শুক্রবার | আগস্ট ১২, ২০২২ | ২৭ শ্রাবণ ১৪২৯  

সম্পাদকীয়

বাজেট নিয়ে বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের সুপারিশ

পর্যালোচনাপূর্বক বিবেচনায় নিক অর্থ মন্ত্রণালয়

প্রস্তাবিত বাজেট ঘিরে বেশকিছু সংস্কার প্রস্তাব আসছে বিভিন্ন সংগঠন, সংস্থা ব্যক্তির পক্ষ থেকে। সম্প্রতি মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) বেশকিছু বিষয় পরিবর্তনের দাবি করেছে। এছাড়া ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই), ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজসহ (আইসিসি) অনেক সংগঠন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রফতানি পর্যায়ে উৎসে কর কর্তন দশমিক শতাংশে বহাল রাখা শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের ওপর করারোপ প্রত্যাহার। এছাড়া কর রেয়াতে বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা কমানো, ল্যাপটপ, প্রিন্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যে শুল্কারোপের সমালোচনা করছেন প্রায় সবাই। এটি ডিজিটাল রূপান্তরের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। কেউ কেউ মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধির দাবি করেছেন। প্রত্যাশা থাকবে, অর্থ মন্ত্রণালয় বাজেট নিয়ে বিভিন্ন সংস্থা, সংগঠন ব্যক্তির পক্ষ থেকে উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনাপূর্বক যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে বিভিন্ন খাতে করছাড় দেয়া হয়েছে। যেসব খাতে করছাড় দেয়া হয়েছে, তার বেশির ভাগ সুবিধা পাবে সংগঠিত বৃহৎ শিল্প। কিন্তু মাঝারি বা ছোট শিল্পের জন্য সুনির্দিষ্ট খুব বেশি সুবিধা নেই। অনানুষ্ঠানিক খাতের জন্য কিছু উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। শিল্প শ্রমিকের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু হতে পারেএকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। বাজেটে করোনাকালে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন কোনো দিকনির্দেশনা নেই। বাজেটে দাবি করা হয়েছে ব্যবসা শিল্পের জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোয় কর্মসংস্থান বাড়বে। সুবিধা সবাই পাবে। কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণী কী কী খাতে সুবিধা পাবে তা পরিষ্কার নয়। বাজেট বক্তৃতায় জীবন-জীবিকাকে অগ্রাধিকার দেয়ার দাবি করা হলেও বাজেট পর্যালোচনা করে এর বাস্তবতার প্রতিফলন দেখতে পাননি অর্থনীতিবিদরা। দীর্ঘসময় ধরে চলা শিক্ষার অচলাবস্থা থেকে বের হয়ে কীভাবে শিক্ষার্থীদের যোগ্য কাজের উপযুক্ত করে তোলা হবে সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট কোনো উদ্যোগ নেই। অর্থনীতির ক্রান্তিকালে করছাড় করপোরেট করের শর্তযুক্ত হ্রাসের ঘোষণা দিয়ে ব্যবসায়ী, শিল্পপতিদের সুবিধা দেয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ ছিল জিডিপির দশমিক ১১ শতাংশ। বর্তমান অর্থবছরে তা কমিয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে দশমিক ৫৫ শতাংশ। শিক্ষা খাতে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল জিডিপির দশমিক ৮৩ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। স্বাস্থ্য খাতে মোট বাজেটের দশমিক শতাংশ বরাদ্দ হয়েছে, যা গত বছরের বাজেটে ছিল দশমিক শতাংশ। জনপ্রশাসন পরিবহন যোগাযোগ খাতের ব্যয় বরাদ্দ কমিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বাড়তি বরাদ্দের অর্থের সংস্থান করা দরকার। প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী মুনাফায় শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিল (ডব্লিউপিপিএফ) খরচ আয়কর অধ্যাদেশের ধারা ৩০ (কিউ) অনুযায়ী অনুমোদনযোগ্য না হওয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়। বিষয়টি শ্রম আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। শ্রম আইনের বিধান অনুযায়ী কর-পরবর্তী মুনাফার ওপর শতাংশ ডব্লিউপিপিএফ পেমেন্ট করা হয়। শ্রম আইনের ধারা ২৪৪ অনুযায়ী কোম্পানির করযোগ্য আয় হিসাব করার সময় ডব্লিউপিপিএফ পেমেন্টকে করযোগ্য আয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। অর্থাৎ ডব্লিউপিপিএফ পেমেন্ট অনুমোদনযোগ্য খরচ। পণ্য পরিবহন ট্রান্সপোর্ট সেবার ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত বাজেটে শতাংশ হারে আয়কর কর্তনের বিষয়টিও পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীতে আরো নতুন সুবিধাভোগী যুক্ত হওয়ার কথা বাজেট প্রস্তাবে করা হয়েছে। বিভিন্ন ভাতার পরিমাণ বাড়লেও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য কোনো আশার খবর নেই। অর্থনীতিবিদদের অনেকেই বলছেন নতুন বাজেট প্রস্তাবে দারিদ্র্য হারসহ অনেক তথ্য-উপাত্তের মধ্যেই সামঞ্জস্য নেই। অনেক উপাত্তের হালনাগাদ পরিসংখ্যান নেই, কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়ে সুস্পষ্ট ধারণাও নেই। কথা ঠিক, সব বাজেটে প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির ফারাক আছে, থাকে। কৃষি জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দেয়ার যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা ইতিবাচক হলেও নিম্ন আয়ের মানুষ কবে তার কতটা সুবিধা পাবে, সেটা পরিষ্কার নয়। ব্যবসাবান্ধব বাজেটের কথা বলা হলেও ক্ষুদ্র মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা সুবিধা পাবে, তা স্পষ্ট নয়। কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন সামাজিক অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি রোডম্যাপ থাকা উচিত।

২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলো সতর্ক পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। প্রথমেই আসে দেশ থেকে পাচার করা টাকা নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিয়ে আবার দেশে ফেরত আনার যে প্রস্তাবটি করা হয়েছে সেটি। দেশে ডলারের প্রবাহ বাড়ানোর সদিচ্ছা থেকেই বাজেটপ্রণেতারা প্রস্তাব যুক্ত করেছেন। কিন্তু অসাধু পাচারকারীরা তাদের পাচার করা টাকা দেশে আনার জন্য সুযোগ কতটা ব্যবহার করবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। দ্বিতীয় যে প্রস্তাবটির কথা জোর দিয়ে পুনর্বিবেচনা করতে হবে, সেটি হলো ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট এবং খুচরা বাজারে সেলফোনের ওপর শতাংশ ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব। করোনার সময়ই বিদ্যমান ডিজিটাল ডিভাইড আমাদের শিক্ষার্থীদের অনলাইন পড়ালেখা চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছিল। এক্ষেত্রে ইন্টারনেট সেবা ডিজিটাল ডিভাইস সব আয় শ্রেণীর পরিবারগুলোর কাছে সহজে পৌঁছানোর উপযোগী আর্থিক নীতিই কাম্য। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে অতিদরিদ্রদের কাছে ১০ টাকা কেজি দরে যে চাল বিক্রি করা হতো, তা করা হয়েছে ১৫ টাকা। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় কর্মসূচি অব্যাহত রাখার বিষয়টি নিম্ন আয়ের মানুষকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে, সন্দেহ নেই। মধ্যবিত্তের জন্যও স্বস্তিদায়ক প্রণোদনা কাম্য। কোম্পানির করপোরেট কর হ্রাস, এক ব্যক্তির কোম্পানিতে করছাড়, স্টার্টআপ কোম্পানির কর হ্রাসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেয়া হয়েছে ছাড়। তবে এনবিআর-বহির্ভূত কর আদায় বৃদ্ধিতে স্ট্যাম্প ডিউটি বাড়ানোর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে খরচ বাড়বে, যা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আগামী দিনে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সংস্কারের লক্ষ্য হতে হবে তিনটি। ব্যবসার প্রতিবন্ধকতা হ্রাস; কর জিডিপির অনুপাত বাড়ানো; খেলাপি ঋণ অর্থ পাচার হ্রাস। কর জিডিপির অনুপাত বাড়াতে কর কর্মকর্তাদের বিবেচনামূলক (ডিসক্রিশনারি) ক্ষমতা হ্রাস কর প্রচেষ্টা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। দ্রুত কর প্রত্যর্পণ; শুল্ক মূল্য সংযোজন করহারের যৌক্তিকীকরণ হতে হবে। বর্তমানে শুল্কহার দরকষাকষি বা ব্যক্তি কিংবা দলীয় চাঁদা প্রদানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়ে থাকে বলে অভিযোগ আছে। এর পরিবর্তে শিল্পভিত্তিক ইনপুট-আউটপুট সারণি প্রস্তুত করে কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য তৈরি পণ্যের শুল্কহার নির্ধারণ করা যেতে পারে। অঘোষিত আয়কে বৈধ অবৈধ দুই ভাগে ভাগ করা প্রয়োজন। প্রথম ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হারে কর প্রদান দ্বিতীয় ক্ষেত্রে জরিমানাসহ কর আদায়ের ব্যবস্থা করার সুপারিশ এসেছে। পাশাপাশি যারা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অঘোষিত আয় ঘোষণা করবে না তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য রাজস্ব (আয় ব্যয়) ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে এক. অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস; দুই. করজাল বাড়িয়ে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি; তিন. সঞ্চয় বৃদ্ধি; চার. বাজেট ঘাটতি হ্রাসের মতো পদক্ষেপ নেয়া দরকার। এছাড়া উৎপাদন বৃদ্ধি, হতদরিদ্রদের জন্য রেশন মধ্যবিত্তের জন্য মূল্য নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নিতে হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন