শনিবার | জুলাই ০২, ২০২২ | ১৮ আষাঢ় ১৪২৯  

সম্পাদকীয়

সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮ মাসে ১ হাজার ৬৭৪ শিশুর মৃত্যু

আইনের কঠোর প্রয়োগ ও সড়ক ব্যবস্থাপনা উন্নত হোক

সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুমৃত্যু কোনোভাবেই রোধ করা যাচ্ছে না। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে ২৮ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় হাজার ৬৭৪ জন শিশু মারা গেছে। বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী হিসেবে নিহত হয়েছে ৩৩১ শিশু, রাস্তা পারাপার রাস্তা ধরে হাঁটার সময় যানবাহনের চাপায় বা ধাক্কায় নিহত হয়েছে হাজার ২৭ শিশু আর ট্রাক, পিকআপ, ট্রাক্টর, ড্রাম ট্রাক ইত্যাদি পণ্যবাহী যানবাহনের চালক সহকারী হিসেবে নিহত হয়েছে ৪৮ শিশু এবং মোটরসাইকেল চালক আরোহী হিসেবে নিহত হয়েছে ২৬৮ শিশু, অর্থাৎ ১৬ শতাংশ। উল্লিখিত পরিসংখ্যানে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহ তথ্য ফুটে উঠেছে। দেশের আইনে শিশুদের পরিবহন পরিচালনা বা সেবা প্রদানের কাজে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তার পরও প্রশাসনের সামনেই দিনের পর দিন এমন কার্যক্রম চলছে, যা বন্ধ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ সড়ক ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে।

দেশে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ ওভারটেকিং প্রবণতা। সাধারণত রাস্তায় ধীরগতির গাড়িগুলোকে ওভারটেকিংয়ের প্রয়োজন পড়ে। সময় হর্ন বাজিয়ে সামনের গাড়িকে সংকেত দিতে হয়। কিন্তু অনেক সময় সংকেত না দিয়ে একজন আরেকজনকে ওভারটেকের চেষ্টা করে, ফলে সামনের দিক থেকে আসা গাড়ি বের হতে না পেরে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। তাই সঠিক নিয়ম মেনে সতর্কতার সঙ্গে ওভারটেক করা উচিত। সড়ক দুর্ঘটনার আরেকটি কারণ হলো ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ব্যবস্থা। মহাসড়কগুলোয় বাঁক থাকার কারণে সামনের দিক থেকে আসা গাড়ি দেখতে না পেয়ে অনেক চালক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে থাকে। রাস্তার পাশে হাটবাজার স্থাপন এবং ওভারব্রিজ না থাকাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। সড়ক দুর্ঘটনার আরেকটি বড় কারণ হলো মহাসড়কগুলোয় দ্রুতগতির যানবাহনের পাশাপাশি ধীরগতির যানবাহন চলাচল। গতির তারতম্য থাকায় দ্রুতগতির গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লেগে ধীরগতির বাহন রাস্তা থেকে ছিটকে পড়ে। তাই মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহন চলাচল বন্ধ করা জরুরি। ট্রাফিক আইন অমান্য করার কারণেও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। তাই আমাদের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরো উন্নত করতে হবে। সড়ক-মহাসড়কগুলোকে ডিজিটাল নজরদারির আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

গবেষণা বলছে, চালকের অদক্ষতা বেপরোয়া যানবাহন চালানোর পাশাপাশি ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, সড়ক সেতুর নাজুক অবস্থাও সড়ক দুর্ঘটনার জন্য বহুলাংশে দায়ী। গণপরিবহনে বাড়তি যাত্রী সামাল দিতে গতিসীমার বাইরে দ্রুত গাড়ি চালিয়ে বেশি ট্রিপ দেয়ার অশুভ প্রতিযোগিতা আর বাড়তি মুনাফার লোভে পরিবহন সংস্থাগুলো চালকদের অনেক বেশি সময় কাজ করতে বাধ্য করে। ফলে চালকের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ পড়ে, তাকে বেসামাল হয়ে গাড়ি চালাতে হয়; যা প্রকারান্তরে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। লক্কড়-ঝক্কড়, অচল যানবাহনে রঙ লাগিয়ে যেনতেন মেরামত করে রাস্তায় চলাচল করে বিভিন্ন উৎসব-পার্বণের সময়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী দূরদূরান্তে গমনাগমন করে। সড়ক-মহাসড়কে চলে বাস-ট্রাকের মাদকাসক্ত চালকের অমনোযোগী লড়াই। অতি আনন্দে গাড়ি চালানোর সময় তারা ব্যবহার করেন সেলফোন, যা সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত। পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী বহন, অদক্ষ চালক হেলপার দিয়ে যানবাহন চালানো, বিরামহীন যানবাহন চালানো, মহাসড়কে অটোরিকশা, নসিমন-করিমন মোটরসাইকেলের অবাধ চলাচল এবং ব্যস্ত সড়কে ওভারটেকিং, ওভারলোডিং তদারক না করা সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। ত্রুটিপূর্ণ মহাসড়কের কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়ক দুর্ঘটনায় বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর কারণে প্রধানমন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পাঁচ দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেগুলো ছিল চালক সহকারীদের প্রশিক্ষণ প্রদান, দূরপাল্লার বাসযাত্রায় বিকল্প চালক রাখা ঘণ্টা পরপর চালক পরিবর্তন করা, চালক যাত্রীদের সিটবেল্ট বাঁধা বাধ্যতামূলক করা, চালকদের জন্য মহাসড়কে বিশ্রামাগার নির্মাণ এবং সিগন্যাল মেনে যানবাহন চালানোর ওপর কড়াকড়ি আরোপ; যা তেমন বাস্তবায়ন হতে দেখা যায়নি। দ্রুতই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

বিশ্বের প্রথম সারির উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার কথা বলতে গেলে সিঙ্গাপুরের নামটি সামনে চলে আসে। সিঙ্গাপুরে পরিবহন ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে ল্যান্ড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি গঠিত হয় ১৯৯৫ সালে। এক দশকের ব্যবধানে সংস্থাটি দেশটির পরিবহন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনে। গ্রাহক সন্তুষ্টির দিক থেকে সিঙ্গাপুরের পরিবহন ব্যবস্থা বিশ্বে প্রথম সারিতে। এশিয়ার মধ্যে চীন, জাপান, দুবাই, ইউরোপের সুইডেন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি প্রভৃতি দেশের পরিবহন ব্যবস্থা বিশ্বে আদর্শ। প্রতিটি দেশই নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। দেশগুলোয় সংশ্লিষ্ট আইনটি অত্যন্ত শক্তিশালী। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আইন বাস্তবায়নে তাদের প্রশাসন খুবই কঠোর, কোনো ছাড় দেয়া হয় না।

উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি নির্দেশকও বটে। বাংলাদেশ দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে, আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর দৃষ্টিতে সম্ভাবনাময় অর্থনীতির দেশ। সরকারের লক্ষ্য ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হওয়ার। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, উন্নয়নশীল বা মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে শামিল হওয়া বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থা এখনো বিশৃঙ্খলই রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছে আইনটির বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে দ্রুত। সাজা জরিমানার পরিমাণ যা- নির্ধারণ হোক না কেন, তা বাধাহীনভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ বাস্তবায়ন না হলে আইনে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে কোনো লাভ হবে না। পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা এলে এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা গেলে দুর্ঘটনার পরিমাণ এমনিতেই কমে আসবে, যেমন কমে এসেছে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ায়।

সরকারি-বেসরকারি নিজস্ব সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রণীত রিপোর্টে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দিক থেকে ভারত পাকিস্তানের পর বাংলাদেশ রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে। পরিসংখ্যানে জানা যায়, বাংলাদেশে বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে চার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। আধুনিক, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশ অনুসমর্থনকারী হিসেবে ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আহত মানুষের সংখ্যা বর্তমানের চেয়ে অর্ধেকে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত সুপারিশের বেশির ভাগই বাস্তবায়ন হয়নি। দেখা গেছে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা হলে, বিশেষ কোনো ব্যক্তি দুর্ঘটনায় নিহত হলে বা সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে সড়কে আন্দোলন দেখা দিলে কিছুদিন প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। কিছু আলোচনা, কিছু সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা রোধে তা তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখে না।

বাংলাদেশ এরই মধ্যে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তীর্ণ হয়েছে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থার দিকে নজর দিলে মনে হয় এখনো সেই আদিম অবস্থায় রয়ে গেছে। নির্ধারিত সময়ে উন্নত দেশের মতো গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা কষ্টসাধ্য বলেই মনে হয়। কারণ হাতে সময় আছে আর মাত্র ২০ বছর। ২০ বছরে সবার জন্য উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে সব উন্নয়নই ম্লান হয়ে যাবে। বলা হয়, কোনো দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য উন্নত পরিবহন যোগাযোগ ব্যবস্থা অপরিহার্য। আর্থসামাজিক অগ্রগতির পূর্বশর্ত উন্নত পরিবহন যোগাযোগ ব্যবস্থা। অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং উন্নত পরিবহন যোগাযোগ ব্যবস্থা দুটি বিষয় অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এছাড়া উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা সভ্যতার পরিচয় বহন করে। সুতরাং উন্নত দেশের উপযোগী পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে পরিকল্পনা কাজ এখনই শুরু করতে হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন