শুক্রবার | আগস্ট ১২, ২০২২ | ২৭ শ্রাবণ ১৪২৯  

সম্পাদকীয়

মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হার বিবেচনায় পদ্মা সেতু নির্মাণে অতিরিক্ত ব্যয় হয়নি

. শামসুল আলম পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ। স্নাতক স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগে। পরবর্তী সময়ে ব্যাংককের থাম্মাসাট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। পিএইচডি অর্জন করেন ইংল্যান্ডের নিউ ক্যাসেল আপন টাইন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কর্মজীবনের বড় অংশ কাটান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায়। পরে প্রেষণে যোগ দেন পরিকল্পনা কমিশনে। সিনিয়র সচিব পদমর্যাদায় সেখানে দায়িত্ব পালন করেন এক যুগ। সময় তার তত্ত্বাবধানে প্রণীত হয় সরকারের বহু পরিকল্পনা দলিল। পদ্মা সেতুর পরিকল্পনা থেকে নির্মাণের নানা দিক দিয়ে তিনি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এম মুসা

দেশের ৫১ বছরের ইতিহাসে পদ্মা সেতু নির্মাণকে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। সম্পর্কে আপনার অভিব্যক্তি জানতে চাই।

পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রথম ডিপিপি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে অনুমোদন হয় ২০০৯ সালে। কিন্তু ডিপিপিটা তৈরি হয়েছিল ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। ২০০৭-০৮ থেকে ২০১৪-১৫ সাল নাগাদ তারা এর মেয়াদ ধরেছিল। প্রথম ডিপিপিতে পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ধরা হয়েছিল দশমিক ৫৮ কিলোমিটার। খরচ ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাসহ নানা কারণে ডিপিপি করার পর তারা আর এগোতে পারেনি। ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতায় আসেন, তিনি ডিপিপি সংশোধন করলেন। ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। তখনো ব্যয় একই ছিল। যদিও ২০০১ সালের জুলাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মাওয়া পয়েন্টে পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেছিলেন। ২০০১ পরবর্তী সরকার এটা নিয়ে আর কোনো কাজ করেনি। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭-০৮ সালে এটি এগিয়ে নেয়ার প্রাথমিক কাজটি শুরু করে ছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর উদ্বোধন করেছিলেন, তিনিই আবার প্রথম ডিপিপি পুনর্বিন্যাস করলেন। ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের জন্য এটিকে চূড়ান্ত করেন তিনি।

২০১৫ সালে এসে প্রধানমন্ত্রী ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য দ্বিতীয় সংশোধনীটি করলেন। তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। যখন প্রথম ডিপিপি করা হয়, তখন ডলার সমান ছিল ৭০ টাকা। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে ডলারের তৎকালীন মূল্যমানটি আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। সে সময় ১৪ কিলোমিটার (মাওয়া প্রান্তে দশমিক কিমি আর জাজিরা প্রান্তে দশমিক কিমি) তীর সুরক্ষার জন্য ব্যয় ধরা হয়। সর্বশেষ সংশোধনীতে প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়ায় ৩০ হাজার ১৯৩ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে সেতু নির্মাণ রেলট্রাক, ভায়াডাক্ট নির্মাণ ব্যয় ছিল ১২ হাজার ১৩৩ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে নদীশাসনের জন্য ব্যয় ছিল হাজার ৪০০ কোটি টাকা, দুই পাড়ে অ্যাপ্রোচ রোডের ব্যয় ধরা হয়েছে হাজার ৯০৭ দশমিক ৬৮ কোটি টাকা, জমি অধিগ্রহণ পুনর্বাসন ব্যয় ধরা হয়েছে হাজার ৬৯৮ দশমিক ৭৩ কোটি টাকা। ডিপিপি অনুযায়ী এটি ছিল প্রকল্পের দালিলিক অবস্থা, যা ২০০৯ সালে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাস হয়। সেখানে তথ্যগুলো আছে। ২০০৯ সালে সেতুটির দৈর্ঘ্য চূড়ান্ত করা হয় দশমিক ১৫ কিলোমিটার।

প্রকল্পের ব্যয়-সুফল অনুপাত (কস্ট-বেনিফিট রেশিও) ছিল .১। মানে যা বিনিয়োগ করা হবে তার দ্বিগুণ উঠে আসবে। এটা প্ল্যান ডকুমেন্টে বলা হয়েছিল। আর অর্থনৈতিক রিটার্ন আসবে ২২ শতাংশ। এর মধ্যে ১২ শতাংশ ডিসকাউন্ট ফ্যাক্টর। এর মানে হলো, এটা ব্যাংকে রাখলে ১২ শতাংশ সুদ সরকার পেতে পারত। সেটি সরকার পাচ্ছে না, সেহেতু সুযোগ হারানো ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ শতাংশ বাদ দিয়ে। এখন ১০ শতাংশ হারে মুনাফা আসতে থাকবে। এটি ছিল এর তখনকার দালিলিক অবস্থা। সবাই জানি, পরে এর ব্যয় বেড়েছে। সর্বশেষ ব্যয় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।

পদ্মা সেতু থেকে টোল আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে বার্ষিক ১০৪ কোটি টাকা। সরকার হারে ৩৫ বছরে সুদসহ ৩৬ হাজার কোটি টাকা ফেরত পাবে। এটা হলো এর আর্থিক যোজনা। আর প্রকল্পের যে প্রভাব পড়বে তা হলো, দশমিক ২৩ শতাংশ আমাদের জিডিপিতে যোগ হবে। যেমন ধরুন বছর প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন শতাংশ। এর সঙ্গে দশমিক শতাংশ যোগ হয়ে দশমিক শতাংশ। অর্থাৎ বাড়তি যোগ হবে দশমিক ২৩ শতাংশ। এটা সারা দেশের জন্য। আর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার জন্য অতিরিক্ত দেশজ আয় বাড়বে দশমিক শতাংশ হারে। যখন হিসাব করা হয় তখনো পায়রা সমুদ্রবন্দর হয়নি। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রও হিসাবে নেয়া হয়নি। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র যে হবে, সেটিও এর মধ্যে ধরা হয়নি। কাজেই প্রবৃদ্ধি হার যা হওয়ার কথা, তার চেয়ে আসলে কম ধরা হয়েছে। এখনকার বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি হলো পায়রা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। আবার পায়রায় সমুদ্রবন্দর হতে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে এর প্রতিফল আরো বেশি হবে। একই সঙ্গে দারিদ্র্য কমবে দশমিক ৮৪ শতাংশ হারে। এটিও আসলে আরো বেশি হবে। সব মিলিয়ে আমরা বলতে পারি, প্রতি বছর দারিদ্র্য হার কম করে হলেও শতাংশ কমবে। এই হলো মোটা দাগে পদ্মা সেতুর আর্থিক বিশ্লেষণ।

অনেকে বলেছেন, পদ্মা সেতুর ব্যয় বেশি বেড়েছে। বিষয়ে আপনার অভিমত কী?

এটা ঠিক প্রকল্পের ব্যয় টাকার অংকে বেড়েছে। ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকা থেকে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা যদি হয় তাহলে টাকার অংকে বেড়েছে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, বৃদ্ধিটা কত বছরে। ১৫ বছরে এটা বেড়েছে। এখানে একটি বিষয় স্মরণ করিয়ে দিই, ১৫ বছরের মূল্য কিন্তু এক জায়গায় নেই। যেমন সে সময়ে ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের আউন্স ছিল হাজার ১০০ টাকা। সেটি এখন হয়েছে হাজার ৯০২ টাকা। অনেক বেড়েছে। সেই অর্থে প্রাথমিক হিসাবের টাকাটা তো হারেই বাড়বে। তখন ডলারের বিনিময় হার ছিল ৭০ টাকা। প্রতি ডলারে কমপক্ষে ১৫ টাকা যোগ করুন। ১৫ টাকা যোগ করলে আমি দেখি যে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা চলে আসে। তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে, ৩০ হাজার কোটি টাকা কীভাবে এল? এটা এল কারণে যে এখানে তিনটা বিষয় পরে যুক্ত হয়েছে। এক. ব্রিজের দৈর্ঘ্য বাড়ানো হয়েছে। এখন এটি দশমিক ১৫ কিলোমিটার। দুই. জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ করা হয়েছে। পুনর্বাসন ব্যয় বেড়েছে। তিন. আরো টেকসই মজবুত করার জন্য নতুন করে মাঝে পিয়ার স্থাপন এবং রিডিজাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বর্ধিত ব্যয় হয়েছে।

প্রাথমিক পরিকল্পনায় সেতুটি ছিল একতলা। পরে সেতুর নকশা পরিবর্তন করে রেললাইন সংযুক্ত করে সেতুটিকে দোতলা করা হয়। সেতুর দৈর্ঘ্য ধরা হয়েছিল দশমিক ৫৮ কিলোমিটার, যা পরে বেড়ে দাঁড়ায় দশমিক ১৫ কিলোমিটার। অর্থাৎ পানির উপরিভাগের সেতুর দৈর্ঘ্য শূন্য দশমিক ৫৭ কিলোমিটার বেড়ে  যায়। কিন্তু পানির বাইরেও ভায়াডাক্টসহ সেতুর কিছু অংশ আছে, এটি সংযোগ সড়ক। পানির বাইরে ভায়াডাক্টসহ সেতুর দৈর্ঘ্য দশমিক ৬৯ কিলোমিটার। পানির অংশ এবং পানির বাইরের অংশসহ পুরো সেতুর দৈর্ঘ্য দশমিক ৮৪ কিলোমিটার। পানির ওপরের অংশে মূল সেতুতে শূন্য দশমিক ৫৭ কিলোমিটার বেড়ে যাওয়ায় পানির বাইরের অংশসহ পুরো সেতুর দৈর্ঘ্য আসলে এক কিলোমিটারের বেশি বেড়ে যায়।

আবার প্রাথমিক পরিকল্পনায় সেতুর ৪১টি স্প্যানের মধ্যে তিনটি স্প্যান একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় রাখার ব্যবস্থা ছিল, জাহাজ চলাচলের জন্য। পরবর্তী সময়ে সংশোধিত বাজেটে ৪১টি স্প্যানেরই উচ্চতা বাড়িয়ে দেয়া হয়। এছাড়া প্রাথমিক পরিকল্পনায় ভূমি অধিগ্রহণের আনুমানিক পরিকল্পনা ছিল হাজার ৭৭৭ একর জমি, যা পরে বাস্তবে গিয়ে দাঁড়ায় হাজার ৬৫৫ একর। অর্থাৎ আড়াই থেকে তিন গুণ বেড়ে যায় এবং জনস্বার্থে ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ ক্ষতিপূরণের পরিমাণও তিন গুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়। সব মিলিয়ে বেড়েছে ব্যয়। মূল্যস্ফীতি পরবর্তী সময়ে হওয়া অতিরিক্ত খরচ বাদ দিলে মূল ব্যয়েই পদ্মা সেতুটি হয়েছে। অতিরিক্ত ব্যয় হয়নি। ১৫ বছরে প্রায় একই খরচে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন বাংলাদেশে সম্ভবত এটিই প্রথম। এটা সম্ভব হয়েছে প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত সবার আন্তরিক প্রচেষ্টা, দেশপ্রেম আর একাগ্রতার কারণে।

পদ্মা সেতু অর্থায়ণ থেকে বিশ্বব্যাংক কেন সরে গেল?

বিশ্বব্যাংকের চলে যাওয়া নিয়ে অনেক আলাপ-আলোচনা হয়েছে। সেতুটি একটি জটিল অর্থনৈতিক স্থাপনা। জটিল অর্থে যে পদ্মা নদী অত্যন্ত খরস্রোতা। বলা হয়, অ্যামাজনের পরে নদী সবচেয়ে খরস্রোতা। আমাদের কারিগরি কমিটি এর ডিজাইন স্থাপনা প্রযুক্তি বিশ্বব্যাংকে পাঠালে তারা এটি অনুমোদন করে। প্রযুক্তিগতভাবে এটা ঠিক আছে। এর প্রযুক্তিগত অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতার সবই ঠিক আছে। কাজেই প্রযুক্তিগত কোনো কারণে তারা এটা বাদ দেয়নি। তাহলে তাদের সরে দাঁড়ানোর কারণ হিসেবে যেটা প্রকাশ্যে বলা যায় তা হলো, এর পেছনে একটা রাজনীতি ছিল। এখন জানা যায়, গ্রামীণ ব্যাংকের এককালীন এমডি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী রাজনীতিকদের প্রভাবিত করেছেন যেন বিশ্বব্যাংক এখানে অর্থায়ন না করে। এর কোনো কারিগরি ত্রুটি নেই, সবকিছু ঠিক আছে অথচ দুর্নীতি ষড়যন্ত্রের মতো অপ্রমাণিত অভিযোগে অর্থায়ন চুক্তি বিশ্বব্যাংক বাতিল করবে, এটা ভাবা যায় না। এটা আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় যে বড় রকমের প্রভাব ছাড়া ঋণ বাতিল হতে পারে না।

এখানে আরো মজার বিষয় হলো, ঋণ চুক্তি যখন বাতিল হয় এবং কানাডার আদালত যখন দুর্নীতির বিষয়টিকে গালগপ্প ছাড়া আর কিছুই নয় মন্তব্য করেন, তখন বিশ্বব্যাংক চেয়েছিল যে তারা ঋণটা বাংলাদেশকে ফিরিয়ে দেবে। সে সময় তারা আবুল মাল আব্দুল মুহিত সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং মুহিত সাহেব ঋণের পরিমাণ বিবেচনায় কিছুটা নমনীয় হন। তিনি গওহর রিজভী মিলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেখা করে পুনর্বিবেচনার কথা বলেছিলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটি কথাই বলেছিলেন, সেতু আমরা নিজের অর্থেই করব। যেহেতু বিশ্বব্যাংক অন্যায়ভাবে না করেছে, যেহেতু তারা দুর্নীতি প্রমাণ করতে পারেনি, আমাদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে, আমাদের বিপদগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা ঝড় সৃষ্টি করা হয়েছে, সেহেতু ঋণ আমরা নেব না। নিজেদের টাকায় করব। প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত ছিল খুবই দূরদর্শী সাহসী এবং নিজের সক্ষমতার প্রতি তার আস্থা ছিল। এজন্য তিনি মুহিত গওহর রিজভী সাহেবের পুনর্বিবেচনার প্রস্তাবটি ফিরিয়ে দেন।

এখানে আমরা অর্থায়নটা কীভাবে করলাম?

প্রশ্নের উত্তরের আগে একটা পটভূমি বলি। বিশ্বব্যাংক না করে দিলে আমাদের নাগরিক সমাজ, বুদ্ধিজীবী, মিডিয়া সবার মধ্যে একটা হতাশা তৈরি হয়েছিল। অনেকেই বলেছিলেন, সেতু বাংলাদেশের পক্ষে করা সম্ভব নয়, এত টাকা বাংলাদেশের দেয়া সম্ভব না, প্রযুক্তিগতভাবেও বাংলাদেশ কারিগরি সহায়তা পাবে না। যদিওবা এটা বাস্তবায়ন করে তাহলে অন্যান্য প্রকল্প বাদ দিতে হবে বাংলাদেশকে। সে সময় প্রথম থেকে আমরা কয়েকজন অর্থনীতিবিদ বলেছিলাম, এটা করা যাবে। আমি এখানে বণিক বার্তা কালের কণ্ঠকে ধন্যবাদ দিতে চাই। দৈনিক কালের কণ্ঠে সে সময় আমার একটা লেখা ছাপে। তার শিরোনাম ছিল—‘আমরাই বাস্তবায়ন করতে পারি পদ্মা সেতু ২০১২ সালের মে। অর্থনীতির মধ্যে ক্ষুদ্র ব্যক্তি হলেও আমি প্রথম প্রতিবাদমূলক নিবন্ধটি লিখি। একই বিষয়ে পরপর দুটি নিবন্ধ ছাপে দৈনিক বণিক বার্তা; লিখিঋণচুক্তি বাতিলের প্রহসন ছিল অবধারিত শিরোনামের নিবন্ধ। লেখায় আমি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছি। রাজনৈতিক প্রভাবে এটা বাতিল করার কথা আমি বলেছি সেখানে। বণিক বার্তা অনেক সাহসের সঙ্গে ২০১৪ সালের ১৪ জুলাই এটি ছাপে। অন্য লেখাটি বণিক বার্তা ছেপেছিল ২০১২ সালের ১৩ মে, শিরোনাম ছিলস্ব-অর্থায়নে বাস্তবায়িত হতে পারে পদ্মা সেতু 

লেখাগুলোয় আমি বলেছি, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ মানির নিরাপদ সীমা অক্ষুণ্ন রেখে প্রতি বছর ৫০০ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ অর্ধবিলিয়ন ডলার ব্যয় করতেই পারে। সেখানে আরো লিখেছিলাম, বেসরকারি বীমা সংস্থায় রক্ষিত ১১ হাজার কোটি টাকাও এতে ব্যয় করা যেতে পারে। বলেছিলাম, আমাদের উন্নয়ন বাজেটে যে অব্যয়িত টাকা থাকে, সেখান থেকেও পদ্মা সেতু করা সম্ভব। আলোচ্য তিনটি লেখা পত্রিকা দুটিতে ছাপা হয়। শ্রদ্ধার সঙ্গে বলব যে . আবুল বারকাতও জোরালো ভাষায় লিখেছিলেন, পদ্মা সেতু আমাদের টাকায় অবশ্যই করা যাবে এবং করা উচিতও। . মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, . মইনুল ইসলাম . আতিউর রহমানও লিখেছিলেন, পদ্মা সেতু বাংলাদেশের টাকায় করা সম্ভব। আমরা মাত্র কয়েকজন অর্থনীতিবিদ এর পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরি। এটা ছিল প্রথম পর্যায়। তবে বেশির ভাগ অর্থনীতিবিদই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের বিপক্ষে ছিলেন।

পরে যখন দুর্নীতি প্রমাণ হলো না, তখন বিশ্বব্যাংক সহানুভূতিশীল দৃষ্টি নিয়ে আসে যে ঠিক আছে আমরা সহায়তা করব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেটি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলেন কারণে, যে অপবাদ আমাদের ওপর চাপানো হয়েছে, আমাদের সরকারি কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে, তাদের জন্য জেলে যেতে হয়েছে। এজন্য তিনি পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থে করবেন বলে দৃঢ় ছিলেন। পদ্মা সেতু আজকে তার সাহসিকতা, দূরদর্শিতা জাতীয় অর্থনীতির সামর্থ্যের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। এটা বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সাহসিকতা আত্মপ্রত্যয়ের প্রতীক হিসেবে আগামী ১০০ বছর দাঁড়িয়ে থাকবে। ১০০ বছরের জন্য করা হয়েছে ঠিকই, যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে সেতুটি ১২০ বছর পর্যন্ত অক্ষত থাকবে এবং চলবে। সেতুটি এমনভাবে করা হয়েছে, মাত্রায় ভূমিকম্প হলেও এর কিছু হবে না। এমনকি বড় সমুদ্রবাহী জাহাজ যদি ঝড়ে এসে প্রবল ধাক্কাও মারে, সেতুটি নড়বে না। সেদিক থেকেও এটি বাংলাদেশের অদ্বিতীয় স্থাপনা হয়ে থাকবে। এটি বলাই যায়, সেতুটি আমাদের জাতীয় গৌরবের প্রতীক হিসেবে দাঁড়াবে, সারা বিশ্ব কুটিল ষড়যন্ত্রের শিকারপদ্মা সেতুনামে  সেতুটি চিনেছে বিধায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও নিজের নামে এর নামকরণে রাজি হননি। অপার দেশপ্রেম আর কুটিল ষড়যন্ত্রীদের সঠিক জবাব দিতে এর চেয়ে আর ভালো কী উদাহরণ হতে পারে! আমি অবশ্যই বলবজয়তু শেখ হাসিনা।

প্রকল্পে অর্থায়নের কারণে অন্য প্রকল্প বাধাগ্রস্ত হবে বলে অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন...

প্রকৃতপক্ষে, পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে ২০১৩ সালে। এর পরে খেয়াল করুন, আমরা ১০টি মেগা প্রকল্প নিয়েছি। অনেকে বলেছিলেন, পদ্মা সেতু শুরু করেছে, শেষ হবে না। এটা অবশ্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বলেছিলেন। কেউ কেউ বলেছিলেন, পদ্মা সেতু করা যাবে, তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প সরকারকে বাদ দিতে হবে। কিন্তু লক্ষ করুন, সেই থেকে আমরা ১০টি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করে চলেছি। আমাদের টাকার কোনো অভাব হয়নি। আরো দুটি মেগা প্রকল্প বছরই চালু হবে।

অন্য কারো কাছ থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে?

না, এখানে কোনো ঋণ নেয়া হয়নি। এটা পুরোটা নিজস্ব টাকায় করা হয়েছে। যেটা নেয়া হয়েছে সেটা হলো প্রযুক্তিগত কারিগরি সহায়তা। যেহেতু এখানে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা দরকার। এর বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে চায়না ব্রিজ মেজর কোম্পানিকে। আর এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনার জন্য বর্তমানে দুটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যাতে সুন্দরভাবে রাখা যায়। দুই বছরের জন্য চায়না মেজর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরিয়া এক্সপ্রেস করপোরেশনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যাতে দুই বছরে বাংলাদেশ অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। এরপর বাংলাদেশ রক্ষণাবেক্ষণ করবে।

সত্যি কথা বলতে কি, পদ্মা সেতুর জন্য আমাদের বাড়তি কর আরোপ কিংবা সারচার্জ আরোপ করতে হয়নি। আমাদের যে অব্যয়িত অর্থ থাকে, তা কাজে লাগানো হয়েছে। পদ্মা সেতুর খরচের একটা অংশ এখান থেকেও এসেছে আর আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আমাদের একটা সক্ষমতাও ছিল। রিজার্ভ অনেক বেড়েছে। সেদিক থেকে আমরা অর্থায়নে কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়িনি।

বলা হচ্ছে, টোল হার অনেক বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। আরো কম টোল কি নির্ধারণ করা যেত না?

অনেক সময় আমরা বাস্তবতার কাছাকাছি না গিয়ে বলতে থাকি। একটা সম্পদ বিনিয়োগ করা হয়েছে, একটা ট্রাকের যেখানে ১৪-১৫ ঘণ্টা বসে থাকতে হয়, গাড়িগুলোকে বসে থাকতে হয় - ঘণ্টা, এখন তো মুহূর্তেই পার হতে পারবে। এজন্য বর্তমানে টোল হারের ৫০ শতাংশ অর্থ বেশি দিলেও গায়ে লাগবে না। প্রথম কথা, জনগণের টাকায় সেতু হয়েছে। টাকা উঠে আসতে হবে। টাকা আবার অন্যখানে বিনিয়োগ করতে হবে। কাজেই সময়ের কথা বিবেচনায় নিয়ে যে টোল হারের কথা বলা হচ্ছে, আমি মনে করি সেটি যৌক্তিক।

পদ্মা সেতুর কারণে দক্ষিণবঙ্গ থেকে ঢাকায় আরো কেন্দ্রীভবন হবে কিনা, যেটি যমুনা সেতু হওয়ার পর উত্তরবঙ্গ থেকে হয়েছিল?

বঙ্গবন্ধু সেতু হওয়ার কারণে বাড়েনি। আসলে বেড়েছে আমাদের সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক। আমাদের মোট দেশজ আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে ঢাকা চট্টগ্রাম শহর থেকে। এখন বিকেন্দ্রীকরণ নির্ভর করে অন্য সুযোগ-সুবিধাগুলো কীভাবে ছড়িয়ে দেবেন। কাজেই পদ্মা সেতুর কারণে যোগাযোগ আরো বাড়বে, পণ্য পরিবহন বাড়বে। কিছুটা হলেও যানজট, জনজট অবশ্যই বাড়বে। তবে ঢাকায় কেন্দ্রীভবন যাতে না হয়, তার জন্য দক্ষিণবঙ্গের আঞ্চলিক উন্নয়নেও জোর দিতে হবে, যাতে মানুষ বেশি মাত্রায় ঢাকামুখী না হয়।

 

শ্রুতলিখন: হুমায়ুন কবির

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন