বুধবার | জুন ২৯, ২০২২ | ১৫ আষাঢ় ১৪২৯  

প্রথম পাতা

আঞ্চলিক বাণিজ্যে পদ্মা সেতুর ভূমিকা হবে অপরিসীম: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল তার কার্যালয়ে বন্যা পরিস্থিতি ও পদ্মা সেতুর উদ্বোধন নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন ছবি: পিআইডি

এশিয়ার আঞ্চলিক বাণিজ্যে পদ্মা সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, পদ্মা সেতুকে ঘিরে গড়ে উঠবে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল হাই টেক পার্ক। ফলে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট এবং দেশের শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত হবে। পদ্মা সেতু এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযোগের একটা বড় লিংক। তাই আঞ্চলিক বাণিজ্যে সেতুর ভূমিকা অপরিসীম। তাছাড়া পদ্মার দুই পারে পর্যটন শিল্পেরও ব্যাপক প্রসার ঘটবে। গতকাল প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতুর ফলে মানুষের একদিকে যেমন দীর্ঘদিনের ভোগান্তি লাঘব হবে, অন্যদিকে অর্থনীতি হবে বেগবান। আশা করা হচ্ছে সেতু জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে দশমিক ২৩ শতাংশ হারে অবদান রাখবে এবং প্রতি বছর দশমিক ৮৪ শতাংশ হারে দারিদ্র্য নিরসন হবে।

তিনি বলেন, ২০১২ সালের জুলাই মন্ত্রিপরিষদের এক বৈঠকে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দিই। আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে পদ্মা সেতুর জন্য অর্থ না নেয়ার কথাও জানিয়ে দেয়া হয়। এরপর আপনারা দেখেছেন, আমাদের দেশের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী অর্থনীতিবিদ কীভাবে মনগড়া সমালোচনায় মেতে উঠেছিল।

সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে সেতু নির্মাণ করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণকাজের গুণগত মানে কোনো আপস করা হয়নি। সেতু নির্মিত হয়েছে বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি উপকরণে। সর্বোচ্চ ১২২ মিটার গভীর পর্যন্ত সেতুর পাইল বসানো হয়েছে। ভূমিকম্প প্রতিরোধ বিবেচনায় ব্যবহূত হয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি।

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়ার পর বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও তা বাস্তবায়নের কঠিন যাত্রায় সঙ্গে থাকায় দেশের মানুষের প্রতি ধন্যবাদ কৃতজ্ঞতা জানান সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, মানুষের কাছ থেকে যে অভূতপূর্ব সাড়া আমি পেয়েছিলাম, সেটাই কিন্তু আমার সাহস আর শক্তি। মানুষ আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল। তাদেরই সাহসে পদ্মা সেতু আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, পদ্মা সেতু আমাদের অহংকার, আমাদের অর্জন। প্রমত্তা পদ্মা নদী দেশের দক্ষিণ অঞ্চলকে রাজধানী ঢাকা আরো অনেক অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। আমরা দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষ। কাজেই সেই কষ্টটা আমরা খুব ভালো করে জানি। দক্ষিণ অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষরাই জানে কী ঝুঁকি নিয়ে আর কত কষ্টে সময় ব্যয় করে রাজধানীতে প্রবেশ করতে হয়।

পদ্মা সেতু করতে গিয়ে ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজনে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের যথাযথ ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভূমিহীনসহ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আবাসিক বাণিজ্যিক প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। অতিরিক্ত সহায়তা, ভিটা উন্নয়ন সহায়তা দেয়া হয়েছে। তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য কর্মমুখী আয়বর্ধনমূলক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে, অর্থ সাহায্য দেয়া হয়েছে এবং পরিবেশ রক্ষার জন্য পুনর্বাসিত এলাকাকে পদ্মা সেতু বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা দিয়ে সেখানে বনায়ন সৃষ্টি করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেতু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে শিল্পায়ন ঘটবে। এজন্য পাওয়ার প্লান্ট আগে করে ফেলেছি। সেখানে বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে, সেদিকটা লক্ষ রেখেছি। আর পায়রা সেতুও আমরা এখন নির্মাণ করেছি।

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশীদের ওপর নির্ভরশীলতার অচলায়তন ভাঙতে পারার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সাহস নিয়ে নিজেদের টাকায় নিজেরা পদ্মা সেতু করার ফলে আজকে বাংলাদেশের সম্মানটা ফিরে এসেছে। আমাদের দেশের অনেকের একটা মানসিকতা ছিল যে আমরা অন্যের অর্থায়ন ছাড়া কিছুই করতে পারব না। পরনির্ভরশীলতা, পরমুখাপেক্ষিতাএটা অনেকের মাঝে ছিল। একটা দৈন্য ছিল। বিশ্বব্যাংক যখন টাকা তুলে নিয়ে গেল আমরা যখন সিদ্ধান্ত নিলাম, অন্তত আমরা সেই জায়গা থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছি। সেই অচলায়তন ভেঙে আমরা যে একটা আত্মমর্যাদাশীল জাতি, সেটা প্রমাণ করতে পেরেছি।

পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে কিনা বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনাসাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তর দেন শেখ হাসিনা। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, একটা প্রবাদ আছে নিজের ভাঁড় ভালো না, গোয়ালার ঘিয়ে দোষটা কী! তারা তো আমাদের দেশেরই লোকের প্ররোচনায় বন্ধ করেছিল, এটাই তো বাস্তবতা। আমার কিছু বলার দরকার নেই। তারা নিজেরাই তো বুঝতে পারবে, যদি তাদের অনুশোচনা থাকে। আর না থাকলে কারো বিরুদ্ধে আমার কিছু বলার নেই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন-সহযোগী হিসেবে বিশ্বব্যাংক থেকে যে আর্থিক সহায়তা আসে, সেটা তারা অনুদান বা ভিক্ষা দেয় না। বরং ঋণ হিসেবে নিয়ে সেগুলো পরিশোধ করা হয়। আমরা বিশ্বব্যাংকের অংশীদার। তারা কোনো অনুদান দেয় না, আমরা ঋণ হিসেবে নিই। এটি সবার মাথায় রাখতে হবে।

পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে সরে গেলেও বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ হওয়া ওই অর্থ অন্যান্য প্রকল্পে আসার কথা তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, যে টাকাটা বাংলাদেশের নামে স্যাংশন হবে, সেই টাকাটা নষ্ট করার কোনো রাইট তাদের নেই। হয়তো পদ্মা সেতু থেকে টাকা তারা বন্ধ করছে, টাকা কিন্তু উদ্ধার আমরা করতে পেরেছি। এই টাকা কিন্তু অন্যান্য প্রজেক্টে ব্যবহার করতে পেরেছি। এটা কিন্তু করা যায়। এটা আমাদের অনেকে জানে না।

আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে বন্যার ঝুঁকি রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বন্যা শুরু হয়েছে, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্যার ঝুঁকি থাকে, পানি নেমে আসবে দক্ষিণ অঞ্চলে। সেজন্য আগাম প্রস্তুতি আমাদের আছে।

সিলেট অঞ্চলে এবারের ভয়াবহ বন্যার কথা উল্লেখ করে সেখানে ত্রাণ উদ্ধার তত্পরতা কার্যক্রম তুলে ধরেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, পানি যাতে দ্রুত নেমে যেতে পারে সেজন্য প্রয়োজনে রাস্তা কাটার নির্দেশ দিয়েছিলাম। এটাও আমাদের একটা শিক্ষা, কোন জায়গা থেকে পানি নিষ্কাশন হচ্ছে, কারণ আমাদের এখানে তো বন্যা আসবেই। সেটা চিহ্নিত করে রাখতে বলেছি, সেখানে ব্রিজ-কালভার্ট এমনভাবে করে দেব, যাতে পানি জমা থাকতে না পারে। বন্যার পর কৃষক যেন কৃষিকাজ করতে পারে, সেজন্য বীজ-সারের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

দু-একদিনের মধ্যে পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হবে আশা প্রকাশ করে সরকারপ্রধান বলেন, সিলেট সুনামগঞ্জ জেলার পানি কমতে শুরু করেছে। বন্যার পানি নেমে গেলে বাড়িঘর মেরামত এবং কৃষি পুনর্বাসনের কর্মসূচি হাতে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজ নির্দিষ্ট করে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।

 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন


×