শুক্রবার | আগস্ট ১৯, ২০২২ | ৪ ভাদ্র ১৪২৯  

সম্পাদকীয়

রফতানি আয় ৫০ বিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছে

ধারাবাহিকতা বজায় থাকুক

বাংলাদেশের রফতানি আয় ৫০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অর্জন করেছে। চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) ৪৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। অবশিষ্ট ২৫ দিনে শুধু পোশাক রফতানি থেকে দশমিক বিলিয়ন ডলার আসায় অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই মাইলফলক অর্জন করেছে বাংলাদেশ। রফতানি আয়ের ৮২ শতাংশ এসেছে তৈরি পোশাক থেকে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ রফতানিকারকদের দেশের তালিকায় নাম লিখিয়েছে। এটি করোনা-পরবর্তী অর্থনীতির অন্যতম বড় সাফল্যও বটে। এর ধারাবাহিকতা রক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপও নিতে হবে। রফতানি বৈচিত্র্যকরণ আরো জোরদার করতে হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার নতুন রফতানি খাত তৈরির জন্য কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এর সঙ্গে উন্নত বিনিয়োগ পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। বাণিজ্যের হাত ধরেই অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটতে পারে। রফতানি আয় দ্রুত বাড়ানোর পথে হয়তো নানা প্রতিকূলতা আছে, যা অতিক্রম করে সমৃদ্ধির ধারা বজায় রাখাটা নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের প্রত্যাশা, সব প্রতিকূলতা, বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকবে। রফতানি আয় বাড়াতে নানামুখী পরিকল্পনা নিতে হবে। নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের মধ্যে রফতানি বাণিজ্য সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন ধরনের পণ্য রফতানির উদ্যোগ নিতে হবে। পৃথিবীর কোন দেশে কোন ধরনের পণ্যের চাহিদা রয়েছে তা জানতে হবে। এজন্য বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস মিশনগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় কার্যকর অংশগ্রহণের জন্য রফতানি বহুমুখীকরণ ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশের রফতানি খাত এখনো গুটিকয়েক পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে পোশাক শিল্প থেকে। এরপর রয়েছে চামড়া, পাটজাত পণ্য ওষুধ পণ্য। স্বল্প পণ্যের ওপর এই অতিনির্ভরতা রফতানি নৈপুণ্য অর্থনৈতিক স্থায়িত্বশীলতা উভয় দিক থেকে দুশ্চিন্তার। কাজেই রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণের বিকল্প নেই। বাস্তবতা হলো, রফতানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। সেগুলোর মধ্যে আছে বর্তমান বাণিজ্য কাঠামোয় সমস্যা, বাণিজ্যনীতি প্রণোদনা ব্যবস্থা সম্পর্কিত সমস্যা, শুল্কায়ন পদ্ধতির জটিলতা, বিরাজমান বাণিজ্যনীতি ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা এবং অবকাঠামো ব্যবহার (বন্দর, পরিবহন প্রভৃতি) সেবায় মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়। রফতানি বৈচিত্র্য বেগবান করতে এগুলোর সমাধান এখন সময়ের দাবি।

উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করলে এবং বিদ্যমান সুবিধাগুলো সংকুচিত হলে দেশের রফতানি বাণিজ্য বছরে - বিলিয়ন ডলার কমে যাবে বলে অনেকে আশঙ্কা করছিলেন। চলতি অর্থবছরের অর্জন এক্ষেত্রে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। প্রচলিত পণ্যের বাইরে আরো কিছু পণ্যের রফতানির সম্ভাবনা রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে আছে গ্লাস, ইলেকট্রনিক পণ্য, সিরামিকস, হালকা প্রকৌশল পণ্য, সিমেন্ট, আইটি পণ্য, কৃষি কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, ছোট জাহাজ প্রভৃতি। শুধু পণ্য নয়, রফতানি গন্তব্যেও বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন। দেশের রফতানি বাজার প্রধানত ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক। মূলত বিভিন্ন ধরনের অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধার কারণে বাজার প্রবেশাধিকারে তুলনামূলক ভালো করেছে বাংলাদেশ। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর সেখানে বাজার ধরে রাখা কঠিন। তাই নতুন রফতানি গন্তব্যের অন্বেষণ দরকার। জাপান, রাশিয়া, ব্রাজিল, চিলি, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশ বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় রফতানি গন্তব্য হতে পারে। রফতানি বাড়াতে ওইসব দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদারের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করা বেশ সহায়ক হতে পারে।

পণ্য রফতানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে বাজার বহুমুখীকরণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকবহির্ভূত পণ্যের বড় বাজার অপ্রচলিত বাজারগুলোয় বিদ্যমান। এসব বাজার মূলত ভারত, শ্রীলংকা, রাশিয়া, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশকেন্দ্রিক। পাশাপাশি বাংলাদেশী অধ্যুষিত বা বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর অবস্থানরত দেশগুলোয় দেশীয় ঐতিহ্যবাহী পণ্যের বাজার রয়েছে। অবশ্য এসব পণ্যের বাজার খুব বড় নয়। উল্লিখিত সব পণ্যের বাজারে বাংলাদেশী উদ্যোক্তারা খুব সীমিত আকারেই রফতানি বৃদ্ধি করতে পারছেন ভিন্ন কারণে। প্রথমত, অপ্রচলিত প্রায় প্রতিটি বাজারে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে ভিন্ন প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এসব দেশ উন্নয়নশীল হওয়ায় পণ্য রফতানিতে উচ্চ শুল্ক এক বড় বাধা। যেমন রাশিয়া, ব্রাজিল বা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বড় বাজারে ৩০-৪০ শতাংশ শুল্ক দিয়ে পণ্য রফতানি সম্ভব নয়। রাশিয়ার মতো বাজারে সরাসরি এলসি খুলে রফতানির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশ, যেমন চীন বা ভারত বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দিলেও বাংলাদেশ তা পর্যাপ্ত আকারে ব্যবহার করতে পারেনি। একটি নির্দিষ্ট খাত রফতানি বাজারে তখনই এগোতে পারে, যখন ক্রেতারা পণ্যের অর্ডার দেয়ার জন্য অনেক বিক্রেতার খোঁজ পান। দুর্ভাগ্যজনক হলো, বাংলাদেশের বেশির ভাগ উদীয়মান খাতই মাত্র এক বা একাধিক স্বল্পসংখ্যক বিক্রেতা উদ্যোক্তার ওপর নির্ভরশীল। একটি নির্দিষ্ট খাতের ন্যূনতমসংখ্যক বড়, মাঝারি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার উপস্থিতি না থাকলে ক্রেতা অর্ডার দেয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধান্বিত থাকে। বেশির ভাগ খাত কিছু বৃহৎ উদ্যোক্তা বা গ্রুপ অব কোম্পানিজ নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে এসব খাতের বিকাশ শ্লথগতিতে হচ্ছে। এসব খাতে ক্ষুদ্র, মাঝারি বৃহৎ উদ্যোক্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক মানের পণ্য সেবা উৎপাদন প্রদানের ক্ষমতা থাকা জরুরি।

রফতানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২১-২৪ মেয়াদের রফতানি নীতি প্রণয়ন করেছে সরকার। কার্যকর হওয়া নীতিতে সম্ভাবনাময় রফতানি পণ্যকে বিশেষ উন্নয়নমূলক খাতের অন্তর্ভুক্ত করে আয়কর রেয়াত, সহজ শর্তে হ্রাসকৃত সুদহারে রফতানি ঋণ প্রদানসহ নানা সুযোগ-সুবিধা জোগানোর কথা বলা হয়েছে। তিন বছরের জন্য প্রণীত নতুন রফতানি নীতিতে সব খাতের জন্য কম-বেশি সুযোগ-সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা রফতানি বহুমুখীকরণে সহায়ক হতে পারে। তবে নীতির সাফল্য নির্ভর করছে যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর। এদিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কারণে বাংলাদেশী বিভিন্ন ধরনের পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন দেশে। বিশেষ করে খাদ্য কৃষিজাত শিল্পপণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ডের পণ্য আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়ায় এর বাজার বিস্তৃতির উজ্জ্বল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং নতুন বাজার সৃষ্টির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এজন্য সময়োপযোগী, কার্যকর, বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন।

রফতানি আয়ের দিক দিয়ে বাংলাদেশ এশিয়া মহাদেশে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের রফতানি সম্ভাবনা বর্তমানে এতটাই প্রকট হয়ে উঠেছে যে কিছুদিন পর বাংলাদেশ ভারতকে ছাড়িয়ে এশিয়ায় রফতানি খাতে নেতৃত্ব প্রদান করবে। কিন্তু সম্ভাবনা থাকলেও শুধু কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত উপযুক্ত পরিকল্পনার অভাবে সম্ভাবনা অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য, জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চীনসহ এশীয় বিভিন্ন দেশের গণ্ডি অতিক্রম করে সুদূর আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকায় অপ্রচলিত এবং তুলনামূলক কম প্রচলিত পণ্য রফতানির সুযোগ মুহূর্তে রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি দেশের প্রকৃত চাহিদার বিপরীতে খুবই সীমিত আকারে কিছু অপ্রচলিত পণ্য রফতানি হয়। বাংলাদেশের অপ্রচলিত পণ্যগুলো পরিকল্পিতভাবে রফতানির মাধ্যমে অপ্রচলিত পণ্যসামগ্রীও হয়ে উঠতে পারে সমৃদ্ধিময় অর্থকরী খাত। প্রসঙ্গত, অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি বাড়াতে এবং ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণের কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি নতুন নতুন রফতানি গন্তব্যও খুঁজে বের করতে হবে।

প্রতিটি উদীয়মান খাতের ভ্যালু চেইনকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কাঁচামাল উৎপাদন বা আমদানি মধ্যবর্তী পণ্য উৎপাদন এবং পূর্ণাঙ্গ পণ্য উৎপাদন বিপণনের সক্ষমতা অর্জন জরুরি। উদীয়মান এসব খাতে স্বল্পতম সময়ে প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে দেশী বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগ উৎসাহিত করা জরুরি। বাংলাদেশে প্রায়ই বলা হয়, বিদেশী বিনিয়োগের জন্য সব ধরনের সুবিধা রয়েছে এবং প্রায় সব খাত বিদেশী বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন ধরনের প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য বাধার সম্মুখীন হন। অনেক ক্ষেত্রে দেশীয় বিনিয়োগ উৎসাহিত করার অজুহাতে বিদেশী বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করার একটা অলিখিত প্রবণতা সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে রয়েছে। রফতানি বহুমুখীকরণে দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগের পথ সুগম করা বিশেষভাবে জরুরি। মনে রাখা দরকার, বিদেশী উদ্যোক্তারা প্রথমে ক্ষুদ্র আকারের বিনিয়োগ দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে বৃহদাকারের বিনিয়োগে যেতে চান। সুতরাং ক্ষুদ্র মাঝারি আকারের বিদেশী বিনিয়োগ উদীয়মান খাতের জন্য উপযোগী এবং এজন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ সহযোগিতা নিশ্চিত করা দরকার।  

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন