রবিবার | জুলাই ০৩, ২০২২ | ১৮ আষাঢ় ১৪২৯  

প্রথম পাতা

বাংলাদেশ-পাকিস্তান

সম্পর্ক জোরদারে মার্কিন সফটপাওয়ার টিকা

বদরুল আলম

একদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ, অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ পোশাক পণ্য আমদানি। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সাম্প্রতিক চিত্র এমনই। যদিও কভিড-১৯ প্রতিরোধে যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া টিকার সবচেয়ে বড় গ্রহীতা বাংলাদেশ। এদিকে সম্পর্ক সুখকর না হলেও বিপুল পরিমাণ টিকা পেয়েছে পাকিস্তানও।

সম্পর্ক জোরদারের উদ্দেশ্যেই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ পাকিস্তানকে বিপুলসংখ্যক টিকা দান করেছে কিনাএমন প্রশ্ন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের। তারা বলছেন, এক্ষেত্রে টিকা প্রদানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এজন্য বাংলাদেশ পাকিস্তানে মার্কিন সফটপাওয়ারের (সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক বাণিজ্যিকভাবে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা) নতুন অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে টিকা।

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের দান করা কভিড-১৯ টিকাগ্রহীতাদের তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে শীর্ষে। পর্যন্ত বাংলাদেশকে কোটি ৪২ লাখ ডোজ টিকা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তানকে দেয়া হয়েছে কোটি ১৫ লাখ ডোজ টিকা। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোটি ৯৭ লাখ ডোজ টিকা পেয়েছে ভিয়েতনাম। ইন্দোনেশিয়া ফিলিপাইন দেশটির কাছ থেকে দান হিসেবে টিকা পেয়েছে যথাক্রমে কোটি ৫৮ লাখ কোটি ৩৩ লাখ ডোজ। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আড়াই কোটি ডোজের বেশি টিকা পেয়েছে নাইজেরিয়া মিসর।

পর্যবেক্ষকদের দাবি, নিষেধাজ্ঞার কারণে বাংলাদেশের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক খুব ভালো অবস্থায় নেই। যদিও দেশটি সবচেয়ে বেশি টিকা দান করেছে বাংলাদেশকে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্য বিশেষ করে পোশাকের রফতানি হু হু করে বাড়ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, কম-বেশি অনেক দেশকেই টিকা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি টিকা দেয়ার কারণ শুধুই মানবাধিকার স্বাস্থ্যের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে নয়। বরং সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে পারস্পরিক আস্থার ক্ষেত্রটিকে নবায়নে টিকা কূটনীতি গুরুত্ব পাচ্ছে। আর রাজনৈতিক অর্থনীতির স্বার্থ রক্ষার দীর্ঘমেয়াদি ভাবনা থেকেই টিকা প্রদানের মতো দাতব্য কার্যক্রমকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ব্যবহার করছে বাইডেন প্রশাসন। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত থেকেই বিনা পয়সায় টিকা প্রদানে সবচেয়ে এগিয়ে রাখা হয়েছে বাংলাদেশকেএমন মত তাদের।

সবচেয়ে বেশি টিকা বাংলাদেশকে দেয়ার ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যকেও বিবেচনায় নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। কারণ বাংলাদেশের মতো আরো অনেক দেশের সঙ্গেই বড় বাণিজ্য রয়েছে, যদিও সেসব দেশকে টিকা প্রদানের ক্ষেত্রে এমন উদারতা দেখায়নি যুক্তরাষ্ট্র। ইন্দোনেশিয়ায় কভিড-১৯ পরিস্থিতি যথেষ্ট নাজুক ছিল। যদিও দেশটিকে দেয়া টিকার পরিমাণ বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কমই। আবার বাংলাদেশের পরেই সবচেয়ে বেশি টিকা পেয়েছে পাকিস্তান, যদিও দেশটির সঙ্গে মার্কিনদের আগের মতো উষ্ণ সম্পর্ক নেই। ফলে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি তার উন্নয়নেও উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে টিকা।

দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আরো বাড়াতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বে তাই মনোনিবেশ করেছে দেশটি। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক পাঁচ দশকের। সময়ে উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, সন্ত্রাস দমন, গণতন্ত্র, মানবাধিকারসহ অন্যান্য খাতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র গুরুত্ব পেয়ে এসেছে।

গত এক দশকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এক্ষেত্রে বিশেষ সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে রয়েছে সন্ত্রাস দমনের বিষয়টি। বিষয়ে সহযোগিতা আরো বেড়েছে ২০১৬ সালের পর।

বাংলাদেশী পণ্যের বড় বাজার রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। বাংলাদেশে উৎপাদিত পোশাকের বৃহত্তম একক বাজার যুক্তরাষ্ট্র। আর তাই দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ভারসাম্যও বাংলাদেশের পক্ষে। ২০২০-২১ অর্থবছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। যেখানে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার। আর যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি .৯৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি। কভিডের মধ্যে দুই বছরে ওঠানামার পর চলতি অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রফতানিতে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে শুধু পোশাক রফতানি প্রবৃদ্ধি ৫৩ শতাংশের বেশি।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বণিক বার্তাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রতিটি ক্ষেত্রকেই আলাদা করে দেখতে হবে। দেশটি তাদের অগ্রাধিকার অনুযায়ী সব ধরনের সম্পর্ক নিয়েই পৃথকভাবে এগিয়ে যায়। কাজেই একটা কাজ করে বিনিময়ে কিছু পেতে চায় এমন ভাবনা থেকে দেখার সুযোগ কম। এটা ঠিক যে প্রত্যেক দেশই চায় অন্য দেশের প্রতি অবদানগুলো স্বীকৃতি পাক। কোনো কিছু দিলে পাওয়ার প্রত্যাশা থাকতেই পারে।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বহুমাত্রিক বিষয় নিয়ে কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের প্রাপ্তির প্রত্যাশা কম। আবার কিছু জায়গায় প্রত্যাশা রয়েছে। ট্রেড বাড়ছে, অভিবাসন হচ্ছে, বড় আকারের রেমিট্যান্স আসছে এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। বাংলাদেশকে নিয়ে দেশটির প্রেক্ষাপট অনেক বড়। বাংলাদেশে মানবিক সহায়তা যুক্তরাষ্ট্র দেবেই। কারণ বাংলাদেশের প্রতি দেশটির দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষাপট অনেকগুলো।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন