শনিবার | আগস্ট ১৩, ২০২২ | ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯  

সম্পাদকীয়

সিওপিডি ও ডায়াবেটিসে বাড়ছে মৃত্যুহার

জীবনযাপনে পরিবর্তন ও দূষণ রোধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হোক

দেশে গত ১০ বছরে শ্বাসতন্ত্র ডায়াবেটিসে মৃত্যুর হার বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের (আইএইচএমই) গবেষণার বরাত দিয়ে গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত রোগে মৃত্যুহারে পরিবর্তন এসেছে। ২০০৯ সালে যে ১০ রোগে মৃত্যুহার বেশি ছিল, তার মধ্যে নম্বরে ছিল ডায়াবেটিস; ২০১৯ সালে সেটি নম্বরে চলেছে এসেছে। একইভাবে ২০০৯ সালে সর্বোচ্চ মৃত্যুহারের তালিকায় ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজের (সিওপিডি) অবস্থান ছিল নম্বরে, আর ২০১৯ সালে সেটি তালিকার - উঠে এসেছে। এর কারণ হিসেবে বায়ু, পানি শব্দদূষণের পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনকে দায়ী করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তথাকথিত উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় নেমে বায়ু, পানি, পরিবেশ জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের বিশ্ব এক চরম মানবিক সংকটে নিপতিত হয়েছে। নানা জরিপে দেখা যাচ্ছে, এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থা খুবই শোচনীয়। শিল্পায়ন, নগরায়ণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিযোগিতা পরিহার করে আমাদের অবশ্যই জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশ প্রকৃতিবান্ধব উন্নয়নের পথে হাঁটতে হবে। পরিবেশ, বায়ু পানিদূষণের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।

পরিবেশ দূষণকে বিশ্বে রোগ বিস্তারে সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিবেশ দূষণ হয় প্রধানত আমাদের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রাকৃতিক উপাদান মাটি, পানি বায়ুদূষণ থেকে। এছাড়া সিসা, ধূমপান কর্মক্ষেত্রে দূষণের শিকার হয়েও অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। বায়ুদূষণে মৃত্যুর দিক থেকেও ভারত শীর্ষে। এরপর যথাক্রমে বাংলাদেশ, নেপাল পাকিস্তানের অবস্থান। অন্যদিকে পানিতে আর্সেনিক সমস্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে আছে বাংলাদেশ, ভারত চীন। পানিতে আর্সেনিকের কারণে ক্যান্সার, কিডনিজনিত রোগ, হূদরোগে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। উন্নয়নের নামে বাংলাদেশেও নদী বন ধ্বংস করা হচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানির কারণে বায়ুদূষণের মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। এসব দূষণ কেবল মানুষের মৃত্যুই ঘটাচ্ছে না, যারা বেঁচে আছে তারাও নানা রোগে ভুগছে। বাংলাদেশে ডেঙ্গু, ডায়রিয়া, ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগের উৎসও পরিবেশ দূষণ। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলেছেন, পরিবেশ দূষণ করোনার চেয়েও ভয়ংকর। অবস্থায় এখনই বায়ু, মাটি পানিদূষণ পুরোপুরি বন্ধ না করতে পারলেও সহনীয় মাত্রায় না নিয়ে আসতে পারলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেবে এবং পরিবেশ দূষণে মৃত্যুর হার আরো বেড়ে যাবে। এরই মধ্যে ঢাকা প্রায় বসবাসের অনুপযোগী শহরে পরিণত হয়েছে। দেশের অন্যান্য শহরের পরিবেশও নাজুক অবস্থায় আছে। আর একদিনও ক্ষতি বাড়তে দেয়া যায় না। দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে পরিবেশজনিত যে পুঞ্জীভূত সমস্যা তৈরি হয়েছে, এতে বিচ্ছিন্নভাবে পদক্ষেপ নিলে কোনো কাজ হবে না। এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন। করোনাভাইরাসের কারণে জাতীয় বাজেটে বাড়তি ব্যয় হয়েছে। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় লকডাউনের ক্ষতি, প্রণোদনাসহ নানাভাবে জনগণের রাজস্ব থেকে অতিরিক্ত ব্যয় হলেও এর চেয়ে অনেক বেশি প্রাণঘাতী বায়ু, পানি পরিবেশগত দূষণ মোকাবেলায় সরকারের বাজেট কর্মপরিকল্পনা খুবই অপ্রতুল। অথচ করোনাভাইরাসের চেয়ে দূষণজনিত কারণে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি। দেশের হাসপাতাল, ডাক্তারের চেম্বার ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোয় আসা রোগীদের বেশির ভাগ বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, খাদ্যসামগ্রীতে ভেজাল, নকল নিম্নমানের ওষুধ, শব্দদূষণ পরিবেশগত দূষণের কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যার শিকার। সরকারের বাজেট সাধারণ মানুষের পকেট থেকে খাতে ব্যয় হচ্ছে সর্বোচ্চ অর্থ। সঠিক পরিকল্পনা কঠোর উদ্যোগের মাধ্যমে সর্বব্যাপী দূষণ স্বাস্থ্য সমস্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা অসম্ভব নয়।

বিশ্বের কয়েকটি নগর কর্তৃপক্ষ যানবাহনের চাপ কমিয়ে পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমিয়ে বা জিরোতে আনতে বেশকিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। নরওয়ের রাজধানীতে ডিজেলচালিত গাড়ি নিষিদ্ধ করা হয়েছে ২০১৭ সালের ১৭ জানুয়ারি। অবশ্য অ্যাম্বুলেন্স অন্যান্য সরকারি পরিষেবার যানবাহন ডিজেলেও চলতে পারে। ২০১৯ সাল থেকে সিটি সেন্টারে সরকারি পার্কিং কমিয়ে দেয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। ২০২৪ সাল থেকে ফ্রান্সের রাজধানীতে ডিজেলচালিত গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ হবে। ২০৩০ সাল থেকে প্যারিসে ডিজেল বা পেট্রলসব ধরনের জ্বালানি তেলে চলা গাড়ি নিষিদ্ধ করা হবে। প্যারিসে শুধু ইলেকট্রিক গাড়ি চলবে। বাংলাদেশও গবেষণা করে অনুরূপ বা বিকল্প পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে। মানুষ যেন গাড়ি নিয়ে শহরের কেন্দ্রে আসা কমিয়ে দেয়, সেজন্য লন্ডনের কেন্দ্রে গাড়ি চালাতে গেলে দিনে ১০ পাউন্ড বা প্রায় ১৪ ডলার কিংবা ১১ ইউরো ভিড়ের মাশুল গুনতে হয়। রাস্তায় লাগানো যন্ত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ির নম্বর প্লেট চিনে নিতে পারে, অর্থাৎ ধরতে পারে ভিড়ের মাশুল দেয়া হয়েছে কিনা। ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে ২০১৯ সাল থেকে ডিজেলচালিত গাড়ি ঢোকা বন্ধ করার কথা ভাবা হচ্ছে। বর্তমানে সেখানে ৩০০ কিলোমিটারের বেশি রাস্তা শুধু সাইকেল আরোহীদের জন্য রাখা হয়েছে। শহরের অর্ধেক বাসিন্দা সাইকেলে চড়ে অফিসে যান। বাংলাদেশের সরকারও নিয়ে ভাবতে পারে। একটি লেন শুধু সাইকেল আরোহীদের জন্য রাখা যেতে পারে। এতে যানজট কমবে, মানুষ সাইকেলে চড়ে অফিস, কর্মস্থলে যেতে পারবে। এতে খরচ কমে যাবে, পরিবেশ দূষণের মাত্রা অনেক হ্রাস পাবে। আর রাজধানীতে যানবাহনের ব্যবহার কমিয়ে দিতে হবেই। ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে দিতে হবে। সরকারি গাড়ি ব্যবহারে বা বরাদ্দে নতুন চিন্তা আনা যেতে পারে; যাতে একটি গাড়ি অনেকে ব্যবহার করতে পারেন, সেই চিন্তাও করা যেতে পারে।

পরিবেশ দূষণ রোধে সরকার আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে অনেক পদক্ষেপই নিয়েছে। দূষণ রোধে ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং ১৯৯৭ সালে পরিবেশ দূষণ বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। পরিবেশ আদালত আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিচারিক আদালতে বিশেষায়িত পরিবেশ বিচার ব্যবস্থা চালু করা হয় ২০০০ সালে। পরিবেশের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত আইনের সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু আইনগুলোর অধিকাংশই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। মাঝেমধ্যে কিছু অভিযান পরিচালিত হলেও তার ফল জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে সমর্থ নয়। দেশের প্রতিটি বিভাগে এক বা একাধিক পরিবেশ আদালত এবং সারা দেশের জন্য এক বা একাধিক পরিবেশ আপিল আদালত প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয় আইনে। পরিবর্তনের হাওয়ায় আগের আইনটি রহিত করে ২০১০ সালের পরিবেশ আদালত আইন নামে সম্পূর্ণ নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়। এছাড়া সবার সহযোগিতায় প্রণীত হয়েছে জাতীয় সংরক্ষণ কৌশল (ন্যাশনাল কনজারভেশন স্ট্র্যাটেজি) এবং বিশেষত জাতীয় পরিবেশ ব্যবস্থাপনা অ্যাকশন প্ল্যান। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে জানাতে হচ্ছে, পরিবেশ রক্ষায় তেমন সুফল মিলছে না। তাই পরিবেশ দূষণ রোধে জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি সরকারকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। দূষণ রোধে উন্নত দেশগুলো যেসব প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, আমাদের দেশেও অনুরূপ প্রয়োগ দরকার।

পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশনসহ অন্যরা মাঝেমধ্যেই অভিযান পরিচালনা করছে। কিন্তু এসবের ফল দৃশ্যমান হয়ে উঠছে না। কারণ এসব ব্যবস্থা খুবই সাময়িক। বছরব্যাপী বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অনুপস্থিতিতে ঢাকার বায়ুর মান উন্নত হচ্ছে না। বাতাস দূষণমুক্ত রেখে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য জরুরি নির্মাণাধীন নতুন ভবন রাস্তাঘাটের ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। শিল্প-কারখানা শহর থেকে দূরে স্থাপন, কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণসহ শিল্পবর্জ্যের নিরাপদ অপসারণ নিশ্চিত অত্যাবশ্যক। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ যানবাহনে সিসামুক্ত জ্বালানি ব্যবহার নিশ্চিত করা চাই। পানি শব্দদূষণ চাইলেই বন্ধ করা সম্ভব। শিল্প-কারখানা গৃহস্থালির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করার মাধ্যমে পানিদূষণ শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। শব্দদূষণ বন্ধে গাড়ির হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বন্ধ করা প্রয়োজন। জাপানে গাড়ির হর্ন ব্যবহারই বন্ধ করা হয়েছে। সর্বোপরি পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ বাস্তবায়ন সুনিশ্চিত করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। সংশ্লিষ্ট সব সরকারি বেসরকারি সংস্থা, প্রতিষ্ঠান বড় বড় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, অর্থাৎ এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে, মেট্রোরেলসহ অন্যান্য প্রকল্পে কার্যকর পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা প্রতিপালন, সঠিক ব্যবস্থাপনা অনুসরণপূর্বক মাটি, বালি অন্যান্য সামগ্রী পরিবহন সংরক্ষণ, কার্যকর কর্মপরিবেশ রক্ষা, সময়মতো রাস্তাঘাট সংস্কার মেরামত এবং বিভিন্ন প্রকল্পে নিয়মিত পানি ছিটানোসহ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। আমাদের সামনেই চীনের বেইজিং বায়ুদূষণ কমিয়ে এনেছে কলকারখানা স্থানান্তর আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে। শুধু পরিবেশ আইন দিয়ে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে এমনটা ভাবার কোনো যৌক্তিকতা নেই। কেননা পরিবেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনগুলোর কঠিন প্রয়োগ প্রয়োজন, যা কিনা অন্যান্য উন্নত রাষ্ট্র অনুসরণ করে। শিল্পাঞ্চল শহরগুলোয় পরিবেশ অধিদপ্তর দ্বারা চিহ্নিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোয় দূষণ নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন