শনিবার | আগস্ট ১৩, ২০২২ | ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯  

শেষ পাতা

সংবাদপত্র শিল্পের সমস্যা ও সংকট শীর্ষক গোলটেবিল

বাজেটে শুল্ক ও কর কমানোর দাবি সংবাদপত্র শিল্পোদ্যোক্তাদের

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে গতকাল আয়োজিত নোয়াবের গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকরা ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী

সংবাদপত্র শিল্পের মৌলিক কাঁচামাল নিউজপ্রিন্টের দাম গত দেড় বছরে দ্বিগুণ হয়েছে। কমছে পাঠক, প্রচার সংখ্যা বিজ্ঞাপন। কভিড-১৯ মহামারী, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। আর্থিক সংকটের পাশাপাশি সংবাদপত্র-সংশ্লিষ্ট নানা আইনের বেড়াজাল বাধাগ্রস্ত করছে বাংলাদেশের সংবাদপত্র শিল্পকে। তার ওপর যোগ হয়েছে নানাবিধ করের বোঝা। বিভিন্ন রকম সংকট মোকাবেলা করতে গিয়ে শিল্পটি এখন রুগ্ণ শিল্পে পরিণত হয়েছে। এর কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হলেও কোনো ধরনের সুবিধা পান না খাতের উদ্যোক্তারা। এসব সমস্যার সমাধানে আসন্ন বাজেটে সংবাদপত্রের ওপর বিভিন্ন ধরনের কর প্রত্যাহার বা কমানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।

গতকাল রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আসন্ন বাজেট এবং বাংলাদেশের সংবাদপত্র শিল্পের সমস্যা সংকট শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) আয়োজিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির সভাপতি কে আজাদ। বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় বৈঠকে সংবাদপত্রের মালিক প্রতিনিধি, সম্পাদক, ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক ট্রেড ইউনিয়নের নেতারা বক্তব্য রাখেন।

সভায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. নিজামুল হক নাসিম, সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, নোয়াবের কোষাধ্যক্ষ মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, ইত্তেফাক সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, সংবাদ সম্পাদক আলতামাস কবীর, অধ্যাপক আসিফ নজরুল, অর্থনীতিবিদ রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক . ইফতেখারুজ্জামান, বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ, এফবিসিসিআইয়ের সিনিয়র সহসভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুল, বিএফইউজের এক অংশের সভাপতি এম আবদুল্লাহ, আরেক অংশের সভাপতি ওমর ফারুক।

সূচনা বক্তব্য রাখেন নোয়াব সভাপতি কে আজাদ। তিনি বলেন, অন্যান্য শিল্পের চেয়ে সংবাদপত্র কিছুটা ব্যতিক্রম। শিল্পে ব্যবহূত মৌলিক কাঁচামালে শূন্য শুল্ক আরোপ করা হলে আমদানিনির্ভরশীলতা কমবে। বিষয়টি এনবিআরকে বোঝানো গেলেও পরে তা বাজেটে বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

তিনি বলেন, সংবাদপত্র শিল্পের মৌলিক কাঁচামাল কাগজ। আমরা আমদানি করি, তার ওপর শতাংশ ডিউটি দিই। তারপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট। আর এআইটি অন্যান্য চার্জসহ আমদানিতে প্রায় ২৭ শতাংশ দিতে হয় সরকারি কোষাগারে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কাগজের দাম এরই মধ্যে দ্বিগুণ হয়েছে। প্রতি টনের দাম পড়ছে হাজার ডলার। পাশাপাশি কাগজের সংকটও রয়েছে। আমরা রাশিয়া, কোরিয়া মালয়েশিয়ার কাগজ ব্যবহার করি। অনেক জায়গায় এলসি করেও কাগজ পাওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয় শিল্পের কাগজ ব্যবহারের চেষ্টা আমরা করছি, কিন্তু মানসম্পন্ন না হওয়ায় তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে আমরা উভয়সংকটে রয়েছি। সরকারের সঙ্গে বিষয়ে আমরা যখন আলোচনা করি তারা অনুধাবন করেন, কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না। একটা কাগজ তৈরিতে খরচ হয় ২৩ টাকা, আমরা ১০ টাকা মূল্য নির্ধারণ করি, বিশেষ করে বড় পত্রিকাগুলো। টাকা আমরা রেখে টাকা হকারকে ছেড়ে দিই। বিজ্ঞাপন হলো সংবাদপত্রের মূল আয়। কিন্তু কভিডের পর তাও কমে গিয়েছে। এমনিতেই বিজ্ঞাপন কমে গিয়েছে, এরপর বিজ্ঞাপনের ওপরও শতাংশ ট্যাক্স দিতে হয়। এমনিতেই এটি রুগ্ণ শিল্প, তার ওপর এসব নানা বাধায় আমাদের এগিয়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে। আবার সরকারের কাছে ১০০ কোটি টাকার মতো বিজ্ঞাপন বিল বকেয়া আছে।

প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, বাংলাদেশে সংবাদপত্র সজীব সক্রিয়। দেশের যা কিছু ভালো, সফলতা সবই তুলে ধরছে সংবাদপত্র। সমস্যা থাকলে সে বিষয়ে সচেতন করা, সমালোচনা করে আসছে তারা। কিন্তু খাতটি সরকারের সুদৃষ্টি পায়নি। নিউজপ্রিন্টের দাম বেড়েছে। দেড় বছর আগে প্রতি টন নিউজপ্রিন্ট ৫৭০ ডলারে পাওয়া যেত। বর্তমানে কিনতে হচ্ছে হাজার ৫০ ডলারে। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচ আরো বেড়েছে। অনলাইনে পাঠক বেড়েছে। সেজন্য বাড়তি বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। করোনার সময় অন্যান্য খাতের মতো সংবাদপত্র শিল্পও সংকটে পড়ে। বিভিন্ন খাতে সরকার প্রণোদনা দিলেও খাত কোনো প্রণোদনা পায়নি। সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে সংবাদপত্রের সংকট দাবির বিষয়ে একমত হলেও কোনো সমাধান হয় না।

মতিউর রহমান জানান, সংবাদপত্রে ৩০ শতাংশ করপোরেট কর রয়েছে।  করহার কমিয়ে ১০ শতাংশ করা উচিত। এছাড়া নিউজপ্রিন্ট আমদানি পর্যায়ে শুল্ক শূন্য করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভ্যাট অব্যাহতি অথবা সর্বোচ্চ শতাংশ ভ্যাট নির্ধারণ, আমদানি শুল্ক শূন্য শতাংশ, বিজ্ঞাপন আয়ে উৎসে কর থেকে কমিয়ে শতাংশ এবং আগাম আয়কর প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি।

প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. নিজামুল হক নাসিম বলেন, আমরা দেখি প্রতি বছর বাজেট এলে পত্রপত্রিকায় আলোচনা শুরু হয়, বাজেটের পরও আলোচনা চলে, কিন্তু ফলাফল দেখা যায় না। তবু আমি বলব, ধরনের আলোচনা আমাদের জন্য উপকারই হবে। এসব আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা উঠে আসে। শুধু সংবাদপত্র শিল্পই নয়, সব শিল্পেরই বাজেটে কিছু অসুবিধা থাকে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হলে সংবাদপত্র শিল্পের সমস্যারও সমাধান হবে।

মাহফুজ আনাম বলেন, সংবাদপত্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মত প্রকাশের স্বাধীনতা। এটা না থাকলে সেটাকে সংবাদপত্র নয়, পিআর জার্নাল বলতে হবে।

সাংবাদিকতা গণমাধ্যমের ওপর এত আইন কেন? এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, এত বেশি আইন আর কোনো পেশার বিরুদ্ধে নেই, যেটা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আছে। প্রত্যেকটা আইন আমাদের ক্ষমতাকে সীমিত করে। সাংবাদিকতা-গণমাধ্যমকে সীমিত করার আইন আছে; আমাদের সাহায্য করার কোনো আইন নেই। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন যতদিন আছে, ততদিন সুষ্ঠু সাংবাদিকতা সম্ভব হবে না। গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে সরকার ভীষণভাবে আমলাদের দ্বারা প্রভাবিত। আমলারা যা বলে দেন, সরকার ওই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে। আমলারা কোনোদিন চাইবেন না স্বাধীন গণমাধ্যমের বিকাশ।

মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, সংবাদপত্রে যেভাবে ব্যয় বেড়েছে, তাতে সরকারি সহায়তা ছাড়া শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব না। ২৬টি আইন রয়েছে, যেখানে সংবাদপত্রের সংশ্লিষ্টরা রয়েছেন। একমাত্র তথ্য অধিকার আইন ছাড়া অন্য সব আইনে সংবাদপত্রকে আটকে রাখার চেষ্টা আছে। আর যেসব আইন প্রস্তাব করা হয়েছে সেখানে আরো বেশি করে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে খর্ব করার আশঙ্কা আছে।

ইত্তেফাক সম্পাদক তাসমিমা হোসেন বলেন, সংবাদপত্রের দায়বদ্ধতা অনেক বেশি। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে সংবাদপত্র বিরোধী দলের কাজ করে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যেসব মানবিক দায়িত্ব প্রয়োজনগুলোকে অবহেলা করা হয়, সংবাদপত্র সেগুলোয় গুরুত্ব দেয়ার চেষ্টা করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সংবাদপত্র অবশ্যই রাষ্ট্রীয় সহায়তা পেতে পারে। কারণ কোনো কাজে তৃতীয় পক্ষ লাভবান হলে বা কোনো দ্রব্য গণদ্রব্য হিসেবে বিবেচিত হলে কিংবা -অর্থনৈতিক বিষয়ে অর্থনৈতিক ভূমিকা থাকলে সেখানে জন-অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগ আছে। এর প্রত্যেকটি বিচারে সংবাদপত্র রাষ্ট্রীয় সহায়তা পায়। তবে দেখতে হবে যার সহায়তা পাওয়ার উপযুক্ততা নেই, সে যেন না পায়। সেজন্য নীতিমালা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের ব্যালান্সশিট অনুযায়ী সুবিধা দেয়ার কথা ভাবতে পারে সরকার। সরকার যে সর্বজনীন পেনশন চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সেটি সাংবাদিকদের মাধ্যমে শুরু করতে পারে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ২০১৬ সাল থেকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃত সংবাদপত্র শিল্পের পণ্য হলো তথ্য মতামত। এর পাবলিক ভ্যালু আছে। একমাত্র জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলে সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন নীতিমালা ঢেলে সাজানো, সংবাদকর্মীদের সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া সরকারি অন্য কোনো নথিতে সংবাদপত্রের স্বীকৃতির প্রতিফলন দেখা যায় না। অন্যান্য শিল্পের মতো সুবিধা সংবাদপত্র শিল্পও পেতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক . আসিফ নজরুল বলেন, সুষ্ঠু সাংবাদিকতার স্বার্থে সরকারের কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। সংবাদপত্র শিল্পকে রুগ্ণ করে রাখা সরকারের কৌশল। সরকার চায় লুটেরারা ছাড়া অন্য কেউ যাতে ব্যবসায় টিকতে না পারে। সেজন্য রাষ্ট্রীয় সুবিধা দেয়া হয় না। সংবাদপত্র শিল্পের সংকট মোকাবেলায় শুল্ক-করে ছাড় দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, সমাজ গড়ায় সংবাদপত্রের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি হচ্ছে। বেকারত্ব, মুদ্রার বিনিময় হার বাড়ছে। সময় অভ্যন্তরীণ শিল্প টিকিয়ে রাখা জরুরি। সংবাদপত্র শিল্পকে আরো শক্তিশালী করতে কর সুবিধা দিতে হবে।

এফবিসিসিআইয়ের সিনিয়র সহসভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, প্রণোদনা পাওয়া সংবাদপত্রের অধিকার। তিনি শিল্পের করের বোঝা কমানোর সুপারিশ করে বলেন, রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে এনবিআরকে কার্যক্রম আরো বিস্তৃত করতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে যেতে হবে।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের এক অংশের সভাপতি ওমর ফারুক সংবাদপত্রের প্রচার সংখ্যা নিয়ে চলচ্চিত্র প্রকাশনা অধিদপ্তরের (ডিএফপি) কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বলেন, ডিএফপি মিথ্যা তথ্য দিয়ে কাজ করে। যার ২০০ সার্কুলেশন নেই, তার দুই লাখ সার্কুলেশন করে দিয়েছে। এত মিথ্যা প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে, এটি কল্পনার বাইরে।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের আরেক অংশের সভাপতি এম আবদুল্লাহ বলেন, সংবাদপত্র শিল্পের বিষয়ে দাবি উত্থাপিত হলেও তা পূরণ হচ্ছে না। যেন অরণ্যে রোদনের মতো। সাংবাদিক, মালিক সম্পাদকেরা বললেও এটি যেন কারো কাছে গুরুত্ব বহন করে না। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের কাছে বিজ্ঞাপন বাবদ ১০০ কোটি টাকা বকেয়া বিল থাকলেও মনে হয় এটি ইচ্ছে করে দেয়া হয় না, যাতে সংবাদপত্রগুলো চাপে থাকে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন