বুধবার | জুন ২৯, ২০২২ | ১৫ আষাঢ় ১৪২৯  

প্রথম পাতা

বন্যা পরিস্থিতি

সিলেট-সুনামগঞ্জে উন্নতি হলেও দুর্ভোগ বাড়ছে

বণিক বার্তা ডেস্ক

এখনো জলাবদ্ধ হাওর অধ্যুষিত জেলাগুলোর বিস্তীর্ণ এলাকা। সিলেট ও সুনামগঞ্জ থেকে তোলা ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী

সিলেট নগরীসহ সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোতে বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। তবে এখনো ঘরবাড়ি থেকে পানি নামেনি। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, পানি কমা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরো অন্তত পাঁচদিন লাগতে পারে। তবে পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে দুর্ভোগ বাড়ছে বানভাসিদের। নানা রোগ-বালাই দেখা দিচ্ছে। গ্রামীণ এলাকাগুলোতে পানিবন্দি মানুষের মধ্যে ত্রাণের জন্য চলছে হাহাকার। এছাড়া সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:

সিলেট: বিভিন্ন উপজেলায় ভয়াবহ বন্যার পর পানি নামতে শুরু করেছে। তবে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে বানভাসিরা। খাদ্যাভাবের পাশাপাশি বন্যাদুর্গতদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা ধরনের রোগ-বালাই। বিভিন্ন উপজেলার সঙ্গে জেলা সদরের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় চিকিৎসাসেবা নিতে পারছেন না অনেকে। বাড়িঘর প্লাবিত হওয়ায় গো-খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

সরকারি হিসাবে সিলেটে ২০ লাখ মানুষ বন্যা আক্রান্ত হয়েছে। সিলেট জেলা প্রশাসন থেকে পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, জেলার ১৩ উপজেলার মধ্যে ১১টি উপজেলার ৯০টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়েছে ২০ লাখ মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাজার ৪২১ হেক্টর আউশ ধানের বীজতলা। বন্যার পানিতে হাজার ৭০৪ হেক্টর বোরো ধান এবং হাজার ৩৩৪ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন সবজি তলিয়ে গেছে। এছাড়া ৬৪০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। ফলে জেলার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

চলতি মাসের ১১ তারিখ থেকে সিলেটের বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল পাহাড়ি ঢল অতিবৃষ্টির কারণে প্লাবিত হয়। ধীরে ধীরে বন্যা বিস্তৃত হয়ে সিলেট মহানগরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। এক এক করে মহানগরীর প্রায় ২০টি ওয়ার্ড বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সিলেট নগরীর সুরমা তীরবর্তী নিচু এলাকা ডুবে যায় বন্যার পানিতে। শাহজালাল উপশহর, ঘাসিটুলা, মাছিমপুর, ছড়ারপার, তালতলা, কুয়ারপার, মেন্দিবাগ, কামালগড়, চালিবন্দর, যতরপুর, সোবহানিঘাট, কালীঘাট, শেখঘাট, তালতলা, জামতলা, মাছুদিঘীরপার, রামের দিঘীরপার, মোগলটুলা, খুলিয়াটুলা, দক্ষিণ সুরমার বঙ্গবীর রোড, ভার্থখলা, মোমিনখলা, পিরোজপুর, আলমপুর, ঝালোপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে পানি ওঠে। তবে এরই মধ্যে পানি কমা শুরু করেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, গতকাল বিকাল পর্যন্ত পানি কমা অব্যাহত আছে। তবে এখনো বাসাবাড়ি থেকে পানি সম্পূর্ণ নেমে যায়নি।

অন্যদিকে সিলেট সদর উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। হাটখোলা জালালাবাদ ইউনিয়নে পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে ৯০ শতাংশ মানুষ। সীমান্তবর্তী উপজেলা কানাইঘাট, জকিগঞ্জকোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাটসহ অনেক এলাকার প্রত্যন্ত গ্রামে এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছেনি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

সিলেট জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলাম জানান, সরকার থেকে তারা যা পাচ্ছেন সবই বিতরণ করছেন। এরই মধ্যে ৩০৫ টন চাল, নগদ ১৫ লাখ টাকা প্রায় সাড়ে হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার দেয়া হয়েছে। আরো ত্রাণের চাহিদা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. এসএম শাহরিয়ার জানান, বন্যাপ্লাবিত এলাকায় পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে সব ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে দুর্গত এলাকায় ওষুধ, খাবার স্যালাইন পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পুর) এসএম শহিদুল ইসলাম বলেন, প্রধান নদ-নদীর পানি এখনো বিপত্সীমার ওপরে রয়েছে। তবে বর্তমানে বন্যার পানি কমছে। ফলে সিলেটে বন্যা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা নেই। অবস্থায় আরো পাঁচদিন পানিবন্দি থাকতে হবে সিলেটবাসীকে। বন্যায় যেখানে যেখানে বাঁধ ভেঙেছে সেখানে আমাদের পক্ষ থেকে আবার নতুন করে বাঁধ দেয়া হচ্ছে।

সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার . মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, আমরা বন্যাদুর্গতদের সঙ্গে কথা বলেছি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে আরো বেশি করে যাতে সহায়তা করা যায়, সে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এছাড়া ত্রিমোহনার বাঁধের স্থায়ী সমাধান করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ আলোচনা সাপেক্ষে নেয়া হবে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী শুক্রবার শনিবার দিনভর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন এবং বন্যার্তদের তালিকা করেন। তালিকা অনুযায়ী দ্রুত খাদ্যসহায়তা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে তিনি কাজ করছেন বলে জানান।

সুনামগঞ্জ: গত ২৪ ঘণ্টায় ভারতের আসাম, মেঘালয় হিমালয়ে ভারি বৃষ্টিপাত না হওয়ায় কমতে শুরু করেছে নদ-নদী হাওরের পানি। গতকাল দুপুর নাগাদ সুরমা নদীর পানি বিপত্সীমার সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে গত ৪৮ ঘণ্টায় সুরমা নদীর পানি প্রায় ২০ সেন্টিমিটার কমেছে। তবে নদীর পানি কমলেও হাওর এলাকার বন্যাকবলিত মানুষের ভোগান্তি দুর্ভোগ কমেনি। ঘরবন্দি মানুষেরা খাবার সংকটে ভুগছে। তারা জানায়, সুনামগঞ্জে যে হারে ত্রাণসামগ্রী দেয়া হচ্ছে এগুলো বন্যাকবলিত গ্রাম-গঞ্জের মানুষরা পাচ্ছে না। শহরের আশপাশের লোকজন পাচ্ছে। তবে জেলা প্রশাসনের দাবি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সব উপজেলায় ত্রাণ দেয়া হচ্ছে।

সরজমিনে জেলার অন্যতম খরচার হাওরপারের রসুলপুর, ইনাতনগর, গৌরারং, শহরতলি আফতাবনগরসহ বিভিন্ন এলাকার বাড়িঘর পাহাড়ি ঢল বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে থাকতে দেখা যায়। সময় খরচার হাওরপারের রসুলপুর গ্রামের মমতা বেগম বলেন, বন্যা আসার পর থেকে খুব কষ্টে আছি। ঘরে, বাইরে এমনকি রান্নার চুলায়ও পানি উঠেছে। তিনদিন ধরে রান্না হয় না। দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে তিনদিন ধরে না খেয়ে আছি। কিন্তু কেউ খবর নেয় না।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সামসুদ্দোহা বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ভারত সুনামগঞ্জে বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। এতে নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। ভারতের মেঘালয়ে বৃষ্টি না হলে হাওরের পানিও কমতে শুরু করবে। আমরা আশা করছি রোববারের মধ্যে নদ-নদীর পানি বিপত্সীমার নিচে নেমে আসবে।

জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, জেলার বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হচ্ছে। ছাতক দোয়ারাবাজার উপজেলার পানি নামতে শুরু করেছে। তবে সদর উপজেলার হাওরগুলোতে পানি বাড়ছে। আমরা বন্যায় কবলিত মানুষদের সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছি। যেসব উপজেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বেশি হয়েছে, সেসব এলাকায় ত্রাণ দেয়া হচ্ছে। ঘরবন্দি পরিবারগুলোকে শুকনো খাবার, নগদ টাকা, জিআর চাল বিতরণ করছি।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন


×