শুক্রবার | আগস্ট ১৯, ২০২২ | ৪ ভাদ্র ১৪২৯  

প্রথম পাতা

গ্যাসস্বল্পতায় শতাধিক শিল্প কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের বেশকিছু অঞ্চলের শিল্প-কারখানা গত কয়েক বছরে দফায় দফায় গ্যাস সংকট মোকাবেলা করেছে। সম্প্রতি কয়েকটি স্থানে আবারো দেখা দিয়েছে গ্যাসের চাপ সংকট। যার কারণে বন্ধ রাখতে হচ্ছে বয়লার, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক উৎপাদন। ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকার টেক্সটাইল মিল, সিরামিক কারখানাসহ অন্য শিল্পগুলোও এক ধরনের অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্যে পড়েছে।

বড় বড় স্পিনিং, উইভিং, ডায়িং-প্রিন্টিং বা সিরামিকের মতো কারখানাগুলোয় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। মূলত ক্যাপটিভ পাওয়ার জেনারেশনের মাধ্যমে এসব কাজ চলে। আর পাওয়ার জেনারেশনের মুখ্য জ্বালানি হলো গ্যাস। কোনো কারণে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে বা গ্যাসের চাপ কমে গেলে তার প্রভাব পড়ে গোটা উৎপাদন প্রক্রিয়ায়।

জানা গিয়েছে, সম্প্রতি সাভার, ভালুকা, রূপগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলের টেক্সটাইল মিলগুলোকে গ্যাস সংকটের কারণে বয়লার বন্ধ রাখতে হয়েছে। যার ফলে বন্ধ রাখতে হয়েছে উৎপাদনও। এর মধ্যে সাভারের বাইপাইলের একটি বড় গ্রুপের কারখানায় গ্যাসের চাপ না থাকায় বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টায় বয়লার বন্ধ করা হয়। দিনের শুরুতেই দেখা দেয়া সংকট রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত কাটেনি। ফলে সারা দিনই বয়লার সচল করা যায়নি।

একইভাবে ময়মনসিংহের ভালুকার সিরামিক পণ্যের কারখানা এক্সিলেন্টও গ্যাস সংকটে পড়েছে। কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সারা বছর প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টাই সচল থাকে এটি। কিন্তু গত বেশ কিছুদিন বিকালের দিকে গ্যাসের চাপ ১৭ থেকে ১০- নামে। তারপর একপর্যায়ে শূন্যে নেমে যায়। এতে মারাত্মকভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। রকম চলতে থাকলে কারখানাটি বন্ধ করে দেয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিষয়ে এক্সিলেন্ট টাইলস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ হাকিম বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা খুব খারাপ অবস্থায় আছি। গ্যাস থাকে না বললেই চলে। কারখানা প্রায় বন্ধ হওয়ার অবস্থায়। রকম পরিস্থিতি চলতে থাকলে আমরা একসময় দেউলিয়া হয়ে যাব।

বৃহস্পতিবারের পরিস্থিতি বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, দিনের শুরুতে গ্যাসের চাপ ১৭ পিএসআই ছিল, সেখান থেকে নেমে ১০- চলে যায়। এরপর এক পর্যায়ে শূন্যে পৌঁছে। দেখা গিয়েছে, প্রতিদিন বিকাল ৫টার মধ্যে গ্যাসের চাপ শূন্যে নেমে যাচ্ছে।

সিরামিকের কারখানাটি বছরের ৩৬৫ দিন ২৪ ঘণ্টা সচল থাকে জানিয়ে মোহাম্মদ হাকিম বলেন, কারখানা বন্ধ করতে তিনদিন লাগে, চালু করতেও লাগে তিনদিন। কেবল তাদের কারখানাই নয়, গাজীপুর থেকে ভালুকা অংশে অবস্থিত সব সিরামিক কারখানাকেই একই রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি লাইনে থাকা সিরামিক কারখানাগুলোর সবগুলোকে এভাবে ভুগতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১৫-১৬টি সিরামিক টাইলসের কারখানা রয়েছে, যেগুলোকে ভুগতে হচ্ছে।

রূপগঞ্জ হাইওয়ে সংলগ্ন এলাকাসহ চন্দ্রা থেকে মানিকগঞ্জ, শ্রীপুর থেকে গাজীপুরএসব এলাকায়ও দেখা দিয়েছে গ্যাসের তীব্র সংকট। যার ভুক্তভোগী হচ্ছে ওই এলাকার পোশাক পণ্যের কাঁচামাল সুতা-কাপড় উৎপাদনকারী বস্ত্র শিল্পের কারখানাগুলো। যেসব কারখানার সক্ষমতা রয়েছে, সেগুলো ডিজেল দিয়ে কার্যক্রম সচল রাখলেও তাতে ব্যবসার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আসন্ন ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ নিয়েও এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বড় একটি শিল্প-কারখানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গ্যাসের চাপের পরিস্থিতি অনেক খারাপ। চন্দ্রা থেকে মানিকগঞ্জ, শ্রীপুর থেকে গাজীপুর এলাকাগুলোর প্রায় ২৫০ কারখানা গ্যাসের চাপ সংকট মোকাবেলা করছে। 

আপস্ট্রিম বা ধনুয়ার দিকের কারখানাগুলোয় গ্যাসের চাপ কম-বেশি ঠিক আছে। কিন্তু বাকি কারখানায় গ্যাসের চাপ শূন্য বললেই চলে, গত কয়েকদিন পরিস্থিতি খুবই খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে। ঈদের আগে পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় মালিকপক্ষ প্রচণ্ড রকমের উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। গ্যাস না থাকলে সাধারণত বড় সক্ষমতার কারখানার ইউনিটগুলো বসে থাকে না, ডিজেল দিয়ে চালিয়ে তারা উৎপাদন সচল রাখে। কিন্তু এতে ব্যবসার খরচ বেড়ে যায়, প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারায়।

গ্যাসের তীব্র সংকটের বিষয়ে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বণিক বার্তাকে বলেন, রূপগঞ্জ হাইওয়ে সংলগ্ন আশুলিয়া এলাকায় গ্যাসের মারাত্মক সংকট চলছে। সংগঠনের অনেক সদস্য কারখানা থেকে মিটারের ছবি তুলে পাঠানো হচ্ছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে গ্যাসের চাপ শূন্য পিএসআই। গ্যাসের তীব্র সংকট মোকাবেলা করা কারখানার সংখ্যা ১২০-এর কম নয়। বিশেষ করে আদমজীতে দুর্ঘটনার পর থেকে সংকট আরো বেড়েছে।

জানা গিয়েছে, গত ১৭ জুন আদমজী ইপিজেডের ভেতরে পাইলিং করার সময় তিতাস গ্যাসের পাইপ ফেটে যায়। কারণে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে অবস্থিত শতাধিক শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহ প্রায় সাতদিন বন্ধ ছিল। এতে ৪০টিরও বেশি রফতানিমুখী টেক্সটাইল স্পিনিং, ফ্যাব্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং, নিট শিল্পসহ ওভেন ফ্যাব্রিক প্রসেসিং মিলের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল।

বিটিএমএর দাবি, সমস্যার কারণে রফতানিমুখী টেক্সটাইল মিলগুলোর অন্তত আড়াই হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। উৎপাদন বন্ধ থাকার কারণে রফতানিমুখী তৈরি পোশাক খাতে সুতা ফ্যাব্রিক সময়মতো সরবরাহ করা যায়নি। উৎপাদনে দেরি হওয়ায় ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছে দিতে আকাশপথ ব্যবহার করতে হয়েছে। যার কারণে বেড়েছে খরচ। আবার অনেক রফতানি আদেশ বাতিল হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়েছে।

গ্যাস সংকটের বিষয়ে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. হারুনুর রশীদ মোল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, এলএনজি সরবরাহ কমে গেলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের ওপর তার প্রভাব পড়ে। গত কয়েকদিনে এলএনজি সরবরাহ ৬৫০ এমএমসিএফডিতে নেমে এসেছে। ফলে তিতাসের আওতাভুক্ত গ্রাহকরা গ্যাস কম পাচ্ছেন। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না পেলে সংকট হবেই।

তিতাসের সূত্র অনুযায়ী, সংস্থাটির সব গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করতে হলে দৈনিক ২১০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন। সেখানে তিতাসকে দেয়া হচ্ছে ১৮০ কোটি ঘনফুট। সেটিও আবার এলএনজি সরবরাহ ৮০ কোটি ঘনফুটের ওপরে থাকলে। যদি এলএনজি সরবরাহ কমে যায় তখন চাহিদা সরবরাহের পার্থক্য বাড়তে থাকে।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে তিতাসের ময়মনসিংহ নারায়ণগঞ্জের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেছেন, গ্যাসের চাপ না পাওয়ার অভিযোগ শিল্পমালিকদের দীর্ঘদিনের। তবে এটি গ্যাস সরবরাহ সংকটের কারণেই হয় এমনটি নয়। বরং বিভিন্ন সময় এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়া, দেশীয় গ্যাসফিল্ডের সংস্কারসহ নানা কারণে হয়ে থাকে। তবে সংকট যে সবসময় হয়, তাও নয়। মূলত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে এটি কম-বেশি হয়ে থাকে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন