শনিবার | আগস্ট ১৩, ২০২২ | ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯  

সম্পাদকীয়

১৩ বছর ধরে চলছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, আরো দেরির শঙ্কা

বড় বড় প্রকল্পে নকশা জটিলতা কাম্য নয়

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত নির্মাণ করা হচ্ছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। চলতি বছরের ডিসেম্বরে কিছু অংশ চালুর পরিকল্পনাও করছে সরকার। কিন্তু নকশাজনিত জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে এক্সপ্রেসওয়ের কাজ শেষ করা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। প্রকল্পটি বিলম্বিত হওয়ায় ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি নানা সমস্যাও তৈরি হচ্ছে। দুঃখজনক বিষয় হলেও সত্য, বড় বড় প্রকল্পে নকশা জটিলতা বাংলাদেশের নিত্য সমস্যায় রূপ নিয়েছে। এটি প্রাক-প্রকল্প গবেষণা পরিকল্পনার দুর্বলতার প্রতিফলন। কাজের মাঝপথে নকশা সংশোধন করায় ব্যয় সময় লাগছে বেশি। এতে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফলও মিলছে না। বিপুল ব্যয়ে নির্মিতব্য বড় বড় প্রকল্পে নকশা জটিলতায় বাস্তবায়ন ব্যাহত হওয়া ব্যয় বৃদ্ধি কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে প্রকল্প গ্রহণের আগেই এর যাবতীয় বিষয় নিষ্পত্তি করবে বলে প্রত্যাশা।

গত দশকের প্রথম দিকে রাজধানীর যানজট কমাতে দুটি বড় উদ্যোগ নেয়া হয়। তার মধ্যে এক্সপ্রেসওয়ে একটি। প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল সাড়ে তিন বছরে। লক্ষ্য ছিল ২০১৩ সালে চালু হবে। কিন্তু ১৩ বছরেও শেষ হয়নি এক্সপ্রেসওয়েটির বাস্তবায়ন। এর মধ্যে কয়েক দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। প্রথমে অর্থায়ন নিয়ে সমস্যা ছিল। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) নেয়া প্রকল্পটির নির্মাণকাজ দেয়া হয় থাইল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইতালিয়ান-থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানিকে, যা ইতাল-থাই নামে পরিচিত। মূলত নিজের টাকা বিনিয়োগের শর্তেই কাজ দেয়া হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটিকে। অথচ নির্মাণকাজের টাকা জোগাড় করতেই কোম্পানিটি লাগিয়ে দেয় নয় বছর। ফলে দেরি হয় বাস্তবায়ন কাজ। এখন অর্থায়ন সমস্যা নেই। নির্মাণকাজও গতি পেয়েছে। তবে নতুন প্রতিবন্ধকতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে নকশা জটিলতা। একাধিক জায়গায় নকশা নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার খবর মিলছে। এসব জটিলতায় এখন নির্ধারিত সময়ে উড়াল সড়কটি বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ, যা দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে ভুল বা ত্রুটির পেছনে দুই ধরনের কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো দক্ষতা বা পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নকশা বা সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন ঠিকমতো যাচাই-বাছাই করতে পারে না। আবার অনেক সময় সম্ভাব্যতা যাচাই কাজে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোও ফাঁকি দেয়। তারা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে মাঠপর্যায়ে নিজে না গিয়ে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে করে থাকে। এতেও প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ত্রুটি ধরা পড়ে। আমরা চাইব, কর্তৃপক্ষ বিষয়ে আরো সতর্ক হবে। পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রকল্প যাচাই-বাছাইয়ের সময়ই এসব ত্রুটি শনাক্তে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে পরিকল্পনাধীন একটি পাতাল মেট্রোরেলের গতিপথ নিয়ে। পাতাল রেল কারওয়ান বাজারের এফডিসি রেলগেট এলাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচ দিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। মাটির নিচে বড় জায়গাজুড়ে থাকবে পাতাল রেলের টিউব। এজন্য ওই এলাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পিলারের জন্য নতুন করে নকশা করতে হবে। নকশা নিয়ে জটিলতা রয়েছে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন এলাকায়ও। নকশা অনুযায়ী, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একটি টোল প্লাজা তৈরি করা হবে। টোল প্লাজার নকশা সংশোধনের অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। কিন্তু বিদ্যমান নকশা অনুযায়ীই কমলাপুর এলাকায় কাজ করতে চান প্রকল্পের কর্মকর্তারা। আরো কিছু জায়গায় ধরনের সমস্যা আছে। আলোচনার মাধ্যমে বিষয়গুলো দ্রুত নিরসন করা প্রয়োজন।

রাজধানীর যানজট নিরসনের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ফ্লাইওভার হিসেবে মৌচাক-মগবাজার ফ্লাইওভার নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল প্রায় দুই দশক আগে। শহরের প্রধান ব্যস্ততম সড়ক হওয়ায় এর নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার তাগিদ থাকলেও ফ্লাইওভার নির্মাণের শেষ পর্যায়ে এসে এর নকশায় বড় ধরনের ত্রুটি ধরা পড়ে। অবশেষে নকশা সংশোধন করে নির্মিত ফ্লাইওভারটি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। একইভাবে মহাখালী ফ্লাইওভারেও নকশাগত ত্রুটির কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। খিলগাঁও ফ্লাইওভার চালুর কয়েক বছরের মাথায় বড় ধরনের ফাটল দেখা গিয়েছিল। যমুনা সেতুতেও বড় ফাটল দেখা দেয়ার পর কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে তা মেরামত করা হয়েছিল। এমনকি দেশের বৃহত্তম সেতু প্রকল্প পদ্মা সেতুর তলদেশের মাটি পরীক্ষা, পাইলিং পিলারের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ত্রুটি ধরা পড়ায় নির্মাণের শুরুতেই বড় জটিলতা দেখা গিয়েছিল। ঢাকা চট্টগ্রামের ফ্লাইওভারগুলোর নির্মাণ পরিকল্পনা নকশায় ত্রুটির কারণে অদূর ভবিষ্যতে এসব স্থাপনাও ভেঙে ফেলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে বলে নগরবিদদের কেউ কেউ মনে করেন। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একেকটি স্বপ্নের স্থাপনা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের খামখেয়ালিপনা, অদক্ষতা, অস্বচ্ছতা দুর্নীতির চিত্র অনেকটাই স্পষ্ট। ত্রুটি ধরা পড়ার পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার সম্মুখীন করার কোনো দৃষ্টান্ত দেখা যায়নি। ধরনের ভুল নকশায় প্রকল্প বাস্তবায়নের উদাহরণ অনেক রয়েছে। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্প, রূপসা রেলসেতু প্রকল্প, খুলনা-মোংলা বন্দর রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প, আখাউড়া- লাকসাম রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথ উন্নয়ন প্রকল্পসহ বেশকিছু প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশা প্রণয়ন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মারাত্মক সব ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা যাচ্ছে। এসব ভুলের কারণে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য অর্জন যেমন ব্যাহত হয়, বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং পরিবেশগত ঝুঁকি স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেয়। শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর কোটি কোটি টাকা খরচ করে তা ভেঙে ফেলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এভাবে জনগণের টাকার অপচয় রোধ করা না গেলে উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন কখনই সম্ভব হবে না। এটি হঠাৎ করেই শুরু হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব অনিয়ম-অস্বচ্ছতার কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় শত শত স্থাপনা ভুল পরিকল্পনা ভুল নকশায় নির্মাণের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এসব স্থাপনা নির্মাণের সঙ্গে জড়িতরা দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার অপচয় দায়িত্বহীনতার দায় এড়াতে পারেন না। তাদের অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। ব্রিজ সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার প্রতি অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে। প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা যাচাই, ভুল নকশা এবং নির্মাণের ক্ষেত্রে মান বজায় রাখতে ব্যর্থতার কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত সাপেক্ষে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

অনেক সময় গড়িয়েছে। তথ্য বলছে এখন পর্যন্ত উড়াল সড়কটির বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৫০ শতাংশেরও নিচে। চলতি বছরের ডিসেম্বরে চালু করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক রাখতে হলে নির্মাণকাজের গতি আরো উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বাড়াতে হবে। এজন্য বিদম্যান নকশা জটিলতা দ্রুত সমাধান করতে হবে। অন্য বাধাগুলো চিহ্নিত করে কাজে গতি আনতে হবে। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পাশাপাশি দেশে আরো কয়েকটি উড়াল সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। সেগুলোও নির্ধারিত মেয়াদে শেষ করতে হবে। নইলে মিলবে না কাঙ্ক্ষিত সুফল। সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীলতা আন্তরিকতায় গৃহীত উড়াল সড়কগুলোর কাজ বেগবান হবে বলে প্রত্যাশা।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন