরিয়া। সেদিন রাতেই সস্ত্রীক কলম্বো বিমানবন্দরে আসেন তিনি। সকালে যেতে চেয়েছিলেন আরব আমিরাত। তবে বাধার পাহাড় হয়ে আসেন অভিবাসন কর্মীরা। ফলে আর দুবাইয়ের ফ্লাইটে চড়া সম্ভব হয়নি পদত্যাগে বাধ্য হওয়া লংকান প্রেসিডেন্টের। পরে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার দিবাগত রাতে একটি সামরিক উড়োজাহাজে তিনি মালদ্বীপ গিয়েছেন বলে জানিয়েছেন অভিবাসন কর্মকর্তারা। তার স্ত্রী এবং দুজন দেহরক্ষীকে সঙ্গে নিয়ে শ্রীলঙ্কার বিমান বাহিনীর একটি উড়োজাহাজে করে দেশ ছাড়েন।   

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন