শনিবার | মে ২১, ২০২২ | ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ 

সম্পাদকীয়

আলোকপাত

শিশু-কিশোরদের খেলার অধিকার রক্ষায় যেসব পরিকল্পনা নেয়া প্রয়োজন

ড. আদিল মুহাম্মদ খান

আমরা যদি এই ময়দানে না খেলি, তো কোথায় খেলব’—তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষা করতে গিয়ে এক নাম না জানা আট-নয় বছরের শিশুর দীপ্ত বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। গণমাধ্যম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে আমরা অনেকেই শুনেছি এই স্পষ্ট উচ্চারণ। আমাদের পাঠকদের জন্য আমরা পুরোটা শোনাতে চাই। এই স্পষ্টবাদী অকুতোভয় শিশুটি রাষ্ট্র তথা আমাদের সবার উদ্দেশে বলেছে,  

আমরা যদি এই ময়দানে না খেলি, তো কোথায় খেলব...এই ময়দানে তো আমরা খেলতেই পারি না। আমরা যদি না খেলি, তাহলে পড়ালেখার কী অবস্থা হবে। মোবাইল-কম্পিউটার চালাব, তারপর ব্লু হোয়েল (আত্মহননে উদ্বুদ্ধ করা মোবাইল গেমস) খেলে যখন মরব, তখন বলা হবে তোমরা কেন ব্লু হোয়েল খেলেছিলে? আপনারা কেন মাঠ বন্ধ করছেন...আমার বাবা-দাদা মাঠে পর্যন্ত খেলেছেন, এত প্রাচীন এই মাঠ, এত আগের এই মাঠ। আপনারা এটাকে কীভাবে ধ্বংস করবেন...

কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠ। সবুজের বিন্দুমাত্র চিহ্নবিহীন; ধুলা ধূসর এবং আকার-আয়তনে এক বিঘারও কম। মাঠকে নগর পরিকল্পনার বিচারে আদর্শ খেলার মাঠ বলার সুযোগ একেবারেই নেই। অথচ শিশুদের খেলার সুযোগ এই ঢাকা শহরের পাড়া-মহল্লায় এতই কম যে এই শ্রীহীন মাঠকে বাঁচানোর জন্য আমাদের শিশুদের এই অন্তহীন প্রয়াস। রাষ্ট্র, সরকার আমাদের সবার কাছে রেখে যাওয়া কোমলপ্রাণ শিশুটির এই অমোঘ জিজ্ঞাসা যেন তার প্রজন্মেরই কণ্ঠস্বর। আর এই তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষার আন্দোলনের ঢেউ যেন তাই ছোট্ট এক টুকরো মাঠ বাঁচানোর গণ্ডির বাইরে গিয়ে আমাদের সারা দেশের মাঠ-পার্ক-খোলা জায়গা রক্ষার বিশাল ময়দানে আছড়ে পড়ছে।

আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় তেঁতুলতলা মাঠে শিশুদের খেলার অধিকার রক্ষা পেয়েছে। এখন সারা দেশের খেলার মাঠগুলোকে সব ধরনের দখলদারিত্ব অব্যবস্থাপনার হাত থেকে মুক্ত করে শিশুদের খেলার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। তেঁতুলতলা মাঠকে কেন্দ্র করে শিশু-কিশোরদের মৌলিক দাবির সার্থক রূপায়ণ হবে তখনই। রাষ্ট্রের কাছে আমাদের শিশুদের রেখে যাওয়া অন্তহীন জিজ্ঞাসার বিপরীতে তাদের খেলার অধিকার বাস্তবায়নে রাষ্ট্র সরকারের আন্তরিক উদ্যোগ বৃহৎ পরিকল্পনা নেয়ার প্রয়োজন এখনই। 

নগরে আমাদের শিশুদের করুণ যাপিত জীবন

উন্নততর সুবিধার জন্য শহরে আসছে মানুষ। কিন্তু খেলার মাঠসহ বিভিন্ন ধরনের নাগরিক সুবিধা নগরের জনসংখ্যা অনুযায়ী পর্যাপ্ত নয়। জনস্বাস্থ্য, সামাজিকীকরণ, পরিবেশ, প্রতিবেশ প্রভৃতি গুরুত্ব বিবেচনায় খোলা স্থান, যেমন খেলার মাঠ, পার্ক ইত্যাদির গুরুত্ব অনেক। ঢাকায় স্বাধীনতার পর থেকেই ক্রমে জ্যামিতিক হারে জনসংখ্যা বাড়তে থাকলে এবং সেই অনুপাতে খেলার মাঠ তৈরি হয়নি। অনেক খেলার মাঠেই দখলদারিত্ব কিংবা অব্যবস্থাপনার কারণে জনসাধারণের খেলার অধিকার সংকুচিত হয়েছে। নগরের শিশু-কিশোর-কিশোরী কিংবা তরুণরা সুস্থ বিনোদনের সুযোগের অভাবে শারীরিক মানসিকভাবে অসুস্থতার মুখোমুখি হচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে। পতনের অশনিসংকেত বেজেছে অনেক আগেই। কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষার প্রচেষ্টা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায় কর্তব্য পালনের বিষয়টি তাই পুনর্বার স্মরণ করিয়ে দিল।

স্বাস্থ্য অবকাঠামো হিসেবে আমাদের খেলার মাঠ

আধুনিক নগর পরিকল্পনায় বিনোদন সুবিধার পাশাপাশি খেলার মাঠ-পার্ক-উদ্যানকে স্বাস্থ্য অবকাঠামো বিবেচনা করা হয়। একই সঙ্গে ধরনের নাগরিক সুবিধাদি সমাজে অপরাধের প্রবণতাও কমায় বহুলাংশে। ফলে ধরনের মাঠকে কেন্দ্র করে সামাজিক সম্পর্ক-যোগাযোগ কমিউনিটিভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ফলে খেলার মাঠকে শৃঙ্খলা নিরাপত্তা অবকাঠামো হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে। আমরা সবাই জানি, আমাদের নগর এলাকায় সুস্থ বিনোদনের অভাবে শিশু-কিশোরদের অনেকেই মাদকাসক্তি, কিশোর গ্যাংসহ নানা ধরনের অপরাধে জড়িত হয়ে পড়েছে। অনেকেই অবসাদগ্রস্ত বিষণ্ন হয়ে পড়ছে। শুধু থানা বা জেলখানা নির্মাণের মাধ্যমে এই ভয়ংকর সামাজিক সমস্যা দূর করা সম্ভব হবে না।

খেলার মাঠ একটি ঘনবসতিপূর্ণ শহরের জন্য ফুসফুস হিসেবে কাজ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য নয় বর্গমিটার খোলা জায়গা থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তবে তা ঢাকা শহরে প্রতিটি ব্যক্তির জন্য খোলা জায়গা এক বর্গমিটারের কম রয়েছে। বিদ্যমান অধিকাংশ খেলার মাঠের পরিবেশ শিশু-কিশোরদের খেলার জন্য উপযোগী নয়, পর্যাপ্ত খেলার অবকাঠামোর অভাব আছে মাঠগুলোয়। নিরাপত্তার অভাব, পর্যাপ্ত সুবিধাদির অভাবে মেয়ে শিশুদের জন্য অধিকাংশ খেলার মাঠই প্রবেশযোগ্য নয়। খেলার মাঠগুলো ক্রমে কমে যাওয়ার ফলে শিশুদের শারীরিক, মানসিক সামাজিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মনোবিজ্ঞানী অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, তরুণদের দ্বারা অপরাধের মাত্রা এবং পার্কের সংখ্যা, খোলা জায়গা খেলার মাঠগুলোর মধ্যে একটি সরাসরি উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে।

নগর, মফস্বল গ্রাম: সব এলাকাতেই আছে খেলার মাঠের সংকট

স্বাধীনতার ৫০ বছর পার হয়ে গেলেও আমাদের শিশু-কিশোরদের বেড়ে ওঠার জন্য অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হিসেবে এলাকাভিত্তিক খেলার মাঠ তৈরি করে দিতে পারিনি, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক বাস্তবতা। আমাদের নগর এলাকা কিংবা মফস্বলের পাড়া-মহল্লায় যেসব খেলার মাঠ ছিল, সেই মাঠগুলোও বিভিন্ন প্রভাবশালীর দখল কিংবা নানা অবকাঠামো নির্মাণের কারণে খেলার জায়গা সংকুচিত হয়েছে কিংবা হারিয়ে গেছে। অনেক খেলার মাঠ আবার বিশেষ কিছু শ্রেণী বা গোষ্ঠীর জন্য নির্ধারিত, যেখানে সাধারণ জনসাধারণের জন্য অবারিত খেলার সুযোগ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। নগর এলাকায় কিছু খেলার মাঠকে সরকারি উদ্যোগে পুনঃউন্নয়নের মাধ্যমে দৃষ্টিনন্দন করা হলেও ঘাস নষ্ট হয়ে যাওয়ার অজুহাত দিয়ে সেখানে শিশু-কিশোরদের খেলার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। আমাদের গ্রামীণ এলাকায় শিশু-কিশোরদের সুস্থ বিনোদনের জন্য প্রয়োজনীয় মানসম্মত খেলার মাঠের সংখ্যা একেবারেই অপ্রতুল। আমাদের কিশোরীদের খেলাধুলা করার সুযোগ নগর কিংবা গ্রামীণ এলাকা সব ক্ষেত্রেই একেবারে নগণ্য। বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষা আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের রাষ্ট্র-সরকার এবং নাগরিক সমাজ-সাধারণ মানুষের যে উপলব্ধি তৈরি হয়েছে, একে কেন্দ্র করে শিশু-কিশোরসহ সবার খেলাধুলা করার অধিকারকে কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে পরিকল্পিত উপায়ে সারা দেশে প্রয়োজনীয়সংখ্যক সবার জন্য উন্মুক্ত খেলার মাঠ তৈরি করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে সঙ্গে নিয়ে যথাযথ উদ্যোগ রাষ্ট্র সরকারকে নিতে হবে।

ঢাকায় আছে খেলার মাঠের তীব্র সংকট, দখলের শিকার মাঠ

ঢাকা শহরের বিদ্যমান বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (২০১০) অনুসারে, প্রতি ১২ দশমিক হাজার জনসংখ্যার জন্য দুই থেকে তিনটি খেলার মাঠ দরকার, যার প্রতিটির আয়তন হবে ন্যূনতম এক একর। সে হিসাবে ঢাকা শহরে খেলার সুবিধা নিশ্চিত করতে হাজারখানেক খেলার মাঠ প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) ২০১৯ সালের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী ঢাকা শহরে খেলার মাঠ আছে ২৩৫টি, যার অধিকাংশই (১৪১) প্রাতিষ্ঠানিক মাঠ, যেখানে এলাকাবাসী তথা সাধারণ জনগণের প্রবেশাধিকার নেই।  বিদ্যমান বেশকিছু খেলার মাঠ বিভিন্ন ক্লাবের নামে দখল হয়ে আছে, যেখানে পাড়া-মহল্লার শিশু-কিশোরদের অবাধ প্রবেশাধিকার নেই। অনেক ক্ষেত্রেই খেলার কোনো সুযোগ নেই। ধরনের খেলার মাঠগুলো জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার জন্য আদালতের নির্দেশনা থাকলেও তার কোনো বাস্তবায়ন নেই, ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও যেন উদাসীন। অনেক খেলার মাঠ আবার বিভিন্ন মেলা কিংবা অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দেয়ার ফলে শিশু-কিশোরদের খেলার জন্য কোনো সুযোগ আর থাকে না।

ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় সবার জন্য প্রবেশাধিকার রয়েছে এমন মাঠ আছে মাত্র ৪২টি এবং বিআইপির গবেষণা অনুযায়ী ঢাকা শহরের মাত্র ১৬ শতাংশ এলাকার মানুষ খেলার মাঠের পরিষেবার মধ্যে বসবাস করে, অবশিষ্ট ৮৪ শতাংশ এলাকার মানুষ খেলার সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।


শিশু-কিশোরদের খেলার অধিকার নিশ্চিতে চাই সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনার যথাযথ বাস্তবায়ন

আমাদের শিশু-কিশোর-তরুণদের পরিপূর্ণ বিকাশের প্রয়োজনে খেলার সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য এলাকাভিত্তিক মাঠ তৈরি করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় যেন শিশু-কিশোররা স্বল্প বা পায়ে হাঁটা দূরত্বে গিয়ে খেলাধুলা করতে পারে। সব শ্রেণী-পেশা সব বয়সের মানুষের জন্য খেলাধুলার অধিকার নিশ্চিত করতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। নিচের প্রস্তাবনাগুলো এক্ষেত্রে বিবেচনা করা প্রয়োজন . নগর এলাকায় বিদ্যমান খেলার মাঠগুলোকে সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে মাঠগুলোর ব্যবস্থাপনার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ এলাকাবাসীর সমন্বয়ে কমিটি করা প্রয়োজন। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলকে খেলার মাঠসংশ্লিষ্ট পরিকল্পনায় উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। কমিউনিটিভিত্তিক সংগঠনগুলো স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলের সঙ্গে কাজ করবে। বছরের বিভিন্ন সময়ে মাঠগুলোয় খেলার প্রতিযোগিতা বিভিন্ন আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। . বিদ্যমান যেসব খেলার মাঠ ক্লাব কিংবা অন্য কারো দখলে আছে সেগুলো অবিলম্বে দখলমুক্ত করে এলাকাবাসীর খেলার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ক্লাব কিংবা অন্য কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে কোনোভাবেই খেলার মাঠের বরাদ্দ দেয়া যাবে না। . প্রতিটি ওয়ার্ড এলাকায় শিশুদের হাঁটা দূরত্বে খেলার অধিকার নিশ্চিত করতে মহাপরিকল্পনা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার মাধ্যমে খেলার মাঠ তৈরি করার উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি অব্যবহূত জমি খাসজমিগুলোকে চিহ্নিত করার মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক খেলার মাঠ তৈরি করার উদ্যোগ নেয়া এখনই দরকার। . নগর এলাকায় ভূমি পুনঃউন্নয়ন, ব্লক উন্নয়ন, ভূমি পুনর্বিন্যাস, ভূমিস্বত্ব প্রতিস্থাপনের (ট্রান্সফার অব ডেভেলপমেন্ট রাইটস বা টিডিআর) মাধ্যমে প্রয়োজনীয় খেলার মাঠ তৈরি করার উদ্যোগ নিতে হবে। নতুন বর্ধিত নগর এলাকায় ভূমি ব্যাংক তৈরি করার মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য খেলার মাঠসহ প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধাদির জন্য জায়গার সংস্থান করে রাখা দরকার। বেসরকারি সরকারি সব ভূমি উন্নয়ন প্রকল্পে জনসংখ্যা অনুপাতে বিভিন্ন বয়সের উপযোগী খেলার মাঠছোট শিশুদের খেলার স্থান (প্লে-লট), কিশোর-কিশোরীদের খেলার মাঠ (প্লে গ্রাউন্ড) বড়দের খেলার মাঠ (প্লে ফিল্ড)প্রয়োজনীয় সংখ্যায় তৈরি করতে হবে এবং পরবর্তী সময়ে কোনো অবস্থাতেই এসব মাঠের শ্রেণী পরিবর্তন করে অন্য কোনো ব্যবহার করা যাবে না। . খেলার মাঠে যথেষ্ট পরিমাণ বসার জায়গা, খেলাধুলার সরঞ্জাম এবং পর্যাপ্ত সুবিধাদি দিতে হবে। খেলার মাঠগুলোর উপযোগিতা বাড়ানোর জন্য প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মাঠগুলোয় ফ্লাডলাইটের ব্যবস্থা করা দরকার। . বিভিন্ন মেলা কিংবা অন্যান্য অনুষ্ঠানের জন্য খেলার মাঠ বরাদ্দ দেয়ার বিদ্যমান সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। খেলার মাঠে যাতে অবৈধভাবে ভাসমান বাজার/ট্রাক-রিকশা স্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহূত না হয় সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। . বিভিন্ন বয়সের শিশু-কিশোরদের চাহিদার ভিন্নতাকে মাথায় রেখে তাদের উপযোগী নানা ধরনের খেলার মাঠের পরিকল্পনা নকশা করতে হবে। এক্ষেত্রে শিশু নারীদের জন্য আলাদা বিশেষ খেলার মাঠের ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে শুধু মেয়েদের জন্য ন্যূনতম একটি খেলার মাঠ নির্ধারণ করা যেতে পারে। সরকারি মহিলা স্কুল কলেজের মাঠ এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পেতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে খেলার মাঠ রক্ষণাবেক্ষণে পর্যাপ্ত আর্থিক অন্যান্য সহায়তা দেয়া যেতে পারে। . শিশুদের খেলার স্থানের পরিকল্পনা রক্ষণাবেক্ষণে এলাকাবাসীকে এবং এলাকার শিশুদের সম্পৃক্ত করতে হবে। শিশুদের খেলার স্থানের রক্ষণাবেক্ষণে এবং -সংক্রান্ত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অব্যবহূত চত্বর/মাঠকে শিশুদের খেলার স্থান হিসেবে ব্যবহার করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। ১০. বিভিন্ন গবেষণায় বিভিন্ন শহরের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনায় দেখা গেছে শিশুরা শিশুদের অভিভাবকরা অর্ধমাইলের বেশি দূরত্বে শিশুদের খেলতে পাঠানোয় কিংবা খেলার জন্য নিয়ে যেতে আগ্রহী নন। এমনকি বড় রাস্তা অতিক্রম করে খেলার স্থানে যেতে শিশুরা উৎসাহিত হয় না এবং তা তাদের জন্য নিরাপদও নয়। ফলে পাড়া-মহল্লাভিত্তিক শিশুদের জন্য খেলার স্থান তৈরির কোনো বিকল্প নেই। ১১. ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী বৃহদায়তন প্রকল্পে কমিউনিটি স্পেস খেলার জায়গায় বন্দোবস্ত করার যে বিধান বিদ্যমান, সেগুলো বাস্তবিক অর্থে ভবনগুলোয় রয়েছে কিনা, তা দেখভাল করতে হবে। ১২. শহরের কানাগলির শেষ প্রান্ত অনেক সময় অব্যবহূত এলাকা হিসেবে পড়ে থাকে। প্রায়ই স্থানগুলো গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য, ময়লা ফেলার জন্য অথবা অন্য কোনো অপরিকল্পিত কাজে ব্যবহূত হয়। স্থানগুলো যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে শিশুদের খেলার স্থানে রূপান্তর সম্ভব। অধিক ঘনবসতিপূর্ণ স্থানে ক্ষেত্রবিশেষে রাস্তা/গলির প্রবেশমুখ গাড়ি চলাচলের জন্য বন্ধ করে দিয়ে সেই রাস্তাগুলোকে উদ্যান/শিশুদের খেলার স্থান হিসেবে পরিকল্পনা/নকশা করা সম্ভব। ১৩. বস্তি এলাকায় নিম্ন আয়ের মানুষদের আবাসন এলাকায় শিশুদের ঘনত্ব অত্যধিক হওয়ায় সেসব এলাকার শিশুদের খেলার জন্য বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। স্বল্প আয়ের মানুষ এবং বস্তির শিশুদের জন্য খেলার মাঠে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে হবে। ১৪. কর্তৃপক্ষের আওতাভুক্ত যেসব খেলার মাঠ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এবং নির্মাণকাজে দখলকৃত হয়ে আছে সেগুলোকে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। ঢাকা শহরের প্রাতিষ্ঠানিক খেলার মাঠগুলোকে শর্তসাপেক্ষে এলাকাবাসীর জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া যেতে পারে। ১৫. নতুন বিদ্যালয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে খেলার মাঠ থাকার শর্ত রয়েছে বিদ্যমান আইনে, তা যথাযথভাবে তদারক করতে হবে। স্কুলগামী ছেলে-মেয়েদের খেলাধুলায় আগ্রহী করার জন্য তাদের পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ কমাতে হবে। প্রতিদিন কমপক্ষে - ঘণ্টা করে ছেলে-মেয়েরা যাতে সক্রিয়ভাবে খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

খেলার মাঠের জন্য প্রয়োজন: মহাপরিকল্পনা, নীতিমালা, পরিকল্পনার সূচক সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ

বর্তমান সরকারের আমার গ্রাম-আমার শহর প্রকল্প উপজেলা পর্যায়ে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের যে উদ্যোগ চলমান, তার মাধ্যমে গ্রামীণ এলাকায় পর্যাপ্তসংখ্যক খেলার মাঠ তৈরি করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। সরকারিভাবে সারা দেশের নগর গ্রামীণ এলাকায় খেলার মাঠের পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য খেলার মাঠের পরিকল্পনার সূচক/মানদণ্ড (প্ল্যানিং স্ট্যান্ডার্ড) খেলার মাঠের নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

বিশ্বের অনেক দেশেই খেলার পাঠসহ গণপরিসর পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পৃথক সংস্থা থাকে। আমাদের দেশের খেলার মাঠ-পার্ক-গণপরিসর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সুনির্দিষ্ট সংস্থা গঠনের মাধ্যমে সব নাগরিকের জন্য খেলার মাঠসহ গণপরিসর সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার।

খেলার অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব

শিশু-কিশোর নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য খেলার সুবিধাপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ওয়ার্ডভিত্তিক খেলার মাঠের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে মেগা প্রকল্প হাতে নিয়ে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক খেলার মাঠ তৈরি করা সম্ভব। ব্যাপারে নগর কর্তৃপক্ষগুলোর প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা জনসাধারণের প্রাণের দাবি বিষয়ে উদাসীনতা দেখানোর কোনো সুযোগ নেই।

তোমাদের আলোয় পথ হারাবে না বাংলাদেশ

আমাদের লেখার শুরুতে বলা আমাদের ভবিষ্যতের রূপকার সেই তেঁতুলতলার শিশুদের কাছে আমরা আবার ফেরত যাই। তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষা করতে গিয়ে রোদ-বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে দিনের পর দিন যেসব নাম না জানা শিশু-কিশোর মাঠ রক্ষার জন্য অকুতোভয়ভাবে দাবি আদায়ের জন্য রাজপথে ছিলেন, তাদের সবার প্রতি রইল আমাদের হূদয় নিংড়ানো ভালোবাসা। এসব নিঃশঙ্কচিত্ত দেবদূত আমাদের আলোকবর্তিকা।

 

. আদিল মুহাম্মদ খান: নগর পরিকল্পনাবিদ; নির্বাহী সভাপতি, ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি); অধ্যাপক, নগর অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় 

ফেলো সাবেক সাধারণ সম্পাদক; বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন